সম্পাদকীয়

নদী রক্ষা দিবস

প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৩-২০১৮ ইং ০২:৪৯:২৬ | সংবাদটি ৬৮ বার পঠিত

আজ আন্তর্জাতিক নদী রক্ষা দিবস। নদ-নদী মহান সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে মানব জাতির জন্য একটি অনন্য উপহার। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, সাগর, হাওর-বিল অবদান রাখে। কিন্তু নানা কারণে নদ-নদী কিংবা সাগর, পাহাড়-পর্বত আজকাল বিপর্যয়ের সম্মুখীন। নদীর পানি একদিকে দুষিত হচ্ছে, অপরদিকে ভরাট হচ্ছে ছোটবড় নদী। নাব্যতা হারাচ্ছে নদী। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে বড় বড় নদী, সাগর বিপর্যয়ের মুখে। তবে সমস্যাটি আমাদের জন্য খুবই ভয়ংকর। আর তাই নদীকে বাঁচিতে রাখার জন্য বিশ্ববাসীকে সচেতন করে তোলা জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে প্রতি বছর আজকের এই দিনে পালিত হয় বিশ্বব্যাপী নদী রক্ষা দিবস। আমাদের দেশেও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হবে দিবসটি।
অতি প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত সারাবিশ্বে। এখানে অসংখ্য ছোট বড় নদী ছড়িয়ে আছে জালের মতো। দেশের আনাচে কানাচে বয়ে চলা এই নদ-নদীর সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন প্রবাহ। কোটি কোটি মানুষের সুখ দুঃখ, হাসি কান্নার অংশীদার এই নদ-নদী। যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে নদীর ভূমিকা অতুলনীয়। মৎস্য সম্পদের ভান্ডারও এই নদী। বর্ষায় ভরা নদীর বুকে রং বেরংয়ের পাল তুলে নৌকার ছুটে চলা, মাঝির কণ্ঠে ভাটিয়ালী গান-এমন দৃশ্য আজকাল হারিয়ে যাচ্ছে। কারণ, মরে যাচ্ছে অনেক নদী। যেগুলো এক সময় ছিলো খর¯্রােতা, আজ তা মৃতপ্রায়। ইতোমধ্যেই মরে গেছে অনেক নদী। শুষ্ক মওসুমে নৌ-চলাচল তো দূরের কথা, তখন এসব নদীর বুকে খেলাধুলা করে শিশুরা। কোন কোন নদীর বুকে ফসল চাষ হচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশে কমপক্ষে আট হাজার কিলোমিটার নৌপথ হারিয়ে গেছে। এখন বর্ষা মওসুমে নৌপথের পরিমাণ ছয় হাজার কিলোমিটারের বেশি নয়। আর শুকনো মওসুমে তা অর্ধেকে নেমে আসে।
এখানে নদীর ভাঙ্গন ও চর জেগে উঠাও একটা বড় বিপর্যয়। সারা বছরই বেশির ভাগ নদীর তীর ভাঙ্গন অব্যাহত থাকে। ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৬ জেলায়ই তীব্র হয়ে ওঠেছে নদী ভাঙ্গন। বছরে গড়ে আড়াই লাখ মানুষ নদী ভাঙ্গনের শিকার হচ্ছে। নদী ভাঙ্গন বছরে ক্ষতি করছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার সম্পদ। এতে গৃহহীন হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। বছরে গড়ে ছয় হাজার হেক্টর জমি নদী ভাঙ্গনে বিলীন হচ্ছে। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া দু’শ একটি আন্তর্জাতিক নদীর মধ্যে প্রধান চারটি নদীতেই ভাঙ্গন বেশি। এর মধ্যে রয়েছে-পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, গঙ্গা। গত তিন দশকে বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়েছে। শুধু তাই নয়, ময়লা আবর্জনা ফেলার কারণে দুষণের শিকার হচ্ছে অনেক নদী। বিশেষ করে, শহর নগরও আশপাশ এলাকা দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলোতে অবাধে নিক্ষেপ করা হচ্ছে কলকারখানা, গৃহস্থালীসহ সব ধরনের ময়লা আবর্জনা। এতে দূষিত হচ্ছে পানি, ভরাট হচ্ছে নদী।
অর্থাৎ মানুষের অপরিণামদর্শী নানা আচরণের শিকার হচ্ছে আমাদের নদ-নদী। সেই সঙ্গে প্রকৃতির খামখেয়ালীর কারণেও বিলীন হয়ে যাচ্ছে অনেক নদী। তবে নদী রক্ষায় সচেতনতার বিকল্প নেই। সরকার-জনগণ সব মহলকেই সচেতন হতে হবে। নদী ধ্বংসকারী সব ধরনের কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃতপ্রায় নদীগুলোকে জাগিয়ে তুলতে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। পত্র পত্রিকাসহ বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে ‘মৃত’সব নদীর হাহাকারের চিত্র প্রকাশ করা হয় সারা বছরই। সরকার থেকেও নদী রক্ষায় বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করার খবর প্রচার করা হয়। তা ওই পর্যন্তই। বাস্তবে তার তেমন প্রতিফলন চোখে পড়েনা। মাঝখানে নদী খনন কাজে বরাদ্দ সরকারের কোটি কোটি টাকা লুটপাট হয়। এভাবে চলছে বছরের পর বছর। আর তাই নদী রক্ষায় শুধু ‘মুখোরোচক’ প্রকল্পের বয়ান নয়, চাই বাস্তব পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক নদী রক্ষা দিবসে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT