শিশু মেলা

শোরগোল

মো: ইব্রাহীম খান প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৩-২০১৮ ইং ০০:৪৮:৩৩ | সংবাদটি ১৭০ বার পঠিত

সেতু স্কুল থেকে বাসায় ফিরে। বিছানার উপর স্কুল ব্যাগ ছুড়ে ফেলে। মাথা বাঁকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে সে তার মাকে খুঁজে। এ ঘর ও ঘর বারান্দায় কোথাও তার মাকে দেখতে পাচ্ছে না। সেতু রান্না ঘরে উঁকি দেয়। সেতুর মা সাজেদা হক রান্না ঘরে দুপুরের খাবার তৈরি করছেন। তিনি সেতুকে রান্নাঘরে দেখে চোখ তুলে তাকান। তাকে খুব অস্থির লাগছে। তাকে দেখে বুঝা যাচ্ছে স্কুলে বিরাট কোন কান্ড ঘটেছে। সাজিদা হক কাজ রেখে সেতুকে জিজ্ঞাসা করেন, কি ব্যাপার সেতু?
আগে এক গ্লাস পানি দাও। পরে বলি। কি মহাবিপদে পড়েছিলাম। বিপদের কথা শুনে সাজিদা হকের মাতৃহৃদয় কেঁপে ওঠে। তিনি সেতুকে পানি দেন। সেতু ঢগ ঢগ করে পানি পান করল। গ্লাসটা তার মায়ের হাতে দিয়ে বলল, জান মা, আজ স্কুলে মস্ত বড় একটা ঘটনা ঘটেছে।
কি ঘটনা? সাজিদা হক ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন। ঘটনা না। বিপদে পড়েছিলাম। মহাবিপদ। খুব লজ্জার ব্যাপার মা। বল না শুনি কি হয়েছে। সাজিদা হক ব্যস্ত গলায় বললেন।
এভাবে বলা যাবে না। তুমি কাজ বন্ধ কর। আমার পড়ার ঘরে এসো। আমি অভিনয় করে সব কিছু বলব।
সাজিদা হক ভেতরে ভেতরে একটু বিরক্তবোধ করলেন। এখন রান্নার কাজে বিরতি দিয়ে ছেলের অভিনয় দেখলে সময় মত তার রান্না বান্না শেষ হবে না। রান্না সঠিক সময়ে শেষ না হলে তার সব কাজ এলোমেলো হয়ে যাবে। সংসারের সব কাজ তাকে একাই করতে হয়। কিন্তু সেতুর স্কুলে কি সমস্যা হয়েছে সেটা জানার কৌতুহল তার মনের ভেতরে তাড়া করছে।
সাজিদা হক পাতিলগুলো ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিলেন। বেসিনে হাত ধোয়ে তিনি সেতুর পড়ার ঘরে এলেন। সোফায় বসে গা এলিয়ে দিয়ে তিনি সেতুর দিকে তাকিয়ে বললেন, এবার তোমার গল্পটা শুরু কর।
এটা তো গল্প নয় মা।
ঠিক আছে। যা হয়েছে তাই বল।
বলতে আমার একটু একটু লজ্জা লজ্জা লাগছে। তুমি কিন্তু শুনে হাসতে পারবে না।
আমি হাসব না। এই মুখে তালা দিলাম।
ক্লাসে আমার নাক দিয়ে সর্দি ঝরতে শুরু হয়। আমার স্কুল ব্যাগে টিস্যু পেপার নেই। আমি নাক মুছতে পারছি না। ক্লাসে আল্পনা আপা ইংরেজি পড়াচ্ছেন। আমি নাকে সর্দি নিয়ে উসখুস করছি। আপার নজর পড়ে আমার উপর। তিনি পাঠদান থামিয়ে দিলেন। কড়া গলায় বললেন, সেতু বাইরে গিয়ে নাক পরিষ্কার করে এসো। সেতু তার আল্পনা আপার মত অভিনয় করে কথাটা বলার চেষ্টা করতেই সাজিদা হক হেসে ফেললেন। হেস না মা। তোমাকে তো আগেই বলেছি হাসতে পারবে না। আসল ব্যাপারটা তো এখনও বলা হয় নি।
সাজিদা হক হাসি থামিয়ে আগ্রহ ভরা চোখে সেতুর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, আসলটা কি বল। শুনি।
আল্পনা আপার কঠিন গলা শুনে ক্লাসের সব ছেলেমেয়েরা আমার দিকে হা করে তাকায়। আমি তো লজ্জায় মরে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে শিউলি বলে ওঠে, সেতু তো দেখি সর্দি খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। শিউলির কথা শুনে ক্লাসের সবাই খিলখিল করে হেসে ওঠে। আল্পনা আপা সবাইকে ধমক দিয়ে থামালেন। লজ্জায় আমি মরি মরি অবস্থা। আপা আবার আমাকে বললেন, সেতু বাইরে গিয়ে ফ্রেস হয়ে এসো। আমি বোকার মত বসে থেকে বললাম, আমার কাছে টিস্যু পেপার নেই। টিস্যু পেপার ছাড়া আমি নাক মুছতে পারি না।
আবার হাসি শুরু হয়। এবার আল্পনা আপাও হাসতে শুরু করেন। আপার হাসি দেখে ক্লাসের সবাই হইচই চেচামেচি শুরু করে। আপার হাসি থামছে না। হাসির জন্যে তিনি ছাত্র ছাত্রীদের ধমক দিতে পারছেন না। ক্লাসে কোলাহল চলতে থাকে। আমাদের ক্লাসের খারাপ অবস্থা আঁচ করে পাশের ক্লাস থেকে ছুটে আসেন জাবের স্যার। জাবের স্যারকে দেখে আল্পনা আপা ভুত দেখার মত চমকে ওঠেন। তার মুখের অদম্য হাসিটা মুহূর্তের মাঝে মিলিয়ে যায়। তিনি চিৎকার ছেড়ে বলেন, এই সব থাম। সবাই থামল। ততক্ষণে আমার নাকের গাঢ় হলুদ রঙের সর্দি দুই ঠোঁটের মাঝখানে চলে এসেছে।
সাজিদা হক ছেলের স্কুলের ঘটনা শুনে হতবাক হয়ে যান। তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন, স্ট্যান্ডার্ড ওয়ানে পড়ে নাকের সর্দি ফেলতে পার না। আগামীকাল স্কুলে গেলে তোমার সহপাঠীরা সর্দি খাদক বলে ক্ষেপাবে। তখন তুমি কি করবে
সেতুর চোখে মুখে চিন্তার ছাপ ফুটে ওঠে। বন্ধুদের ক্ষেপানোর ভয়ে তার মনের ভেতরটা অচেনা ব্যথায় টনটন করছে। সে তার মায়ের কাছে বুদ্ধি চায়। কিভাবে বন্ধুদের হাত হতে রক্ষা পাওয়া যাবে। সাজিদা হক হাসি হাসি মুখে ছেলেকে অভয় দিয়ে বললেন, তোমাকে ধৈর্য ধরতে হবে। বন্ধুরা ক্ষেপালেও তুমি চুপচাপ থাকবে। তাদের সাথে ঝগড়া ঝাটি করা যাবে না। তর্কাতর্কি করা চলবে না। তারা যতই ক্ষেপানোর চেষ্টা করুক, তুমি নীরব থাকবে।
ওরা যদি আমার মুখের কাছে এসে হাত নাচিয়ে ক্ষেপানোর চেষ্টা করে। তখন আমি কি করব।
তখনও তুমি তাদেরকে কিছু বলবে না। কারণ তুমি যদি একবার ক্ষেপে যাও, তাহলে তোমার সহপাঠীরা তোমাকে আরও বেশি রাগাতে চেষ্টা করবে। আর শুন স্কুল ব্যাগে আগে থেকেই টিস্যু পেপার রেখে দাও। হাতেও নাক ঝেড়ে সর্দি ফেলার অভ্যাস করতে হবে। তার চেয়েও বড় ব্যাপার হলো সর্দি যাতে না হয় সে চেষ্টা করতে হবে। ঢ়ৎবাবহঃরড়হ রং নবঃঃবৎ ঃযধহ পঁৎব- অর্থাৎ প্রতিকারের চেয়ে পতিরোধই উত্তম। গোসলের সময় শাওয়ারের নীচে বেশি সময় থাকা যাবে না। বেশি ঠান্ডা, বেশি গরম লাগানো যাবে না। শীত এলে কুসুমগরম পানিতে গোসল করতে হবে। শরীরে সরিষার তেল মালিশ করতে হবে। গরমের সময় গায়ে বেশি ফ্যানের বাতাস না লাগিয়ে প্রাকৃতিক বাতাস লাগাতে হবে।
আমি তোমার সব উপদেশ মানব। তুমি শুধু আমার একটা কথা রাখ মা।
কি কথা বাবা।
আমি আগামীকাল স্কুলে যাব না।
তুমি যদি স্কুলে না যাও তাহলে তোমার বন্ধুরা তোমাকে না দেখে আরও বেশি সমালোচনা করবে।
বন্ধুদের চেয়ে বেশি ভয় হচ্ছে আল্পনা আপাকে। আপা আমাকে দেখেই হেসে ফেলবে।
আল্পনা আপা হাসবেন না। তিনি টিচার। টিচার সাধারণত গম্ভীর প্রকৃতির হয়ে থাকেন।
আমাদের সব টিচারই গম্ভীর। তাঁরা শুধু পড়ান। পড়া শিখার জন্যে চাপ দেন। তাঁরা মোটা মোটা উপদেশ বাণী বলেন। আল্পনা আপা তাঁদের মত নন। তিনি খাদ্য পুষ্টি নিয়ে কথা বলেন। বিকেলে দৌড় ঝাপ খেলাধুলার ব্যায়াম নিয়ে আলোচনা করেন। মজার মজার গল্প বলে সবাইকে হাসান। তিনি যদি আমাকে নিয়ে গল্প বানিয়ে ফেলেন।
তুমি নিশ্চিত থাকতে পার। এমনটি তিনি করবেন না।
আরও একটা বিপদ হতে পারে।
কি বিপদ?
আমাদের স্কুলে স্যান্ডার্ড টুতে একটা মস্ত বড়লোকের ছেলে পড়ে। সে কারে করে ক্লাসে আসে। সে মাঝে মধ্যে ক্যামেরা নিয়ে আসে। সে যদি লুকিয়ে আমার ছবি তুলে সবাইকে দেখায়। তাহলে আমার অবস্থা কি হবে।
কিচ্ছু হবে না তোমার। সাজিদা হক রাগি গলায় বললেন।
তুমি কি আমার উপর রাগ করছ মা। সেতুর গলায় কান্নার সুর শুনা গেল।
সাজিদা হক থতমত খেয়ে বললেন, না। আমি মোটেই রাগ করছি না। তোমার অহেতুক চিন্তা ভাবনার জন্যে বিরক্তবোধ করছি।
সেতু বিছানায় শুয়ে আছে। তার ঘুম আসছে না। সে এপাশ ওপাশ করছে। ক্লাসের ঘটনাটা সে মন থেকে মুছে ফেলতে পারছে না। বন্ধু-বান্ধবীদের হাসাহাসি। শিউলির কথা। আল্পনা আপার হাসি। ক্লাসে শোরগোল শুনে জাবের স্যারের ছুটে আসা। তার মনের পর্দায় ভেসে বেড়াচ্ছে।
সেতুর সহপাঠীরা ছোট মাঠে গোল হয়ে বসে আছে। মাঝখানে সেতু বসা। সবাই সুর করে বলছে, সর্দি খাদক সেতু। সর্দি খাদক সেতু। লজ্জায় সেতু লাল নীল সবুজ বাতির মত জ্বলছে নিভছে। লজ্জায় ঘৃণায় তার গা কাঁপছে। সহপাঠীদের শোরগোলে তার মাথা আউলা হয়ে যাচ্ছে। এখান থেকে দৌড়ে পালাতে পারলে সে বাঁচে। কিন্তু সে বন্ধুদের বেড়া ভেঙ্গে বের হতে পারছে না। হঠাৎ দৌড়ে আসে শিউলি। সে কাছে এসে বলল, এ্যাই। এ্যাই, এসব কি করছ তোমরা। থাম সবাই। সবাই থামল। শিউলি আঙ্গুল উঁচিয়ে বলল, তোমরা যা করছ তা খুব অন্যায়। এমনটা হতে পারে। গতকাল সেতুর যে অবস্থা হয়েছে সে রকম অবস্থা আমাদের যে কারো হতে পারে। সর্দি, জ্বর, হাম চোখ ওঠা এ রোগগুলো সাবধান না থাকলে আমাদের বয়সের ছেলেমেয়েদের বেশি হয়। তোমরা যা করছ তা সেতুর প্রতি অবিচার করছ। সে মানসিকভাবে খুব কষ্ট পাচ্ছে। সবাই সেতুকে সরি বল। শিউলির কথায় সবাই সুর করে সেতুকে সরি বলল।
সেতু। এই সেতু। ওঠ বাবা। স্কুলে যাওয়ার সময় হয়ে এলো। মা সাজিদা হকের ডাকে সেতুর ঘুম ভাঙ্গে। সেতু শুয়ে থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল সে তার ঘরের বিছানায় শুয়ে আছে। তার মা শিয়রে দাঁড়িয়ে মিটমিট হেসে তাকে ডাকছেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT