মহিলা সমাজ

নারীর অগ্রযাত্রায় আলোর মিছিল

সৈয়দা রওশন আরা পারভীন প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৩-২০১৮ ইং ০২:২৫:০৬ | সংবাদটি ১০৪ বার পঠিত

যুগ যুগ ধরে নারী জাতি তাদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও তার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। সংসার সমাজ তথা রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর যথার্থ মূল্যায়ন হচ্ছে না। যার ফলে নারী তাদের প্রকৃত স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর ফলশ্রুতিতে নারীরা কেবল পিছিয়েই থাকছে না দেশ ও সমগ্র জাতি পিছিয়ে পড়ছে। উন্নতি ও অগ্রগতির লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে না। বর্তমান সভ্যতা স্বীকার করে নারী পুরুষের সমান অংশগ্রহণ ও শ্রমের বিনিময়ে আসে সমৃদ্ধি, উন্নতি আর অগ্রগতি। নারীরা আজ বিশ্ব জয়ের মিছিলের অগ্রপথিক। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশ নেয়া সহ বর্তমানে পরিবার, সমাজ গঠনসহ দেশ গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেছে চলেছেন নারীরা। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠি নারীকে বাদ দিয়ে কোন ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আজ শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর অগ্রসরতার কারণে সকল ক্ষেত্রে সরবে তারা অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছেন। সময়ে সময়ে খেতাব প্রাপ্ত বীরাঙ্গনা নারীসহ কাঁটা বিছানো সে সব পথ মাড়িয়ে দৃষ্টান্ত রেখেছেন। এভারেষ্টজয়ী ওয়াসফিয়া নাজনীন, নিশাত মজুমদারসহ সাহসী নারীগণ।
১৮৫৭ সালের ৮ই মার্চ তারিখে নিউইয়র্কে সূচ কারখানার মহিলা শ্র্রমিকরা অমানবিক কাজের পরিবেশ, নিম্ন মজুরী এবং দৈনিক ১২ ঘন্টা খাটুনির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এক মিছিল বের করেন। তাদের শান্তিপূর্ণ মিছিল পুলিশ ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বহু মহিলা আহত হন। অনেককে পুলিশ গ্রেফতার করে। এর তিন বছর পর ১৮৬০ সালের মার্চ মাসে সূচ কারখানার মহিলা শ্রমিকরা তাদের নিজস্ব ইউনিয়ন গঠন করতে সক্ষম হন। সমান অধিকার ও কাজের পরিবেশের উন্নতির জন্য মহিলা শ্র্রমিকদের আন্দোলন এর পর থেকে স্বীকৃতি পেয়ে আসছে। ১৯০৮ সালের ৮ই মার্চ তারিখে আবারও নিউইয়র্ক শহরে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। এ সময় পোশাক ও বস্ত্রশিল্প কারখানার মহিলা শ্রমিকরা এই আন্দোলনে যোগ দেন। তাদের দাবী ছিল কাজের ঘন্টা কমানো। মানবেতর কাজের পরিবেশের উন্নতি, শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে আইন এবং ভোট দেবার অধিকার। এরই ফলশ্রুতিতে দুই বছর পর ১৯১০ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ৮ই মার্চ তারিখ স্বীকৃতি পেয়ে যায়।
এরপর থেকে পৃথিবীর অনেক দেশেই দিবসটি পালিত হয়। আমাদের দেশের নারী শ্রমিকদের অবস্থা পর্যালোচনা করলে এখনও দেখতে পাই মজুরীর বৈষম্য, শ্রম আইন উপেক্ষা, শিশু শ্রমের ব্যবহার, পারিবারিক নির্যাতন, অত্যাচার, এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ, পেট্রল দিয়ে শরীর ঝলসে দেয়া ও যৌতুকের বলি হয়ে নারীর মৃত্যুই যেন নারীর শেষ আশ্রয়। বিগত কয়েক বছর ধরে পোশাক শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটেছে। অনেক মহলের মতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এবং নারীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই শিল্প একটি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। সুতরাং এই শিল্পের সম্প্রসারণ দেশের জন্য প্রয়োজন ও কাম্য। অস্বীকার করার উপায় নাই দুটি যুক্তিই সত্য। তবে পোশাক শিল্পে নারী শ্রম ব্যবহারের আরো একটি উল্লেখযোগ্য কারণ রয়েছে। নারীদের সস্তা শ্রমিক হিসেবে পাওয়া যায়। তা ছাড়া শ্রমিক আইন উপেক্ষা করে নির্ধারিত সময় ছাড়াও এদেরকে দিয়ে কাজ করানো যায়। উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারীরা অবহেলিত, লাঞ্চিত ও অত্যাচারিত।
একটি রাষ্ট্র সর্বস্তরের মানুষের উন্নয়নের জন্যে এবং মৌলিক অধিকারের জন্যে কাজ করে থাকে। তার পরেও কিছু কিছু বিষয় এর পরিপন্থী হয়ে থাকে কেন? এর জন্য প্রয়োজন সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন, অঙ্গিকার বাস্তবায়ন। তবে আগের তুলনায় মহিলাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। মহিলারা আত্মনির্ভরশীলতার দিকে এগিয়ে চলছে। নারী শিক্ষার হার বাড়ছে। কিন্তু তার পরেও তথাকথিত সমাজপতিতের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ঘরে বাইরে আজো নারী নিরাপত্তাহীন। আর্থ-সামাজিক কর্মকান্ডে এগিয়ে যাওয়ার কারণে নারীদের উপর চলছে ফতোয়া। এত কিছুর পরও কি বলা যায় নারী খুব বেশী দূর এগিয়েছে? সরকার যেখানে নারীদের লেখাপড়া ও নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের ক্ষমতায়নের চেষ্টা করছে। সেখানে এমন কার্যক্রম অনাকাঙ্খিত ও নারী জাগরণের অন্তরায়তো বটেই। প্রয়োজন নারীর সত্যিকারের ক্ষমতায়ন। এজন্য অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি ও কাজের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে আরো বেশী নারীদের সম্পৃক্ত করা এবং নারীর শক্তি, জ্ঞান ও সৃষ্টি করার ক্ষমতাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। কারণ এ যুগে সফলতার সহিত এগিয়ে যাচ্ছেন নারী। বলা-বাহুল্য এ দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী, বিরোধী দলীয় নেতা, স্পিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েক মন্ত্রণালয়ে নারীদের পদায়ন, সেখানে নারীদের জয়গানে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বর্তমানে নারী উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছেন, অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন নানা ক্ষেত্রে। আজ নারীরা শিক্ষকতা, চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকৌশলী, নার্সিং, আইন, সাংবাদিকতা, বৈমানিক, সেনা, নৌ, পুলিশ, বিজিবি, আনসার, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলাধুলা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পসহ সকল ক্ষেত্রে সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় নারীদের নানা সাফল্যের খবর যেমন আমাদের আশাম্বিত করে তেমনি নারীদের উপর নানা নির্যাতন আমাদের করে ব্যথিত।
প্রকৃতপক্ষে ১৯১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের বিশেষ সভায় সদস্য রষ্ট্রসমুহ ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই বৈশ্বিক উন্নয়ন বা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৭টা টেকসই লক্ষ্য নির্ধারণ করে, যা এসডিজি নামে পরিচিত। এই এসডিজির ৫ নম্বর লক্ষ্য হলো লিঙ্গসমতা, যা গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে না পারলে টেকসই বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্জন সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের মানবিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাকে বিশ্ব অর্থনীতি যে ইতিবাচক দৃষ্টি নিয়ে মূল্যায়ন করেছে, তা টেকসই করতে হলে ২০২০ সালের মধ্যে এসডিজির ৫ নম্বর লক্ষ্য পূরণের পথে আমাদের এগুতে হবে দুর্দমনীয় ও সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে। সংবিধানে উল্লেখিত পুরুষের মতো সমান অধিকার জীবনের সব ক্ষেত্রে নারীর জন্য নিশ্চিত করতে হবে। আর্থসামাজিক ও মানবিক উন্নয়ন ছাড়াও নারীর ক্ষমতায়নের বিভিন্ন উন্নয়ন সূচকেও উন্নতি ঘটছে। আমরাও বাংলাদেশে পৃথিবীর অন্য দেশের মতো চেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি হলো সমাজ ও মানব উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ ও উন্নয়ন অপরিহার্য।
স্বাধীনতার সময়ে অতিদরিদ্র দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ পরবর্তী চার দশকে মানবিক ও অর্থনৈতিক সূচকে অভূতপূর্ব অর্জনের কারণে উন্নয়নের বিশ্বয়রূপে খ্যাতি লাভ করেছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও আমাদের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার গড়ে ৫-৬ শতাংশ থেকেছে, এবং বর্তমানে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। যা বাংলাদেশের শ্রমশক্তির উদ্যম ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিকাশের ইঙ্গিত বহন করে। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশ হবে, এমনটা আশা করা যাচ্ছে। এ দেশের নারীরা নানা প্রকার সামাজিক প্রতিকূলতা ও লৈঙ্গিক বৈষম্যের মধ্যেও মানবিক উন্নয়নে দর্শনীয় অবদান রাখছে। বেগবান নারী আন্দোলন ও নব্বইয়ের দশক থেকে সরকারের কিছু নারীবান্ধব নীতি ও এনজিওগুলোর প্রশংসনীয় নারী সংবেদনশীল কার্যক্রমের ফলে, বিশেষত গ্রামীণ নারীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ সৃষ্টি হয়।
দেশকে উদার গণতান্ত্রিক ও ক্ষমতাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়তে দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় চার দশকে নারী দেশের নানা অর্জনে তার অবদানের তালিকা দীর্ঘ করেছে। ২০১৮ সালে এসে নারী তার অবদান, প্রাপ্তি আর প্রত্যাশার খতিয়ানে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে তার সমঅধিকার আদায়ের সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত। এর জন্য প্রথমে প্রয়োজন সর্বস্তরে নারীর অবস্থা ও মর্যাদার মূল্যায়ন এবং লিঙ্গ বৈষম্যকে জাতীয় উন্নয়নের মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিতকরণ। নারীর ব্যক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনি সুরক্ষা ও ন্যায় বিচার প্রাপ্যতাকে নিশ্চিত করে মজুরি বৈষম্য নিরসন করতে হবে। নারীকে তার সব অধিকার দাবি করতে এবং নিজের জীবন নিয়ন্ত্রনে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তাদের সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জায়গা করে নেওয়ার পেছনের সরকারি নীতিমালাও ইতিবাচক উদ্যোগ এবং সেই সঙ্গে বেসরকারি সহায়তার ভূমিকা রয়েছে। ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যাবে, তৃণমূল পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নের ঘটনাটি ঘটে চলেছে অনেকটা অগোচরে। আর এটা ঘটছে নারীদের দারিদ্র দূরীকরণ থেকে শুরু করে তাদের অর্থনৈতিক কাজে যুক্ত করার কিছু বিশেষ পদক্ষেপের কারণে। সরকারি পর্যায়ে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ এই অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখছে।
এত অগ্রযাত্রার পরেও মাঝে মাঝে শঙ্কিত হই নারীর প্রতি অসম আচরণ ও নির্যাতন দেখে। আবার যে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে আমরা চিন্তিত, সেই নারীরাইতো আজ দায়িত্ব নিয়েছেন অন্যদের নিরাপত্তা বিধানের কাজে। পুলিশ, আনসার, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীতেও আজ নারীরা দায়িত্ব পালন করছেন। আজ বাংলাদেশের নারী পুলিশ বাহিনী হয়ে উঠছে জাতিসংঘের শান্তি মিশনের অন্যতম অংশ। আজ আমাদের নারীরাই অন্যের দায় নিয়েছেন। যেখানে এতভাবে নারীকে এগিয়ে যেতে দেখি, সেখানে আর একটুখানি সচেতনতা, ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা নিলে আমরা সবাই নিশ্চয়ই বন্ধ করতে পারি অন্য নারীদের প্রতি সহিংসতা। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নারী উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যার প্রতিফলন আমরা সংবিধানে দেখতে পেয়েছি। উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় আজ নারীরা সমাজ ও জাতীয় জীবনের বহু ক্ষেত্রে বিচরণ করছেন। নারীর এ সাফল্যের পেছনে পুরুষেরাও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন। তাদের সহযোগী মনোভাব নারীকে সমাজে আরও প্রতিষ্ঠিত করছে। নারীদের পথচলাকে মসৃণ করতে পুরুষের সহায়ক ভূমিকা খুব জরুরি। এটা সত্যি যে, নারী পুরুষ কেহ কারো প্রতিপক্ষ নয়, পরিপূরক বটে। একটি সুখী সমৃদ্ধ সমাজ দেশ ও শান্তির নীড় বিশ্ব বিনির্মাণে নারী পুরুষ যৌথ উদ্যোগে হয়ে উঠুক আলোর সহযাত্রী।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT