ইতিহাস ও ঐতিহ্য

মুক্তিযুদ্ধে ছাতক : ইতিহাসের এক স্মরণীয় অধ্যায়

মিজানুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৩-২০১৮ ইং ০৩:১৮:৫৮ | সংবাদটি ১৪৯ বার পঠিত


১৯৭১ সালের ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যা। তুরা পাহাড়ের তেলঢালা থেকে শতাধিক গাড়ীবহর নিয়ে ৪০০ মাইল পথ অতিক্রম করে শেলা বিওপিতে পৌঁছান জেড ফোর্স। জেড ফোর্সের অধীনে ছিল তিনটি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (১, ৩ এবং ৮) ছিল এবং তাদের এখানে আগমনের উদ্দেশ্য ছিল সেক্টর-৫ (কমান্ডার: মেজর শফিউল্লাহ) কে সহায়তা করা। কিন্তু চারশো মাইল পথ পাড়ি দেয়া রণক্লান্ত সেই ৩য় বেঙ্গলকে ভারতীয় বাহিনীর জেনারেল গিল (পরবর্তীতে কামালপুর অভিযানে মাইনে আহত হয়ে পা হারান) নির্দেশ দেন পরদিনই ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি আক্রমণের। সম্পূর্ণ নতুন একটি এলাকায় এসে কম্পাস, সিগন্যাল সেট, বাইনোকুলার এর মত প্রয়োজনীয় যুদ্ধোপকরণ ছাড়া এই ধরণের একটি আক্রমণ পরিচালনা করা যে চূড়ান্ত বোকামি তা জানতেন ৩য় রেজিমেন্টের অধিনায়ক মেজর শাফায়াত জামিল । যদিও পাঁচ নং সেক্টর থেকে তিনটি ফ্রিডম ফাইটার কোম্পানি তাকে দেওয়া হয় কিন্তু তারপর ছাতক শহর এবং সিলেট অঞ্চলে ছিল আর্টিলারি সহ পাক বাহিনীর শক্ত ঘাঁটি।
প্রথাগত যুদ্ধের নিয়মানুযায়ী ডিফেন্সিভ বাহিনীর একজনের বিরুদ্ধে এটাকিং বাহিনীর তিনজন সৈন্য প্রয়োজন। পাকিস্তানী বাহিনী ছাতকে ছিল ডিফেন্সিভে, কিন্তু তাদের এট্যাক করার মত পর্যাপ্ত সৈন্য ছিলনা ৩য় রেজিমেন্টের। আর যেসব সৈন্য ছিল তার মধ্যে আবার বেশীরভাগ ছিল মাত্র অল্প ট্রেনিং পাওয়া ছাত্র এবং সাধারণ জনতা নিয়ে তৈরি এফএফ বাহিনী। এই হল আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল। সামনে নিশ্চিত পরাজয় এবং মৃত্যু জেনেও আদেশ পালনে তাদের কখনো ব্যত্যয় ঘটেনি। তারা যুদ্ধ জিতেছিলেন শুধু দেশের প্রতি ভালবাসা দিয়ে, অন্তর দিয়ে।
১৪ আগস্ট ভোর পাঁচটা, হাজারের কাছাকাছি মুক্তিসেনা তিনদিক থেকে আক্রমণ করেন ছাতকের সিমেন্ট ফ্যাক্টরি। কিন্তু যথারীতি বিধি বাম। পাকিস্তানী বাহিনীর হেভি আর্টিলারি শেলিং এ পরাজিত হয় মুক্তিবাহিনী। শুধু তাই নয় পরবর্তীতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সবচেয়ে গৌরবময় বাহিনী গুর্খা রেজিমেন্ট দুইবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় ছাতক এলাকার ছোটখেল দখলে। কিন্তু পরবর্তীতে সেই ৩য় বেঙ্গলের সাহসী সৈন্যরাই ছোটখেল দখল করে প্রমাণ করে স্বল্প সরঞ্জামাদি আর ট্রেনিং সত্ত্বেও শুধু দেশপ্রেমকে পুঁজি করে গঠিত আমাদের মুক্তিবাহিনী বিশ্বের কোন নিয়মিত সেনাবাহিনী থেকে পিছিয়ে ছিলনা।
এই যুদ্ধটি ছিল পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর প্রথম সংঘবদ্ধ আক্রমণের একটি যা তাদের বেশ ভালভাবে নাড়া দিয়েছিল। পরবর্তীতে পাকিস্তানী বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিক সালিক (পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের সাথে প্লেন ক্র্যাশে নিহত) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ডরঃহবংং ঃড় ঝঁৎৎবহফবৎ বইতে উল্লেখ করেছিলেন। তার পুরো বইতে শুধু দুইটি মাত্র যুদ্ধের কথা উল্লেখ ছিল। একটি হলো কামালপুর আক্রমণ এবং অন্যটি হলো এই ছাতক যুদ্ধ।
পাঁচ দিনব্যাপী ওই ভয়াবহ ছাতক যুদ্ধে ৩৬৪ জন পাকসেনা নিহত হয় এবং চার শতাধিক পাকসেনা আহত হয়। ছাতক দখল সম্ভব না হলেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ছাতক ওপারেশন অনন্য সাধারণ সাহস ও দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
শ্বাসরুদ্ধকর এই ছাতক যুদ্ধ নিয়ে শুনুন কর্নেল (অব.) শাফায়াত জামিল বীরবিক্রম এর কাছ থেকেই।
তুরা পাহাড়ের তেলঢালা ক্যাম্প থেকে ১০ অক্টোবর আমরা রওনা হলাম। আমাদের বহরে প্রায় একশ' গাড়ি। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ৫৯টি সিভিল ট্রাক দিয়েছিল, বাকিগুলো আমার ব্যাটালিয়নের জিপ, ডজ, থ্রি টন এই সব। টানা দু'দিন দু'রাত চলার পর গৌহাটিতে পৌঁছলাম। গৌহাটি থেকে শিলং। শিলং থেকে দীর্ঘ পাহাড়ি ও বিপদসংকুল রাস্তা পাড়ি দিয়ে বৃষ্টিবহুল চেরাপুঞ্জি।
চেরাপুঞ্জির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলাম আমরা। মেঘের দেশ চেরাপুঞ্জি। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা আকারের পাথর। চোখে পড়ল অনেক পাহাড়ি ঝরনা। আর বহু উঁচুতে বলে হাত বাড়ালেই যেন মেঘের নাগাল! আকাশের গাছোঁয়া পাহাড়ি রাস্তা ধরে চলেছি, হঠাৎ করেই দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়ে গেল। গাড়ির সামনে পথের ওপর ভেসে এসেছে এক টুকরো মেঘ! তাই এ বিপত্তি। ভাসমান মেঘটা সরে যেতেই আবার যাত্রা। ৫ হাজার ফুট নিচে দিগন্ত বিস্তৃত সমতল ভূমি, আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ। অদ্ভুত এক ধরনের অনুভূতি হচ্ছিল।
চেরাপুঞ্জির বৃষ্টির কথা এতদিন কানে শুনেছি, এবার চোখে দেখা হলো। এই অক্টোবর মাসেও ক'দিনের যাত্রায় চেরাপুঞ্জির বৃষ্টিতে ভেজার অভিজ্ঞতা হলো। চেরাপুঞ্জি হয়ে আমরা এলাম শেলা বিওপিতে। শেলা বিওপির অবস্থান সিলেটের ছাতক শহর থেকে বারো মাইল উত্তরে, ভারতে। শেলা বিওপির পাশেই বাঁশতলা নামে একটা জায়গা। গোটা জায়গাজুড়ে শুধু ছোট ছোট পাহাড় আর ঘন জঙ্গল। আপাতত জঙ্গল পরিষ্কার করে অনেক তাঁবু পেতে বাঁশতলায় ক্যাম্প করলাম আমরা। এই ক্যাম্পেই ক্যাপ্টেন আকবর, আশরাফ আর আমার পরিবারের থাকার ব্যবস্থা হলো। আমাদের পরিবার এর আগে ছিল তুরার উপকণ্ঠে একটা ভাড়া বাড়িতে। বাঁশতলা আসার সময় আকবর গিয়ে ওদের সঙ্গে করে নিয়ে আসে। এ জন্য সে আমাদের একদিন পর রওনা হয়। বাঁশতলায় আমাদের গুছিয়ে উঠতে উঠতে বেলা গড়িয়ে গেল।
সন্ধ্যায় ভারতীয় ১০১ কম্যুনিকেশন জোনের জিওসি মেজর জেনারেল গুরবক্স সিং গিল এবং ৫ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর মীর শওকত আলী (পরে লে. জেনারেল অব.) আমাদের স্বাগত জানাতে এলেন। কথাবার্তার এক পর্যায়ে জে. গিল এবং মেজর শওকত জানালেন, সেদিন ভোর রাতেই আমাদের অপারেশনে যেতে হবে। তারা বললেন, পুরো ব্যাটালিয়ন এই অপারেশনে যাবে, সঙ্গে দেওয়া হবে আরও তিনটি এফএফ (ফ্রিডম ফাইটার) কোম্পানি। এফএফ কোম্পানিগুলো ছিল সেক্টর কমান্ডার মেজর মীর শওকত আলীর অধীনে। ৫ নম্বর সেক্টরে এ সময় কোনো নিয়মিত সেনাদল ছিল না।
এই সেক্টরে অপারেশন চালাতে মেজর শওকতকে সাহায্য করার জন্য জেড ফোর্স থেকে সাময়িকভাবে আমাদের পাঠানো হয়। এদিকে জেড ফোর্স কমান্ডার মেজর জিয়া তুরা থেকে সিলেটের পূর্বদিকে মুভ করলেন। তার সঙ্গে প্রথম ও অষ্টম বেঙ্গল। তৃতীয় বেঙ্গলকে নিয়ে আমি এলাম সিলেটের উত্তরাঞ্চলে। যাই হোক, সেক্টর কমান্ডার মেজর শওকত এবং ভারতীয় জেনারেল গিল বললেন, আমাদের (তৃতীয় বেঙ্গলকে) প্রথমে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে অবস্থিত পাকসেনাদের অবস্থান দখল করতে হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে দখল করতে হবে ছাতক শহর।
প্রায় ৪শ' মাইল পথ পাড়ি দিয়ে সবাই খুব ক্লান্ত। আর এ অবস্থায় সেদিন ভোর রাতেই অভিযানে যেতে হবে। একেবারে অবাস্তব পরিকল্পনা। সাধারণ বাস্তববুদ্ধি-বিবর্জিত উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। যাই হোক, অপারেশনের নির্দেশনা দেওয়া হলো এ রকমেরথ ক্যাপ্টেন মোহসীন তার চার্লি কোম্পানি নিয়ে ছাতকের উত্তর-পশ্চিমে দোয়ারাবাজারের নিকটবর্তী টেংরাটিলা দখল করবে, যাতে করে পাকসেনারা তাদের অবস্থানের সাহায্যার্থ ছাতকের দিকে অগ্রসর হতে না পারে। দোয়ারাবাজারে পাকিস্তানিদের ফ্রন্টিয়ার কনস্ট্যাবুলারির একটি দল প্রতিরক্ষার দায়িত্বে ছিল। ছাতক ও ভোলাগঞ্জের মধ্যে ছিল একটা রোপওয়ে। সেই রোপওয়ে দিয়ে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির জন্য ভোলাগঞ্জ থেকে চুনাপাথর আনা হতো। রোপওয়েটির প্রায় নিচ দিয়েই ভোলাগঞ্জ থেকে ছাতক পর্যন্ত একটা হাঁটাপথও আছে।
পথটা গিয়ে পৌঁছেছে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি পর্যন্ত। সিমেন্ট ফ্যাক্টরির মাইল দেড়েক উত্তরে আরেকটি পায়ে-চলাপথ দোয়ারাবাজারের দিক থেকে এসে এই রোপওয়ের নিচের রাস্তার সঙ্গে মিশেছে। ওই রাস্তা ধরে পাকিস্তানি সৈন্যরা যাতে আমাদের মূল বাহিনীর পেছনে এসে আক্রমণ করতে না পারে, সেজন্যই দোয়ারাবাজার দখল করতে হবে। ইকো কোম্পানি থাকবে এই হাঁটাপথ দুটোর সংযোগস্থলের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে, যাতে শত্রুপক্ষ দোয়ারাবাজার থেকে আমাদের পেছনে কোনো সৈন্য সমাবেশ করতে না পারে।
ছাতক শহর ও সিলেটের মধ্যে গোবিন্দগঞ্জ বলে একটা জায়গা আছে। গোবিন্দগঞ্জে সিলেট-ছাতক এবং সিলেট-সুনামগঞ্জ রাস্তা এসে মিলেছে। সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের দিকে মাইল বিশেক ভেতরে এর অবস্থান। ছাতক শহর থেকে দূরত্ব ১০ মাইল। লে. নূরন্নবীকে তার ডেলটা কোম্পানি নিয়ে এই গোবিন্দগঞ্জের রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করার দায়িত্ব দেওয়া হলো।
সিলেট থেকে ছাতকে পাকিস্তানি রিইনফোর্সমেন্ট আসা ঠেকাতে হবে তাকে। সেই সঙ্গে ছাতক থেকে যেন পাকসেনারা সিলেটে পশ্চাদপসরণ করতে না পারে, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। ছাতক অবরোধ এবং দখলের জন্য মূল ফোর্স হিসেবে রইল আলফা ও ব্রাভো কোম্পানি, ছাত্রদের নিয়ে গঠিত ইকো কোম্পানি এবং সেক্টর কমান্ডার মেজর মীর শওকতের দেওয়া তিনটি এফএফ কোম্পানি। এ ছয়টি কোম্পানি প্রথমে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি আক্রমণ করে দখল করবে। এরপর নদী পার হয়ে ছাতক শহরে অভিযান চালাবে। ভারতীয়রা জানাল, তারা এ সময় আর্টিলারি সাপোর্ট দেবে।
অপারেশন শুরু হওয়ার কথা পরদিন অর্থাৎ ১৪ অক্টোবর ভোর ৫টায়। রাতে রওনা হলাম আমরা। মেজর শওকত এ সময় আমার সঙ্গে ছিলেন। পরিকল্পনা মতো আলফা ও ব্রাভো কোম্পানি বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে ক্যাপ্টেন আনোয়ার ও আকবরের নেতৃত্বে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে তীব্র আক্রমণ শুরু করল। তাদের আক্রমণের প্রচ-তায় টিকতে না পেরে সেখানে অবস্থানরত পাকিস্তানি সৈন্যরা এক পর্যায়ে ফ্যাক্টরির অবস্থান ছেড়ে দিয়ে সুরমা নদীর ওপারের ছাতক শহরে পিছিয়ে গেল। ৩০ এফএফ এবং টোচি স্কাউটসের সৈন্যরা সেখানে অবস্থান করছিল। আনোয়ার সিমেন্ট ফ্যাক্টরি দখল করে সেখানে অবস্থান নেয়। আকবর ঠিক তার পেছনেই, মাঝখানে একটা বিল।
এদিকে দোয়ারাবাজারে একটা বিপর্যয় ঘটে গেল। দোয়ারাবাজার ঘাটে আগে থেকেই পাকিস্তানিরা তৈরি হয়ে ছিল। পাকসেনা, রাজাকার বাহিনী এবং পাকিস্তান থেকে আসা ফ্রন্টিয়ার কনস্ট্যাবুলারি তখন ঘাট এলাকায় প্রতিরক্ষার দায়িত্বে ছিল। হাওর-বিল পার হয়ে মোহসীন ও তার চার্লি কোম্পানি দোয়ারাবাজার ঘাটে নামার আগেই তারা গুলি চালাতে শুরু করে। খুব সম্ভবত রাজাকারদের কাছ থেকে তারা আমাদের আগমনের খবর পেয়ে যায়। খবর পাওয়ার কথাই। প্রায় শ'খানেক গাড়ির বহর আমাদের। হেডলাইট জ্বালিয়ে এত গাড়ি আসছে, সেটা চোখে পড়া খুবই স্বাভাবিক। আর উঁচু পাহাড়ি রাস্তা বলে অনেক দূর থেকেই দেখতে পাওয়ার কথা। পাকসেনারা বুঝে গিয়েছিল, এ এলাকায় আমাদের সৈন্য সমাবেশ হচ্ছে। সেজন্য তারা পুরোপুরি সতর্ক ছিল।
মোহসীনের কোম্পানিটা নৌকায় থাকা অবস্থাতেই পাকিস্তানিরা গুলি চালাতে শুরু করলে বেশ কয়েকটি নৌকা পানিতে ডুবে যায় এবং অতর্কিত আক্রমণে পুরো কোম্পানিই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এই যুদ্ধের দিনতিনেক পরও আমি মোহসীনের কোম্পানির জনাত্রিশেক সহযোদ্ধার কোনো খবর পাইনি। এরা শহীদ, আহত, না বন্দি- কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। দেড়শ' যোদ্ধার প্রায় ষাট শতাংশ অস্ত্রই পানিতে পড়ে যায়। প্রাণ রক্ষার্থে আমাদের সৈন্যরা হাওরের গভীর পানিতে অস্ত্রশস্ত্র ফেলে দিতে বাধ্য হয়। কাজেই কোম্পানি তাদের নির্ধারিত দায়িত্ব পালন, অর্থাৎ দোয়ারাবাজার দখল এবং প্রতিবন্ধকতা তৈরিতে ব্যর্থ হলো।
ওদিকে নৌকা জোগাড় করতে দেরি হওয়ায় গোবিন্দগঞ্জে পৌঁছতে নবীর কিছুটা বিলম্বই হয়ে যায়। সেই সুযোগে পাকিস্তানিরা ছাতকে তাদের ট্রুপস রিইনফোর্সমেন্ট পাঠিয়ে দেয়। তারা ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির আশপাশে আমাদের অবস্থানে প্রচ- শেলিং শুরু করল। ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি দখল করার জন্য আমরা সেখানে কিছু শেলিং করেছিলাম। ফ্যাক্টরি দখল হয়ে গেলে ছাতক শহরের ওপর কিছু গোলাবর্ষণ করা হয়। কিন্তু বেসামরিক লোকদের হতাহত হওয়ার আশঙ্কায় কিছুক্ষণ পরই শহরে গোলাবর্ষণ বন্ধ করা হলো। এদিকে নবীর গোবিন্দগঞ্জে পৌঁছতে দেরি হওয়ার সুযোগে সিলেট থেকে পাকবাহিনীর নতুন সৈন্য এসে যায়।
৩০ এফএফ রেজিমেন্টের দুই কোম্পানি এবং ৩১ পাঞ্জাবের এক কোম্পানি সৈন্য ছাতক শহরে পৌঁছে যায়। নবী গোবিন্দগঞ্জে পৌঁছানোর পরদিন পাকসেনাদের ওই কোম্পানিগুলোর একটি অংশ তার ওপর আক্রমণ চালায়। নবী সেখানে প্রতিরোধ যুদ্ধ করে। পাকসেনাদের কিছু ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়ে এক পর্যায়ে সে পিছিয়ে আসে।
আমরাও এ যুদ্ধে বেশ কয়েকজন যোদ্ধাকে হারাই। ছাতক যুদ্ধ শেষে পুরো ঘটনা জানতে পেরে আমি ওই দু'জন জেসিওকে ঈষড়ংব করে বাঁশতলায় পাঠিয়ে দিই। বাঁশতলায় তখন আমার ব্যাটালিয়নের এলওবি। যুদ্ধ শেষে তাদেরকে অন্য একটি ব্যাটালিয়নে বদলি করা হয়।
এদিকে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি দখল করে আনোয়ার ও আকবর দু'দিন ধরে সেখানে অবস্থান নিয়ে আছে। এই দু'দিনের মধ্যে পাকিস্তানিরা ছাতকে যে রিইনফোর্সমেন্ট নিয়ে এলো, সেটা দোয়ারাবাজারে এসে আমাদের পেছনে সমবেত হতে লাগল। আমাদের অগ্রবর্তী সৈন্যরা তখন সুরমা নদীর সামনে পৌঁছে গেছে। ক্যাপ্টেন আনোয়ার তাদের সঙ্গে।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম মিয়ারচর
  • বিভীষিকাময় একাত্তর শ্বাসরুদ্ধকর পাঁচঘণ্টা
  • সিলেটের প্রথম সংবাদপত্র এবং কবি প্যারীচরণ
  • সিলেটের প্রথম সাংবাদিক, প্রথম সংবাদপত্র
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • মুক্তিযোদ্ধা নজরুল এবং অন্যান্য
  • বানিয়াচং সাগরদিঘী
  • খুন ও ধর্ষণ করেছে চরমপন্থিরাও
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • গ্রামের নাম পুরন্দরপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • জামালপুর একটি সমৃদ্ধ জনপদ
  • জীবন নিয়ে খেলছেন এডলিন মালাকারা
  • সিলেটের প্রাচীন ইতিহাস
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • মৃৎশিল্পের চিরকালীন মহিমা
  • পাক মিলিটারির ৭ ঘণ্টা ইন্টারগেশন
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • ঐতিহ্যবাহী গাজীর মোকাম
  • ইসলাম ও ইতিহাসে মুদ্রা ব্যবস্থা
  • Developed by: Sparkle IT