ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য তথ্য কোষ

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৩-২০১৮ ইং ০৩:২৩:০২ | সংবাদটি ৯৬ বার পঠিত


[পূর্ব প্রকাশের পর]
স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার দাবি দাওয়ার পক্ষে, পরিচালিত রাজনীতি, আন্দোলন ও সশস্ত্র তৎপরতায়, নির্বিচারে গণহত্যা কোনো মতেই অনুমোদন যোগ্য নয়। এখন স্বাভাবিক শান্ত পরিবেশে গণহত্যার অভিযোগগুলো যাচাই করে দেখা দরকার। পার্বত্য চট্টগ্রামে এরূপ বিচারযোগ্য ঘটনা অনেকই আছে ও তার বিচার অবশ্যই হতে হবে। সাধারণ ক্ষমার আওতা থেকে গণহত্যার অপরাধটি অবশ্যই বাদ যাবে।
পার্বত্য ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে, আমার নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ হলো : এই পর্বতাঞ্চলের প্রতিটি দাঙা, অগ্নিসংযোগ, ছিনতাই, চাঁদাবাজী, হত্যা ও পীড়নের অগ্রপক্ষ হলো জনসংহতি সমিতি ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলো। বাঙালিরা তাতে পাল্টাকারী পক্ষ মাত্র। এমতাবস্থায় জনসংহতি সমিতি নেতৃবৃন্দ হলেন আসল অপরাধী। মানবতা বিরোধী অপরাধ সংগঠনে তাদের নির্দেশ ও অনুমোদন না থাকলে, তারা প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে অবশ্যই দমাতেন বা শাস্তি দিতেন। পাক্যুয়াখালি ঘটনা তাদের দ্বারা অনুষ্ঠিত হয়নি, অনুরূপ অস্বীকৃতি আমলযোগ্য নয়। কারণ অনুরূপ ঘটনা ঘটাবার দ্বিতীয় কোনো প্রতিষ্ঠান এই আমলে অত্রাঞ্চলে উপস্থিত নেই। ভূক্তভোগীপক্ষ একমাত্র তাদেরকেই তজ্জন্য দায়ী করে। তাদের অস্বীকারের অর্থ নিজেদের সংগঠনভূক্ত অপরাধীদের অপরাধ ঢাকা। সুতরাং জনসংহতি নেতৃবৃন্দই অপরাধী।
এখন গণহত্যার অভিযোগটি বিদ্রোহী সংগঠনের প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার উপরই পতিত হয়। তিনি অপরাধী না নির্দোষ তা বিচার প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে। আমরা আইন শৃঙ্খলা মান্যকারী সাধারণ মানুষ, সরকারের কাছে এই দাবী করছি : পাক্যুয়াখালি সহ অন্যান্য গণহত্যার বিচার হোক। আন্তর্জাতিক আইন হলো : গণহত্যা ক্ষমাযোগ্য নয়। যদি পাকুয়্যাখালি ভুষণছড়া ও অন্যান্য ঘটনাকে গণহত্যা রূপে ধরে নিতে সন্দেহ থাকে, তা হলে আন্তর্জাতিক মানে এর যথার্থতা যাচাই করা হোক। আমরা বিচার চাই, অবিচার নয়।
সন্তু বাবু, এখন সরকারের নিরাপদ পক্ষপুটে আশ্রিত। তাই বলে তাকে অভিযুক্ত করা যাবে না, এমন পক্ষপাতিত্ব ন্যায় বিচারের বিরোধী। সন্তু বাবু নিজেকে নিরপরাধ মনে করলে, সরকারের পক্ষপুট ছেড়ে বিচার প্রক্রিয়ার কাছে নিজেকে সোপর্দ করুন। নিরপরাধ স্বজাতি হত্যার অনেক অভিযোগ ও তার বিরুদ্ধে ঝুলে আছে। অধিকার আদায়ের সংগ্রাম মানে তো, মানুষ হত্যার অবাধ লাইসেন্স লাভ নয়। মানবতাবাদী সংগঠনের হিসাব মতে তাদের হাতে অন্ততঃ ত্রিশ হাজার স্থানীয় আধিবাসীর প্রাণনাশ ঘটেছে। এটি গুরুতর অভিযোগ।
স্থানীয় পরিষদের আইন ও আচরণের সংশোধন প্রয়োজন :
উপজাতীয় সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতি ও তার সশস্ত্র অঙ্গ সংগঠন শান্তি বাহিনীর দ্বারা, উত্থাপিত স্বায়ত্ত শাসনের দাবি ও উৎপাতে অতিষ্ঠ সরকার ১৯৮৯ সালে স্থানীয় শাসন ক্ষমতা সম্বলিত তিন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ গঠন সংক্রান্ত সংসদীয় আইন পাশ করেন এবং তার আওতায় নির্বাচনের মাধ্যমে তিন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ গঠিত হয়। তৎপর একটানা এই পরিষদগুলো বহাল আছে। আইনতঃ মিয়াদ শেষেও এগুলোর আয়ু শেষ হচ্ছে না। ইতোমধ্যে অনেক চেয়ারম্যান ও সদস্যের পদ খালি হয়েছে। মনোনয়নের মাধ্যমে সদস্য আর চেয়ারম্যানের পদ পূরণ করা হলেও, আইনতঃ শূন্য পদগুলো শূন্যই আছে। তিন বৎসর মেয়াদের এই পরিষদগুলোর আয়ু আরো বৃদ্ধি পেয়ে চলতি শতাব্দী ফুরায় কিনা কে জানে। কোনো তিক্ত রহস্য এর পিছনে সক্রিয় বলা মুশকিল।
ধারণাটি নতুন। এ সম্বন্ধে কারো কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিলো না। ওয়াকিবহাল বিশেষ মহলের শুধু এ খবরটি জানা ছিলো যে, ভারতের মিজোরাম অঞ্চলে, এতদাঞ্চলেরই পূর্ব উত্তর সীমান্তের লাগোয়া চাকমা অধ্যুষিত এলাকায় একটি চাকমা স্বায়ত্ত শাসিত পরিষদ কার্যকরী আছে। কিন্তু সেটা ফেডারেল স্টেটের গঠন কাঠামোতে গঠিত। যেহেতু বাংলাদেশ বিশুদ্ধ এক কেন্দ্রিক রাষ্ট্র, সেহেতু ঐ গঠন কাঠামো এখানে প্রযোজ্য নয়। তবু এ অনুপ্রেরণায় বাংলাদেশ সংবিধানের স্থানীয় শাসন কাঠামোতে, তিন স্থানীয় সরকার পরিষদ গঠনের পরিকল্পনা গৃহিত হয়। লক্ষ্য হয় অসন্তুষ্ট উপজাতীয় পক্ষকে সন্তুষ্ট করা। কিন্তু সময়ের পরীক্ষায় দেখা যাচ্ছে স্বায়ত্ত শাসন কামীরা তাদের দাবিতে এখনো অনড়। আগে তাদের দাবি ছিলো প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, এখন তা সংশোধিত হয়ে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের রূপ নিয়েছে। ক্ষমতার পরিসর তাতে স্থানীয় সরকারের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। দীর্ঘ দিনেও এর বিপক্ষে জন সংহতি সমিতি ও শান্তি বাহিনীকে নমনীয় করা যায়নি। স্বায়ত্তশাসন দাবির মীমাংসা কখন হবে, সেই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য স্থানীয় সরকার পরিষদগুলোর নির্বাচন ও ভুল ত্রুটিগুলোর সংশোধনের ব্যাপারটি প্রলম্বিত হয়ে আছে। এ সবের সংশোধন ও নবায়ন দরকার। বর্তমানে সময়ের প্রয়োজন এটা। ভবিষ্যতে গোটা পরিষদ ব্যবস্থার বিলোপ সাধন বা মৌলিক পরিবর্তন করার প্রয়োজন হলেও, তখন তার প্রয়োজন থাকবে বলা যায় না।
সময়ের যাচাই বাছাই ও চাহিদাই পরিষদ আইনের কিছু দোষ ত্রুটিকে চিহ্নিত করেছে। পরিষদগুলোকে কার্যকর রাখতে এ সব দোষ ত্রুটির সংশোধন অবশ্যই দরকার। প্রথমেই ধরা যায়, জেলা প্রশাসকদের মর্যাদার কথা। তারা স্থানীয় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হওয়া ছাড়াও সরকারের মুখ্য প্রতিনিধি। প্রয়োজন মুহূর্তে সরকারের পক্ষে তারা সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারী। এই অর্থে পরিষদগুলো তাদের প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারি ক্ষমতার অধীন। যে পর্যন্ত ভিন্ন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের খবরদারির ব্যবস্থা না হবে, সে পর্যন্ত জেলা প্রশাসকদের খবরদারী কর্তৃত্ব বহাল থাকবে। সুতরাং জেলা প্রশাসকদের স্থানীয় সরকার পরিষদগুলোতে সচিবের পদ দান সঙ্গতিশীল ও যুক্তিযুক্ত নয়। সংশ্লিষ্ট আইনের ৩১ (১) ধারাটি তাই সংশোধন করা দরকার ছিলো ও তাই হয়েছে।
দ্বিতীয় আপত্তিকর বিষয় হলো : পরিষদীয় আইনে অবাঙালিদের আখ্যায়িত করা হয়েছে উপজাতি আর বাঙালিদের অউপজাতি সংজ্ঞায়। এ সংজ্ঞাগুলো বির্তকিত। এর পরিবর্তে বাঙালি আর অবাঙালির সংজ্ঞা অধিক পরিষ্কার ও অর্থবহ। জায়গা জমির মালিকানা ও জন্মের ভিত্তিতেই কেবল স্থানীয় অস্থানীয় সনদ জেলা প্রশাসকদের মঞ্জুর করার ক্ষমতা থাকা উচিত। বিতর্কিত নৃতাত্বিক পরিচয়ের সনদ এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না। তুলনামূলকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম একমাত্র পশ্চাৎপদ অঞ্চল নয়। তথ্য উপাত্ত এই বিশ্লেষণ সমর্থন করে না। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি পশ্চাদপদ। মানব বসতির বিচারে এটি একক উপজাতীয় অঞ্চলও নয়। এটি বাঙালি অবাঙালি মিশ্র অঞ্চল। আইনের ভাষা থেকে এ বিতর্কিত শব্দগুলোর ছাটাই হওয়া আবশ্যক। সর্বাধিক ঝঞ্ঝাটপূর্ণ ব্যাপার হলো নির্বাচনী ব্যবস্থা। প্রচলিত জন প্রতিনিধিত্ব আইনে ইউনিয়ন কাউন্সিলের সদস্য থেকে দেশের রাষ্ট্রপতির পদ পর্যন্ত, প্রতিটি জন প্রতিনিধিত্বমূলক পদ অলাভজনক। পূর্বাহ্নে পদত্যাগ ব্যতীত প্রতিনিধিত্বমূলক দ্বিতীয় পদের জন্য তারা অযোগ্য। তবে জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের এই অব্যাহতি সুযোগ স্থানীয় আইনে নেই।
প্রতিটি জেলা পরিষদে একজন চেয়ারম্যান ও তিরিশ জন সদস্যের জন্য কোনো ভেদাভেদ ছাড়াই নির্বাচনী এলাকার পরিধি গোটা জেলা ব্যাপ্ত। জেলা প্রতিনিধিত্ব ক্ষমতার অধিকারী একজন চেয়ারম্যানের পক্ষে এটি যুক্তিযুক্ত হলেও সদস্যেদের পক্ষে তা নয়। তাদের নির্বাচনী এলাকা, তিরিশটিতে বিভক্ত ও ক্ষুদ্র হওয়া উচিত। চেয়ারম্যান বাঙালি হতে পারবেন না এবং তাকে অবশ্যই উপজাতীয় হতে হবে। এ কেমনতর তোষামোদী আইন? আইনকে সার্বজনীন ন্যায় বিচার ও সুবিধা সুযোগের ধারক গণতান্ত্রিক হতে হবে। বঞ্চণাপূর্ণ আইনের ক্ষতিপূরণ হিসাবে একটি ভাইস চেয়ারম্যানের পদ, বঞ্চিত বাঙালিদের জন্য রাখা হলেও তা সান্ত¦নাকর হতো। এ ব্যবস্থা সাংবিধানিক অধিকার ও গণতন্ত্রের পরিপন্থী। ব্যবস্থাটি উপজাতীয়দের সন্তুষ্ট করতেও ব্যর্থ হয়েছে। বিপরীতে বাঙালিরাও বিক্ষুব্ধ। নির্বাচন হলো একটি গণতান্ত্রিক সুস্থ প্রতিযোগিতা। তাতে জাত বেজাত সম্প্রদায় ও ধর্মের ভেদাভেদ টানা, গ্রহণীয় নয়। তাতে সম্প্রীতি রচনার জাতীয় রাজনীতি উপেক্ষিত হবে।
সাম্প্রদায়িক জনসংখ্যার হার অনুযায়ী, সদস্য কোটা নির্ধারণ করা না হলে, তাও হবে আরেক অবিচার। এমনিতে স্থানীয় নির্বাচনী আইন সাম্প্রদায়িক পৃথক প্রতিনিধিত্বকে সমর্থন করে না। ভবিষ্যতে এটি আইন সঙ্গত করা সাপেক্ষে, নিয়ম প্রবর্তিত হলেও তাতে সর্বজন গ্রাহ্যতা থাকতে হবে। নতুবা হুলস্থুল বাধবে।
প্রধান পদগুলোর নির্বাচনে সর্বাধিক উত্তম ব্যবস্থা হবে বাঙালি অবাঙালিরা প্রতি এক মিয়াদ পরপর এর অধিকারী হবে। অবসর মিয়াদে তারা ভাইস চেয়ারম্যান পদেও সমাসীন হবে। যাতে কোনো প্রধান জনগোষ্ঠী একা পদ দুটিকে কুক্ষিগত করে রাখতে না পারে, তজ্জন্য উচিত হবে বাঙালি আর অবাঙালিদের নিজেদের আভ্যন্তরীন মনোনয়নমূলক সমঝোতা। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্প্রদায়গুলোর জনসংখ্যা জনিত স্বল্পতা হেতু যৌগিক প্রতিনিধিত্ব রাখা যাবে। প্রতি মিয়াদে নতুন সম্প্রদায় থেকে সদস্য নির্বাচিত হবে।
সাম্প্রদায়িক সদস্য কোটার পক্ষে যুক্ত নির্বাচন অসুবিধাজনক। তাতে বিপক্ষ সম্প্রদায়ের ভোট, নির্বাচনী ফলাফলে অপ্রীতিকর প্রস্তাবও পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। সুতরাং কোটা ভিত্তিক নির্বাচনকে সাম্প্রদায়িক করা নিরাপদ নয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে অবশ্যই জাতীয় নির্বাচনী আইনের ছত্রছায়া দিতে হবে। তা না হলে তা বৈধতা পাবে না।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT