ধর্ম ও জীবন

তাফসির

প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৩-২০১৮ ইং ০১:৫৯:২৮ | সংবাদটি ১৭০ বার পঠিত


[পূর্ব প্রকাশের পর]
বস্তুত, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান হজ্জের প্রধান অঙ্গ। বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থসমূহে এই মর্মে হাদিস বর্ণিত হয়েছে যে, রসূল (সা.) বলেছেন, ‘হজ্জ হচ্ছে আরাফাত (তিনবার)। যে ব্যক্তি ফজর হওয়ার আগে আরাফাতে অবস্থানকে ধরতে পারবে, তার হজ্জ আদায় শুদ্ধ হবে। আর মিনায় অবস্থানের জন্যে তিন দিন নির্ধারিত। যে ব্যক্তি দ্রুততার সাথে দুই দিনে কাজ সারবে, তার কোনো গুনাহ হবে না। আর যার বিলম্ব হবে, তারও কোনো গুনাহ হবে না।’
উল্লেখ্য যে, আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের নির্ধারিত সময় হচ্ছে ৯ই যিলহজ্জ যোহর থেকে ১০ই জিলহজ্জ ফজর হওয়া পর্যন্ত। ইমাম মোহাম্মদের মতে ৯ই যিলহজ্জ দিনের শুরু থেকে আরাফাতে অবস্থানের সময় হওয়া পর্যন্ত। ইমাম মোহাম্মদের মতে ৯ই যিলহজ্জ দিনের শুরু থেকে আরাফাতে অবস্থানের সময় শুরু হয়। এই মতের সপক্ষে তিনি ইমাম আহমাদ, তিরমিযী ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থে উদ্ধৃত নি¤েœাক্ত হাদিসের বরাত দিয়েছেন, হযরত ওরওয়া বিন মিযরাস বলেন, এক বছর হজ্জের সময় আমি মুযদালেফায় রাসূল (সা.) এর সাথে দেখা করলাম। তখন তিনি নামাযের জন্যে রওয়ানা হচ্ছিলেন। বললাম, হে রাসূলুল্লাহ (সা.), আমি তায়ী পর্বত থেকে এসেছি। আমার বাহক জন্তুটি এবং আমি উভয়েই ক্লান্ত। আল্লাহর কসম, এমন কোনো পাহাড়ই নেই যার ওপর আমি অবস্থান করিনি। আমার হজ্জ হবে তো?
রাসূল (সা.) বললেন, যে ব্যক্তি আমাদের এই নামাযে শরীক হয়েছে, অতপর এখান থেকে রওয়ানা হওয়া পর্যন্ত আমাদের সাথে অবস্থান করেছে এবং এর আগে এক রাত কিংবা এক দিন আরাফাতে অবস্থান করেছে, তার হজ্জ সমাধা হয়েছে এবং সে নিজের অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হয়েছে।’
উক্ত দুই মতের যেটিই গ্রহণ করা হোক রাসূল (সা.) এটাকেই অবস্থানের সময় হিসাবে নির্ধারণ করেছেন এবং আরাফায় অবস্থানের সময় যিলহজ্জের দশ তারিখের ফজর পর্যন্ত দীর্ঘয়িত করেছেন যাতে তা মোশরেকদের আরাফায় অবস্থানের সময়ের বিপরীত হয়।
এক হাদিসে হযরত মিসওয়ার ইবনে মাখরামা বলেন, রাসূল (সা.) আরাফায় আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে ভাষণ দিলেন। ভাষণে প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করলেন। তারপর বললেন, ‘আজকে বৃহত্তর হজ্জের দিন। মোশরেক ও মূর্তি পূজারীরা এই দিনে সূর্যাস্তের আগে নিষ্ক্রান্ত হতো যখন সূর্য পর্বতের মাথার ওপর এমনভাবে শোভা পেতো, যেন তার মুখে মানুষের পাগড়ি শোভা পাচ্ছে। কিন্তু আমরা সূর্য উদিত হওয়ার আগে নিষ্ক্রান্ত হবো, যাতে আমাদের নীতি মোশরেকদের নীতির বিপরীত হয়।’
হাদিস থেকে জানা যায় যে, রাসূল (সা.) কার্যত ৯ই যিলহজ্জের সূর্যাস্তের পরে আরাফা ত্যাগ করতেন। সহীহ মুসলিমে হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, ‘রাসূল (সা.) সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় অবস্থান করেন। অতপর যখন আকাশের হলুদ আভা সামান্য অবশিষ্ট আছে এবং সূর্যের গোলাকার আলো অদৃশ্য হয়েছে, তখন নিজের পিছে ওসামাকে বসিয়ে রাসূল (সা.) রওয়ানা হলেন। বাহক জন্তুর লাগাম কষে টেনে ধরে ডান হাত উঁচিয়ে এই কথা বলতে বলতে রওয়ানা হয়েছেন যে, ‘হে লোকেরা, শান্তভাবে চলো, শান্তভাবে চলো।’ যখনই কোনো পাহাড় তার সামনে এসেছে, বাহক জন্তুকে একটু ঢিল দিয়েছেন যাতে সে তার ওপর আরোহণ করতে পারে। অবশেষে মুযদালেফায় পৌঁছে একই আযানে ও দুই একামাতে মাগরেব ও এশার নামায পড়েছেন। এই দুই নামাযের মাঝখানে তিনি কোনো তাসবীহও পাঠ করেননি। তারপর তিনি ফজর পর্যন্ত শয়ন করেছেন। যখন ভোরের আলো স্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে, তখন তিনি আযান ও একামাত সহকারে ফজরের নামায পড়েছেন। অতপর বাহক জন্তুর পিঠে আরোহণ করে ‘মাশয়ারে হারামে’ এসেছেন। সেখানে কেবলামুখী হয়ে আল্লাহকে ডেকেছেন, আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব একত্ব ও মহত্ত ঘোষণা করেছেন, এভাবে আলোর প্রভাব অধিকতর উজ্জ্বল হওয়া পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে সূর্যোদয়ের আগেই রওয়ানা হয়েছেন।’
বেদ’য়াত ও শ্রেণিবৈষম্যের মূলোৎপাটন :
এই ছিলো রাসূল (সা.) এর বাস্তব কার্যধারা এবং আয়াতে এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে, ‘যখন তোমরা আরাফাত থেকে রওয়ানা হবে, তখন মাশয়ারে হারামে পৌঁছে আল্লাহর যেকের করো এবং তিনি যেমন নির্দেশ দিয়েছেন, তেমনি তাকে স্মরণ করো। তোমরা ইতোপূর্বে পথভ্রষ্ট ছিলে।’
মাশয়ারে হারাম হচ্ছে মোযদালেফা। আরাফাত থেকে রওয়ানা হয়ে এখানে পৌঁছার পর আল্লাহর যেকের করতে কুরআন নির্দেশ দিচ্ছে। অতপর একথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, তাদের পক্ষে এই যেকের করা আল্লাহর হেদায়াতের কল্যাণেই সম্ভব হয়েছে। তাই এই যেকের উক্ত হেদায়াতের জন্যে কৃতজ্ঞতার নিদর্শন। আর আল্লাহর এই হেদায়াত লাভের আগে তাদের কী অবস্থা ছিলো, তাও এই বলে স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, ‘এর আগে তোমরা পথভ্রষ্ট ছিলে।’
প্রথম যুগের মুসলমানরা উপরোক্ত সত্যটির গভীরতা ও ব্যাপকতা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতো। আরবদের ভ্রষ্টতা ও গোমরাহী ছিলো তাদের নিকটতম অতীতের ব্যাপার। তাদের চিন্তাধারা ও আকীদা বিশ্বাসের ভ্রষ্টতা এতোদূর গড়িয়েছিলো যে, তারা মূর্তি, জ্বিন ও ফেরেশতাদের পূজা করতো এবং ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর মেয়ে ও জিনদেরকে আল্লাহর স্ত্রীপক্ষীয় আত্মীয়-স্বজন মনে করতো। তাদের এ ধরনের নিকৃষ্ট, তুচ্ছ ও খাপছাড়া ধ্যান ধারণা তাদের এবাদাত উপাসনা, রীতিনীতি ও আচার আচরণকেও বিক্ষিপ্ত বিশৃঙ্খলা ও খাপছাড়া বানিয়ে দিয়েছিলো। কোনো কোনো সময় বিভিন্ন দেবদেবীর উপাসনা তারা শুধু এ জন্যে নিষিদ্ধ করে রেখেছিলো যে, তারা তাদের সাথে বিভিন্ন দেবদেবীর নানা রকম সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করতো। তাদের কোনো কোনো সন্তানকে তারা দেবদেবীর নামে মান্নত মানতো ও উৎসর্গ করতো এবং জিনদেরকে তার অংশীদার করতো। [চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT