মহিলা সমাজ

পড়ন্ত বিকেলের ভাবনা

জাহিদা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৩-২০১৮ ইং ০২:২৫:৫৩ | সংবাদটি ১৯৮ বার পঠিত

প্রিয়াঙ্কার স্কুল জীবনের বান্ধবীদের সাথে এখন আর তেমন যোগাযোগ নেই। পুরনো দিনের কথা তার খুবই মনে পড়ে। কতো মধুর স্মৃতিতে ভরা ছিলো সে দিনগুলি। আজ সে দিনগুলোর কথা মনে হলে প্রিয়াঙ্কার খুব কষ্ট হয়। তারপরেও যখন একটু সময় পায় তখন সে বান্ধবী স্বপ্নার ওখানে যায়। স্বপ্না তার স্কুল জীবনের পুরনো বান্ধবী। স্বপ্না এখন পুরো সংসারী। স্বপ্না প্রিয়াঙ্কাকে বলে, তুই সেই আগের মতোই আছিস। সবার সাথে এখনো বেশ যোগাযোগ আছে।
মনে আছে বান্ধবী মহলে তোর বেশ সুনাম ছিলো, সদালাপী এবং স্পষ্টভাষী বলে। সবাই তোকে পছন্দ করতো। আড্ডা জমাতেও তুই ছিলে ভীষণ ব্যস্ত। সবাইকে নিয়ে আনন্দে তোর কোনো জুড়ি ছিলো না। কতো জায়গায় যে আমরা বেড়াতে যেতাম সে সব কি তোর মনে আছে?
অথচ দেখ আমরা সবাই আজ কতো ব্যস্ত। ইচ্ছে করলেও আগের মতো সময় ও সুযোগ পাচ্ছি না। স্বপ্না বলে, তুই তো ঘর সংসার না করেও জীবনটাকে ব্যস্ততার মধ্যে রেখেছিস। সত্যিই তো প্রিয়াঙ্কার আগের মতো এখন সময় নেই। সময় যেনো পাল্লা দিয়ে তার সাথে দৌড়াচ্ছে। প্রিয়াঙ্কা খুব জেদি মেয়ে। তাই তো আজো সে তার কথায় অটল। বাবা তাকে শত চেষ্টা করেও পারেননি পাত্রস্থ করতে।
বাবা বেঁচে নেই। মনে পড়ে প্রিয়াঙ্কার বাবার কথা। মারা যাবার আগে একদিন প্রিয়াঙ্কাকে কাছে ডেকে বললেন, মা তুই কেনো এতো জেদি? মেয়েদের জীবনে কতো কিছুই তো ঘটে যায়। তাই বলে কি সবাই সবকিছু মনে রাখে? একটু থেমে বাবা আবারো বলেন, তোকে যদি আমি কারো হাতে তুলে দিতে না পারি তাহলে যে আমি মরে গিয়েও শান্তি পাবো না।
কিন্তু প্রিয়াঙ্কার তো কিছুই করার ছিলো না। জীবনটা চলমান নদীর মতো। একে ¯্রােতের প্রতিকূলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে কষ্টই পেতে হয়। নদীর ওপর দিয়ে কতো খড় কুটো ভেসে যায় নদী কি তাদের ধরে রাখে? প্রিয়াঙ্কা বুঝতে পারে বাবা কি বোঝাতে চাচ্ছেন ও বলেছিলেন। তার খুব কষ্ট হয় বাবার জন্য।
প্রিয়াঙ্কা এখন একটা স্কুলে চাকুরি করে। সকাল বেলা স্কুল, দুপুরে ঘরে ফিরে নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। অসুস্থ মা, ভাই এদের দেখাশোনা সবকিছু নিয়ে প্রিয়াঙ্কা একেবারে যন্ত্রের মতো ছুটছে। তার পরেও যেটুকু সময় পায় ঐ সময়টাতে তার নিজস্ব কিছু কাজ নিয়ে সে ব্যস্ত থাকে।
এমনি করে হঠাৎ একদিন প্রিয়াঙ্কা তার বান্ধবীর বাসা থেকে ফেরার পথে দেখা হয় জামিলের সাথে। জামিল ছিলো তারই বান্ধবী সোমার খালাতো ভাই। প্রিয়াঙ্কা জামিলকে চিনতে পারেনি। জামিলই তাকে পরিচয় দেয় সোমার কথা বলে। প্রিয়াঙ্কার সব কিছু মনে পড়ে যায়।
সোমার সাথে জামিলের ভালো সম্পর্ক ছিলো। একজন আরেকজনকে খুবই পছন্দ করতো। সবাই জানতো সোমা এবং জামিলের বিয়ে হবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিয়ে হয়নি। জামিল চলে যায় বিদেশে, কথা ছিলো জামিল ফিরে এলে তাদের বিয়ে হবে।
কিন্তু জামিল আর ফিরে আসেনি। সে এক বিদেশিনীকে বিয়ে করে ওখানে থেকে যায়। এরপর থেকে জামিলের আর কোনো খোঁজ নেই। জীবনটাতে হঠাৎ করেই যেনো ছন্দপতন ঘটে যায়।
এদিকে সোমার মা-বাবা জামিল দেশে না ফেরাতে শেষ পর্যন্ত সোমার বিয়ে দিয়ে দেন। সোমা এখানে ঘর সংসার নিয়ে সুখী। কিন্তু জামিলের বিদেশী বউ দু’বছর তার সাথে থেকে অন্যত্র চলে যায়। জামিল এরপর দেশে ফেরে। প্রিয়াঙ্কার সাথে দেখা হলে জামিল তার সব খবর বলে। প্রিয়াঙ্কা খুব অবাক হয় জামিলের জীবনের ঘটনাগুলো শুনে।
জামিল বলে প্রিয়াঙ্কা, আমি ভাবতেই পারিনি যে, সোমার মতো মেয়েকে আমি ফাঁকি দেবো। সোমার মাঝে কোন ফাঁক ছিলো না। আমি জানি খালা-খালু মনে খুব কষ্ট নিয়ে মারা গেছেন। তবে সোমা যে সুখী হয়েছে তাতে আমার কষ্টটা লাঘব হয়েছে অনেকখানি।
জামিল প্রিয়াঙ্কাকে বলে তোমার খবর কি? তোমার জীবনের কি কোন পরিবর্তন হতে পারে না? তুমি কেনো এভাবে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছো। কতো ঘটনাই তো ঘটে যায় মানুষের জীবনে। তাই বলে কি তুমি সারাটা জীবন এভাবে কাটিয়ে দেবে? তুমি ইচ্ছে করলে তোমার জীবনের সবকিছু পরিবর্তন করতে পারো। তুমি হাত বাড়ালেই সব পেতে পারো।
প্রিয়াঙ্কা চুপ করে জমিলের কথাগুলি শুনে এবং বাসায় আসতে আসতে ভাবে, হায়রে জামিল তোমাদের মতো পুরুষরাই পারে সব কিছু করতে। জামিলের প্রতি ঘৃণায় বিতৃষ্ণায় প্রিয়াঙ্কার মন বিষিয়ে ওঠে। প্রিয়াঙ্কা ভাবে মানুষের জীবন কতো বিচিত্র।
আজ যদিও সে একা, তার জীবনের সাথে কাউকে জড়ায়নি, তবুও সে ভালো আছে। ব্যস্ততার মাঝে হলেও তার জীবন চলছে নির্দিষ্ট এক গতিসীমায়, যেখানে নেই কোন ভয়ভীতি, নেই কোন সীমানার বেড়াজাল।
সে কাটিয়ে দিতে চায় তার অনাগত দিনগুলি শত ব্যস্ততার মাঝে। কিন্তু তার জীবনেও তো সূর্যের উদয় হয়েছিলো-আঁধারের ঘন কালো মেঘ কেনোই বা যে সূর্যকে চিরদিনের মতো ঢেকে দেবে। জীবন একটাই, একে নিয়ে কি বার বার ছিনিমিনি খেলা চলে?

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT