ধর্ম ও জীবন

গীবত নয়, প্রশংসা করুন

আব্দুস সালাম সুনামগঞ্জী প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৩-২০১৮ ইং ০১:৩৮:১৩ | সংবাদটি ৮১ বার পঠিত

আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন ‘তোমরা একে অন্যের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? তোমরা তা অপছন্দই করবে। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। (সূরা : হুজরাত, আয়াত : ২২)
গীবত করা হয় সাধারণত মানুষের শারীরিক গঠন, পোশাক, চলন, কথন, আচরণ, মালের স্বল্পতা, বংশ নীচুতা কর্মদুর্বলতা, সম্মান স্বল্পতা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে। মোটকথা কারো পেছনে অথবা অনুপস্থিতে তার সম্পর্কে এমন কথা বলা, ইঙ্গিত বা কাজ করা যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অন্তরে ব্যথা পায়। মানুষ তখনই অন্যের গীবত করে, যখন তাকে নিজে অপেক্ষা ছোট, অসম্মানী ও হেয় মনে করে। তাই এর প্রতিকার হচ্ছে- নিজের দিলের মধ্যে অন্যের কদর পয়দা করা। আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ বলেন দুনিয়ার যে কোনো মানুষকেই দেখনা কেন, তাকে নিজের চেয়ে বড় ও সম্মানী মনে করবে। কেননা, কোন না কোন দিক থেকে সে তোমার চেয়ে বড় হবেই। হয়ত তার মধ্যে এমন কোনো গুণ আছে যা তোমার মধ্যে নেই।
কেউ যদি কোনো ব্যক্তির মধ্যে নিরান্নব্বইটি দোষ আর একটি মাত্র গুণ দেখে তবে তার জন্য ভালো গুণটিই দেখা উচিত। তাতে করে মানুষের ভালো গুণগুলো তার মধ্যে চলে আসবে। পক্ষান্তরে মানুষের দোষ দেখলে, সেই দোষ তার মধ্যে এসে পড়বে। ফলে অন্তর নাপাক হয়ে সে শাস্তির উপযুক্ত হয়ে যাবে। আর যদি কোনো মানুষের মধ্যে একটিও ভালো গুণ না দেখে তবে বুঝবে যে, আল্লাহপাক হয়তো তার কোনো সামান্য আমল দেখেও তাতে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে জান্নাত দিতে পারেন। যেমন, এক পাপী মহিলা এক পিপাসিত মৃতপ্রায় কুকুরকে পানি পান করিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি, হিদায়ত ও জান্নাত পেয়ে গিয়েছেন। পক্ষান্তরে আমার কোনো ছোট দোষ দেখেও আল্লাহপাক আমাকে জাহান্নামে দিতে পারেন। যেমন, বনী ইসরাঈলের জনৈকা মহিলা সারাদিন রোযা রাখত, সারারাত্রি নামায পড়ত প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করত, দান- সদকা করত। কিন্তু সে একটি বিড়াল পালন করত, তাকে কয়েকদিন যাবৎ বেঁধে রাখে খাদ্য পানীয় কিছুই দেয়নি। এমনকি ছেড়েও দেয়নি যাতে করে কীট পতঙ্গ ধরে খেতে পারত। ফলে বিড়ালটি মরে যায়। ঐ মহিলার এ ছোট কাজটিও আল্লাহর কাছে এতো অপছন্দ হয় যে, আল্লাহ পাক ঐ মহিলাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করেন। (রিয়াজুসসালিহীন)। তাই গীবত নিন্দা, সমালোচনা ত্যাগ করুন। অন্যের গুণচর্চা, প্রশংসা করুন।
