ধর্ম ও জীবন

ইবাদাতের শ্রেণীবিভাগ

মুন্সি আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৩-২০১৮ ইং ০১:৫৮:৪৭ | সংবাদটি ২৬৬ বার পঠিত


মানুষ এবং আল্লাহ তায়ালার মধ্যে মূল সংযোগকারী হল ইবাদাত। ইবাদাতকারী প্রত্যেক ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার প্রিয়। ইবাদাতহীন ব্যক্তি শয়তানের বন্ধু। ইবাদাতকারী আল্লাহ তায়ালার অনুগত। ইবাদাতহীন শয়তানের তাবেদার। ইবাদাতকারী আল্লাহর আহলের জন্য উপকারী। ইবাদতহীন আল্লাহর আহলের দুশমন। তবে ইবাদাত কারী হতে হবে কোরআন ও হাদিসের পাবন্দী। তিনি নিজের মর্জি মাফিক কোনো কাজ করবেন না। প্রত্যেকটি কাজ করার আগে চিন্তা করবেন, এই কাজে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) এর সন্তুুষ্টি আছে কি না? রাসূল (সা.) এই কাজ কতটুকু, কখন, কিভাবে করেছেন? তিনি জেনে নিবেন কোনো কাজের গুরুত্ব কতটুকু। পরিশুদ্ধ অল্প আমলই একজন ইবাদাতকারীর নাজাতের জন্য যথেষ্ট। রাসূল (সা.) বলেন, তোমার দ্বীনকে পরিশুদ্ধ করে নাও। অল্প আমলই তোমার (নাজাতের) জন্য যথেষ্ট হবে।
রোগী যখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। ডাক্তার যেভাবে তাকে নির্দেশনা প্রদান করেন, সে ঠিক সেভাবেই ঔষধ সেবন করে। পথ্য মেনে চলে। এর সামান্যও কম-বেশী করে না। তাছাড়া ভুল হলে আপনজনেরা তাকে জিজ্ঞাসা করে সুধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। ডাক্তারের কথা অনুযায়ী ঔষধ সেবন না করলে তার রোগ ভালো হবেনা বলে তাকে বুঝানো হয়। ঘরের সকলে তার দিকে দৃষ্টি রাখে। কিন্তু আমার মাওলা আমাকে যে প্রেসক্রিপশন দিয়েছেন, আমি কি তার নিয়ম মেনে চলি? তাঁর বিধান আমি কখনো ছেড়ে দেই, কখনো মানতে গিয়ে নিজের মর্জি মাফিক কমিয়ে দেই, কখনো অতিভক্তি দেখাতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করি। আল্লাহ তায়ালার কোনো নির্দেশ ছেড়ে দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি নিজের মর্জি মাফিক কম করা বা বাড়াবাড়ি করাও অন্যায়।
একজন মানুষ দুনিয়াতে চলতে গেলে, অনেক কিছুরই প্রয়োজন হয়, তবে সব জিনিস বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য নয়। কোনটি অপরিহার্য, কোনটি সাধারণভাবে প্রয়োজন, কোনটি আরাম আয়েস বা সৌন্দর্য বর্ধণের জন্য। এই বিষয়টি আমরা বুঝতে পারি একজন খেটে খাওয়া গরীব মানুষের জীবনের দিকে তাকালে। সে যখন বাজারে যায় তখন সে প্রথমে চাউল, আটা কিনে এতে আবার বাজারের সবচেয়ে দামীটা বেছে নেয় না। মোটামুটি তার সাধ্য অনুযায়ী তা বেছে নেয়। তারপর তরকারী, মাছ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করে। এখানে তার বিরুদ্ধে কেউ আপত্তি করে না। তার বদনাম করে না। তার খুঁত তালাশ করে না। কিন্তু আজকাল ইবাদাতের ক্ষেত্রে তার সম্পূর্ণ উল্টো কাজটাই করা হয়। আজকাল আমরা দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে বাদ দিয়ে তার শাখা প্রশাখা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। একজন মানুষ নামাজ আদায় করে না, তাকে নিয়ে কোনো চিন্তা ফিকির নেই। বরং যে মসজিদে গেল তার খুঁত ধরায় লেগে যাই। তার ভুল সংশোধনের জন্য তার বন্ধু হতে পারি না। এর মূল কারণ আমরা ইবাদাতের শ্রেণী বিভাগ জানি না। এই কারণে কোনো ইবাদতের গুরুত্ব কতটুকু তা অনুধাবন করতে পারি না। গুরুত্ব অনুযায়ী ইবাদতের শ্রেণী বিন্যাসের ক্ষেত্রে ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রাহ) রাহে বেলায়েতে খুব সুন্দরভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি সকল ইবাদাতকে আট শ্রেণীতে ভাগ করেছেন :
১। ঈমান : ঈমান হল সকল বিষয়ের মূল। ঈমানবিহীন কোনো ইবাদত আমল গ্রহণযাগ্য নয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, সেই সত্তার কসম যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ। যে কোনো ব্যক্তিই হোক চাই সে ইয়াহুদী হোক বা খৃষ্টান হোক, আমার রিসালাত ও নবুয়তের খবর পাবে এবং আমার আনীত শরীয়তের উপর ঈমান না এনেই মারা যাবে সে জাহান্নামী। (মুসলিম)
২। হালাল রিজিক : ঈমানের পর সর্বপ্রথম দায়িত্ব হালাল জীবিকা অর্জন করা। অবৈধ উপার্জন দ্বারা জীবিকা নির্বাহকারীর কোনো ইবাদত আল্লাহ তায়ালার নিকট কবুল হবে না। আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল (সা.) বলেছেন। হে লোক সকল আল্লাহ তায়ালা পবিত্র, তিনি কেবল পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন। আল্লাহ তায়ালা রাসূলগণকে যে নির্দেশ দিয়েছেন, মুমিনগণকেও একই নির্দেশ দিয়েছেন। অতপর তিনি বলেন, হে রাসূলগণ তোমরা পবিত্র বস্তু সমূহ থেকে আহার গ্রহণ কর এবং সৎ কাজ কর। তোমরা যা কর অবশ্যই আমি সে ব্যাপারে অবগত। (আল কুরআন)
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন হে ঈমানদারগণ আমি তোমাদেরকে যে হালাল রিযিক দিয়েছি তা থেকে আহার গ্রহণ কর। (আল কুরআন)
অতঃপর রাসুল (সা.) এমন এক ব্যক্তির উল্লেখ করেন, যে ব্যক্তি সফরের কারণে এলোমেলো কেশে আলুথালু বেশে আকাশ পানে দুই হাত তুলে ইয়া রব ইয়া রব বলে আকুতি জানায়। অথচ তার খাদ্য হারাম, পোষাক হারাম, উপার্জন হারাম। এমতাবস্থায় তার ফরিয়াদ কি করে কবুল হতে পারে। (বায়হাকী শুয়াবুল ইমান)
হালাল রিযিক তালাশ করা আল্লাহ তায়ালা ফরজ করেছেন। ইহা একটি সর্বোত্তম ইবাদত। তার উপর নির্ভর করে অন্যান্য ইবাদত কবুল হওয়া না হওয়া। একদিন সায়াদ (রা.) রাসূল (সা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল আমার জন্য দোয়া করুন যেন আমি আল্লাহর নিকট যে দোয়া করি এই দোয়া যেন আল্লাহ কবুল করেন। রাসূল (সা.) তখন বলেন তুমি হালাল খাদ্য খাও তাতে তোমার সকল দোয়া কবুল হবে। রাসূল (সা.) আরও বলেন দেহের যে অংশ হারাম দ্বারা লালিত হয়েছে তা জান্নাতে যাবে না। রাসূল (সা.) অন্যত্র বলেন জীবিকা উপার্জন হালাল পন্থায় হচ্ছে না হারাম পন্থায় হচ্ছে তার প্রতি যার সতর্ক দৃষ্টি নাই। আল্লাহ তায়ালা তাকে কোন পথে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন তার দিকেও ভ্রুক্ষেপ করবেন না। ইমাম গাজ্জালী (রাহ.) কিমিয়ায়ে সায়াদাত কিতাবে উল্লেখ করেন, ইবাদতের ১০টি অংশ রয়েছে এর মধ্যে ৯টি অংশই হালাল রিযিক তালাশ করা। তিনি আরো উল্লেখ করেন যে ব্যক্তি হারাম থেকে বেঁচে থাকে আল্লাহ তার হিসাব নিতে লজ্জাবোধ করেন।
৩। বান্দার হক সম্পর্কিত হারাম : কর্মের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল : ফরজ কর্ম। ফরজ দুই প্রকার ১. করণীয় ফরজ ২. বর্জনীয় ফরজ বা হারাম। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হারাম হল অন্যের হক বা অন্যের ক্ষতি সম্পর্কিত হারাম। ভাল কাজ ও তওবা দ্বারা গুনাহ মাফ হয়ে যায় কিন্তু মানুষের হক্ব মাফ হয় না। মানুষের হক নষ্ট করে থাকলে কেবল যার হক নষ্ট করা হয়েছে তার কাছ থেকে মাফ নিলেই আল্লাহ তায়ালা মাফ করবেন। অন্যের সম্পদ দখল করা, আত্মসাৎ করা, প্রতারণা করা, কাউকে ধোকা দেওয়া, অন্যের সম্মান নষ্ট করা, গীবত বা অপবাদ দেওয়া, পিতা-মাতার অধিকার হরন ইত্যাদি। রাসুল (সা.) বলেন, একজন মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে তার মুসলিম ভাইকে হেয় মনে করে। এক মুসলিমের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান অন্য মুসলিমের জন্য হারাম।
৪। আল্লাহ তায়ালার অন্যান্য আদেশ নিষেধ বিষয়ক হারাম : আল্লাহ তায়ালার সাথে কাউকে শরীক করা। শিরক সকল ভালো কাজকে নষ্ট করে দেয়। শিরককারীকে আল্লাহ তায়ালা মাফ করেন না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর তোমার কাছে এবং তোমার পূর্বে যারা ছিল তাদের কাছে এই প্রত্যাদেশ এসেছে যে, যদি তুমি শরীক কর তাহলে অবশ্যই তোমার আমল বরবাদ হয়ে যাবে এবং নিশ্চয়ই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (সূরা : জুমার, আয়াত : ৬৫)
আল্লাহ তায়ালা আরোও বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না, এছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন, এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার সাথে শরীক করে, সে চরমভাবে গোমরাহীতে পতিত হল। (সূরা : নিসা, আয়াত : ১১৬)
মদ খাওয়া, সুদ খাওয়া, যিনা করা, ইত্যাদি।
৫। সকল ফরজ ইবাদাত : আল্লাহ তায়ালা আমাদের উপর আরো যে কাজগুলো ফরজ করেছেন যেমন নামাজ, রোজা, হজ্জ. যাকাত ইত্যাদি করা। কিন্তু আফসোস দেখা যায় একজন মানুষ নামাজে যতো পাবন্দি, হারাম থেকে বাঁচার জন্য তার কোনো পেরেশানী দেখা যায় না। নামাজ আদায় করছে, রোজা রাখছে, হজ্জ করছে আবার অন্যের হক নষ্ট করছে, হারাম উপার্জন করছে।
৬। মাকরূহে তাহরীমি ও সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ : ফরজ কাজগুলো করার পর আমাদের উচিত মাকরূহে তাহরীমি বর্জন করা ও সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ সম্পর্কিত কাজগুলো করা।
৭। সৃষ্টির কল্যাণ : নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত নফল ইবাদতের চেয়ে সৃষ্টির কল্যাণ করা বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রাণীর উপকার করা, বিপদে সাহায্য করা, কারো সাহায্য করার উদ্দেশ্যে সামান্য পথচলা, অন্যের উপকার করতে না পারলেও তার ক্ষতি করা থেকে নিজেকে হিফাজত করা। রাসুল (সা.) বলেন, সব সৃষ্টিই আল্লাহর পরিবার। তাদের মধ্যে সেই বেশী প্রিয় যে তাঁর পরিবারের জন্য বেশী উপকারী।
৮। অন্যান্য সুন্নত ও নফল : ব্যক্তিগত সুন্নাত নফল কর্ম। যে কাজগুলো রাসূল (সা.) করেছেন, করতে উৎসাহ দিয়েছেন কিন্তু না করলে কোনো আপত্তি করেননি সেই কাজগুলো এই পর্যায়ের। যে কাজগুলো রাসূল (সা.) সর্বদা করেছেন বা বেশীরভাগ সময় করেছেন কিন্তু না করলে আপত্তি করেননি আবার যে কাজ মাঝে মাঝে করেছেন কিন্তু কেউ না করলে আপত্তি করেননি তার চেয়ে পূর্বের কাজটি বেশী গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দিনে মুসলিমগণ এই অষ্টম প্রকার নিয়ে বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো বাদ দিয়ে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় এই অষ্টম প্রকার নিয়ে দলাদলি, হাঙ্গামা, ভেদাভেদ সৃষ্টি করছি। এই অষ্টম প্রকার হয়ে গেছে তাকওয়া আর বুজুর্গীর মানদন্ড। নফল ইবাদাত ফরজের ঘাটতি পূরণ করে কিন্তু নফল ফরজের সমকক্ষ হতে পারে না। মুসলিম বিশ্বে ফরজ নিয়ে কোনো ভেদাভেদ নেই, আদায়গত পদ্ধতি নিয়ে ভিন্ন মতামত আছে। এই শাখা প্রশাখাগুলোই যেন দ্বীনের মূল বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। আমরাও যার যার অবস্থান থেকে এই আগুনে ঘি ঢালছি।
আসুন সবাই ভেদাভেদ ভুলে একত্রিত হয়ে আল্লাহর দ্বীনকে আকড়ে ধরি। অন্যের ভুলগুলো গুরুত্ব অনুযায়ী বন্ধু হিসেবে সংশোধন করার চেষ্টা করি। সত্যিকার অর্থেই নিজেকে আল্লাহ তায়ালার ইবাদাতকারী বান্দা হিসেবে গঠন করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তৌফিক দান করুন। আমীন!

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT