শিশু মেলা

ভালো মানুষ

ধীরেন্দ্র কুমার দেবনাথ (শ্যামল) প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৩-২০১৮ ইং ০০:৪৯:৫৩ | সংবাদটি ১২৮ বার পঠিত

রিকসায় যাচ্ছি। রিকসার ড্রাইভারের মুখ থেকে শুনা একজন ভালো মানুষের গল্প। গল্পটা শুনে আনন্দে আমার বুকটা ভরে ওঠে। শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে।
দিন মজুর। সারা দিন অন্যের কাজ করে। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। অর্ধাহারে, অনাহারে দিন অতিবাহিত হচ্ছে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা পাঁচ। দুটো ছেলে পড়াশোনা করছে। বাবার মনে কোনো কষ্ট নেই। একটাই আশা ছেলেরা বড় হয়ে চাকুরি করবে। অভাব অনটন দূর হবে। প্রকৃতির নিয়মে দিন অতিবাহিত হচ্ছে। ছেলে দুটো এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। বাবার মনে অনেক আনন্দ। ছেলেরা পাস করবে। যথাসময়ে পরীক্ষার ফলাফল বের হলো ছোট ছেলে কৃতকার্য হয়েছে বড়টি পরীক্ষায় খারাপ করেছে। মা-বাবার মনে অনেক আশা ভরসা ছিল দুটো ছেলেই পাস করবে। আশা পূর্ণ হলো না।
মনের কষ্টে বাবা বড়টিকে অনেক বকাঝকা দিলেন। রাগে বলে ফেললেন পড়াশোনা বন্ধ, আমি আর তোকে খাওয়াতে পারব না। কাল থেকে কাজ করো। বড়টি মন খারাপ করে বসে আছে। এভাবে কয়েক দিন অতিবাহিত হলো। বাবা ছোটটিকেও বললেন তোকে আমি কলেজে ভর্তি করাতে পারবো না। কলেজে ভর্তি করার মতো সামর্থ নেই। তোমাদের চিন্তা কর।
দু’ভাই মন মরা হয়ে বসে আছে। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। কথায় আছে ‘ভাগ্যের লিখন না হয় খন্ডন।’ দু’ভাই যুক্তি পরামর্শ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যথা ইচ্ছা তথা কাজ। একদা দু’ভাই অজানার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। দু’ভাই যেতে যেতে কটিয়াদি শহরে উপস্থিত হয়। শহর দিয়ে দু’ভাই হেঁটে চলেছে।
ওই দিন কটিয়াদি শহরে পুলিশে লোক নিয়োগ হচ্ছে। লোক বাছাইয়ের জন্য লাইনে দাঁড় করানো হয়েছে। ছোট ভাইটি বড়টিকে বলল দাদা এখানে কি হচ্ছে, চল দেখি! দু’ভাই দূরে দাঁড়িয়ে তামাসা দেখছে। ভাগ্যে থাকলে ফেরায় কে? হঠাৎ পুলিশের নিয়োগকারী কর্মকর্তা ছেলে দুটোকে লক্ষ্য করেন। বললেন তোমরা কী চাও? ছেলে দুটো বলল, আমরা কিছু চাই না। দেখছিলাম কী হচ্ছে?
কর্মকর্তা বললেন, তোমরা লেখাপড়া জানো। বড় ভাইটি বলল, ‘আমরা আপন দু’ভাই। আমি এ বছর এসএসসি ফেল করেছি। আর ও পাস করেছে। পরিবারের বিস্তারিত ঘটনা বড় ভাইটি খুলে বলে। শুনে কর্মকর্তা বললেন এসো আমার সাথে। তিনি দু’ভাইকে লাইনে দাঁড় করালেন। মাপ জোখে ফিট হয়। পরীক্ষা হলো, দু’ই কৃতকার্য হলো। সবশেষে দু’ভাই পুলিশে ভর্তি হবার উপযুক্ত বলে নির্বাচিত হয়। কর্মকর্তা ভাই দুটোকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। যথাসময়ে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে। কর্মকর্তা ছাড়া দু’ভাই অন্য কিছুই বুঝে না। কর্মকর্তাই সব। ছয় মাস সাফল্যের সাথে প্রশিক্ষণ শেষ করে দু’ভাই ফিরে আসে। তাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এক মাস চাকুরি করার পর কর্মকর্তা তাদেরকে বাড়ি যাবার জন্য তিন দিনের ছুটি দিলেন। বলেন, তিন দিনের মধ্যে ফিরে না আসলে চাকুরি থাকবে না। দু’ভাই পুলিশের পোশাক পরে কর্মকর্তাকে সালাম জানিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। রাস্তায় দু’ভাই থাকতেই বাড়িতে খবর পৌঁছে যায়। মা-বাবা সবাই দৌড়ে আসেন। পুলিশের পোশাক পরা দেখতেই মা-বাবা আনন্দে কান্না জুড়ে দেন। বিশ্রাম সেরে সম্পূর্ণ ঘটনা দু’ভাই মা-বাবা ও গ্রামবাসীর কাছে বর্ণনা দেয়। মা-বাবা, কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন উনি মানুষ নন, ফেরেস্তা।
তিন দিন পর মা-বাবার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে তারা কর্মস্থলে চলে যায়।
বর্তমানে পরিবারটি সুখে আছে। লেখাপড়ার কোনো বিকল্প নেই। আর ভালো মানুষ আছে বলেই পৃথিবী টিকে আছে। আমরা প্রত্যেকেই যদি কিছু না কিছু ভালো কাজ করি, তাহলে পৃথিবীতে এত হিংসা, নিন্দা, সংঘাত থাকবে না। মিলেমিশে থাকতে পারব।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT