সম্পাদকীয়

ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৩-২০১৮ ইং ০০:৩১:৩১ | সংবাদটি ১৭১ বার পঠিত

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক পাওয়া যায় না-এই অভিযোগ অত্যন্ত পুরনো। এর কারণ হচ্ছে সরকারি চিকিৎসকগণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হাসপাতালের চেয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিসেই বেশি সময় দিয়ে থাকেন। কারণ এতে কম সময়ে বেশি উপার্জন হয়। অথচ ইতোপূর্বে সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধের ব্যাপারে সরকারি নির্দেশনা দেয়া হয়। ২০০৮ সালে দেয়া আদেশে সরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, নার্সিং হোমসহ সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের চাকুরিতে কর্মরত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নিবন্ধিত চিকিৎসক, নার্স ও চিকিৎসা সহকারীদের অফিস সময়ে বেসরকারি চিকিৎসা সেবা প্রদান নিষিদ্ধ করা হয়। নির্ধারিত অফিস সময়ে বেসরকারি চিকিৎসা সেবা প্রদান করলে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হবে। লাইসেন্স ছাড়া কেউ কোন বেসরকারি চিকিৎসালয় পরিচালনা করলে তাকেও অর্থদন্ডসহ সশ্রম কারাদন্ড ভোগ করতে হবে। আদালত বেসরকারি চিকিৎসালয়ের সম্পূর্ণ বা আংশিক অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারবেন।
দেশের প্রায় সব সরকারি হাসপাতাল স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মানুষ সেবা পায় না প্রত্যাশিতভাবে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে সরকারি ডাক্তার-নার্সদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস-সরকারি খাতে চিকিৎসা ব্যবস্থার দৈন্যদশার অন্যতম কারণ হচ্ছে প্রাইভেট প্র্যাকটিস। সরকারি হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা নাসিং হোমে ডাক্তাররা নিয়মিত উপস্থিত না থাকার বিষয়টি কারও অজানা নয়। ডাক্তাররা অনেক সময় কর্মস্থলে হাজিরা দিয়েই চলে আসেন প্রাইভেট প্র্যাকটিসে। চেম্বার বা বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালে সময় দিতেই তারা বেশি পছন্দ করেন। শুধু তা-ই নয়, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে এমনও অভিযোগ রয়েছে- তারা সরকারি হাসপাতালের রোগীদের হাসপাতালে চিকিৎসা না করে প্রাইভেট চেম্বার বা ক্লিনিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এছাড়া, সরকারি হাসপাতালেও ফি নিয়ে রোগী দেখচ্ছেন অনেক চিকিৎসক। সরকারি হাসপাতালের নার্সদের বিরুদ্ধেও রয়েছে একই ধরনের অভিযোগ।
ডাক্তার-নার্সদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে বরাবরই দাবি উত্থাপিত হয় বিভিন্ন মহল থেকে। কিন্তু এ ব্যাপারে ইতোপূর্বে কর্তৃপক্ষের গরজ চোখে পড়েনি। অবশ্য বিগত এরশাদ সরকারের আমলে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিলো। তখন প্রাইভেট প্র্যাকটিসের ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলনের মুখে ভেস্তে যায় সেই পদক্ষেপ। ২০০৮ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বাধীন দশ সদস্যের রিভিউ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে অধ্যাদেশ চূড়ান্ত করা হয়। এতে প্রস্তাব করা হয়- সরকারি কর্তৃপক্ষের চাকুরিতে কর্মরত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নিবন্ধিত চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসা সহকারী কোন ব্যক্তি অফিস সময়ে বেসরকারি চিকিৎসা সেবা প্রদানে নিয়োজিত হলে তিনিও ৫০ হাজার টাকার অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন। খসড়া অধ্যাদেশে বেসরকারি চিকিৎসালয়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নিবন্ধিত চিকিৎসকের রোগী দেখাসহ বিভিন্ন চিকিৎসার জন্য চার্জ, ফি নির্ধারণে প্রস্তাব করা হয়েছে। চিকিৎসা সেবা বাবদ গৃহীত চার্জ, ফি-র রসিদ সংশ্লিষ্ট রোগী বা তার অভিভাবককে দিতে হবে এবং সেবা প্রদানকারীকেও অনুলিপি সংরক্ষণ করতে হবে। তাছাড়া, প্রাইভেট চেম্বারে রোগী এবং তাদের এটেনডেন্টসের জন্য বসার ব্যবস্থাসহ স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যথাযথ চিকিৎসা হচ্ছে না, এই অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর কারণ অসংখ্য। হাসপাতাল-স্বাস্থ্য-কেন্দ্রে রয়েছে নানা সমস্যা। ওষুধ-যন্ত্রপাতির অভাবসহ রয়েছে চিকিৎসকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারী সংকট। সেই সঙ্গে রয়েছে ডাক্তার-নার্সসহ অন্যান্যদের কর্তব্য কাজে অবহেলা। তারা অনেক সময় রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সরকারি চিকিৎসকরা সরকারি দায়িত্ব ছেড়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিসেই বেশি সময় দিতে আগ্রহী। কারণ এতে তাদের আয় বেশি। রোগী প্রতি ফি আদায় করা হয় ইচ্ছে মতো। এর বাইরে রয়েছে প্রয়োজন অপ্রয়োজনে মেডিকেল টেস্ট-এর পরামর্শ এবং এর বিনিময়ে নির্দিষ্ট অংকের কমিশন আদায় প্যাথলজি থেকে। ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তো রয়েছেই। এসব কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, হয়রানীর শিকার হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা। অথচ এইসব অনিয়ম, অব্যবস্থা আর হয়রানী বন্ধ করার জন্য উল্লিখিত চিকিৎসা অধ্যাদেশটি জারী করা হয়। কিন্তু তা কার্যকর হয়নি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT