ধর্ম ও জীবন

মহানবীর মানবতাবাদ হাফিজ মাওলানা আহমদ যাকারিয়া

প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৩-২০১৮ ইং ০১:৩৬:২৭ | সংবাদটি ৩৪৬ বার পঠিত

রাসূল (সা.) সর্বদা মানুষের কল্যাণ কামনা করতেন। কাদিসিয়ায় একবার হযরত সাহল বিন হানীফ ও কাইস বিন সা’দ রা. বসা ছিলেন, এমন সময় তাঁদের সামন থেকে একজন লোকের লাশ নিয়ে যাওয়া হলে তারা তৎক্ষনাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন। তখন তাঁদেরকে বলা হল যে, এটা একজন কর প্রদানকারী বিধর্মীর লাশ। তাঁরা বললেন, রাসূল সা. একবার সাহাবাদের সাথে বসা ছিলেন, তখন একটা লাশ তাদের সামন দিয়ে নেওয়া হচ্ছিল, রাসূল সা. সে লাশ দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং সাহাবাগণও তাঁর সাথে দাঁড়ালেন। সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এটা এক ইহুদীর লাশ; রাসূল সা. বললেন, তারপরও তো সে একজন মানুষ। অর্থাৎ, একজন মানুষকে আমি দাওয়াত দিতে পারিনি বলে সে আমার হাতছাড়া হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হলো। রাসূল সা. আফসোস করছেন; কারণ তিনি এ ব্যক্তির কল্যাণ করতে পারেন নি বলে। এ লোকটিকে জান্নাতের দিকে আহবান করতে পারেন নি বলে।
একজন ইহুদী চাকর রাসূল সা. এর সেবা করত। সে অসুস্থ হলে রাসূল সা. তার সেবা-শুশ্রুষার জন্য তার কাছে আসেন। চাকরের মাথার কাছে বসে রাসূল সা. বলেন, হে বালক! ইসলাম গ্রহণ কর; সে তার বাবার দিকে তাকালে তখন তার বাবা বলেন যে, হে বৎস! তুমি আবুল কাসেম (মোহাম্মদ) সা. এর দাওয়াত গ্রহণ করে নাও। বাবার কথা শেষ হতে না হতেই সেই বালকটি ইসলাম গ্রহণ করে নেয়। তারপর রাসূল (সা.) বের হন আর বলতে থাকেন, ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর তা'আলা, যিনি তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেছেন।’
রাসূল (সা.) এরকম মানবদরদী ছিলেন। একজন ইহুদী বা বিধর্মী মানুষের প্রতিও রাসূল (সা.) এর শুভকামনা ছিল। রাসূল (সা.) সবসময় কামনা করতেন যেন কোন মানুষ কষ্ট না পায়। এমন যেন না হয় যে কোন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করা ছাড়া দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে আর জাহান্নামে গিয়ে কষ্ট পাবে। রাসূল সা. প্রতিনিয়ত কামনা করতেন যে, মানুষ যেন সর্বদা সুখী থাকে। চাই সে মুসলমান হোক বা ইহুদী, খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ যেই ধর্মেরই হোক না কেন। রাসূল সা. সর্বদা চেষ্টা করতেন যেন সকল মানুষ সুখ পায় ইহজগতে ঠিক তেমনিভাবে যেন পরজগতে প্রশান্তিতে থাকে। আর সেজন্যই কোন বিধর্মী ইসলাম গ্রহণ করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করলে রাসূল (সা.) হতাশা প্রকাশ করতেন। আর কোন বিধর্মী মৃত্যুবরণ করার আগে ইসলাম গ্রহণ করলে রাসূল (সা.) অসম্ভব খুশি হতেন।
হযরত তুফাইল বিন আমর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূল সা. তাঁকে তাঁর জাতির কাছে দা'ওয়াত দেওয়ার উদ্দেশ্যে পাঠালেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার (সত্যবাদিতার) জন্য একটি আলামত প্রদান করুন। রাসূল (সা.) বললেন, হে আল্লাহ! তাঁকে আলোকিত করুন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর দু'চোখের মাঝে আলো দান করলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহ! আমি আশঙ্কা করছি যে, আমার গোত্রের লোকেরা বলবে যে এটা একটা শাস্তি। তখন সে আলো তার লাঠির মাথায় চলে আসে। রাতের অন্ধকারে তা তমশাকে দূরিভূত করে আশপাশ আলোকিত করে ফেলতো। পরে তাঁর গোত্রকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার পর তাঁর বাবা ইসলাম গ্রহণ করেননি বটে কিন্তু তাঁর মা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর গোত্রের মধ্যে কেবল হযরত আবু হুরাইরা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর হযরত তোফায়েল (রা.) রাসূল (সা.) এর কাছে আসলেন এবং বললেন যে, আমার জাতি "দাওস" ইসলাম গ্রহণে অস্বীকার করেছে এবং আল্লাহ ও তার রাসূল (সা.) এর অবাধ্য হয়েছে। তাই আপনি তাদের জন্য বদ দোয়া করুন; তখন রাসূল সা. ক্বিবলার দিকে মুখ ফিরালেন ও তার দু হাত আসমানের দিকে উঠালেন, উপস্থিত লোকজন তখন পরষ্পর বলতে লাগল যে, তবে তো দাউস জাতি ধ্বংস হয়ে গেল। কিন্তু রাসূল (সা.) তার দোয়ার মধ্যে বললেন, হে আল্লাহ! আপনি দাওস জাতিকে হেদায়াত দান করুন! হে আল্লাহ! আপনি দাওস জাতিকে হেদায়াত দান করুন ও তাদেরকে নিয়ে আসুন, হে আল্লাহ! আপনি দাওস জাতিকে হেদায়াত দান করুন! ও তাদেরকে নিয়ে আসুন। এই হলো রাসূল (সা.) এর মানবতা। হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওবাইদ (রা.) বলেন; উহুদের যুদ্ধের দিন যখন রাসূল (সা.) এর দাঁত ভেঙ্গে যায়, কপাল ফেটে যায় এবং রাসূল (সা.) এর চেহারায় রক্ত প্রবাহিত হতে থাকে তখন তাঁকে কেউ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আল্লাহর কাছে তাদের জন্য বদ দোয়া করুন। তখন রাসূল (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ তা'আলা আমাকে এই পৃথিবীতে অভিশাপকারী ও দোষারোপকারী রূপে প্রেরণ করেন নি, বরং আল্লাহ তা'আলা আমাকে দাঈ ও রহমতস্বরূপ এই পৃথিবীবাসীর নিকট প্রেরণ করেছেন। হে আল্লাহ! আপনি আমার জাতিকে হেদায়াত দান করুন, কারণ তারা জানে না।’
হযরত আনাস রা. বলেন; উহুদের যুদ্ধের দিন যখন রাসূল (সা.) এর চেহারায় ক্ষত সৃষ্টি হয়, তার দাঁত ভেঙ্গে যায়, তার কাঁধ তীরের আঘাতে বিদ্ধ হয় এবং রাসূল (সা.) এর চেহারায় রক্ত প্রবাহিত হতে থাকে তখন রাসূল (সা.) নিজে রক্ত মুছতেছেন আর বলতেছেন যে, কিভাবে সে জাতি সফল হবে? যারা তাদের নবীর সাথে এমন আচরণ প্রদর্শন করল! অথচ সেই নবী (সা.) তাদেরকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেন।
হযরত আয়েশা (রা.) একবার রাসূল (সা.) কে জিজ্ঞাসা করলেন যে, উহুদের দিনের চেয়ে কঠিন কোন দিন কি আপনার সামনে এসেছিল? রাসূল (সা.) বললেন, আমি তোমার জাতির কাছ থেকে সবচেয়ে বেশী কষ্ট পেয়েছি তখন, যখন আমি আব্দিয়ালীল এর সন্তানদের কাছে আক্বাবার পাশে নিজেকে উপস্থাপন করেছিলাম। তখন তারা আমার আহ্বানে সাড়া দেয়নি; রাসূল (সা.) তায়েফ নেতৃবর্গ ইবনে আব্দিয়ালীল, মাসউদ ও হাবীবের কাছে ইসলামের দাওয়াত দেন ও তাদেরকে ইসলাম ও রাসূল (সা.) কে সহযোগিতা করার প্রস্তাব পেশ করেন। রাসূল (সা.) সেখানে দশ দিন অবস্থান করেন এবং সেখানকার সকল প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছান ও ইসলামের সাহায্যের জন্য বলেন। তারা রাসূল (সা.) এর দাওয়াতের প্রতি কর্ণপাত তো করেই নি বরং রাসূল (সা.) কে উল্টো অপমান করে তায়েফ থেকে বের করে দেয়। রাসূল (সা.) তাদেরকে বিষয়টি গোপন রাখার অনুরোধ করেন। কিন্তু তারা অনুরোধ তো রক্ষা করেই নি বরং তারা বলে যে, তুমি আমাদের শহর থেকে বেরিয়ে যাও এবং তারা নির্বোধ মানুষদেরকে রাসূল (সা.) এর পেছনে লেলিয়ে দেয়। রাসূল (সা.) বের হয়ে যেতে চাইলে তাদের নির্বোধ লোকেরা রাসূলের পিছু নেয় এবং তাঁকে গালিগালাজ ও চেঁচামেচি করতে থাকে। অবশেষে লোকজন রাসূল (সা.) এর কাছে জড়ো হয়ে রাসূল (সা.) এর চলার পথের দু’পাশে দাঁড়িয়ে যায়। সবাই রাসূল (সা.) কে পাথর মারতে থাকে, গালি দিতে থাকে, কটু বাক্য ছুঁড়তে থাকে ও রাসূল (সা.) কে আঘাত করতে থাকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে। আর হযরত জায়েদ রা. নিজের শরীর দ্বারা রাসূল (সা.) কে বাঁচাতে থাকেন যার ফলে তার মাথাও আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এভাবে আঘাতের কারণে রাসূল (সা.) এর দুটি জুতা রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। রাসূল (সা.) বলেন, আমি হতাশ হয়ে চলতে থাকি ও একপর্যায়ে বেহুঁশ হয়ে যাই। একসময়ে ‘কারনুস সাআ’লিব’ নামক স্থানে আমার হুঁশ আসে। আমি মাথা উঁচু করে দেখতে পাই যে, একটি মেঘের ছায়া আমাকে ঘিরে আছে। আমি তাতে হযরত জিবরাইল আঃ কে দেখতে পেলাম, হযরত জিবরাইল আঃ আমাকে বলছেন, আল্লাহ তা'আলা আপনার জাতির কথা শুনেছেন ও আপনাকে তারা যা উত্তর দিয়েছে তাও তিনি শুনেছেন। আল্লাহ তা'আলা আপনার কাছে পাহাড়ের ফেরেশতা পাঠিয়েছেন। এ জাতি সম্পর্কে আপনি যা চান তা তাকে আদেশ করতে পারেন। রাসূল (সা.) বলেন যে, পাহাড়ের ফেরেশতা আমাকে ডেকে সালাম দিল ও বলল, হে মুহাম্মদ! আল্লাহ তা'আলা আপনার জাতির কথা শুনেছেন ও আপনাকে তারা যা উত্তর দিয়েছে তাও তিনি শুনেছেন। আমি পাহাড়ের ফেরেশতা; আপনার পালনকর্তা আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন যাতে আপনি যা চান সে আদেশ আমাকে করতে পারেন। আপনি যদি এ দু’পাহাড় দ্বারা তাদেরকে পিষিয়ে দিতে ইচ্ছুক হয়ে থাকেন তবে তাই করব। রাসূল (সা.) তখন সেই ফেরেশতাকে বলেন যে, হে আল্লাহর ফেরেশতা! আমি বরং আশা করি যে, আল্লাহ তা'আলা যেন তাদের আগামী প্রজন্ম থেকে এমন মানুষ সৃষ্টি করবেন যারা আল্লাহর এবাদত করবে ও আল্লাহর সাথে কোন কিছু শরীক করবে না। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) হযরত খালেদ বিন ওয়ালিদ (রা.) এর নেতৃত্বে এক জামাতকে ‘জুযাইমা’ গোত্রের কাছে পাঠান। তাঁরা তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করেন। ‘জুযাইমা’ গোত্রের লোকেরা (ভাষাগত কারণে) ‘আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি’ সুন্দর করে বলতে পারেনি। তারা বলতে থাকে, আমরা ধর্মান্তরিত হয়েছি; আমরা ধর্মান্তরিত হয়েছি; তখন হযরত খালেদ বিন ওয়ালিদ (রা.) তাদেরকে হত্যা করতে শুরু করেন ও কিছুকে আটক করতে থাকেন। হযরত ইবনে ওমর (রা.) বলেন, এক পর্যায়ে আমাদের প্রত্যেকের কাছে তিনি বন্দীদের থেকে একেকজন করে দেন এবং বলেন যে, আমরা যেন প্রত্যেকে আমাদের হাতে আটক বন্দীকে হত্যা করি। তখন আমি বললাম, আল্লাহর শপথ, আমি আমার বন্দীকে হত্যা করব না এবং আমার সঙ্গী কেউ তার বন্দীকে হত্যা করবে না। পরে আমরা রাসূল (সা.) এর কাছে বিস্তারিত বিবরণ দিলে রাসূল (সা.) বললেন, হে আল্লাহ! খালেদ যা করেছে তা থেকে আমি দায়মুক্ত। এভাবে দু’বার বললেন। রাসূল (সা.) হযরত আলী (রা.) কে ডেকে বললেন যে, তুমি এ জাতির কাছে যাও এবং অন্ধাকার যুগের সকল কর্মকান্ড তোমার পায়ের নিচে চাপা দাও। হযরত আলী (রা.) তাদের কাছে গিয়ে তাঁদেরকে রক্তপণস্বরূপ অনেক সম্পদ প্রদান করেন। হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, সেখানে এক যুবক আটক হয়। সে বলে আমি এ গোত্রের লোক নই; আমি এখানের এক মেয়েকে ভালবাসি; আমাকে একটু তাকে দেখতে দিন, তারপর তোমাদের যা ইচ্ছা তা তোমরা আমার সাথে কর। তখন তাকে সেই মেয়েকে দেখতে দেয়া হল, মেয়েটি লম্বা শ্যামলা ছিল, যুবকটি মেয়েকে বলল, হে হুবাইশ! জীবন শেষ হওয়ার ক্ষণে তুমি সুস্থ থেক! তারপর সে কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করল। মেয়েটি তাকে বলল; তোমার জন্য আমার জীবন উৎসর্গ করলাম। তারপর সে যুবকটিকে আনা হল এবং যথারীতি হত্যা করা হল। মেয়েটি যুবকটির মৃতদেহ দেখে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চিৎকার করতে করতে সেও মারা গেল। রাসূল (সা.) এর কাছে এ খবর পৌঁছানো হলে তিনি বললেন; তোমাদের মধ্যে কি কোন দয়াবান মানুষ ছিল না? (অসমাপ্ত)

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT