পাঁচ মিশালী

‘ছিল বাসনা সুখী হইতাম’

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৩-২০১৮ ইং ২৩:২৮:৩৪ | সংবাদটি ৭১ বার পঠিত

যে ব্যক্তি তার পাশবিক কুপ্রবৃত্তিগুলো পরিত্যাগ করে সংযত জীবন গড়ে ক্ষমা ও পুরস্কার প্রত্যাশী হবে, সে অবশ্যই বাস্তবিক জ্ঞানী ও সুবিবেচক। অন্যদিকে যে ব্যক্তি পঞ্চইন্দ্রিয় সেবায় মত্ত্ব থেকে কুপ্রবৃত্তিগুলোর দাসত্ব করে ক্ষমা ও শান্তির প্রত্যাশা করে, সে নির্বোধ।
পৃথিবীতে সৃষ্ট সকল নদনদীর পানি সমুদ্রে এসে পড়লেও কিন্তু সমুদ্রের সামান্যতম পরিবর্তন ঘটতে যেমন দেখা যায় না, তেমনি রূপ, রস, গন্ধ ও প্রচুর অর্থলোভের মধ্যে থেকেও যে ব্যক্তির অন্তরে কোনো প্রকার পরিবর্তন আসে না, বা তাকে বিচলিত করতে পারে না, প্রকৃত শান্তি ও সুখ তার অন্তরের মধ্যে নিহিত থাকে। অন্তরে প্রবল ভোগের ইচ্ছা পোষণকারী ব্যক্তি কখনো শান্তি পেতে পারে না, কেননা পরশ্রীকাতর ও লোভী ব্যক্তি কখনো সুখ-শান্তি লাভ করে না।
আমরা বাল্যকাল থেকেই নিজেদের ইচ্ছাকে চরিতার্থ করার জন্য অহেতুক কিছু কাজকর্ম করে থাকি। উত্তম ও সুন্দর মতাদর্শের চেয়ে, মনুষ্যত্ব গঠনের চেয়ে, এমনকি সুখ ও মঙ্গলময় কাজগুলিকে হেয় প্রতিপন্ন করে থাকি। নিজেরা নিজেদের অধিকাংশ কাজ কর্মে পরাস্থ ও ব্যর্থ হই। তাই সুখী হওয়াতো সম্ভবই হয় না বরং দুশ্চিন্তা ও দুঃখ ব্যথায় হয়ে উঠি আকুণ্ঠ। তাই জীবনের উপর গভীর বিশ্বাস রাখুন, আত্মবিশ্বাস গঠনে সচেষ্ট হউন।
জীবনকে পবিত্র করুন, শান্ত রাখুন, ¯িœগ্ধ করুন, আনন্দময় করুন, ঘৃণা লোভের নাগপাশ থেকে মুক্ত থাকুন, পঙ্কিলতার ঊর্ধ্বে থাকার শক্তি সঞ্চয় করুন, আনন্দ গ্রহণ ও আনন্দ দানের ক্ষমতা অর্জন করে অন্তরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সুখ সমৃদ্ধির পূর্ণতায় সমৃদ্ধি ঘটিয়ে ফুলের মতো পবিত্র হয়ে ফুটে ওঠার চেষ্টা করুন দেখবেন সৃষ্টিপথের মর্মকোষের মধু পানের ক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান ও বিচারসম্পন্ন আলোয় আলোকিত হয়ে শান্তনার শান্তি অন্তরে প্রস্ফুটিত হয়ে আলো ছড়াচ্ছে। যা নিজেকে তো বটেই, সমাজ ও রাষ্ট্রকেও আলোকিত করছে। তখন সুখ-শান্তি শুধু তোমাকেই আমন্ত্রণ জানাবে।
চরিত্রের মধ্যে যদি সত্যের আলো দীপ্তিমান না থাকে, তবে জ্ঞান, গৌরব, মর্যাদা সবই বৃথা। মানুষের মূল্য চরিত্র, মনুষ্যত্ব, জ্ঞান ও কর্মের মাধ্যমে। আমাদেরকে অকপটে স্বীকার করা উচিৎ যে, আমরা এখনো চরিত্র বলে বলিয়ান হতে সক্ষম হতে পারি না বলেই আমরা সারাক্ষণ দলাদলি, ঈর্ষা ও মারামারিতে জীর্ণ ও ক্ষত বিক্ষত। ফলে আমরা একত্রিত হতে পারি না, পরস্পরকে বিশ্বাস করি না, কিঞ্চিৎ ত্যাগ স্বীকারে আমরা নির্জীব থাকি, এমনকি তিলমাত্র আত্মাভিমান ক্ষুন্ন হলে অগ্নিশর্মা হয়ে পড়ি ফলে আমাদের সরব কর্মগুলোও নির্জীব হয়ে পড়ে। মানুষ যখন দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে সক্ষম হয়, তখন নিজেরাই বুঝতে পারে, আমরা নৈতিক চরিত্রের দিক দিয়ে অনেক উন্নততর হয়েছি। উন্নত সমাজ গঠনে ব্যক্তিগত চরিত্রবান মানুষ থাকলেই তা সম্ভব। কেননা দুনিয়াতে ভালো মন্দ বলতে কিছু নেই, আমাদের উন্নত চিন্তা চেতনাই ভালো, মন্দ ও সুখী সমাজ সৃষ্টির একমাত্র পথ।
সুখ শান্তি লাভের প্রকৃতপন্থা হলো তোমার চারপাশের সবকিছুকেই সুখ শান্তিতে রাখার চেষ্টা করা। দুনিয়াতে তুমি যে পরিমাণ সুখ পেয়েছ ও দেখেছ, ঠিক তার চেয়ে একটু বেশি শান্তি সুখ রেখে যাইতে চেষ্টা কর, কারণ তোমার যখন মৃত্যুর সময় আসিবে তখন যেন, তুমি এই আত্মতৃপ্তি নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পার যে তুমি অন্তত তোমার জীবনকে অনর্থ হতে দাও নাই বরং সাধ্যমত জীবনের সদ্ব্যবহার করেছ। তাইতো সর্বদা সাধ্যমত প্রতিশ্রুতি পালনে দৃঢ় অবস্থানে থাকতে চেষ্টা করতে হবে। কেননা নিজের বিশ্বাস আর সত্যের মাধ্যমে আত্মার তৃপ্তিই স্বর্গ সুখ।
যখন যে কাজই করতে ইচ্ছা করবে, তা সেবার মনোভাব নিয়ে করতে চেষ্টা করবে, তাতে সকল কাজই মানব সেবায় রূপান্তরিত হবে। আর মানব সেবার নামে করা সমস্ত কাজই হলো ইবাদত। প্রত্যেক মানুষের কাছে পৃথিবীর একটা দেনা-পাওনা রয়েছে। আর সে ঋণ পরিশোধ করা প্রত্যেকের কর্তব্য। সেবা পরিচর্যা ও ভালোবাসা হচ্ছে সুখ শান্তি বৃদ্ধির অন্যতম প্রসাধনী। নিজে শান্তিতে থাকতে হলে, মানুষকে ভালোবাসতে ও সেবা করতে হবে এবং সেবা নিতে ও সেবা দিতে হবে। তোমার যা আছে তা দিয়েই অন্যকে সন্তুষ্ট করতে চেষ্টা করতে হবে। কেননা মানব সেবাই সর্বোৎকৃষ্ট শান্তি।
বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কুদরতের কথা চিন্তা করুন, তিনি দুইজন মানুষের চেহারা একই রকম করে সৃষ্টি করেননি, দুই মানুষের স্বভাব ও মেজাজ মর্জিও এক রকম হয় না। পৃথিবীতে সাড়ে ছয় শত কোটি মানুষ সৃষ্টি করেছেন কিন্তু প্রত্যেকের আকৃতি, প্রকৃতি, স্বভাব, রং ও রূপ একে অন্যের থেকে ভিন্নতর। পুরুষের আকৃতি পৃথক, মহিলাদের আকৃতি পৃথক। আবার জাতিতে জাতিতে আকৃতি ভিন্ন হলেও তাদের মধ্যেও একে অন্যের থেকে পৃথক বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা রয়েছে। তাই প্রত্যেক মানুষের স্বভাব ও পছন্দ ভিন্ন ভিন্ন থাকা স্বাভাবিক।
আপনি আমি কতদিনের গ্যারান্টি নিয়ে দুনিয়াতে এসেছি জানি না, তথাপি বলে থাকি আমার প্রচুর সম্পদ হলো না, অমুক জিনিষটি আমি পেলাম না। এমনিভাবে না পাওয়ার ব্যথা মনকে অশান্ত করে তোলে, ফলে মনে শান্তি পাওয়া যায় না। ধন, সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতি যতই আসক্ত হবে, ততই স্বার্থ বুদ্ধিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। ফলে রোগ, শোক, দরিদ্র, মৃত্যু, অশান্তি ইত্যাদি যন্ত্রনা তোমার উপর আধিপত্য বিস্তার করবে তোমার জীবন থেকে শান্তি হবে তিরোহিত। তাইতো সিলেটের সন্তান বাউল স¤্রাট আবদুল করিম গেয়েছেন-‘ছিল বাসনা সুখী হইতাম, দিন হতে দিন আসে যে কঠিন, করিম দিনহীন কোন পথে যাইতাম।
পারিবারিক জীবন সুন্দর ও পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করুন। বৃদ্ধ পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুখের সংসার গড়–ন। পিতা-মাতার সেবা যতœ ও সন্তানের গভীর ভালোবাসায় গড়া পরিবারে সর্বদা আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়, ফলে সংসারে শান্তি সুখের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে পারিবারিক অশান্তি শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্যহীনতা ডেকে আনতে পারে। ছোটখাটো ভুলত্রুটি মানুষের সুখ শান্তি কেড়ে নেয়। যে সুখী নয়, সে সুস্থও নয়। বস্তুজগতে কাম, ক্রোধ, লোভ, লালসা, ঈর্ষা ও প্রতিহিংসা আমাদের দুঃখ, কষ্ট, অশান্তি, অসুস্থতা ও ধ্বংসের মূল কারণ। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে নিয়মতান্ত্রিক চলার বিধান ও ফর্মুলা দিয়েই পাঠিয়েছেন অতএব জীবন বিধান মেনে চলার অভ্যাস করুন, সুখ শান্তিতে বেঁচে থাকুন। শান্তি সুখে থাকার একমাত্র পথ সর্বাবস্থায়-আত্মসমর্পণ।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT