ধর্ম ও জীবন মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

আর্থিক জামানত : শরীয়তের দৃষ্টিতে

প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৩-২০১৮ ইং ০১:৩৪:২৫ | সংবাদটি ১৮৮ বার পঠিত

ইজারায় জামানতের একটি ধরণ হলো আর্থিক জামানত (ভরহধহপরধষ ংবপঁৎরঃু)। এ পদ্ধতিটি দোকান, গুদাম, অফিস, ফ্যাক্টরি ও বাসাবাড়ি ইত্যাদি ইজারার ক্ষেত্রে সমাজের বহুল প্রচলিত। সাধারণত ইজারা নেওয়ার সময় ভাড়াটিয়াকে দোকান বা ভূমির মালিকের নিকট অগ্রিম হিসাবে নগদ অর্থ দিতে হয়। জামানত হিসাবে নগদ অগ্রিম অর্থ নেওয়ার বিষয়টি পূর্বযুগে তেমন চালু ছিল না। গত শতাব্দিতে তা বহুল প্রচলন লাভ করেছে। আর্থিক জামানত কখনও মোটা অংকের হয়ে থাকে। আবার কখনও কম অংকের হয়ে থাকে, যা দুই-এক মাসের ভাড়ার পরিমাণ হতে পারে। ইজারা দেওয়া যেমন শরীয়তে বৈধ, তেমনি আর্থিক জামানত গ্রহণ করাও শরীয়তে বৈধ। জামানতের অর্থ আমানত হিসাবে রাখা। চুক্তিমতে পরে তা ফেরত দেওয়া হয়। তবে অনেক সময় অফেরতযোগ্য মোটা অংকের আর্থিক জামানতও গ্রহণ করা হয়, যা আসলে দখলি স্বত্বের বেচাকেনা হিসাবে গণ্য করা হয়। তাও শরীয়তে বৈধ। বিভিন্ন সরকারি মার্কেট ইত্যাদিতে এর প্রচলন দেখা যায়। এরূপ অবস্থায় উভয় পক্ষের চুক্তিটি কাগজে স্পষ্টভাবে লিখিত হতে পারে। যাতে মতানৈক্যের সম্ভবনা না থাকে। ইজারা গ্রহীতা অপরকে ভাড়া দিয়েও আর্থিক জামানত গ্রহণ করতে পারে । তাও শর্ত সাপেক্ষে বৈধ। কখনো মালিক ভাড়াটিয়া থেকে কিছু টাকা ভাড়া ব্যতীত অগ্রিম নেয়, যা আর ফেরত দেয় না। শরীয়তের দৃষ্টিতে এটা অবৈধ। যা মূলত পজিশন বিক্রি।
বর্তমান সময়ে দোকান বা ঘর ভাড়া হয় আর্থিক জামানত গ্রহণ করে। ভাড়া নেওয়ার সময় দোকান বা ভূমির মালিকের কাছে কিছু টাকা অগ্রিম দিয়ে দিতে হয়। যাকে বিভিন্ন নামে আখ্যায়িত করা হয়। তাতে স্থান, অবকাঠামো ও সুযোগ সুবিধা অনুপাতে তারতম্য হয়ে থাকে। ভাড়াটিয়া মালিককে এক সাথে কখনো মোটা অংকের জামানত দেয়, আবার কখনো সামান্য অংকের। তাও কখনো ফেরত যোগ্য হয়, আবার কখনো অফেরতযোগ্য হয়। ফেরতযোগ্য জামানত আবার কখনও কর্তনযোগ্য হয়। সেই হিসাবে বিভিন্ন বিন্যাসে অগ্রিম জামানত গ্রহণ করা হয়। সমাজে তাকে বিভিন্ন নাম দ্বারা আখ্যায়িত করা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন শব্দের প্রকাশ করা হয়। কোথাও বলা হয় সেলামি বা অগ্রিম। আর্থিক জামানতের সকল প্রকার মোটামুটি বৈধ। কেননা, ইবাদতের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো নিষিদ্ধ হওয়া। দলীয় পাওয়া গেলেই তা পালন করা যাবে। নতুবা তা বিদ‘আত হবে। আর লেনদেনের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো মুবাহ বা বৈধ হওয়া। নিষেধের দলীল পাওয়া গেলেই কেবল সেটি সম্পাদন করা অবৈধ হবে। তবে অনেক সময় আর্থিক জামানতের মাধ্যমে ইজারা নেওয়ার পরও ভাড়াটিয়া মালিকের বিভিন্ন ধরনের হয়রানির সম্মুখীন হয়। এ ব্যাপারে ইসলামে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৯১ সালে বাড়ী ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে এসকল প্রকার অনিয়ম থেকে উভয় পক্ষ বিরত থাকতে পারে।
ইজারা শব্দটি আল-আজরু শব্দ থেকে নির্গত। এর অর্থ পারিশ্রমিক, সম্মানী বিনিময় ও পুরষ্কার। পরিভাষায় ইজারা হল যেকোন বস্তুর উপকারিতা বা সুবিধা (ঁঃরষরঃু, ধফাধহঃধমব) ভাড়ার বিনিময়ে বিক্রি করা। আলাউদ্দিন আল-কাসানী রা.(মৃ. ৫৮৭ হি.) বলেন, ইজারা হলো (যে কোন বস্তুর) সুবিধা বা উপকারিতা বিক্রি করা, যা বর্তমানে বিদ্যমান নেই। বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী রহ. (মৃ. ৫৯৩ হি.) বলেন, ইজারা হলো, বিনিময় দ্বারা (কোন বস্তুর) সুবিধা ও সেবা অর্জনের জন্য চুক্তি করা। শরীয়তে ইজারা বৈধ। নিম্নে এর কয়েকটি প্রমান তুলে ধরা হলো :
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, আপনি তো ইচ্ছা করলে এর জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারেন। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, তাদের একজন বললো, হে পিতা! তুমি একে শ্রমিক হিসেবে নিযুক্ত কর, কারণ তোমার শ্রমিক হিসাবে উত্তম হবে সে ব্যক্তি যে শক্তিশালী, বিশ্বস্থ। তিনি মূসা আ. কে বললেন আমি আমার এই কন্যাদ্বয়ের একজনকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে চাই, এই শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার কাজ করবে, যদি তুমি দশ বছর পূর্ণ কর, সেটা তোমার ইচ্ছা। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। ইনশাআল্লাহ তুমি আমাকে সদাচারি পাবে।
আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত. নবী স. ও আবু বকর রা. বনী দিলের এক ব্যক্তিকে, (যে পরবতীতে বনী আবদ ইবন্ আদীর সদস্য হয়েছিল) ইজারা নিলেন। সে একজন দক্ষ পথ প্রদর্শক ছিল (খিররিত হলো দক্ষ পথ প্রদর্শক)। সে আস ইবন ওয়ায়িলের বংশের সাথে বন্ধুত্বের চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। সে লোকটি কাফির কুরাইশদের ধর্মালম্বী ছিল। তারা তাকে নিরাপদ মনে করেন; তাই তারা তাকে তাদের বাহন দু‘টি সোপর্দ করলেন ও তাকে তিন রাত পরে সওর পর্বতে দ্বারে উপস্থিত হওয়ার জন্য অঙ্গীকার নিলেন। সে তাদের নিকট তাদের দুই বাহন নিয়ে তিন রাত পরে ভোরবেলা হাযির হলো। যখন তারা যাত্রা শুরু করলেন। তাদের সাথে আমির ইবন্ ফুুহাইরা ও দীল গোত্রের পথ প্রদর্শকও চলল। সে তাদের নিয়ে মক্কার নিম্নভূমি নদীর কিনারা দিয়ে যাত্রা শুরু করল। আবূ হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, তিনি নবী স. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বললেন আল্লাহ বলেন, আমি তিন ব্যক্তির পক্ষে কিয়ামতে বাদী হব। এক ঐ ব্যক্তি যে আমার নাম দিয়ে শপথ করে চুক্তি করেছে, অতঃপর সে তা ভঙ্গ করেছে। আর ঐ ব্যক্তি যে কোন স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রি করেছে, অতঃপর তার মূল্য ভক্ষণ করেছে। আর ঐ ব্যক্তি যে কোন শ্রমিক নিয়োগ করল। তার থেকে সে যথাযথ কাজ নিল কিন্তু তার মজুরী দিল না। এ ব্যাপারে আরও অনেক দলীল কুরআন ও সুন্নাহ্য় বিদ্যমান। ফকীহগণ ইজারা বৈধ হওয়ার ব্যাপারে ইজমা পোষণ করেছেন।
জামানত শব্দটি মূলত আরবী। এর অভিধানিক অর্থ যিম্মাদারী ও কাফালত গ্রহণ। জামানত-এর সংজ্ঞায় ডক্টর সাদী বলেন, সাধারণভাবে কোন ব্যক্তি বা ঋণ বা কোন স্বত্বের দাবীর ক্ষেত্রে মূল ব্যক্তি দায়-দায়িত্বের পাশাপাশি কফিলের (মঁধৎধহঃড়ৎ) দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করা। ড. মুহাম্মদ রুয়াস কালা’জী বলেন, এঁধৎধহঃবব কোন দাবির ক্ষেতে মূল ব্যক্তির দায়িত্বের পাশাপাশি অপর কারও দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করা। ইংরেজীতে একে গ্যারান্টি বলা হয়। জামানত কয়েক ধরনের রয়েছে। এক কাফালত সূত্রে জামানত। যাকে কাফালতও বলা হয়। তা আবার কয়েক ধরনের হতে পারে। ব্যক্তিকে হাযির করার জামানত। যেমন কেউ বিচারককে বলেন, তাকে যামিন দিন, তাকে হাযির করার দায়িত্ব আমি নিলাম বা অর্থের জামানত বা কেউ কারও প্রাপ পরিশোধের ব্যাপারে কাফালাত গ্রহণ করা। যেমন বলা হয়, সে তোমার পাওনা না দিলে তুমি আমার নিকট থেকে তা গ্রহণ করবে বা তোমার পাওনা আদায়ের দায়িত্ব আমি নিলাম। ব্যাংকের এলসির ক্ষেত্রে এই রীতি অনুসৃত হয়। ক্রেতার পক্ষ থেকে ব্যাংক রপ্তানীকারকের পাওনা আদায়ের দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরকম যে কোন লেনদেনের জন্য জামানত গ্রহণ করা যেতে পারে। জামানত গ্রহণ শরীয়তে বৈধ। এর কিছু প্রমাণ নিম্নে তুলে ধরা হল: পবিত্র কুরআনে এসেছে, যে তা নিয়ে আসতে পারবে তাকে একটি উঠের বোঝা পুরুস্কার দেওয়া হবে। আমিই তার দায়িত্ব নিলাম।
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী স, কোন ব্যক্তির উপর ঋণ থাকলে তার সালাতুল জানাযা পড়তেন না। একদিন এক মৃতের জানাযা হাযির করা হল। তখন জিজ্ঞেস করলেন, তার উপর কোন ঋণ আছে কি? সাহাবীরা বললেন দুই দিনার ঋণ আছে। তখন তিনি বললেন, তোমরা তার জানাযা পড়। তখন আবু কাতাদাহ রা, বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেই দুই দীনার আদায়ের দায়িত্ব আমি নিলাম। তখন তিনি তার জানাযা পড়িয়ে দিলেন। যখন আল্লাহ তাকে বিভিন্ন এলাকায় বিজয় দান করলেন (এবং এর ফলে যুদ্ধলব্ধ মাল আসতে লাগল) তখন তিনি বললেন, আমি প্রত্যেক মুমিনের জন্য নিজের সত্তার চেয়েও বড় অভিভাবক। সে যা ঋণ রেখে যাবে তা আমার যিম্মায় থাকবে (আমি বায়তুল মাল থেকে তা আদায় করে দেব)। আর যে সকল সম্পদ সে রেখে যাবে তা তার উত্তরাধিকারীগণ (মিরাস হিসাবে) পাবে। জামানতের আরেক পদ্ধতি হলো, বন্ধক আকারে জামানত গ্রহণ করা নিজের ঋণ বা যেকোন হক উসূলের জন্য। তা স্থাবর সম্পত্তি হতে পারে। আবার অস্থাবর সম্পত্তিও হতে পারে। বন্ধকের সংঙ্গা বাহরাইনের শরঙ্গ স্ট্যান্ডার্ডে এভাবে এসেছে,বন্ধক হলো, কোন আর্থিক সম্পদ বা এ জাতীয় বস্তুকে কোন ঋণের পরিবর্তে আমানত রাখা, যাতে তা থেকে বা তার বিক্রিত মূল্য থেকে অনাদায়ের সময় (ঋণদাতা) তার পাওনা আদায় করে নিতে পারে।
দোকান ও ঘর ভাড়ার ক্ষেত্রে আর্থিক জামানত ও এ্যাডভান্স গ্রহণের পদ্ধতি নতুন উদ্ভাবিত হলেও তা প্রয়োজন, প্রচলন ও লেনদেনের মূলনীতির আলোকে বৈধ। ইসলামের প্রাথমিক যুগে তা বিদ্যমান না থাকলেও তার দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। কেননা তা মূলত এক প্রকার জামানত। আর শরীয়তে জামানত বৈধ। রাসূলুল্লাহ স. এর যুগেও জামানত প্রথা ছিল। রাসূলূল্লাহ স. নিজেই মৃত ব্যক্তির ঋণের জামানত গ্রহণ করেছেন। তা তিনি বায়তুল মালে অর্জিত মাল ফাই তথা যুদ্ধবিহীন অর্জিত সম্পদ থেকে আদায় করতেন। তবে সকল প্রকার আর্থিক জামানত ও এ্যাডভান্স গ্রহণের ক্ষেত্রে স্পষ্ট চুরি হওয়া জরুরী। যাতে পরবর্তী সময়ে তাতে কোনো ধরনের জটিলতা তৈরি না হয়। আর কোনো পক্ষের সীমালঙ্গনের সময় লিখিত চুক্তি দেখে তার সমাধান করে নিতে পারে।

 

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  • প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান (রাহ.) ও সাদাকায়ে জারিয়া
  • রাসূলের সাথে জান্নাত
  • মাতা-পিতার অবাধ্যতার শাস্তি
  •  তাফসিরুল কুরআন
  • বিশ্বনবীর কাব্যপ্রীতি
  • শতবর্ষের স্থাপত্য সিকন্দরপুর জামে মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  •  আত্মার খাদ্য
  • মানব জীবনে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা
  • সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ : ইসলাম কী বলে
  • মৃত্যুর আগে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করি
  •   তাফসীর
  • ইসলামে বিনোদনের গুরুত্ব
  • কুরআনে হাফিজের মর্যাদা
  • মদীনা রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকা-ের কেন্দ্র ছিল মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  • এতিম শিশু
  • বার্মিংহামে আল কুরআনের হাতে লেখা প্রাচীন কপি
  • রাসুলের সমগ্র জীবন আমাদের জন্য অনুকরণীয়
  • মৌল কর্তব্য আল-কুরআনের বিধান
  • Developed by: Sparkle IT