সাহিত্য

পার্বত্য তথ্য কোষ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৩-২০১৮ ইং ২৩:৪৩:০৮ | সংবাদটি ১০৪ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রসঙ্গক্রমে ভূষণছড়া গণহত্যার বিষয়টি আলোচিত হয়। তখন কিছু ভুক্তভোগী ভোটার নিজেদের ক্ষোভ দুঃখ নিয়ে সোচ্চার হোন। এই ক্ষোভ দুঃখ স্থানীয় সহ জাতীয় পত্র পত্রিকায় আত্মপ্রকাশ করে। আলোচনার বিষয়টি ছিলো অত্যন্ত মর্মান্তিক। তাতে সাংবাদিক ও মানবতাবাদী মহলে সঙ্গতভাবেই দুঃখবোধ সমবেদনা ও প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তারা তথ্য প্রচারের অতীত অপারগতার ক্ষতি পূরণে এগিয়ে আসেন। বিষয়টি নিয়ে তথ্যানুসন্ধান পরিচালিত হয়। বেরিয়ে আসে তিন শতাধিক নিহতের নাম, ধাম, পরিচয়, ঘটনার নৃশংসতা ও বহু গণকবর। এসবই ৩১ মে ১৯৮৪ সালের এক অর্ধরাত্রের নৃশংসতার শিকার, যার হোতা হলো বিদ্রোহী সশস্ত্র সংগঠন শান্তিবাহিনী। ঘটনাস্থল বড়কল থানাধীন ভূষণছড়া নামক ইউনিয়ন ও তার পার্শ্ববর্তী বাঙালি। সেটেলার অধ্যুষিত এলাকা। তাদের অপরাধ হলো ঃ তারা বহিরাগত সেটেলার বাঙালি। সরকারি প্ররোচনায় তারা এতদাঞ্চলে এসে পার্বত্য জায়গা জমিতে ভাগ বসিয়েছে, যে জায়গা জমির অধিকাংশ খাস হলেও, আগে ছিলো একচেটিয়া উপজাতীয় নিয়ন্ত্রণাধীন। এই সেটেলারদের দ্বিতীয় অপরাধ হলো তারা বাংলাদেশ আর্মির ঢাল, যারা বিদ্রোহী শান্তি বাহিনীর সশস্ত্র প্রতিপক্ষ। বাঙালি হত্যা ও তাড়ানো মানে আর্মিকে দুর্বল করা এবং বেকায়দায় ফেলা যায় মানে, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও অখন্ডতাকে হীনবল করে দেয়া। তখন জুম্যাল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন এমনকি স্বাধীনতা লাভও হবে সহজ। এই হলো উপজাতীয় নৃশংসতার মূল লক্ষ্য ও কারণ।
প্রত্যক্ষদর্শী ভুক্তভোগী, এতিম ও বিধবাদের মৌখিক বর্ণনায় পাওয়া গেলো নিহতদের এক বিরাট তালিকা। তবে আগে পরে নিহত সব শহীদদের তালিকা আরো বিরাট। তা পেতে আরো অনুসন্ধানের দরকার। এখানে শুধু ৩১ মে ১৯৮৪ তারিখের ভূষণছড়াবাসী সেটেলার বাঙালি শহীদদের সংখ্যা হলো তিনশতের অধিক। তালিকা প্রস্তুত করার পর যাত্রা শুরু হলো গণকবর পরিদর্শনে। পাড়া, বন, পাহাড় ও দূর দূরান্তে তা ছড়ানো ছিটানো। দু’দিন পায়ে হেটে অত্যন্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে তার কিছু কিছু দেখা হলো। লোকালয়ে অবস্থিত প্রধান দু’টি গণকবরের অবস্থান হলো ভূষণছড়া ইবতেদায়ী মাদরাসা প্রাঙ্গণ ও প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। এখানে প্রথমটিতে এক সাথে ৩৮ জন শহীদ শায়িত আছেন এবং দ্বিতীয়টিতে আছেন ২৩ জন। বর্ণনা মতে বনে পাহাড়ে বহু কঙ্কাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তা খুঁজে দেখা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
ভুক্তভোগীদের আহাজারিতে প্রকাশ পেলো : এ পর্যন্ত সান্ত¦নামূলক কোনো সরকারি অনুদান বা ক্ষতিপূরণ তাদের ভাগ্যে জুটেনি। অথচ হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত উপজাতীয় পাবলিকরা, প্রতিশোধ ও শাস্তির ভয়ে সীমান্ত পারে গিয়ে আত্মগোপন করায়, তাদের ফিরিয়ে এনে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয়ে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। বাঙালিদের ধনমান ও প্রাণ গেলেও তাদের প্রতি সরকারসহ উপজাতি নিয়ন্ত্রিত জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ বিরূপ ও বিরাগভাজন।
কোনো বড় যুদ্ধে কয়েক ঘণ্টার ভিতর কোনো একক পরিবেশে অত্যন্ত নৃশংসভাবে এতো বিপুল সংখ্যক বেসামরিক সাধারণ লোককে কুপিয়ে পিটিয়ে গুলিতে ও আগুনে পুড়িয়ে মারার নজির ইতিহাসে বিরল। এ কাজটি শাস্তিযোগ্য ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অপরাধ হলেও, এখানে তার কোনো তত্ত্ব তালাশ ও বিচার অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা হচ্ছে না, এটা আশ্চর্যজনক। ঘটনাটি যারা ঘটিয়েছে তারা এবং ভুক্তভোগী মহলও চিহ্নিত। এ নিয়ে সে সময় বড়কল থানায় ডায়েরীও করা হয়েছে। দেশের প্রেসিডেন্টসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রায় সবাই, ঘটনাগুলোর ভয়াবহতার প্রত্যক্ষদর্শী। এ ঘটনাগুলোর বিচার নিষিদ্ধ করে কোনো ইনডেমনিটি আইনও জারি করা হয়নি। তবে দীর্ঘদিন পরে সম্পাদিত পার্বত্য চুক্তির দ্বারা সাধারণ ক্ষমা ঘোষিত হয়েছে, যা চিহ্নিত অপরাধীদের পক্ষে ছাড়পত্র বিশেষ। ভুক্তভোগী ও ফরিয়াদী নেংটি বাঙালিরা এই চুক্তি ও ক্ষমার তাৎপর্য সম্বন্ধে অজ্ঞ হলেও, গুণী ও জ্ঞানীজন বুঝেন। চুক্তি ও ক্ষমার সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার জড়িত নয়। এটা চীফ হুইপ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ ও পার্বত্য জনসংহতি সমিতি প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার মধ্যকার সমঝোতা। এটাকে সরকারি চুক্তি ও ক্ষমা বলা নেহাত প্রতারণা।
হাসনাত আব্দুল্লাহ ছিলেন সরকার নিযুক্ত সংলাপ কমিটির আহবায়ক। তাকে চুক্তি সম্পাদনের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব দেয়া হয়নি। সুতরাং এ ব্যাপারে সরকার সমূদয় দায় দায়িত্ব থেকে মুক্ত। ঘটনাটির নৃশংসতার অনুসন্ধান, তার দায় দায়িত্ব নিরুপণ, তার বিচার অনুষ্ঠানে ট্রাইবুনেল গঠন ইত্যাদি এবং দোষী বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পাকড়াও করত : ট্রাইবুনেলের নিকট সোপর্দ করতে, সরকারের পক্ষে কোনো বাধা নেই। তবে এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে বিরূপ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া স্থানীয় উপজাতি সমাজে ও আন্তর্জাতিকভাবে ঘটা সম্ভব, এটাই সরকারের বিবেচ্য। এই সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া সরকারের উপর অতিমাত্রিকভাবে ক্রীয়াশীল। অথচ এটি আসলে আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদিত অপরাধ। দুনিয়াবাসী পক্ষপাতমূলকভাবে জানে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিরা নিরীহ আর নির্যাতিত। বিপরীতে তারাও যে গুরুতর অনেক নৃশংসতা ও অপরাধের হোতা, এ কথা বিচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অবগত হলে, তারা ধিক্কার জানাতো অবশ্যই। বাংলাদেশ আর বাঙালিদের অনেকে বিপক্ষদের বিরুদ্ধে অনেক বাড়াবাড়ির জন্য দায়ী। তাদের অনেকে উচ্চ পদে ক্ষমতাসীন থাকাকালে নিজেদের কু কর্মের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হওয়ার আশঙ্কায়, অনুরূপ বিচার অনুষ্ঠানের বিরোধী। তারা পক্ষে বিপক্ষে বিচার অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রভাব খাটাচ্ছেন।
আমাদের অভিমত : বিচার এক তরফা কাম্য নয়। দেশ ও বাঙালি পক্ষের অপরাধীদেরও রেহাই দেয়া উচিত হবে না। নির্যাতিত উপজাতিদের পক্ষেও রাষ্ট্রকে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে, দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের জন্য সোপর্দ করা আবশ্যক। সাধারণভাবে অভিযুক্ত পক্ষ হলো : জনসংহতি সমিতি ও তার সশস্ত্র অঙ্গ সংগঠন শান্তিবাহিনী। এই সংগঠন দুটির কারা গণহত্যার মত গুরুতর নৃশংসতার জন্য দায়ী, জীবিত ফরিয়াদীদের সাক্ষ্যে ও দলিল পত্রের মাধ্যমে তা নির্ণয় করা সম্ভব। সুশাসন, ন্যায় বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে, অপ্রিয় হলেও সরকারকে গণহত্যার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিশেষে আমাদের শেষ আবেদন : এখানকার বিপুল এতিম, বিধবা ও দুস্থদের প্রতি সরকার সদয় হোন।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন : ভূষণছাড়া গণহত্যা-২
স্থানীয় ভুক্তভোগী প্রত্যক্ষদর্শী মুরুব্বিদের বর্ণনায় মর্মন্তুদ বর্ণনা পাওয়া গেলো। তারা জানালেন ৩০ মে তারিখ দিনের বেলায় খবর রটে যায় সামনের রাত্রেই শান্তিবাহিনী জ্বালাও পোড়াও মার দাঙ্গা শুরু করতে যাচ্ছে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু করার কিছু ছিলো না। বাঙালিরা নিরস্ত্র। নিরাপদ আত্মগোপনের বা পালাবার জায়গাও নেই। বাড়ি ঘর ছেড়ে পাহাড় বনে লুকাতে গেলে, সেখানেও শান্তিবাহিনী ও বিদ্বিষ্ট পাহাড়ীরা ওৎ পেতে বসা। সরকারের পক্ষে শান্তিরক্ষী হিসেবে কিছু ভি,ডি,পি সদস্য, আর্মি আর বিডিআর সৈনিক। তাও যথেষ্ট নয়। তাদের ক্যাম্প অনেক দূরে দূরে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সেটেলার বসতিগুলো পাহারা দেয়া ও নিরাপদ রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং নিরূপায় আল্লাহ ভরসা, যা হবার হবে। এরূপ অনিশ্চয়তা ও ভয়ের ভিতরই নিজ নিজ বাড়ি ঘরে থাকতে হলো। সবার জানামতে নদী তীরবর্তী সেটেলার বসতিগুলোর পিছনে সংলগ্ন পাহাড় ও বনে শান্তি বাহিনী ও তাদের দোসররা অবস্থিত। সালিশ বিচার ও চাঁদা দান উপলক্ষে কোনো কোনো বাঙালির সেখানে যাতায়াত ও কমান্ডার মেজর রাজেশের সাথে সাক্ষাত সম্পর্ক ছিলো। বিপদের আশঙ্কায়, স্থানীয় সেটেলার বাঙালিদের পক্ষে, ঐ কামান্ডারের দয়া ভিক্ষা করে দু’একজন লোক চেষ্টাও করেন। কিন্তু তা নিষ্ফল হয়।
এই ভয়াল রাতের প্রথম শহীদ হলো শেফালী বেগম নামের ২০ বছরের এক যুবতী, সে থমথমে অবস্থা অবলোকন ও প্রাকৃতিক কাজ সারার জন্য রাত আনুমানিক আটটায় ঘরের বাহির হয়েছিলো। সে জানতো না ইতোমধ্যে শান্তিবাহিনীর যাতায়াত ও সমাবেশ হওয়া শুরু হয়ে গেছে। সামনে পড়ে যাওয়ায় শেফালীকেই গুলিতে প্রথম প্রাণ দিতে হলো। কলা বন্যা গোরস্তান, ভূষণছড়া, হরিনা হয়ে ঠেকামুখ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিরাট এলাকা জুড়ে সন্ধ্যা থেকে আপতিত ভয়াল নিস্তব্ধতা। কুকুর শিয়ালের ও সাড়া নেই। আর্মি, বিডিআর, ভিডিপি সদস্যরাও ক্যাম্প বন্দি। অতর্কিতে বাহির দিক থেকে রাত আটটায় ধ্বনিত হয়ে উঠলো, শেফালী হত্যার সাথে জড়িত ঐ গুলির শব্দটি। তৎপরই ঘটনাবলীর শুরু। চতুর্দিকে ঘর বাড়িতে আগুন লেলিহান হয়ে উঠতে লাগলো। উত্থিত হতে লাগলো আহত নিহত লোকের অনেক ভয়াল চিৎকার এবং তৎসঙ্গে গুলির আওয়াজ, জ্বলন্ত গৃহের বাঁশ ফোটার শব্দ, আর আক্রমণকারীদের উল্লাস মুখের হ্রেসা ধ্বনি। এভাবে হত্যা, অগ্নিসংযোগ আর্তচিৎকার ও উল্লাসের ভিতর এক দীর্ঘ গজবী রাতের আগমন ও যাপনের শুরু। চিৎকার, আহাজারি ও মাতমের ভিতর রাতের পর সূর্যোদয়ে জেগে ওঠলো পর্যুদস্ত জনপদ। হতভাগ্য জীবিতরা আর্তনাদে ভরে তুললো গোটা পরিবেশ। অসংখ্য আহত ঘরেও বাহিরে। লাশে লাশে ভরে আছে পোড়া ভিটা পথঘাট ও পাড়া। সবাই ভীত বিহবল। এতো লাশ এতো রক্ত আর এতো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, এক অর্ধরাতের ভিতর এলাকাটি বিরান। অদৃষ্ট পূর্ব নৃশংসতা। অভাবিত নিষ্ঠুরতা। ওয়ারলেসের মাধ্যমেই এই ধ্বংসাত্মক দুর্ঘটনার কথা, স্থানীয় বিডিআর ও আর্মি কর্তৃপক্ষ উর্ধ্বমহলে অবহিত করেন। শুরু হয় কর্তৃপক্ষীয় দৌড়, ঝাপ, আগমন ও পরিদর্শন। চললো লাশ কবরস্থ করার পালা ও ঘটনা লোকানোর প্রক্রিয়া। ঘটনাটি যে কতো ভয়াবহ, মর্মন্তুদ আর অমানবিক এবং শান্তি বাহিনী যে কতো হিং¯্র পাশবিক চরিত্র সম্পন্ন ও মানবতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক সংগঠন, তা প্রচারের সুযোগটাও পরিহার করা হলো। খবর প্রচারের উপর জারি করা হলো নিষেধাজ্ঞা। ভাবা হলো : জাতীয়ভাবে ঘটনাটি বিক্ষোভ ও উৎপাতের সূচনা ঘটাবে। দেশ জুড়ে, উপজাতীয়রা হবে বিপন্ন।
[চলবে]

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT