উপ সম্পাদকীয়

শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের গ্যারান্টি চাই

রতীশ চন্দ্র দাস তালুকদার প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৩-২০১৮ ইং ০২:২৪:০৯ | সংবাদটি ২০৪ বার পঠিত

বর্তমানে দেশে যেন প্রশ্নফাঁসের হিড়িক চলছে। অনেক বছর ধরেই অবশ্য বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে তবে এবার বোধ হয় সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এ বছর আগাম ঘোষণা দিয়ে প্রশ্ন ফাঁস করা হয়েছে এবং স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার ১৭ দিনে ১২টি বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফেসবুক সহ বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় যে, কোমলমতি শিশুরা যারা সদ্য স্কুলে ঢুকেছে, তাদের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়েছে। এই যে, শিক্ষা জীবনের শুরুতেই এদের অনৈতিকতার পাঠ দেওয়া হলো, এর পরিণাম কী হতে পারে তা কি আমরা ভেবে দেখেছি? এস.এস.সি পরীক্ষার শুরুর পূর্বেই সরকার প্রতিরোধের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল কিন্তু ফাঁসকারীরা এসব চ্যালেঞ্জ করে অবাধে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে গেছে এবং সরকার অসহায় দর্শকের ভূমিকা নিয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অবশ্য বেশ কিছু লোককে গ্রেপ্তার করেছে। তবে মূল হোতা বা ফাঁসের উৎসের ধারে কাছেও যেতে পারছেনা। অন্যদিকে সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা অনেক সময় বেফাঁস কিছু মন্তব্য করেছেন যা বরং মূল হোতাদের উৎসাহিত করেছে। অনভিপ্রেত মন্তব্য ও অসহায় আত্মসমর্পন সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে জনমনে প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে একটি প্রশাসনিক এবং একটি বিচারিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখন দেখা যাক, মূল দুষ্কৃতিকারীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয় কিনা।
আমাদের সমাজে মূল্যবোধের যে চরম অবক্ষয় ঘটেছে তার সাথে প্রশ্নফাঁস সরাসরি সম্পর্কিত। পত্রিকায় দেখতে পেলাম, ঢাকায় নিকটবর্তী একটি অঞ্চলের অভিভাবকরা একটি তহবিল গঠন করেছেন যার সাহায্যে ঐ অঞ্চলের কিছু কোচিং কেন্দ্র এবং স্কুলের কিছু শিক্ষক পরীক্ষার ঘন্টা দু’য়েক আগে প্রশ্ন সংগ্রহ করে শিক্ষার্থীদের শিখিয়ে পড়িয়ে কেন্দ্রে পাঠান। আসলে পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ মিলে একটি হবীঁং গঠিত হয়েছে। পিতা মাতা তথা অভিভাবকবৃন্দের দিক থেকে প্রশ্নফাঁসের যে চাহিদা সৃষ্টি হয়, অর্থনীতির মৌলিক সূত্র অনুসরণ করেই দুর্নীতিবাজচক্রের মাধ্যমে এর যোগান দেওয়া হচ্ছে। সন্তানদের নিয়ে প্রায় সব পিতামাতারই প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। তারা সব বিষয়ে উচ্চ নম্বর পেয়ে জিপিএ-৫ পাবে, এটা সবাই চায় কিন্তু পঠিত বিষয় কতটুকু আত্মস্থ করলো এ ব্যাপারে থাকেন সম্পূর্ণ উদাসীন। এজন্য অবশ্য সাধ্যাতীত বিনিয়োগ করতেও অনেকে পিছপা হননা। তথাকথিত নামকরা কোচিং কেন্দ্রে ভর্তি করে দায়িত্ব শেষ হলো বলে মনে করেন। এ প্রসঙ্গে কবি জয় গোস্বামীর একটি কবিতা উল্লেখ করা যায় ঃ “তোমাকে পেতেই হবে শতকরা অন্তত নব্বই (নব্বইয়ের বেশি)/ তোমাকেই হতেই হবে একদম প্রথম/পাঁচটা নম্বর কম কেন? কেন কম?/এ জন্য আমি রোজ মুখে রক্ত তুলে খেটে আসি।”
দেখা যায়, যেনতেন প্রকারে কাক্সিক্ষত নম্বর পেলেই অভিভাবকরাই সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। এখন শিক্ষার্থীরা আর শিক্ষার্থী নেই বরং বলা যায় নম্বরার্থী। এই যে মানসিকতার পরিবর্তন এটাই প্রশ্নফাঁসের অন্যতম প্রধান কারণ। আবার শিশু-কিশোরদের উপর পরীক্ষার অস্বাভাবিক চাপ প্রশ্নফাঁসের আরেকটি কারণ। বারো বছরের শিক্ষা জীবনে তাদেরকে চারটি পাবলিক পরীক্ষা দিতে হয় অথচ ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ঐ সময়ে মাত্র দুটি পরীক্ষা দেয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে, আমাদের শিক্ষা বিভাগের কর্তা ব্যক্তিরা এটা আমলেই নিতে চান না। ২০১০ সালের শিক্ষা নীতিতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষাস্তর উন্নীত করার প্রস্তাবনা ছিল। এখন, শিক্ষামন্ত্রীর বয়ান থেকেই জানা যাচ্ছে, এ প্রস্তাবনা বাস্তবায়নযোগ্য নয়। তাহলে জি.এস.সি পরীক্ষার আদৌ কি কোন যৌক্তিকতা আছে? ২০১০ সালের শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ডঃ জাফর ইকবাল ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত কলামে বলেছেন, “আমার যতদূর মনে পড়ে সেখানে আমরা বলেছিলাম স্কুলের বাচ্চাদের প্রথম তিন বছর কোন পরীক্ষাই থাকবেনা। কিন্তু আমরা বেশ অবাক হয়ে আবিস্কার করেছি, শুধু ক্লাস ওয়ান নয়, প্রি-স্কুলে পর্যন্ত বাচ্চাদের পরীক্ষা নেয়া হয় এবং সেই পরীক্ষা নিয়ে বাবা মাদের ঘুম নষ্ট হয়ে যায়।” এই অত্যধিক পরীক্ষার চাপে তারা স্বাভাবিক শৈশব ও কৈশোর হারিয়ে ফেলছে। সকাল বিকাল ভারি বইয়ের বোঝা কাঁধে নিয়ে ছটে যাচ্ছে এক কোচিং কেন্দ্র থেকে আরেক কোচিং কেন্দ্রে। কিন্তু শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা এবং বিনোদন ও যে অপরিহার্য্য তা অভিভাবকরা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করছেন। পিতা মাতারা যদি পিছনে তাকান, ফিরে দেখেন তাদের শৈশব ও কৈশোর তখন অবাক হয়ে দেখবেন, তারা কিন্তু সকাল বিকাল মাঠে ঘাটে খেলাধুলা করে আনন্দঘন পরিবেশে কাটিয়েছেন জীবনের সেই মূল্যবান সময়টুকু। এখন হয়ত বলবেন-বর্তমান বিশ্ব অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সুতরাং ছেলে মেয়েদেরকে সেভাবে গড়ে তুলতে হবে। তবে তারা ভুলে গেছেন শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত করলে প্রতিযোগিতাপূর্ণ পৃথিবীতে কোনভাবেই তারা তাল মিলিয়ে চলতে পারবে না। পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী যা বলেন তা খুবই বিভ্রান্তিকর। তিনি বলে থাকেন, গ্রাম অঞ্চলে খুবই উৎসব মুখর পরিবেশে পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হয়। হ্যাঁ, কিছু লোকের সমাগমকে যদি তিনি উৎসব বলেন, তবে তা উৎসবই বটে। কারণ অভিভাবকরা সন্তানদের পরীক্ষাস্থলে পৌঁছে দিয়ে কেন্দ্রের কাছাকাছি অপেক্ষা করেন, তখন পরিচিত অনেক বন্ধু-বান্ধবের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হয় এবং গল্প গুজব করে সময় কাটান। এতে হয়ত তাদের মনে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যাদের নিয়ে এ আয়োজন তাদের মনে কি এর কোন সদর্থক প্রভাব পড়ে? যারা আনন্দময় শৈশব ও কৈশোরের স্বাদ থেকে বঞ্চিত, যারা সারা বছর কোচিং কেন্দ্রে ছুটাছুটি করে প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত শ্রান্ত, তাদের মনে এ তথাকথিত উৎসবের কি আদৌ কোন ছোঁয়া লাগে?
আমরা পিতা মাতারা চাই আমাদের সন্তান যেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হয়। এ চাওয়ার মধ্যে অবশ্য কোন দোষ নেই। কিন্তু ভুলে যাই, সবাই ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার মেধা নিয়ে জন্ম নেয় না। আবার সমাজে অন্য অনেক পেশার লোকেরও দরকার আছে। একজন কবি একথাগুলো তাঁর কবিতায় সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন ঃ “চাই যে অনেক ইঞ্জিনিয়ার, চাই অনেক ডাক্তার/পাশাপাশি চাই শিল্পী, খেলুড়ে, ¯েœহময়ী সিস্টার।/কম নম্বর পাওয়া ছেলেটাই কারিগর বলে আজ/দেশটা গড়তে ওরও হাতে দেখ কত দরকারি কাজ।/পরের দুঃখে কাতর যে মেয়ে মুখটি করেছে কালো/কম নম্বার পেয়েছে বলে বলবোনা ওকে ভালো?”
মনে রাখতে হবে, কোন পেশাই কিন্তু অসম্মানজনক নয়। সব পেশাজীবীই তাদের সামর্থ্যানুযায়ী দেশ ও সমাজের জন্য অবদান রেখে থাকেন। তাই সবার উচিত, শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশের পথে কোন অন্তরায় সৃষ্টি না করা। তাহলে মেধা ও অঢ়ঃরঃঁফব অনুযায়ী তারা পেশা বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, এমসি কলেজ, সিলেট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • অরিত্রী : অস্তমিত এক সূর্যের নাম
  • স্বপ্নহীন স্বপ্নের তরী
  • মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান
  • নয়া রাষ্ট্রদূত কী বার্তা নিয়ে এসেছেন?
  • ফেসবুক আসক্তি
  • কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় পৌরসভা প্রসঙ্গে
  • শিক্ষার্থীদের শাস্তি এবং অরিত্রী প্রসঙ্গ
  • রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ শিল্প টিকিয়ে রাখা ও উন্নয়ন জরুরি
  • হাফিজ মোবাশ্বির আলী
  • Developed by: Sparkle IT