যদি প্রত্যেক পদে পদে বন্ধুর সমালোচনা করো, তাকে ভৎসনা দাও, তাহলে মনে রেখো, এমন সময় আসবে, যখন তোমার ভৎসনা সহ্য করার মতো কেউ থাকবে না। (আল হাম সাতুল বাসরিয়া : ১২৬)
আল্লাহপাক ইরশাদ করেন- ‘যখন তোমরা কথা বলবে তখন ইনসাফ করে বলবে। (সূরা : আনআম, আয়াত : ১৫২)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি চায় যে লোকজন যেন তার কাছে আসে, তা হলে তার উচিত হল মানুষের কাছে যাওয়া। (নাসায়ী, হাদিস নং-৪১৯১)। অর্থাৎ আপনি মানুষের সাথে সেই আচরণ করুন, যেই আচরণ আপনি নিজে তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করেন। কীভাবে? যদি আপনি বন্ধুর গায়ে সুন্দর একটি পোশাক দেখেন, তা হলে আপনি খেয়াল করুন। তার প্রশংসা করুন। কয়েকটি ঝনঝনে বাক্য তাকে শুনিয়ে দিন মা-শা আল্লাহ! খুব চমৎকার! আজ তোমাকে নওশা নওশা মনে হচ্ছে।
এক লোক আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন। তার কাপড় থেকে তীব্র খোশবু ছড়িয়ে পড়ছে। আপনি একটু প্রশংসা করুন। তার সাথে শরীক হোন। তিনি তো আপনার জন্যই খোশবু ব্যবহার করেছেন। কয়েকটি বাক্য উপহার দিন- কি চমৎকার খুশবো! আপনি তো রুচিশীল। কেউ আপনাকে খাওয়ার দাওয়াত দিয়েছেন। তার আয়োজনের প্রশংসা করুন। কারণ, আপনি জানেন যে, তার মা, তার স্ত্রী অথবা তার বোন শুধু আপনার জন্য অথবা আপনার মতো মেহমানদের জন্য কয়েক ঘণ্টা সময় রান্নাঘরে ব্যয় করেছেন। অথবা কম পক্ষে তিনি হোটেল অথবা রেস্তোরাঁ থেকে খাবারগুলো উপস্থিত করার কসরত করেছেন। আপনি তাদের জন্য কয়েকটি বাক্য খরচ করুন, যাতে তারা বুঝতে পারেন যে, আপনি তাদের আয়োজনকে মূল্যায়ন করেছেন অথবা কমপক্ষে তাদের মেহনত বিফলে যায়নি। আপনি যদি কোনো বন্ধুর ঘরে প্রবেশ করেন এবং সেখানে সুন্দর আসবাবপত্র দেখতে পান, তাহলে সেগুলোর এবং উন্নত রুচির খানিকটা প্রশংসা করুন। তবে সতর্ক থাকবেন যাতে উপহাস না হয়ে যায়।
মানুষের অনুভূতি আয়ত্ব করা এবং তাদের ভালোবাসা কুঁড়ানো খুব সহজ। কিন্তু আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক দক্ষতা প্রয়োগ করতে উদাসীন থাকি, যেগুলোর সাহায্যে আমরা তাদের হৃদয় জয় করতে পারি। আজব কিছু নয়, যদি আমরা মহানবী (সা.) এর দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, মহান চরিত্রের অধিকারী মহানবী (সা.) এসব দক্ষতা প্রয়োগ করতেন এবং অনেক সুন্দরভাবে করতেন।
ইসলামের সূচনাকালে যখন মক্কার মুসলমানদের ধর্ম পালন সংকটময় হয়ে উঠল, তখন তারা মদিনার দিকে হিজরত করলেন। তারা ছেড়ে এলেন নিজেদের দেশ ও বিষয়-সম্পত্তি। আব্দুর রহমান ছিলেন একজন বড় ব্যবসায়ী। কিন্তু তিনি মদিনায় এলেন নিঃস্ব ও অসহায় হয়ে। সমস্যার দ্রুত সমাধানের জন্য নবীজী মুহাজির ও আনসারদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব কায়েম করে দিলেন। আব্দুর রহমান ইবনে আউফের ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি হলো সা’আদ ইবনে রবী আনসারীর সঙ্গে। তাদের মন ছিল সুস্থ ও পবিত্র। এজন্য সা’আদ আব্দুর রহমানকে বললেন মদিনাতে আমি সবচেয়ে বড় সম্পদশালী। আমি আমার সম্পদ দু’ভাগে ভাগ করছি। আপনি তার এক ভাগ গ্রহণ করুন। বাকি আরেক ভাগ থাক আমার জন্য। তারপর সা’আদ আশঙ্কা করলেন হয়তো আব্দুর রহমানের বিয়ে করার ইচ্ছা আছে, কিন্তু পাত্রী পাচ্ছেন না। এজন্য তিনি তাঁকে বিয়ের প্রস্তাবও দিলেন।
আব্দুর রহমান বললেন, আল্লাহ আপনার পরিবার ও সম্পদে বরকত দান করুন। আপনি আমাকে বাজার দেখিয়ে দিন। আব্দুর রহমান তাঁর সহায় সম্পত্তি মক্কায় রেখে এসেছেন। কাফেররা সেগুলো দখল করে নিয়েছে। কিন্তু তিনি ছিলেন বুদ্ধিমান ও ব্যবসা বাণিজ্যে দক্ষ।
সা’আদ তাঁকে বাজারের পথ দেখিয়ে দিলেন। তিনি বাজারে গিয়ে কেনাবেচা করলেন এবং লাভবান হলেন। অর্থাৎ তিনি বাকিতে কিছু পণ্য খরিদ করে নগদে বিক্রি করলেন। এতে তাঁর কিছু মূলধন সঞ্চিত হলো। সেটাই ব্যবসায় খাটালেন তিনি। আব্দুর রহমান কেনাবেচায় ছিলেন অত্যন্ত পটু। অল্প দিনেই তিনি বেশ সম্পদের মালিক বনে গেলেন এবং বিয়েও করলেন। তারপর এলেন নবীজীর কাছে। তখন তার গায়ে ছিল আরব নারী সমাজের সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহৃত যাফরানের হলুদ দাগ। এটা অসম্ভবও ছিলো না, কারণ তিনি তখন নতুন দুলা।
নবীজী ছিলেন আত্মার চিকিৎসক। ছিলেন সূক্ষ্মদর্শী। মানুষের হৃদয় জয় করার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় থাকতেন। তিনি যেই মাত্র তাকে দেখলেন, তখনই এই পরিবর্তনের ব্যাপারে সজাগ হলেন। সুগন্ধি দাগের দিকে দৃষ্টিপাত করে তিনি আব্দুর রহমানকে বললেন, ব্যাপার কী? প্রফুল্ল হলেন আব্দুর রহমান, বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি এক আনসারী নারীকে বিয়ে করেছি। তাজ্জব হলেন নবীজী। কীভাবে তিনি বিয়ে করতে পারলেন! তিনি তো সবেমাত্র হিজরত করেছেন! নবীজী সুধালেন কতোটুকু মহর দিয়েছ তাকে?
আব্দুর রহমান বললেন, খেজুরের বিচীর ওজনে সোনা দিয়েছি। তখন নবীজী চাইলেন আনন্দ আরও বাড়াতে। তিনি বললেন- ওয়ালিমা করো চাই তা একটি ছাগল দিয়েই হোক। অর্থাৎ তোমার বিয়ের মান রক্ষা করে আমাদের জন্য ওয়ালিমার আয়োজন করো। এরপর নবীজী আব্দুর রহমানের সম্পদ ও বাণিজ্যে বরকতের জন্য দো’আ করলেন। সুতরাং তাঁর সম্পদ ও বাণিজ্যে অবর্ণনীয় বরকত হয়। (জীবন উপভোগ করুন)
নবীজী গরিব-মিসকীনদের বেলায়ও সংবেদনশীল ছিলেন, তাদেরও মর্যাদা অনুভব করতেন। গরিব-মিসকীনের কাজ সামান্য হলেও তার মূল্যায়ন করতেন। অনুপস্থিত থাকলে তাদের স্মরণ করতেন এবং তাদের আমলের প্রশংসা করতেন। তখন অন্যরাও সচেতন হত তাদের মতো কাজ করার জন্য। তাই আসুন, আমরা অন্যের দোষ, নিন্দা, গীবত, সমালোচনা না করে প্রশংসা করি। নবীজীর আদর্শমত চলি। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফিক দাও।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT