সম্পাদকীয়

বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী নির্যাতন

প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০৩-২০১৮ ইং ০০:৫৭:২৮ | সংবাদটি ২১২ বার পঠিত

শিক্ষকের প্রহারে আহত হয়েছে শিক্ষার্থী। চোখে মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত ছাত্র এখন চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকগণ বলছেন উন্নত চিকিৎসা করা না হলে তার চোখটি অন্ধ হয়ে যেতে পারে। ঘটনাটি গত সপ্তাহের। সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার পিএইচজি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র মাহদি শিক্ষকের আক্রমণের শিকার হয়। এই শিক্ষক মাহদির পাশের ছাত্রকে বেত দিয়ে প্রহার করতে থাকলে বেতের আঘাত লাগে মাহদির বাম চোখে। বেতের প্রচন্ড আঘাতে আহত হয় মাহদি। সাথে সাথে রক্ত ঝরতে থাকে চোখে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে। পরে তাকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন করা হয়। ঘটনা তদন্তের জন্য গঠন করা হয়েছে কমিটি।
এমন ঘটনা আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। বলা যায় সারা দেশেই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়গুলোতে এই ধরনের অমানবিক ঘটনাবলী ঘটে চলেছে। শিক্ষকের প্রহারে শিক্ষার্থী আহত হওয়া, পঙ্গু হওয়া এমনকি প্রহারে শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। অথচ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারিরীক বা মানসিক প্রহার করা আইনত নিষিদ্ধ। ইতোপূর্বে সর্বোচ্চ আদালতও এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু কে শুনে কার কথা? শারিরীক প্রহার করে শিক্ষার্থীদের পড়া শেখানোর অমানবিক প্রথা চালু আছে কেবল আমাদের দেশেই। অথচ প্রহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় মনোযোগী হয় না; বরং এতে তাদের লেখাপড়ার প্রতি অনীহা জন্ম হয়, ভীতি সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব থাকে তার ভবিষ্যৎ জীবনেও। অর্থাৎ লেখাপড়ার জন্য শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করলে উল্টো তাদের শিক্ষাজীবনই ধ্বংস হয়ে যায়। তাই যেভাবেই হোক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শারিরীক বা মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে।
কারণে-অকারণে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করা হয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয় কিংবা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের। লেখাপড়ায় অমনোযোগীতা, হোম ওয়ার্ক না করা বা দুষ্টুমির অজুহাত দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের বেত দিয়ে প্রহার করা হয়। অনেক সময় স্কেল, ডাস্টার, ক্লিপ বোর্ড বা অন্য বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয় ছেলেমেয়েদের। অনেক সময় হাত দিয়েও কিল, ঘুষি, থাপ্পর মারা হয়। এছাড়াও রয়েছে আরও অনেক ধরনের নির্যাতন। যেমন- ডেস্কের নীচে মাথা ঢুকিয়ে রাখা, রোদের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখা ইত্যাদি। এই ধরনের শাস্তি শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলে। বিশেষ করে তাদের নীচের ক্লাসের শিক্ষার্থীদের সামনে এই সব শাস্তি দেওয়ার ফলে তারা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। তাদের আত্মসম্মানে আঘাত লাগে দারুণভাবে। সবচেয়ে বড় কথা এই নির্যাতনের কারণেই বিদ্যালয় ভীতি সৃষ্টি হয় ছেলে মেয়ের মধ্যে। আর বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধির এটাও একটা কারণ।
বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। অথচ সেটা কেউ মানছে না। এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, যে শিক্ষক সরকারের আইন মানে না, তার পক্ষে কি শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষা দেয়া সম্ভব? আর যদি কোনো শিক্ষার্থী লেখাপড়ায় অমনোযোগী হয়, তবে এর দায় তো শিক্ষার্থীর যতোটুকু, তার চেয়ে বেশি শিক্ষকের। কারণ একটি শিশুকে যদি বিদ্যালয়ে যথাযথভাবে পাঠ্যবই পড়ানো হয়, নির্দিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান দেয়া হয়, যদি শিক্ষকরা তার প্রতি ভালো ব্যবহার ও সুন্দর আচরণ করেন- তবে সে ক্লাসে মনোযোগী না হয়ে পারে না। আসল কথা হলো, ¯েœহ-মমতার মাধ্যমে যে বিষয়টি শেখানো হয় সেটা একজন শিক্ষার্থীর মনে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে। যা কোনোদিন সে ভুলবে না। এটাই স্বাভাবিক। বিদ্যালয় কিংবা মাদ্রাসা সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করা হোক। এ ব্যাপারে প্রয়োজনে আরও কঠোর আইন প্রণয়নের ব্যবস্থা করা দরকার বলে আমরা মনে করি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT