সম্পাদকীয়

বজ্রপাত বিষয়ে সতর্কতা

প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৩-২০১৮ ইং ০২:২০:৩৫ | সংবাদটি ২২৬ বার পঠিত

ঝড়-বৃষ্টির দিনে বজ্রপাত অতি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা। তবে ইদানিং সামান্য বৃষ্টিপাত বা ঝড়ো বাতাস হলেই ঘটছে বজ্রপাত। এতে মৃত্যুর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে বজ্রপাতের বড় কারণ বায়ু দূষণ, জলবায়ুর পরিবর্তন, মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক টাওয়ার। এছাড়া, ধাতব পিলার (ম্যাগনেটিক পিলার) চুরিকেও বজ্রপাতের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন গবেষকগণ। তারা বলছেন, এই পিলারের মধ্যে এক ধরনের বিশেষ ধাতব তার আছে। যা বজ্রপাতকে মাটিতে টেনে নেয়। কিন্তু এই পিলারগুলো চুরি হওয়ার ফলে বজ্রপাত যেখানে-সেখানে আঘাত হানছে। আকাশে মেঘের গর্জনের সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকালেই জনমনে সৃষ্টি হয় বজ্রপাতের আতংক। আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, স্বাভাবিক ইলেকট্রিসিটির চেয়ে বজ্রপাতের ক্ষমতা কয়েক হাজার গুণ বেশি। ফলে বজ্রপাতে আহত হলে মারা যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি থাকে। বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা সারা বিশ্বে বাংলাদেশেই বেশি। তবে এদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই।
আমাদের দেশে বজ্রপাতের আতঙ্ক বিরাজ করে পুরো গ্রীষ্ম ও বর্ষা মওসুম জুড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা মওসুমে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৪০টি বজ্রপাত আঘাত হানে। সাধারণত আবহাওয়া পরিবর্তনে জলীয় বাষ্পে কালো মেঘের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। এজন্য আকাশে কালো মেঘ দেখলে ঘরের বাইরে না যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞগণ। তাছাড়া, গ্রামাঞ্চলে ফাঁকা জায়গায় বজ্রপাত বেশি হয়। তাই বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে এসব জায়গায় উঁচু বাঁশের সঙ্গে বিদ্যুৎবাহী তার স্থাপন করা যেতে পারে। এই ধরনের উদ্যোগ নিলে বজ্রপাতে মানুষ ও গাছপালার ক্ষতির পরিমাণ কমবে। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মতে, ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় দশ মাইল উচ্চতায় কালো মেঘের ওপরে বিদ্যুৎ সৃষ্টি হয়। আর এই কালো মেঘ থেকে সৃষ্টি হচ্ছে বিদ্যুৎ ও বজ্রপাত। বর্ষা মওসুমের শুরু ও শেষ দিকে এই কালো মেঘের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বজ্রপাতের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায় অর্থাৎ এপ্রিল-মে এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বরে বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটে।
গবেষণায় দেখা গেছে, আকাশে যেখানে মেঘ সৃষ্টি হয় তার ২৫ হাজার থেকে ৭৫ হাজার ফুট-এর মধ্যে বজ্রপাত ঘটে বেশি। আর প্রতি সেকেন্ডে ৬০ হাজার মিটার গতিতে বজ্র বিদ্যুৎ নীচে নেমে যায়। প্রতিটি বজ্রপাতে ৫০ হাজার এম্পিয়ার বিদ্যুৎ শক্তি থাকে। যেখানে একটি বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ চলে গড়ে মাত্র ১৫ এম্পিয়ার-এ। আর একটি বজ্র অনেক সময় ৩০ মিলিয়ন ভোল্ট নিয়ে আকাশে জ্বলে ওঠে। এই বিপুল পরিমাণ তাপসহ বজ্র মানুষের দেহে আঘাত লাগার সাথে সাথেই তার মৃত্যু হয়। বিজ্ঞানীদের মতে- উষ্ণ, আর্দ্র ও শীতল জলীয় বাষ্পের পারস্পরিক সংঘর্ষে জন্ম হয় বিদ্যুৎ শক্তির। এই বিদ্যুৎ শক্তি বৃদ্ধিতে আকাশে দেখা দেয় আলোর ঝলকানী। প্রাকৃতিক ভাবেই বায়ুমন্ডলে বিদ্যুৎ সৃষ্টি হয়ে মেঘে জমা থাকে। এই বিদ্যুৎ মেঘে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জ হিসেবেই বিদ্যমান থাকে। বিপরীতধর্মী বিদ্যুৎ শক্তির দু’টি মেঘ কাছাকাছি এলেই পারস্পরিক আকর্ষণে চার্জ বিনিময় হয়। ফলে বিদ্যুৎ চমকায়। মেঘের নীচের অংশে ঋণাত্মক চার্জ গ্রহণ করে। আর ভূ-পৃষ্ঠ থাকে ধনাত্মক চার্জ। দুই চার্জ মিলিত হয়ে উর্ধ্বমুখী বিদ্যুৎ প্রবাহ প্রচ- বেগে ওপরে উঠতে থাকে। সৃষ্টি হয় উজ্জ্বল আলো। এটিই বজ্রপাত। বজ্রপাতের তাপমাত্রা ৩০ হাজার থেকে ৬০ হাজার ডিগ্রি ফারেন হাইট পর্যন্ত হয়ে থাকে।
বজ্রপাত প্রাকৃতিক দুর্যোগ; একে ঠেকানো যাবে না। সেই উপায় জানা নেই আমাদের। তবে এ ব্যাপারে সচেতনতাই সবচেয়ে জরুরি। তাই মওসুমী বায়ু বাংলাদেশে প্রবেশের প্রাক্কালে আকাশে ঘন কালো মেঘ দেখলেই সতর্ক হতে হবে। গুড়– গুড়– মেঘের ডাক শুনলেই চলে যেতে হবে নিরাপদ স্থানে। পাকা বাড়িতে আশ্রয় নেয়া নিরাপদ। গাড়ির ভেতরেও আশ্রয় নেয়া যেতে পারে। তবে গাছের নীচে, টেলিযোগাযোগের খুঁটির পাশে, বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইনের খাম্বার পাশে দাঁড়ানো নিরাপদ নয়। ফাঁকা মাঠে অবস্থানও নিরাপদ নয়। পানির সংস্পর্শে থাকা উচিত নয়। বজ্রপাতের আওয়াজ কানে আসার আগেই তা ভূমি স্পর্শ করে। বজ্রপাত সোজাসুজি মানুষের গায়ে পড়লে মৃত্যু অবধারিত। বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিকেও স্পর্শ করা বিপজ্জনক। এক্ষেত্রে শুকনো কাঠ ব্যবহার করা যেতে পারে। বজ্রপাতের পূর্বাভাস আবহাওয়া বিভাগের রাডারে ধরা পড়ার কথা। কিন্তু অনেক সময়ই আমাদের আবহাওয়া বিভাগ সেই পূর্বাভাস দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। তবে আসল কথা হলো সতর্কতা। সেই সঙ্গে বজ্রপাত নিরোধে সর্বত্র তাল গাছ লাগানো সরকারি উদ্যোগকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT