সাহিত্য

ডিগবাজি

আবদুস সবুর মাখন প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৩-২০১৮ ইং ০১:৫০:০৪ | সংবাদটি ১০৪ বার পঠিত

ছুটে চলেছে ট্রেন। দু’পাশে সবুজ বনানী, গ্রাম জনপদ, ভবন-অট্টালিকা, পাহাড়-টিলা, হাওর-বিল ছাড়িয়ে, নদী-খাল পেরিয়ে চলছে ট্রেন। পড়ন্ত বিকেল। পশ্চিমে দিগন্ত জুড়ে লাল আবির ছড়িয়ে আজকের মতো বিদায়ের প্রহর গুণছে সূর্য। একটু পরেই ডুবে যাবে সে। মনে হচ্ছে যেন দূরে সবুজের ছায়াঘেরা গ্রামগুলোর পেছনেই আস্তে আস্তে সূর্যটা হারিয়ে যাচ্ছে। এই সময়টির অপেক্ষাই করছে শায়ন। কারণ সূর্য ডুবে যাওয়ার সাথে সাথে পূর্বাকাশে উঠছে চাঁদ; পূর্ণিমার চাঁদ। আর এই শরতের পূর্ণিমা রাতের অপরূপ দৃশ্য উতলা করে দেয় শায়নকে। বিকেলের ট্রেনে ভ্রমণ করার উদ্দেশ্যই হচ্ছে চলতি পথে বিকেলের প্রকৃতি আর জোসনা ধোয়া রাতের সৌন্দর্য্য অবগাহন করা। শায়ন বাঁ হাতের কনুই জানালার রেলিংয়ে রেখে চেয়ে আছে বাইরে এক দৃষ্টিতে। সুন সান নীরবতা; কেবল ট্রেনের শাঁ শাঁ শব্দ ছাড়া আর কিছুই তার কানে আসছে না। বাতাস একটু জোরেশোরেই বইতে শুরু করলো। শরতের উত্তরি-শীতল হাওয়ায় জড়িয়ে যায় শায়নের শরীর-মন। হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে খোলা প্রান্তরে- একা। দু’হাত মেলে হাওয়ায় ভাসতে ইচ্ছে করে। প্রাণ খুলে গান গাইতে ইচ্ছে হয় তার।
হঠাৎ মেয়ে কন্ঠে ‘এক্সকিউজ মি’শব্দটি শুনে ধ্যান ভাঙে শায়নের। দেখে তার সামনের আসনে একটি মেয়ে এসে বসেছে। যখন ট্রেন ছাড়ে আসনটি খালি ছিলো। শুধু তা-ই নয়, পুরো কম্পার্টমেন্ট জুড়েই যাত্রীর সংখ্যা প্রথমে ছিলো হাতে গোনা। কিন্তু এখন প্রায় সব আসনই পূর্ণ হয়ে গেছে। ট্রেন ছাড়ার পর মাঝখানে কয়েকটি স্টেশনের যাত্রীরা ওঠেছে। মেয়েটিও কখন তার মুখোমুখি আসনে এসে বসেছে, সে বুঝতেই পারে নি। হতচকিত হয়ে মেয়েটির দিকে তাকাতেই সে বললো অনুনয়ের সুরে-
ঃ জানালার কাঁচটা নামিয়ে দিই? আমার ঠান্ডা লাগছে।
ঃ ঠিক আছে। আমিই নামিয়ে নিচ্ছি।
-বলেই জানালার কাঁচটি নামিয়ে নিলো শায়ন। মেয়েটির করুণ মুখের দিকে চেয়ে তার মায়া হলো। পরিমার্জিত পোশাক, সাজগোজের বালাই নেই। উজ্জ্বল শ্যামলা বরণ মেয়েটির টানা টানা অনুসন্ধিৎসু চোখের গভীরে যেন বিরাজ করছে রাজ্যের অবসাদ। চোখ দু’টি বোঁজে আসছে ক্লান্তিতে। বোঝা যায় চোখের পাতা খোলা রাখার জন্যে তাকে বেশ কষ্টই করতে হয়েছে। বার কয়েক তাকালো শায়নের দিকে। মনে হলো যেন কিছু বলতে চায়। শায়ন বই পড়তে শুরু করলো। কম্পার্টমেন্টের ভেতরকার বাতির আলোতে বই পড়তে একটু অসুবিধা হচ্ছিলো। পকেট থেকে চশমা বের করে চোখে দেয় সে। হঠাৎ বইয়ের কভারে চোখ পড়লো মেয়েটির। যেন আড়মোড়া ভাঙ্গে তার। একটু নড়ে চড়ে বসে। আলাপ করতে চায় ভদ্রলোকের সঙ্গে। কীভাবে শুরু করবে ভাবছে।
ঃ আপনার সঙ্গে একটু আলাপ করলে কি বিরক্ত হবেন?- বইয়ের পাতায় ডুবে থাকা শায়নের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করে মেয়েটি। বইয়ের পাতা থেকে মাথা তুলে শায়ন।
ঃ না, বিরক্ত হবার কিছু নেই।
ঃ নামবেন কোথায়?
ঃ ট্রেনের শেষ গন্তব্য যেখানে, সিলেটে।
ঃ বাড়ি কি ওখানেই?
ঃ হ্যাঁ।
ঃ ফিরছেন তো ঢাকা থেকেই?
ঃ হ্যাঁ।
মেয়েটির একটু রাগও হয়। সে একতরফা শুধু প্রশ্ন করেই যাচ্ছে, আর তার জবাব ‘হ্যাঁ-না’ এর মধ্যেই থেকে যাচ্ছে। নিজে থেকে কোনো কথাই বলছেন না ভদ্রলোক।
শায়ন বইয়ে নিমগ্ন। ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি ইতোপূর্বে একবার পড়ে ফেলেছে। আবার পড়তে শুরু করেছে। মনে হয় যেন বার বার বইটি পড়া উচিত। তাকে নেশায় পেয়ে বসেছে। বইয়ের নেশা, জানার নেশা। যিনি স্বাধীন বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা-স্থপতি, সেই মহান ব্যক্তিটির সংগ্রামী জীবন আলেখ্য আত্মস্থ করার নেশাটা তার দৈনন্দিন জীবনের কার্যতালিকায় একটা উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে আছে। শুধু এই বইটিই নয়, বঙ্গবন্ধু-স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধ-রাজনীতি এই সংক্রান্ত অন্যান্য বইও পড়ার অভ্যাস রয়েছে তার। বইয়ের পাতায় ডুব দিয়ে যেন একেবারে হারিয়েই গিয়েছে অন্য এক জগতে। একটুও ফুসরত নেই চোখ তুলে তাকানোর। মেয়েটি ছটফট করছে কীভাবে এই রাসভারী লোকটির সঙ্গে গল্প জমাবে। কারণ, তার মনে হলো এই লোকটি স্বাধীনতার চেতনার পক্ষের একজন বঙ্গবন্ধু প্রেমিক। এই চেতনাধারী লোকদের তার খুব পছন্দ।
কতো আর সে উপযাচক হয়ে কথা বলবে। যতো সময় যাচ্ছে, লোকটির ব্যাপারে তার আগ্রহ অনুরাগ বেড়ে যাচ্ছে। জানালার কাচ ওপরে তুলে সে। বাইরের ঠান্ডা বাতাস ভিজিয়ে দেয় মেয়েটিকে। তাকায় আকাশে। ভরা পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে আকাশ, মাটি। কিছুটা রোমাঞ্চিত হয়। নিজের অজান্তেই গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠে- ‘চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে...’। শায়নের যেন সম্বিৎ ফিরে আসে। বইটি নামিয়ে নেয় চোখের সামন থেকে। মেয়েটি গেয়ে চলেছে। তার ডান হাতটি জানালায়, মাথা বাইরে বের না করলেও মনে হচ্ছে তার দেহটি ট্রেনের ভেতরে আর অন্তরাত্মা বাইরে ভেসে বেড়াচ্ছে জোসনার বন্যায়। নিজের মধ্যেই হারিয়ে গেছে সে। শায়নের ইচ্ছে হয় বাইরে তাকাবে, কিন্তু পারে না। মেয়েটি জানালায় হাতের ওপর চিবুক রাখে; চেয়ে থাকে এক দৃষ্টিতে। গুনগুন গানও থেমে যায়। একটু আগেই অবসাদে ক্লান্ত- বিধ্বস্ত মনে হয়েছিলো যে মেয়েটিকে, এখন তার উল্টো। বেশ চনমনে- প্রাণোচ্ছ্বলই মনে হচ্ছে তাকে। অথচ শায়ন চুপচাপ এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে বাইরে। যার সঙ্গে আলাপ জমাবে বলে এতোক্ষণ হা-হুতাশ করছিলো, সেই লোকটিই এখন তার দিকে চেয়ে আছে অপলক। বাতাসে উড়ছে কালো চুল। অবিন্যস্ত চুলগুলো কপাল বেয়ে পড়েছে চোখ, নাক, ঠোঁট, গাল, কাঁধের ওপর। জোসনার আলোয় এলোকেশি মেয়েটির পবিত্র সৌন্দর্য্য শায়নের অন্তরে সামান্য হলেও দোলা দেয়। সে ভাবে কেন এমন হলো? জীবনের এতোগুলো বসন্ত পাড়ি দিয়ে দুপুরের খরতাপে দগ্ধ যখন জীবনতরী, তখনই কেন শীতল হাওয়ার হাতছানি? -এখন সে নিজেই মেয়েটির সঙ্গে কথোপকথনের জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়ে।
গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে ট্রেন। ঘন্টা খানেকের মধ্যেই হয়তো ট্রেন থামবে স্টেশনে, আর হুড়মুড় করে সবাই নেমে যাবে ট্রেন থেকে। এরপর কে কারে চেনে, কে কার খবর রাখে?
ঃ আমি কি আপনাকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করতে পারি? -শায়নের আকস্মিক প্রশ্নে মুখ ঘুরায় মেয়েটি। বাঁ হাত দিয়ে মুখের ওপর থেকে অগোছালো চুল সরিয়ে তাকায় শায়নের প্রতি। ঠোঁটে কিছুটা তৃপ্তির হাসি।
ঃ হ্যাঁ, অবশ্যই।
ঃ তুমিওতো সিলেট যাবে, কী যেন নাম তোমার?
ঃ আমার নাম শান্তা। সিলেট যাচ্ছি; ঢাকায় গিয়েছিলাম একটা চাকরীর ইন্টারভিউ দিতে। সিলেট শহরেই আমাদের বাসা। বাবার কাছে শুনেছি, আমাদের মূল বাড়ি ছিলো ময়মনসিংহে। স্বাধীনতার পরে বাবা চলে আসেন সিলেটে; এখানেই স্থায়ী হয়েছি এখন আমরা। বাপ দাদার ভিটে এখনও আমার দেখা হয়নি। আমাদের মূল বাড়ি বা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে এখন আর কোনো যোগাযোগ নেই। আমরা এখন সিলেটেরই স্থায়ী বাসিন্দা। -এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে ফেলে শান্তা। সে এখন উৎফুল্ল। তার কেবলই কথা বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কী বলে সম্বোধন করবে, ভেবে পাচ্ছে না। নিজের বয়সের প্রায় দ্বিগুণ বয়সী একজন ভদ্রলোককে ‘ভাই’ বলবে না ‘আংকেল’! সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। শেষমেশ মনস্থির করে- না, কিছুই বলবো না; কোনো ধরনের সম্বোধন ছাড়াই থাকল।
ঃ আচ্ছা, আপনিতো বেশ বই পড়েন, কিন্তু এতো বই থাকতে এই বইটি পড়ছেন কেন?
ঃ কোনটি?
ঃ এই যে ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’?
ঃ কেন, আপত্তি আছে?
ঃ না- আপত্তি নয়, বরং আমারও আগ্রহ আছে এই ধরনের বইয়ের প্রতি।
ঃ ঠিক আছে, পড়ো। -বলেই শায়ন বইটি বাড়িয়ে দেয় শান্তার দিকে। সে বলে-
ঃ না, না, এখন না। এখন গল্প করি। বই না হয় পরে নেয়া যাবে।
ঃ মানে?
ঃ মানে, পরে না হয় বই একদিন চেয়ে নেবো। কী দেবেন না?
ঃ কীভাবে দেবো? ট্রেন স্টেশনে পৌঁছুলেই তো তুমি একদিকে,্ আর আমি একদিকে। দু’জনের দেখা কি হবে আর কখনও?
ঃ কেন হবে না? আপনি ভালোবাসেন বঙ্গবন্ধু, পূর্ণিমার চাঁদ, ভরা জোসনা আর বই পড়তে। আমিও তো। এখানে তো কোনো পার্থক্য নেই। আপনার আমার চলার পথ তো একই। থাকিও তো আমরা এক শহরে। পাশাপাশি হাতে হাত ধরে রেল লাইনের মতো সমান্তরাল চলতে না পারলেও আপনার পেছন পেছন তো চলতে পারি। একজন সিনিয়র বন্ধু বা সিনিয়র ভাই কি হতে পারেন না?- চোখে তার আকুতি, চেহারায় আধো হাসি আধো বিমর্ষ। শায়ন মাথা নাড়ে। শান্তা বলে-
ঃ চমৎকার। এবার বলুন আপনার কথা। মানে ব্যক্তিগত কথাগুলো।
ঃ বলার তেমন কিছুই নেই। সদ্য স্বাধীন দেশে ৭২-এর জানুয়ারিতে আমার জন্ম। একাত্তর দেখিনি, পঁচাত্তরও তেমন একটা দেখেছি বললে ভুল হবে। কারণ তিন বছরের শিশুর অন্তরে এমন একটা নির্মম ঘটনা খুব বেশি দাগ কাটতে পারে না। তবে বড় হওয়ার পর আস্তে আস্তে উপলব্দিতে আসে সবকিছু। আমার কাছে সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হচ্ছে জাতির পিতার খুনীরা এই দেশের আলো-বাতাসেই বেড়ে ওঠেছে। আরও যন্ত্রণার বিষয় হচ্ছে- প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীদের অনেকেই সেই খুনীদের অনুসারী ছিলো। এদের সঙ্গেই আমাকে বসবাস করতে হয়েছে। তাদের দুর্দ- দাপট এখনও আমাকে পীড়া দেয়। -কথাগুলো শুনে বিচলিত হয়ে পড়ে শান্তা। তার আর শুনতে ইচ্ছে করে না এই দুঃসহ স্মৃতিচারণ। সে লক্ষ করে শায়ন বড় বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেছে। সে নিজেই পরিবেশ পাল্টাতে চাচ্ছে।
ঃ শুনুন, আপনার অনুভূতি আর আমার অনুভূতিতে কোনো পার্থক্য নেই। তবে এখন তো সুবাতাস বইছে। স্বাধীনতার চেতনা বিরোধীদের দাপট এখন কমছে। যাক সে কথা। আমি আশা করি আপনার সঙ্গে মাঝে মধ্যে যোগাযোগ হবে।
স্টেশনে ট্রেন থামে। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে; ব্যাগ এন্ড ব্যাগেজ নিয়ে নেমে যাচ্ছে একে একে। নেমে যায় শায়ন। শান্তাও পিছু পিছু নামে। চলে যায় যে যার পথে।
শায়নের সাদাসিধে ছোট্ট ভুবনে ছোটখাটো একটা পরিবর্তন অনুভুত হয়। দৈনন্দিন কার্যতালিকায় যুক্ত হয় নতুন একটি বিষয়। সেই দিনের ঘন্টা কয়েকের ট্রেন ভ্রমণের স্মৃতি রোমন্থনে কাটে এখন দিনের অনেকটা সময়। ভাবে শান্তার কথা। তার ধীর স্থির স্বভাব, চলন বলন সত্যি মার্জিত। এই সময়ে এমন মেয়ে খুব একটা দেখা যায় না। ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে যায় সাথীর কথা। পুরনো ক্ষতটা যেন জেগে ওঠে। যে ছবিটা হৃদয়ের ক্যানভাস থেকে মুছে গিয়েছিলো, সেটা আবার উন্মোচিত হতে চাইছে। শায়নের কৈশোর উত্তীর্ণ উচ্ছ্বল সময়ের স্বপ্নিল অধ্যায় সাথী। সহপাঠী সাথী। সহপাঠী থেকে বন্ধু। এক পর্যায়ে বন্ধুত্বের গভীরতা বাড়ে। শায়ন স্বপ্ন দেখে সাথীকে নিয়ে; স্বপ্ন দেখতো সাথীও। কিন্তু আকস্মিক ভাবে তছনছ হয়ে যায়ু সবকিছু। তারপর একে একে অনেকগুলো বছর। শায়ন যেমন ছিলো তেমনই; সংসার বিরাগীও হতে পারেনি, সংসারীও হতে পারলো না।
কিন্তু সেই সাথীর ছবিই আজ নতুন করে তার সামনে ভেসে উঠবে, সেটা ভাবতে পারে না শায়ন। বরষায় টইটম্বুর নদীর পানিতে এখন ভাটার টান, সূর্যটা পশ্চিমে হেলান দিয়েছে। এই সময়ে ¯্রােতের উজানে বৈঠা ধরা কি মানায়? এলোমেলো হয়ে যায় সবকিছ্।ু ভালোই কাটছিলো তার পিছুটানহীন জীবন। কেন যে ট্রেনে ওই মেয়েটির সঙ্গে দেখা হলো। শান্তার মাঝে কি সাথীর প্রচ্ছায়া খুঁজে পাচ্ছে সে?- এমনি অনেক প্রশ্ন তার সামনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
শান্তা প্রায়ই ফোন করে। এটা ওটা আলাপ হয়। ব্যক্তি, সমাজ, রাজনীতি- এই পর্যন্তই। শায়ন বলতে চায় আরও অনেক কিছু। বড্ড হেয়ালী মেয়েটি যেন একটা ছকের মধ্যে বন্দী। নির্দিষ্ট কিছু বিষয় আর সীমিত কিছু শব্দে কথোপকথন শেষ করে। চৈত্রের শেষ দিন সন্ধ্যায় ফোন করে শায়ন-
ঃ হ্যালো শান্তা, কেমন আছো?
ঃ ভালো, আপনি?
ঃ এই তো, আছি এক রকম। তোমার সাথে তো এমনিতে দূরালাপনীর মাধ্যমেই আলাপ হয়। কাল চলো বৈশাখী মেলায়; ঘুরোঘুরি করবো, আড্ডা দেবো। তোমাকে বইটিও দিয়ে দেবো।
ঃ ওয়াও! এটা তো খুশির খবর। অবশ্যই যাবো।
শায়ন সিদ্ধান্ত নেয় মেলাতেই সামনাসামনি বলে ফেলবে কথাগুলো; বলবে একটি অসম প্রেমের উপাখ্যান। সকালে চায়ের টেবিলে বসে পত্রিকা পড়তে থাকে চা খেয়ে খেয়ে। স্থানীয় একটি পত্রিকায় একটি শিরোনামে চোখ আটকে যায়।’ ‘একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী সিলেটের... এর বিচার শুরু’। কিছুটা উৎফুল্ল হয়ে ওঠে শায়ন। ঘুম থেকে ওঠেই এমনি একটি সুসংবাদ পাবে সে আশা করেনি। ভাবলো আজকের দিনটি ভালোই যাবে। বিকেলে মেলায় শান্তার সঙ্গে তো সাক্ষাৎ হতোই, এটা আগের নির্ধারিত; সেই সঙ্গে এখন যুক্ত হলো পত্রিকার খবরটি। দু’টি বিষয় নিয়ে ভাবতেই বেশ পুলক অনুভব করে সে।
বিকেলে ফুরফুরে মেজাজে মেলায় যায় শায়ন। পত্রিকাটিও সাথে নেয়। দেখা হয় শান্তার সঙ্গে। অথচ সে যতোটুকু প্রাণোচ্ছল, শান্তা ততোটুকুই বিমর্ষ। তারা মেলার একটি কোণায় গাছের নীচে দাঁড়ায়। পড়ন্ত বিকেলে সূর্যের রক্তিম আভা শান্তার বিষন্ন অবয়বকে উজ্জ্বল করে তুলে। শান্তার হাতে ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থটি তুলে দিয়ে শায়ন বলে-
ঃ জানো, আমি আজ বেশ আনন্দেই আছি।
ঃ কেন?
ঃ আমাদের সিলেট শহরেই একজন ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধীর বসবাস। সে বোল পাল্টিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সেজে দীর্ঘদিন ধরে এই সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো দাপটের সাথে। নিয়েছে সরকারি সুযোগ-সুবিধাও। এখন তার বিচার শুরু হয়েছে। এই দেখো পত্রিকায় এসেছে খবরটি। -বলেই পত্রিকাটি শান্তাকে দিতে হাত বাড়ায়। শান্তা হাতে নেয় না। মুখ ঘুরিয়ে তাকায় পশ্চিমে। ডুবন্ত সূর্যের দিকে। তার দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে। একটু একটু করে কান্না বেড়ে যায়। অঝোরে কাঁদে। শায়ন কী করবে বুঝতে পারে না। সে দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ। মেলার স্টলগুলোতে বাতি জ্বলে ওঠে। ঝলমলে আলো। বেড়ে গেছে লোকসমাগমও। চোখ মুছে। কান্না থামে শান্তার। স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। শায়নের চোখে চোখ রাখে। এভাবে আর কখনও চার চোখের সংযোগ হয়নি কখনও।
ঃ আপনি যে যুদ্ধাপরাধীর কথা বলছেন, তিনি আমার বাবা। তার জন্য এখন আমরা সমাজে মুখ দেখাতে পারি না। বলা যায় একঘরেই হয়েই রয়েছি। মাঝে মাঝে নিজেকে অপাংক্তেয় মনে হয় এই পৃথিবীতে। আমাদের অর্থ-বিত্তের অভাব নেই; কিন্তু অভাব রয়েছে সুখের। মাথা তুলে কথা বলার শক্তি নেই মনে। আমাদের এই দুঃসময়ে কেউ কাছে আসছে না। একটি ছায়াবৃক্ষ খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও। -এক নাগাড়ে কান্নাজড়িত ভেজা ভেজা কন্ঠে কথাগুলো বলে একটু থামে শান্তা। কয়েক মুহূর্ত মাটির দিকে চেয়ে আবার চোখ রাখে শায়নের চোখে।
ঃ আপনি কি পারেন না আমার আকাশের কাঠফাঁটা রোদে এক খ- মেঘ হতে? -শান্তা তার ডান হাত বাড়ায় শায়নের হাত ধরতে। কিন্তু নির্জীব-নিষ্পলক দাঁড়িয়ে থাকে শায়ন। যেন একটি জড় পদার্থ। কিছু না বলে সে পেছনে ঘুরে। আস্তে আস্তে পা ফেলে; হারিয়ে যায় বৈশাখী মেলায় মানুষের ভীড়ে। মেলার মঞ্চে লাউড স্পিকারে বেজে উঠে- ‘আজ আবার সেই পথে দেখা হয়ে গেলো- কতো সুর কতো গান মনে পড়ে গেলো...।’

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT