উপ সম্পাদকীয়

শিক্ষকের মর্যাদা রুদমিলা মাহবুব

প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৩-২০১৮ ইং ০২:২২:৪৯ | সংবাদটি ১১৮ বার পঠিত

‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতায় কবি কাজী কাদের নেওয়াজ তৎকালীন মোঘল সাম্রাজ্যের অধিপতি মহান বাদশা বাবরের শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের যে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন তা নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। কিন্তু সেই শিক্ষকের সম্মানই যখন এখনকার সমাজে অবলুণ্ঠিত হতে দেখি, তখন একজন শিক্ষক হিসেবে নিজেকে খুবই অরক্ষিত বোধ হয়। চিন্তা করার স্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের অধিকার একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে সকলের কাম্য। কিন্তু যখন এ স্বাধীন চিন্তাই একটি নামধারী গোষ্ঠীর অসাধু তত্পরতার কারণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন কষ্টের সীমা থাকে না। সেই মুক্তকণ্ঠকে চিরতরে বধ করে দেবার লক্ষ্যেই যেন তত্পর তারা। যারা তাদের ঝাঁজালো বাকচাতুর্যতায় উত্তপ্ত করে তোলে তরুণ হূদয়, মানুষকে করে তোলে বিবেক-বুদ্ধিহীন এবং পরিশেষে চরিতার্থ করতে চায় তাদের হীন উদ্দেশ্য। তাদের এ অসত্ উদ্দেশ্যকে বাস্তবরূপ দিতে তারা সাধারণত বেছে নেয় অল্পবয়স্ক কিশোর এবং তরুণদের।
সাধারণত মানুষের মস্তিষ্কের বুদ্ধিভিত্তিক অংশের পরিপূর্ণ বিকাশে সময় লাগে পঁচিশ বছর। অর্থাৎ পঁচিশ বছর বয়সের পর একজন মানুষের বুদ্ধির পূর্ণ বিকাশ সাধিত হয়। ফলে একজন বাকচতুর ব্যক্তি যত সহজে একজন কিশোর বা তরুণকে তার বক্তব্যের মাধ্যমে প্রভাবিত করতে পারেন, একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিষয়টি ততটা সহজসাধ্য নয়। ফলে এ ধরনের অসাধু গোষ্ঠীগুলো ব্যক্তি নির্বাচনের ক্ষেত্রে মূলত এমন একটি বয়সভিত্তিক শ্রেণিকে নির্বাচন করে যাদের সহজেই প্রভাবিত করা যায়। ধর্মকে এক্ষেত্রে তারা একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। সাধারণত সাধারণ মানুষ ধর্মের ক্ষেত্রে যতটা না যুক্তিবাদী তার চাইতে অনেক বেশি আবেগপ্রবণ এবং এই অনুভূতিটুকুকে পুঁজি করেই একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি তাদের উদ্দেশ্যকে চরিতার্থ করতে সদা সচেষ্ট। অথচ আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ (স) ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন, তবে মানুষকে বোঝানোর মাধ্যমে ইসলামের পথে দাওয়াত দেবার কথাও বলেছেন। সকল কিছুকে যদি এভাবে বিচারবুদ্ধি এবং নৈতিকতার আলোকে বিবেচনা করা হত, তাহলে একজন স্বনামধন্য শিক্ষকের প্রাণনাশে কারোর হাতে অস্ত্র উঠত না।
উল্লেখ্য, এখনকার তরুণ সমাজে নৈতিকতার চরম অবক্ষয় লক্ষণীয়। হলি আর্টিজান এবং এর পরবর্তী বিভিন্ন জঙ্গি আক্রমণ লক্ষ করলে দেখা যায়, যে তরুণ সমাজ এ ধরনের ন্যক্কারজনক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে তাদের মধ্যে অন্যায়কে অন্যায় বলে স্বীকার করে নেবার ক্ষমতাটুকুও যেন নষ্ট হয়ে গেছে। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশ একটি ধর্ম নিরপেক্ষ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলেও এখানে নেই ধর্মের অপব্যবহারকারীদের নিয়ে কথা বলার স্বাধীনতা, নেই মত প্রকাশের অধিকার। অন্তত ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের ওপর হামলা তারই সাক্ষ্য বহন করে। মূলত এ আঘাত শুধু ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের ওপর নয়, বরং তা করা হয়েছে সেই সমস্ত মুক্তচিন্তার অধিকারী এবং স্বাধীনচেতা শিক্ষক সমাজের ওপর যাঁরা তাঁদের ছাত্রদের শেখায় নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ হতে, সত্যকে সত্য, মিথ্যাকে মিথ্যা, সুন্দরকে সুন্দর আর কৎসিতকে কুিসত বলে স্বীকার করতে। আর তাই, এই বর্বর আচরণের লজ্জা আমাদের সবার।
আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি ধর্মে রীতিনীতি এবং আচার অনুষ্ঠানগত বিভেদ থাকলেও প্রতিটি ধর্মের মূলভিত্তি মূলত শান্তি এবং অহিংসা। প্রতিটি ধর্মই বলে শান্তির কথা, নৈতিকতার কথা। আর তাই সকল ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে উঠে সত্যের ব্রতে সামনে এগিয়ে চলাই হোক প্রতিটি গোষ্ঠীর মূল অনুপ্রেরণা।
লেখক : প্রভাষক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • অরিত্রী : অস্তমিত এক সূর্যের নাম
  • স্বপ্নহীন স্বপ্নের তরী
  • মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান
  • নয়া রাষ্ট্রদূত কী বার্তা নিয়ে এসেছেন?
  • ফেসবুক আসক্তি
  • কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় পৌরসভা প্রসঙ্গে
  • শিক্ষার্থীদের শাস্তি এবং অরিত্রী প্রসঙ্গ
  • রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ শিল্প টিকিয়ে রাখা ও উন্নয়ন জরুরি
  • হাফিজ মোবাশ্বির আলী
  • Developed by: Sparkle IT