ইতিহাস ও ঐতিহ্য

  যেকোনো মূল্যে ঋণখেলাপি সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে

মাহফুজুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৩-২০১৮ ইং ০২:৫৪:৪১ | সংবাদটি ১০৭ বার পঠিত


ব্যাংকের শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ বা হার নিয়ে অর্থনীতি নিয়ন্ত্রকদের দুশ্চিন্তা নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই ব্যাংকগুলোর জন্য এই শ্রেণীকৃত ঋণ বৃদ্ধি এবং শ্রেণীকৃত আদায় নিয়ে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশে ঋণখেলাপি কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। তাই দেখা যায়, নির্বাচনের সময় কাছে এগিয়ে এলে নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী ব্যক্তিরা দ্রুত ব্যাংকমুখী হন এবং ঋণের টাকা ফেরত দিতে শুরু করেন। খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য সরকার অর্থঋণ আদালত গঠন করেছে। এই আদালতের প্রধান দায়িত্বই হলো খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করা। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক গঠন করেছে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি)। যেসব লোক ঋণখেলাপি হবেন তাঁদের নাম-ঠিকানা এই সিআইবির তথ্যভা-ারে রাখা হয়। দেশের যেকোনো ব্যাংককেই ঋণ প্রদানের আগে এই তথ্যভা-ার থেকে দেখে নিতে হয় যে সম্ভাব্য ঋণগ্রহীতা খেলাপি কি না? যদি আবেদনকারী ঋণখেলাপি হয়ে থাকেন, তাহলে প্রচলিত আইন অনুসারে তাঁকে ঋণ প্রদান করা যায় না। এত কিছু করার পরও দেশের সব ব্যাংকের সম্মিলিত ঋণস্থিতির বিবেচনায় শ্রেণীকৃত ঋণের হার ২০০৮ সাল পর্যন্ত দুই ডিজিটে ছিল। ১৯৯৮ সালে এই হার ছিল ৪০.৬৫ শতাংশ। এর পর থেকে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মিলিত উদ্যোগের ফলে এই হার ক্রমান্বয়ে কমে আসে।
প্রসঙ্গত, সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেলেও সার্বিকভাবে বাংলাদেশে শ্রেণীকৃত ঋণের হার আগের দশকগুলোর চেয়ে বর্তমান দশকে অনেকটা কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে দেখা যাচ্ছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত (শুধু ২০১২ বাদে) এই হার এক ডিজিটে বিদ্যমান থাকলেও ২০১৭ সালে তা আবার দুই ডিজিটে ফিরে গেছে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে এই শ্রেণীকৃত ঋণের হার যথাক্রমে ছিল ৮.৭৯ ও ৯.২৩ শতাংশ। তবে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে এটি দাঁড়িয়েছে ১০.৬৭ শতাংশে।
বর্তমানে শ্রেণীকৃত ঋণের হিসাবায়ন জটিলতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা হতে দেখা যায়। কোনো কোনো গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদনও ছাপা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে তাঁদের অনেকেই হিসাবায়ন করেছেন ভ্রান্ত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কৌশল প্রয়োগ করে।
বাংলাদেশ ব্যাংক অনুসৃত নিয়ম অনুসারে একটি নির্দিষ্ট সময়ে মোট ঋণস্থিতির বিপরীতে যে পরিমাণ ঋণ শ্রেণীকৃত থাকে, তাই শতকরা হিসেবে দেখানো হয়ে থাকে। কোনো অবস্থায়ই অবলোপনকৃত অংশ টেনে এনে শ্রেণীকৃত ঋণের সঙ্গে যোগ করে এই হারকে স্ফীত করা সমীচীন নয়। কারণ অবলোপনকৃত ঋণকে শ্রেণীকৃত বলে বিবেচনায় আনা হয় না। কিন্তু অনেকেই আলোচনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে বা কোনো নির্দিষ্ট সময়কালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাকে অতি উজ্জ্বল বা অতি কালিমাযুক্ত করার প্রয়াস নিয়ে এগুলো বলেন।
২০০১ সালে গঠিত ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে জারীকৃত ঋণ শ্রেণীকরণ ও অবলোপনসংক্রান্ত নীতিমালা প্রস্তুত করা হয়। এই নীতিমালার আওতায় ইচ্ছাবহির্ভূত কারণে কেউ ঋণখেলাপি হয়ে গেলে বিশদ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মূলত এর সুদের অংশ মওকুফ করে ঋণ অবলোপন করা হয়। তবে এ ধরনের ঋণগ্রহীতাদের নাম ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) থাকে, যাতে তাঁরা বাংলাদেশের আর কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ না নিতে পারেন। উপরন্তু ব্যাংক এ ধরনের খেলাপিদের বিরুদ্ধে মামলাও করতে পারে।
ব্যাংকিং খাত অধিকতর সংস্কারের লক্ষ্যে এবং ঋণ শ্রেণীকরণকে অধিকতর কার্যকর করার স্বার্থে ২০১২ সালে ঋণ শ্রেণীকরণের সময়সীমা হ্রাস এবং ন্যূনতম প্রভিশন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা চালু করা হয়। এ ক্ষেত্রে ছয় মাসের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণকে নিম্নমান (এসএস), ৯ মাসের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণকে সন্দেহজনক (ডিএফ) ও ১২ মাসের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণকে মন্দ (বিএল) নির্ধারণের বদলে যথাক্রমে তিন মাস, ছয় মাস ও ৯ মাসের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণকে যথাক্রমে নিম্নমান, সন্দেহজনক ও মন্দ বলে বিবেচনা করার বিধান চালু করা হয়। এই নতুন নীতিমালাটি আন্তর্জাতিক ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিং নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আর্থিক খাতে এসব সংস্কারের ফলে ২০১২ সালে শ্রেণীকৃত ঋণের হার যৎসামান্য বেড়ে গেলেও (১০.০৩ শতাংশ) মূলত সেটা ছিল ১৯৯৮ বা ১৯৯৯ সালের এক-চতুর্থাংশ। শ্রেণীকৃত ঋণ কমিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ শুরু করা হয় ২০০৩ সালের দিকে। এই ধারা পরবর্তী সময়ও কার্যকরভাবেই বহাল রয়েছে। তবে শ্রেণীকৃত ঋণের হার সবচেয়ে কমে আসে ২০১১ সালে। এ সময় এই হার ছিল ৬.১২ শতাংশ। কিন্তু ২০১২ সালে খেলাপি বিবেচনার সময়কালকে কমিয়ে এনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়ার ফলে আবারও শ্রেণীকৃত ঋণের হার কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ১০.০৩ শতাংশে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নজরদারির ফলে পরের বছরই এই হার ৮.৯৩ শতাংশে নেমে আসে।
ব্যাংকিং খাতে এরই মধ্যে ঋণপ্রবাহ বহুগুণে বেড়েছে। ১৯৯৯ সালে মোট ঋণস্থিতি ছিল মাত্র ৫২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। আর ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে এই স্থিতি ছিল সাত লাখ ৫২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। ২০০৭-০৮ সালের পরই ঋণপ্রবাহের গতি বিপুলভাবে বাড়তে শুরু করে। ২০১০ সালে ব্যাংকিং খাতকে গণমুখী করে তোলার ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সে লক্ষ্যে ২০১০ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজন করে উন্নয়নের যাত্রা : রোড শোÍটেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। কৃষিঋণ, এসএমই ঋণ, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ও ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্সÍএই চারটি মূল প্রতিপাদ্য সারা দেশে প্রচারের লক্ষ্যে ১০ দিনের এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সব ব্যাংকের প্রতিনিধিরা বিপুল উৎসাহ নিয়ে গণমুখী ব্যাংকিং শুরু করার প্রত্যয়ে টেকনাফ থেকে গাড়িবহর নিয়ে পথে পথে সভা করে তেঁতুলিয়া যান।
পথশিশু, শারীরিক প্রতিবন্ধী থেকে শুরু করে সমাজের অতিদরিদ্র শ্রেণি ও পেশার মানুষের জন্য ব্যাংক হিসাব ও ঋণের ব্যবস্থা করা হয়। নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে নারী ও এসএমই খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি পায়। সুদের হার এক অঙ্কে আনা হয়। এ সময়ই বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক সুপারভিশন ও খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন করে নিয়ন্ত্রণ দৃঢ়তর করছে। বিশেষ করে ২০১২ সালে এই নীতিমালা করা হয়েছে বিশ্বমানের। এই নীতিমালার আওতায় থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হলে শ্রেণীকৃত ঋণের হার কোনোভাবেই বাড়তে পারে না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংককে এর নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম উন্নত করে যথাযথভাবে তা প্রয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রকারভেদ অনুসারে বা সমাজে গ্রাহকের অবস্থান দেখে কারো ঋণ শ্রেণীকরণ করা বা না করার বিষয়ে বিবেচনা করা সংগত হবে না। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে খেলাপি সংস্কৃতির বাইরে নিয়ে আসতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT