সাহিত্য

অন্য স্বাদের ব্রেকফাস্ট

আবদুল হাই মিনার প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৩-২০১৮ ইং ০১:৫১:০৩ | সংবাদটি ৫০ বার পঠিত

টুসু-পরব শেষ হলো তিনদিনও হয়নি।
তীব্র শীত পড়েছে চারদিকে।
সময়টা ডিসেম্বরের শেষ কিংবা জানুয়ারির প্রথম। দিনের দ্বিপ্রহরেও এখন বাতাসে মাকড়শার জালের মতো ফিনফিনে কুয়াশার আমেজ। মালনীছড়ার বাসা থেকে বেরিয়ে আমরা টাঙ্গুয়ার হাওরে পৌঁছলাম দিন-শেষের একটুক্ষণ আগে।
ততক্ষণে ‘ভেজা বাতাসের বেলচা’ হাওরের টলটলে পানি থেকে রাশি রাশি শীত উঠিয়ে নিয়ে আমাদের গায়ের ওপর ঢেলে দিতে লেগেছে। ওভারকোট জ্যাকেট সোয়েটার মাফলার আর মাঙ্কি-ক্যাপট্যাপেও শীতকে ঠিকমতো ‘বাউগ্’ মানানো যাচ্ছে না। জুতো আর মোজার ভেতর দিয়ে কনকনে ঠান্ডা ঢুকে পড়ছে পায়ের ভেতর। শীতে হি হি করে কাঁপছি।
ল্যান্ডরোভার আর জিপ এক মাইল দূরে এক মরা খালের ধারে দুটো জারুলের নিচে রেখে এসেছি। এক মাইল পায়ে হেঁটে হাওরের ঢালের এ সাফ-সুতরো জায়গাটায় এসে আমরা তাঁবু ফেললাম। একটা বিশাল তিরপালও সাথে আনা হয়েছে। এটি দিয়ে আরেকটি তাঁবু বানানো হলো। এ তাঁবুতে গুজরুর সাথে তার বন্ধু রঘোবীর আহীর আর বাবুর্চি ফরনমিয়া থাকবে। গুজরু আর রঘু হচ্ছে মালনীছড়া আর তেলিহাটির সবচেয়ে সেরা শিকারি। তাদের হাতের টিপ খুবই ভালো। শিকারি-জীবনে আজ পর্যন্ত একটা কার্তুজও তারা নষ্ট করেনি। বনমোরগ, মধুরা, হরিয়াল, খরগোশ, বাঘডাঁশ, হরিণ কিংবা চিতা আর শুয়োর শিকারে প্রয়োজনের বেশি একটা কার্তুজও তাদের খরচ করতে হয়নি।
যখনকার কথা বলছি তখন বন্য জীবজন্তু বা পাখি শিকারে এত কড়াকড়ি ছিল না। বনবিভাগের অনুমতি নিয়ে লাইসেন্সধারী যে কেউ নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় শিকারে যেতে পারত। তাছাড়া আজ থেকে চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর আগে সিলেটের এসব পাহাড়ি এলাকায় লোকজনের বসত-বাড়ি ছিল অতি অল্প। তুলনায় বন-জঙ্গল আর জলমহালের প্রাচুর্য ছিল অনেক বেশি। কত রকমের পশুপাখি আর জীব-জানোয়ারই না এসব অঞ্চলে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াত! মেজোমামা, ছোটোমামা আর তাদের দুজন বন্ধুর সাথে আমরা দু’ভাই এ হাওরে এসেছি লেন্জা আর সরালি শিকারে।
যেখানে এসে তাঁবু ফেলা হলো তার ধারেই দূর গাঁয়ের একটি কৃষক পরিবার খলা বানিয়ে ধান মাড়াইবাছাই করছিল। অনেক শুকনো খড় পড়েছিল তাদের খলার ধারে। অনুমতি নিয়ে সেখান থেকে গুজরু আর রঘু প্রচুর খড় এনে তাঁবুগুলোর মেঝেতে বিছিয়ে দিতে লাগল। কয়েকবারের খড়ে তুলতুলে জাজিমের মতো দুটো স্তূপ জমে উঠল তাঁবুর ভেতর। সেই খড়ের ওপর বাসা থেকে আনা তোষক-বিছানাচাদর বিছিয়ে তার ওপর সাদা কভারের লেপ দুটো ফেলে দিতেই আমরা দু-ভাই খড়ের বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে লেপের তলায় ঢুকে পড়লাম। নিমেষেই শীত যে কোথায় পালাল।
আহ্ কী আরাম!
ওম ওম গরম খড়ের তোষক আর লেপের ভেতর হাওরের শীতের লেশমাত্র নেই। সারাদিনের পথশ্রম একটুকুতেই প্রায় দূর হয়ে গেল। এখন শুধু পেটের ভেতর ক্ষুধার ছুঁচো ডন-বৈঠক শুরু করেছে, টের পেলাম।
খাওয়া-দাওয়া আর রান্নার ব্যাপারে ফরনমিয়া বিরাট তালেবর আদমি। সিলেট থেকে বেরোনোর সময় বড় বড় দুটো টিফিন-ক্যারিয়ার ভর্তি মোরগপোলাও নিয়ে এসেছিল। প্লাস্টিকের সোরাইতে খাবারের পানি। দুপুরের দিকে তাহিরপুরে ঢোকার মুখে একটি মসজিদের পুকুরপারে বসে সেই পোলাওটুকু খাওয়া হলো। মামারা জোহরের নামাজও সেখানেই সারলেন। তারপর আবার যাত্রা করে তাহিরপুরের দক্ষিণ-পশ্চিম দিক দিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর এলাকায় প্রবেশ করলাম।
এখন রাতের খাবারের ব্যাপারে ফরনমিয়াকে বেশ দুশ্চিন্তিত দেখা গেল। কারণ, দুপুরের মোরগপোলাও এর সবটুকু আমরা পথেই মেরে দিয়েছিলাম। ফরনমিয়া ভেবেছিল এক টিফিন-ক্যারিয়ার দিয়েই সে দু-বেলা চালিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে তা আর হয়ে উঠেনি। আশেপাশে কোনো গাঁওগেরাম নেই। কোথা থেকে খাবার জোগাড় করবে?
‘আমাকে একটু গাঁয়ের দিকে যেতে হবে।’ মেজোমামাকে বলল ফরনমিয়া।
মেজোমামা বলল, ‘কি ব্যাপার, কোনো সমস্যা?’
‘রাতের খাবারে আতান্তরে পড়েছি, চাল ডাল লবণ আলু আর ডিম নিয়ে আসতে হবে। হাওরে পাখির দেখা তো মিলছে না। নইলে শুধু চাউল আর লবণ হলেই চলত। পোড়া লেন্জার মাংস দিয়ে দু’একদিন চালিয়ে নেয়া যেত।’
‘তোমার ডেকচিরও তো অভাব, ভাত পাক করবে কি দিয়ে?’ বলল মেজোমামা।
‘সে আপনাকে ভাবতে হবে না। টিফিনের বাটি দিয়ে রান্নাবান্নার কাজ চালিয়ে নেব। ভালো কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন, কয়েকটা বর্তনও কিনে আনতে হবে।’
মেজোমামা খাবারের জিনিস কিনে আনতে তাকে টাকা দিয়ে গ্রামে পাঠিয়ে দিল। তার সাথে রঘুকেও দিয়ে দিল। বলল, ‘জলদি ফিরবি রে ভাই, ক্ষিধায় জান বেরিয়ে যাচ্ছে।’
ফরনমিয়া আর রঘু গ্রাম থেকে রসদ নিয়ে ফিরে এল আমাদের ধারণারও আগে। দ্রুত সে চাল-ডাল দিয়ে খিঁচুড়ি পাকিয়ে ফেলল। গ্রাম থেকে শুধু ময়নাশাইল চালই আনেনি, দু-সের কালোজিরা চাল আর এক শিশি গাওয়া-ঘিও নিয়ে এসেছে। খিঁচুড়িটা হলো সেই কালোজিরা চাল দিয়ে। সাথে সেদ্ধ ডিম। ফেরার পথে ওরা চৌদ্দটা বড়ো বড়ো তাজা ভেড়া মাছ (ভেদা) আর মশলাপাতি কিনে নিয়ে এসেছিল। খিঁচুড়ি পাকানো শেষ করেই ফরনমিয়া অসাধারণ ঘ্রাণের ভেড়া মাছের ভুনা রেঁধে ফেলল।
কিন্তু হতভাগা রাতের খাবারের সময় সেই মাছের ভুনা আর পরিবেশনই করল না।
আমরা যখন রাতের খাবার খাচ্ছি মেজোমামা বলল, ‘ফরনমিয়া, তোমার এত খুশ্বুঅলা ভেড়ামাছের ভুনা কোথায়? আমাদের খাওয়াবে না?’
ফরনমিয়া ঝকমকে চোখে মেজোমামার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সবকিছুরই একটা নিয়মকানুন আছে, ভাইজান। ভেড়ামাছের ভুনা এভাবে খাওয়া হয় না। এটা আজ সারারাত শীতের হিমে সরার নিচে ডেকচির ভেতর জমতে থাকবে। ভোরে যখন ডেকচির সরা সরাব তখন দেখবেন মজা! সবটুকু মাছের ভুনা জমে চাকার মতন হয়ে আছে। গরম ধোঁয়া-ওড়া ময়নাশাইলের ভাত বর্তনে দেয়ার পর সেই ভাতের ওপর ডেকচি থেকে চামচ দিয়ে কেটে কেটে ভেড়ামাছের ভুনা সেখানে ফেলব। দেখবেন মাছভুনার চাকাটা গরম ময়নাশাইলের ভাতের ওপর পড়ে কেমন গলে গলে যাচ্ছে! তখন মজা করে সেই গরম ভাত দিয়ে মাছের ভুনাটা খান। বেহেশতের খাবারও এর সামনে কিছু না।’
অতএব, ধৈর্য ধরে সে রাতে আমরা শুধু মুগডাল আর নতুন আলু ঘি দিয়ে পাকানো খিঁচুড়িটুকু পেট পুরে খেয়ে নিলাম। তারপর খড়ের তোষকের আরামের বিছানায় শুয়েই ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি টাঙ্গুয়ার হাওরের চারদিক কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে আছে। তীব্র শীতে লেপের তলা থেকে বেরোনো যাচ্ছে না।
ওদিকে তাঁবুর বাইরের চুলায় ফরনমিয়া ময়নাশাইলের ফেনসা ভাত রাঁধছে। কী মজার ঘ্রাণ নাকে এসে লাগছে। সাধারণ ভাতেরও যে এত সুঘ্রাণ হয় কোনোদিন কল্পনাও করিনি।
আমরা সবাই শীতে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে হাওরের পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে এলাম। তারপর লেপের তলায় বসে বসেই সেই বিখ্যাত ভাত খাওয়া।
নরম হয়ে জমে যাওয়া ভেড়ামাছের ভুনা আর ময়নাশাইলের গরম ধোঁয়াওড়া ভাত!
আশ্চর্য! ফরনমিয়া যেমন যেমন বলেছিল ঠিক সে ভাবেই মাছের চর্বির মতো ভুনাটা আস্তে আস্তে গরম ভাতের ভেতর গলে গলে গেল। সকালের খাবার খেলাম একটা ঘোরের ভেতর। এত স্বাদের ব্রেকফাস্ট আমার জীবনে এই প্রথম। ঠান্ডা জমাট ভেড়ামাছের ভুনা দিয়ে ধোঁয়াওড়া ময়নাশাইলের ফেনসা ভাত খাওয়া শেষ করে ফরনমিয়াকে একটা স্যালুট আমাদের দিতেই হলো। তার মুখটা ঝল্মলে হয়ে ওঠল। ঝকঝকে চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বলি নাই ভাইজান, এ মাছ খাওয়ার একটা আলাদা তরিবত আছে? এখন বুঝলেন তো?’
‘বিলক্ষণ।’ মেজোমামা আবার তাকে বাউ করলেন।
শীতের সেই ভোরে টাঙ্গুয়ার পারে অত্যাশ্চর্য সুস্বাদু এক ভাত খাওয়ার গল্প সারাজীবনের জন্য আমার মগজে সেদিন ঠাঁই করে নিল।

শেয়ার করুন
সাহিত্য এর আরো সংবাদ
  • ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সাহিত্যের জনক
  • সুশাসন ও দুঃশাসনের তাত্ত্বিক পাঠ
  • মালতি
  • ‘মার্কস চিন্তার সহি তফসির’
  • নষ্ট দাঁতের যন্ত্রণা
  • সুরমা সৈকতে গীতাঞ্জলি বিতর্ক
  • রবীন্দ্রনাথ ও নীলেশ্বর মুখার্জি
  • প্রতিক্ষার শেষ প্রহর
  • ‘দায়বদ্ধ অর্থশাস্ত্রী’ ও আমাদের দায়বদ্ধতা
  • শহিদ শিবলী : বিস্মৃত এক মুক্তিযোদ্ধা
  • হাজরে আসওয়াদের ইতিহাস
  • নাশপাতি ঘ্রাণে মন : কবির অনবদ্য সৃষ্টি
  • কবিতার অক্ষরে, কবির বেদনার ভেতর
  • অন্য স্বাদের ব্রেকফাস্ট
  • ডিগবাজি
  • কবিতা
  • ছন্দ ঝরে বন্ধ ঘরে : ছড়ার চিরন্তন ব্যঞ্জনা
  • বঙ্গীয় বাস্তবতায় উত্তর-আধুনিকতা
  • এমসি কলেজ : ইতিহাস ও জ্ঞান বিকাশের বাতিঘর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • Developed by: Sparkle IT