সাহিত্য

মালজোড়া গান

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৩-২০১৮ ইং ২৩:৪২:৪৩ | সংবাদটি ১৫৬ বার পঠিত

গানের দেশ প্রাণের দেশ বাংলাদেশ। বর্তমান স্যাটেলাইট চ্যানেল আর ডিশ সংস্কৃতির যুগেও আবহমান বাংলার রকমারি গানের সুর হাটে মাঠে ধ্বনিত হয়। আধুনিক গান, সিনেমার গান, হিন্দি-ইংরেজি গান ধীরে ধীরে গ্রামাঞ্চলেও ঠাঁই করে নিচ্ছে। কিন্তু লোকজীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়ানো পল্লি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদি, গম্ভীরা, জারি, সারি গান আজও এদেশের নরনারীর হৃদয় ছুঁয়ে যায়। জমকালো, হইহল্লা, গানের অনুপ্রবেশে শিল্পীর কণ্ঠে শোনা যায়-
আউল বাউল লালনের দেশে মাইকেল জ্যাকসন আইলরে/ আমার সাধের একতারা কান্দেরে/ সাধের দোতারা কান্দেরে।
এই আহাজারি থেকেও বোঝা যায়, মাটি ও মানুষের অন্তর থেকে বেরিয়ে আসা গানের প্রতি অনুরাগ এখনো আছে।
বাস্তবতায় কিন্তু লোকগীতি ও লোককবিরা অতীতের মতো সমাদৃত হচ্ছে না, এটি হয়তো যুগের ধর্ম। রাতভর পালাগান, গাজির গানের আসর এখন বসে খুবই কম। এই ধারায় কবিগান বা সিলেট অঞ্চলে কথিত মালজোড়া গানের সুদিনও এখন নেই।
অতীতে বিনোদনের এতো মাধ্যম ছিল না। রেডিও, টিভি নেই, ডিশ তো দূরের কথা। তখনো বাংলার মানুষ নীরস নিষ্প্রাণ ছিলো না। শীত মৌসুমে অথবা সুবিধাজনক সময়ে গ্রাম বাংলায় রাতে বসত গানের আসর। কারো বাড়ির উঠানে অথবা মাঠে শামিয়ানা টানানো হতো। সারা এলাকায় আগেই ছড়িয়ে পড়ত খবর। কোনো কোনো কবিয়াল বা গায়কের মধ্যে সওয়াল জবাব হবে- তা নিয়ে মুখে মুখে চলত আলোচনা। নির্ধারিত রাতে কবিয়ালরা আসতেন। আসতেন দলবল, যন্ত্রপাতি, ঢোল, দোতারা মন্দিরা নিয়ে। জ্বালানো হতো বাতাস দেয়া বড় সাইজের পেট্রোম্যাকস লাইট- লোকে বলত ডেলাইট। দু’পক্ষ বসতেন দু’দিকে। চারদিকে উৎসাহী শ্রোতার দল।
মালজোড়া গান আসলে প্রশ্নোত্তরভিত্তিক। কার বিদ্যার ও জ্ঞানের বহর কতো, শ্রোতারা তা দেখার জন্য কান খাড়া। এক পক্ষের মূল গায়ক দোতারা অথবা বেহালা হাতে দাঁড়ালেন। বন্দনা শেষে প্রতিপক্ষের উদ্দেশে ছুঁড়ে দিলেন প্রশ্ন। যেমন-
মানব দেহ আল্লাহ তালা কয় চিজে বানায়/ তাহার বিবরণসহ বলিবেন সভায়।/ সকল শ্রোতারা বসে আছেন উত্তরের লাগিয়া/ দেখি আমার প্রতিপক্ষ কী যান বলিয়া।
সুরে সুরে প্রশ্নের পর উত্তরের পালা। এবার দাঁড়ালেন প্রতিপক্ষ। ভণিতা বন্দনা শেষে দিলেন উত্তর-
বেশ ভালো প্রশ্ন করলেন প্রতিদ্বন্দ্বী ভাই/ শুনেন তবে প্রশ্নের উত্তর আসরে জানাই।/ চার চিজে মাবুদ আল্লা আদম বানাইয়া/ আগুন, পানি, মাটি, হাওয়া দিলেন মিশাইয়া।
উত্তর শেষে নিজেও গানে গানে ছুঁড়ে দেন প্রশ্ন। এভাবে জমে উঠত মালজোড়া গানের আসর। কৌতূহলী লোকজন রাতভর শুনতেন এই কবির লড়াই। পরে হাটেবাজারে এ নিয়ে চলত বেশ কয়েক দিন আলাপ-আলোচনা।
কবিয়ালদের সম্মান দিত মানুষ। বিত্তবান কেউ অথবা গ্রামের লোক চাঁদা তুলে দিতেন তাঁদের সম্মানী। অনেক কবির এটিই ছিল পেশা। সাধারণ লোকের বিনোদনের পাশাপাশি এক ধরনের লোকশিক্ষাও এতে হয়ে যেত। দেহতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব, আসমান জমিন, নারী পুরুষ সম্পর্কিত সূক্ষ্ম প্রশ্নোত্তর শুনে মানুষ মুগ্ধ হয়ে যেত। গান রচনার এবং সুরে সুরে গাওয়ার দক্ষতা ছিল কবিয়ালের স্বাভাবিক। উপস্থিত বুদ্ধি ছিল তাদের প্রখর। আজও এ ধারাটি আছে। তবে আগের মতো এর সমাদর নেই।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT