সম্পাদকীয়

সড়কে মৃত্যুর মিছিল কি নিছক দুর্ঘটনা

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৩-২০১৮ ইং ০৩:০৯:৪২ | সংবাদটি ১১৮ বার পঠিত

প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মরছে। আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করছে অনেকে। পরিবার-পরিজন পথে বসছে। কিন্তু দুর্ঘটনা প্রতিরোধে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ দৃশ্যমান নয়। আর এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামীদিনে সড়ক দুর্ঘটনা হয়ত অন্যতম প্রধান জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হবে। গেল বছর সড়ক দুর্ঘটনা দিবসও পালিত হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ নিয়ে বিস্তর আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু তাতে সড়ক দুর্ঘটনা কমেনি, কমবেও না। পত্রিকার পাতা খুললেই যে কেউ এটা উপলব্ধি করতে পারবেন। এজন্য বেশি বুদ্ধির প্রয়োজন হবে না। আসল কথা সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে, অন্তত দুর্ঘটনাকে ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসতে যেসব পদক্ষেপ কার্যকর করা দরকার বাস্তবে তা আদৌ হচ্ছে না।
বিশ্বের সড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের নাম রয়েছে প্রথম সারিতে, খবরটা মোটেও সুখকর নয়। সড়ক দুর্ঘটনায় বেঘোরে মানুষ অকালে প্রাণ হারাবে, তা মেনে নেয়া যায় না। এভাবে অব্যাহত থাকলে আগামী বিশ বছরে সড়ক দুর্ঘটনার হার দ্বিগুণ হতে পারে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। এই তো গেল ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের টিপরদী এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস একটি লরিকে পেছন থেকে ধাক্কা দিলে শিশুসহ অন্তত দশজন যাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ২৩ জন। একই দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় আরও চারজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিশ্ব ব্যাংকের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে মারা যায় প্রায় ১২ হাজার মানুষ। সরকারি হিসাবমতে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে প্রতিদিন ১২ জনের মৃত্যু হয়। আর বিগত ১৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় সড়ক দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃতের সংখ্যা ছিল ৫৫ হাজার। মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার মতে, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৭ মাসে ১৪৭৩ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ২৫৮০। গত পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন ৭৬০৭ জন।
এক তথ্যসূত্রে জানা যায়, দেশের সড়ক দুর্ঘটনার ৪৪ শতাংশ ঘটে দুই বা ততধিক যানবাহনের সংঘর্ষে এবং দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহনের ২৮ শতাংশই যাত্রীবাহী বাস। মোট যানবাহনের ৪৬ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৮ শতাংশ নছিমন-করিমন-ভটভটি এবং ৪ শতাংশ অন্যান্য যানবাহন এসব দুর্ঘটনার শিকার। মোট সংঘটিত দুর্ঘটনার ৫১ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১২ শতাংশ খাদে পড়ে, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ৪ শতাংশ, ওভারলোড সংক্রান্ত কারণে ২৩ শতাংশ এবং যানবাহনের ত্রুটি ও চালকের অসর্তকতার জন্য ১০ শতাংশ দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়।
সড়ক দুর্ঘটনার কারণ কারও অজানা নয়। বিশেষ করে যারা সড়ক নির্মাণ, সড়কে যান চলাচল ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত তারা তো ভালো করেই এসব জানেন। সড়ক-মহাসড়কে যানবাহনের দ্রুতগতি ও বেপরোয়া ওভারটেকিং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ডেকে আনে। চালকদের ট্রাফিক আইন না মেনে গাড়ি চালানো দুর্ঘটনা অন্যতম কারণ। তবে কেন ট্রাফিক আইন মেনে নির্ধারিত গতিতে গাড়ি চালাতে চালকদের বাধ্য করা হচ্ছে না? কেন মাত্রাতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালিয়ে, অহেতুক ওভারটেকিং করে মানুষ হত্যা করছে? কেন হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না! কীভাবে ত্রুটিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন নিম্নমানের যানবাহন রাস্তায় যাত্রী বা মালামাল বহন করে? এসব দেখভালের কী কেউ নেই? এছাড়া কারিগরি নির্মাণ ত্রুটি, অপরিকল্পিত বাঁক, শোল্ডারবিহীন অপ্রশস্ত সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনার প্রবণতা বেশি থাকে। রাস্তার প্রকল্প প্রণয়ন, নির্মাণ তদারকির জন্য সরকারের একটি মন্ত্রণালয়-বিভাগ রয়েছে। সেখানে কর্মরত রয়েছেন উচ্চশিক্ষিত, দক্ষ, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একদল প্রকৌশলী। সাধারণ মানুষের ঘামঝরা অর্থে তাদের বেতন-ভাতা দেয়া হয়। কেন তবে রাস্তার এমন বেহাল দশা! খবরের কাগজে বেরিয়েছে, বর্তমানে দেশের ২১ হাজার কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়কের মধ্যে ১৬ হাজার কিলোমিটারই বিধ্বস্ত। যান চলাচলের অনুপযুক্ত। সড়কের ওপর হাটবাজার বসানো, বাসে-ট্রাকে অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহন করা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বরত ব্যক্তিবর্গ বসে কী করেন? কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই যার-তার হাতে ড্রাইভিং লাইসেন্স তুলে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে বিআরটিএর বিরুদ্ধে। কীভাবে দীর্ঘকাল ধরে এক শ্রেণীর দালালচক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে ড্রাইভিং লাইসেন্সপ্রত্যাশী চালকগণ- এ প্রশ্নের জবার কে দেবে? কেন এসব অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় না, কেমন করে গাড়ির হেলপারের হাতে চলে যায় গাড়ির স্টিয়ারিং-এসব প্রশ্ন স্বভাবতই জনমনে প্রতিনিয়ত উঁকি দেয়।
গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণে দাঁড়িয়েছে যার মধ্যে নিবন্ধিত যানবাহনের চেয়ে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ড্রাইভারের সংখ্যা অনেক কম। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, দেশের ৬১ শতাংশ যানচালকের বৈধ লাইসেন্স নেই। সারাদেশে বর্তমানে যেসব ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল করছে যার বেশির ভাগই যাত্রীবাহী বাস। সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ছাড়াও অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও অনেক। এছাড়া সড়ক অবরোধ, গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ সব মিলিয়ে বৎসরে গড়ে ৫ হাজার কোটির বেশি টাকার সম্পদ নষ্ট হয় যা বাংলাদেশের মোট জিডিপির প্রায় শতকরা দেড় ভাগ।
সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাকে দুর্ঘটনামুক্ত রাখতে সড়ক-মহাসড়কের প্রযুক্তিগত নির্মাণ কাঠামোর উন্নয়নসহ যানবাহনের নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষার দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ, গাড়ি চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে সর্বোচ্চ কঠোরতা অবলম্বন করা অত্যাবশ্যক। লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা গাড়ি চলাচল চিরতরে বন্ধ করাসহ মহাসড়কে অনুমোদিত গতিবেগের ঊর্ধ্বে যানচলাচল বন্ধ করা, মহাসড়কে স্পিড ইন্ডিকেটর স্থাপনসহ ভ্রাম্যমাণ ট্রাফিক পুলিশের নজরদারি বৃদ্ধি, শহরাভ্যন্তরের সড়কে পথচারীদের যত্রতত্র রাস্তা পরাপার নিষিদ্ধ করাসহ পথচারীদের জেব্রাক্রসিং ও ওভারব্রিজ ব্যবহারে বাধ্য করতে হবে। উল্টোপথে গাড়ি চালানো বন্ধ করতে সড়কে ট্রাফিক পুলিশের নজরদারি ও সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। ট্রাফিক আইন ও সিগন্যাল অমান্যকারী বেপরোয়া গাড়িচালকের বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা। প্রশিক্ষণবিহীন অদক্ষ চালককে ভুয়া লাইসেন্স প্রদানকারী বিআরটিএর অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার বিকল্প নেই। সড়ক দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটির প্রদত্ত রিপোর্টের প্রেক্ষিতে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। আর রাস্তা ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলাও জরুরি। কেননা অসচেতন পথচারী সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর জন্য বহুলাংশে দায়ী।
একটি আধুনিক ও মানসম্পন্ন ও নিরাপদ সড়ক পরিবহন দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে গতিশীল করে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর যাতায়াত, পণ্য সরবরাহ, শিক্ষায় অগ্রগতি এমন কি সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিনিময়ের ক্ষেত্রে সড়ক যোগাযোগের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও মহাসড়কগুলো অতি দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা না করলে দুর্ঘটনা বাড়বে। ছুটিছাটার দিনগুলোতে মহাসড়কে যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ থেকে। বাস মালিকরা অধিক মুনফালাভের আশায় বেশি ট্রিপ দিতে চায়। কাজেই চালককে অতি দ্রুত গতিতে বাস চালিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছুতে হয়। ফলে মহাসড়কে চলে ওভারটেকিংয়ের অশুভ প্রতিযোগিতা, বাড়ে সড়ক দুর্ঘটনা। এ ধরনের প্রবণতা বন্ধ করতে সড়ক-মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের টহল বাড়ানো দরকার। মহাসড়কে যান চলাচলের প্রচলিত যে কোনো আইন ভঙ্গের জন্য উপযুক্ত শাস্তির নিশ্চয়তাবিধান অবশ্যই ইতিবাচক ফল দেবে। সড়ক দুর্ঘটনার একটি স্থায়ী সমাধান পেতে হলে সড়কের কাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়াও সড়ক-মহাসড়কে আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত যানবাহন চলাচল ব্যবস্থাপনা চালু করার লক্ষ্যে গড়ে তুলতে হবে একটি নির্ভরযোগ্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। সড়ক-মহাসড়কের মানোন্নয়নসহ সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনাকে আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে নতুন করে ঢেলে সাজাতে পারলে সড়ক দুর্ঘটনা বহুলাংশে হ্রাস পাবে। অন্যথায় সড়কে দুর্ঘটনার নামে এ হত্যাযজ্ঞ চলতেই থাকবে। সড়কে মৃত্যু এ মিছিলের পেছনে রয়ে গেছে কারও অজ্ঞতা, অনভিজ্ঞতা, কারও বা অবহেলা তাকে দুর্ঘটনাই বা বলি কেমন করে, এতো এক ধরনের হত্যা। এ ধরনের নির্মম হত্যাযজ্ঞ অচিরেই বন্ধ হোক।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গল্পকার।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT