উপ সম্পাদকীয়

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় সকাম ও নিষ্কাম কর্ম

সুপর্না রায় প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৩-২০১৮ ইং ০২:২৩:২৩ | সংবাদটি ১৯৬ বার পঠিত

ভগবানের সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ জীব হচ্ছে মানুষ। তাই মানবজীবনের একটি মহৎ উদ্দেশ্য আছে, কর্তব্য আছেÑসেটি হচ্ছে ব্রহ্মজিজ্ঞাসা অর্থাৎ আমি কে? আমি কোথা থেকে এসেছি? আমি কেন এখানে কষ্ট পাচ্ছি? মানব মনে যতক্ষণ না এ ব্রহ্ম জিজ্ঞাসার উদয় হচ্ছে, ততক্ষণ তাকে মানুষ বলে গণ্য করা হয় না।
মানবজীবন সুদুর্লভ এবং বিশেষ তাৎপর্য্যপূর্ণ। তাই এ জীবন পেয়েও যদি আমরা যথাযথ সদ্ব্যবহার না করি, এ জীবন পেয়েও যদি আমরা ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা না করি তাহলে মৃত্যুকালে যখন এ দেহটি ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় আসবে, তখন এ দুর্লভ জনম অবহেলায় ও অপচয় করার জন্য লজ্জায় ও দুঃখে আমাদের অন্তর ব্যথাতুর হয়ে উঠবে। কিন্তু তখন আমরা সেই হারিয়ে যাওয়া সম্পদ ফিরে পাব না। তাই যে বুদ্ধিমান, সে সময় থাকতে এ সম্পদের সদ্ব্যবহার করে নেয়। এ সম্বন্ধে শ্রী ভক্তি বিনোদ ঠাকুরের অমোঘ বাণী :
এমন দুর্লভ মানব দেহ,/ পাইয়া কি কর ভাবনা কেহ,/ এবে না ভজিলে যশোদা-সুত, / চরমে পড়িবে লাজে।
অর্থাৎ আমরা ব্রহ্মজিজ্ঞাসার মাধ্যমে যথাযথ উত্তর লাভ করে যদি যশোদা নন্দনের সেবা করি তাহলে আমরা জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারি। আর এ আশায় মানুষ সদ্গুরুর শরণাপন্ন হয়, গুরুদেব তাদের ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মে স্মরণাগত হওয়ার জন্য গীতার রহস্য শিক্ষাদান করেন।
গীতার অন্যতম প্রধান উপদেশ হলোÑকাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য ত্যাগ করা।
শ্রীগীতায় সংসার ধর্মকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। হিন্দু ধর্ম মতে, প্রথমে সংসার কর এবং তখন আমাকে একহাতে ধর, যখন তোমার কর্তব্য কর্ম শেষ তখন আমাকে দুইহাতে ধর।
মানবজীবনে কর্ম হলো দুই ধরনের: সকাম-কর্ম ও নিষ্কামকর্ম।
ফল লাভের আশা নিয়ে যে ভগবানের পূজো করবে সেই কর্মকে বলা হয় সকাম কর্ম। সকাম কর্মের জন্য মানব কুলে পুনর্জন্ম হবে। এই পুনরায় জন্মগ্রহণ করার নামই জন্মান্তর। জন্মান্তরবাদে-শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন- আত্মা অবিনাশী, আত্মা নিত্য। নিত্য কিরূপ? Ñ যাহা পূর্বে ছিল, এখন আছে, পরেও থাকবে। আমি এখন ‘বাসুদেব’রূপে আবির্ভূত, তুমি মধ্যম পান্ডবরূপে জন্মগ্রহণ করেছ, পূর্বে আমরা অন্যরূপে ছিলাম, পরেও অন্যরূপে থাকব। ‘মৃত্যু’ অর্থ দেহের বিনাশ, আত্মা জন্ম-মরণহীন। আত্মার পক্ষে ‘জন্ম’ অর্থ- দেহ গ্রহণ, ‘মৃত্যু’ অর্থ- দেহ ত্যাগ। আত্মা একদেহ ছেড়ে অন্য দেহে প্রবেশ করে মাত্র- একেই বলে জন্মান্তরবাদ। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের কামনা-বাসনা দূর না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষ জন্মান্তর চক্রে আবদ্ধ থাকবে।
জন্মান্তর থেকে মুক্তি পাবার উপায় কি? উত্তর হচ্ছেÑনিষ্কাম কর্ম করা। নিষ্কামকর্ম হলো-ফল লাভের আশা না করে যে পূজো বা প্রার্থনা বা কর্ম করা হয়। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য- এগুলো হলো মানব শত্রু। এগুলো প্রতিনিয়ত আমাদেরকে খারাপ কাজের দিকে ধাবিত করতে চাইবে। যেমন কোন লোক পূজো করতে যেয়ে যদি তার অহংকার বোধ আসে অর্থাৎ আমি পূজো করেছি, আমি অনেক ধনী, ঈশ্বরÑআমি তোমাকে অনেক ভোগ-নৈবদ্য নিবেদন করেছিÑএ ধরণের অহংবোধ থাকলে সে পূজো হবে না। অহংকার বিবর্জিত, সৎবুদ্ধি, সৎকর্মই হলো পূজো। যেখানে মানুষে মানুষে বিভেদ নেই, নেই ধনী-গরীব, জ্ঞানী-অজ্ঞানীর বিভেদ, সেই পূজোই আসল পূজো। জীব সেবাই ভগবান প্রেম। তাহলে প্রশ্ন ভগবান প্রেম কিভাবে
উদয় হবে? উত্তরে বলা যায়Ñএকবার কৃষ্ণ নাম নিলে যত পাপ হরে, জীবের সাধ্য নাই তত পাপ করে। অর্থাৎ-মানুষকে ষোল নাম বত্রিশ অক্ষরে যে নাম- তা নিতেই হবে। তাহলে আবারো প্রশ্ন উঠেÑএই নামকি একবার নিলেই হয়? উত্তরে বলা যায়Ñ না।
মানুষের মন ছয়টি রিপু বা শত্রুর দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে কুকর্মে, আনন্দে-মেতে উঠতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তখন যদি সে নাম নিতে চেষ্টা করে এবং নাম নেয়া অভ্যাসে পরিণত করে তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার মন থেকে কালিমা দূর করে দিবেন। তার (মানুষ) হৃদয়ে কৃষ্ণ প্রেম জাগবে, ভালো কাজে মন বসবে, মনে কোন রিপু বাসা বাধতে পারবে না। এজন্যেই আমরা ভগবানের গুণকীর্তনে শুনতে পাই- “এই নাম জপিতে জপিতে উঠে অমৃতের খনি” অর্থাৎ অনন্ত জপে আনন্দ অনুভব করে, কৃষ্ণ প্রেমে মগ্ন হয়, বিবেক বলতে থাকে এ-জগতে এসে তোমার নাম নিলাম না, তখনই অন্তরে নিষ্কাম ভাব উদয় হয়, রাধা প্রেম জাগে।
ইহজগতের মায়ার বন্ধন কাটিয়ে কৃষ্ণ নামে বিভোর হয়ে হৃদয়ঙ্গম করে ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যাÑঅর্থাৎ জগতের বিষয়সম্পত্তি, লোভ-লালসা সব মিথ্যা, তখন সে গেয়ে উঠবে :
প্রাণ কৃষ্ণ হে কবে কাটিবে মায়াজাল/ সংসারের সংসারী হইয়া তব পদ পাসরিয়া/ বিষয়-ভোগে হয়েছি মাতাল।
উক্ত আকুতির মাধ্যমে নিষ্কাম ভাব উদয় হবে। মন বলতে থাকবে যে, হে ভগবান-তুমি এক ও অদ্বিতীয়, তোমার ক্ষয় নাই, লয় নাই, তুমি অনন্ত, অসীম, সর্বজ্ঞাতা, সর্বব্যাপী। তুমি আমার অন্তরের খবর জানো। আমি যেন সর্বপাপমুক্ত হয়ে তোমার চরণসেবা করতে পারি- সেকর্ম হবে নিষ্কামকর্ম। নিষ্কামকর্মের দরুণ জন্মান্তর থেকে মুক্ত হয়ে ভগবানের চরণাশ্রিত হবে এবং বৈকুণ্ঠে চলে যাবে।
সুতরাং আমাদের সকলের উচিত মনের কালিমা দূর করে ও সৎপথে থেকে ভগবানের চরণ পাওয়ার আশায় কাজ করা এবং সংসার ও সমাজকে সুন্দর করে তোলা।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • দেশীয় চ্যানেল দর্শক হারাচ্ছে কেন?
  • বিশ্ব বরেণ্যদের রম্য উপাখ্যান
  • আশুরা ও কারবালার চেতনা
  • জলবায়ু পরিবর্তন ও সংকটাপন্ন বন্যপ্রাণী
  • অধ্যাপক ডাক্তার এম.এ রকিব
  • শিশু নির্যাতন ও পাশবিকতা
  • প্রবীণদের প্রতি নবীনদের কর্তব্য
  • রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে আগস্টের শোকাবহ ঘটনাবলী
  • সংযোগ সেতু চাই
  • টিবি গেইট ও বালুচরে ব্যাংকিং সুবিধা চাই
  • হাসান মার্কেট জেল রোডে স্থানান্তর হোক
  • ২৭নং ওয়ার্ডের কিষণপুর-ঘোষপাড়ার রাস্তা মেরামত প্রসঙ্গে
  • প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
  • দেশীয় রাবার শিল্প বাঁচান
  • পরিবর্তিত হও : ছকের বাইরে ভাবো
  • শিক্ষা ও চিকিৎসায় প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ
  • কতটা ভালোবাসি দেশ?
  • রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান আন্তর্জাতিক চাপেই সম্ভব
  • শুধু একবার বলুন : আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি
  • Developed by: Sparkle IT