ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৩-২০১৮ ইং ০১:৩৯:৩৯ | সংবাদটি ১১৮ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
দ্বিতীয় আয়াতে তাঁর গুণ, দয়ার প্রসঙ্গ ‘রাহমান ও রাহিম’ শব্দদ্বয়ের দ্বারা বর্ণনা করেছেন। উভয় শব্দই ‘গুণের আধিক্যবোধক বিশেষণ’ যাতে আল্লাহর দয়ায় অসাধারণত্ব ও পূর্ণতার কথা বুঝায়। এ স্থলে এ গুণের উল্লেখ সম্ভবত এজন্য যে, আল্লাহ তা’আলা যে সমগ্র সৃষ্টিজগতের লালন-পালন ভরণ-পোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং গ্রহণ করেছেন এতে তাঁর নিজস্ব কোনো প্রয়োজন নেই বা অন্যের দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েও নয়; বরং তাঁর রহমত বা দয়ার তাগিদেই করেছেন। যদি সমগ্র সৃষ্টির অস্তিত্বও না থাকে, তাতেও তাঁর কোনো লাভ-ক্ষতি নেই, আর যদি সমগ্র সৃষ্টি অবাধ্যও হয়ে যায় তবে তাতেও তাঁর কোনো ক্ষতি-বৃদ্ধি নেই।
‘মালিকি ইয়াও মিদ্দীন’ -এর অর্থ কোনো বস্তুর উপর এমন অধিকার থাকা, যাকে ব্যবহার, রদবদল, পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সব কিছু করার সকল অধিকার থাকবে। ‘দীন’ অর্থ প্রতিদান দেয়া। ‘মালিকি ইয়াও মিদ্দীন’ এর শাব্দিক অর্থ প্রতিদান- দিবসের মালিক বা অধিপতি। অর্থাৎ প্রতিদান- দিবসের অধিকার ও আধিপত্য কোনো বস্তুর উপরে হবে, তার কোনো বর্ণনা দেয়া হয়নি। তফসিরে কাশশাফে বলা হয়েছে যে, এতে ‘আম’ বা অর্থের ব্যাপকতার প্রতি ইশারা করা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিদান- দিবসে সকল সৃষ্টিরাজি ও সকল বিষয়ই আল্লাহ তা’আলার অধিকারে থাকবে।
প্রতিদান- দিবসের স্বরূপ ও তার প্রয়োজীনয়তা : প্রথমত : প্রতিদান দিবস কাকে বলে এবং এর স্বরূপ কি? দ্বিতীয়ত : সমগ্র সৃষ্টির উপর প্রতিদান দিবসে যেমনিভাবে আল্লাহ তা’আলার একক অধিকার থাকবে, অনুরূপভাবে আজও সকল কিছুর উপর তাঁরই তো একক অধিকার রয়েছে; সুতরাং প্রতিদান দিবসের বৈশিষ্ট্য কোথায়?
প্রথম প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে এই যে, প্রতিদান দিবস সে দিনকেই বলা হয়, যেদিন আল্লাহ তা’আলা ভালো-মন্দ সকল কাজ-কর্মের প্রতিদান দেবেন বলে ঘোষণা করেছেন। রোযে-জাযা শব্দ দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, দুনিয়া ভালো-মন্দ কাজ-কর্মের প্রকৃত ফলাফল পাওয়ার স্থান নয়; বরং এটি হল কর্মস্থল; কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনের জায়গা। যথার্থ প্রতিদান বা পুরস্কার গ্রহণেরও স্থান এটা নয়। এতে একথাও বুঝা যাচ্ছে যে, পৃথিবীতে কারও অর্থ-সম্পদের আধিক্য ও সুখ-শান্তির ব্যাপকতা দেখে বলা যাবে না যে, এ লোক আল্লাহর দরবারে মকবুল হয়েছেন বা তিনি আল্লাহর প্রিয়পাত্র। অপর পক্ষে কাকেও বিপদাপদে পতিত দেখেও বলা যাবে না যে, তিনি আল্লাহর অভিশপ্ত। যেমনি করে কর্মস্থলে বা কারখানার কোনো কোনো লোককে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে ব্যস্ত দেখে কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি তাকে বিপদগ্রস্ত বলে ভাবে না; বরং সে এ ব্যস্ততাকে জীবনের সাফল্য বলেই গণ্য করে এবং যদি কেহ অনুগ্রহ করে তাকে এ ব্যস্ততা থেকে রেহাই দিতে চায়, তবে তাকে সে সবচেয়ে বড় ক্ষতি বলে মনে করে। সে তার এ ত্রিশ দিনের পরিশ্রমের অন্তরালে এমন এক আরাম দেখতে পায়, যা তার বেতনস্বরূপ সে লাভ করে।
এ জন্যই নবীগণ এ দুনিয়ার জীবনে সর্বপেক্ষা বেশি বিপদাপদে পতিত হয়েছে এবং তারপর ওলী-আওলিয়াগণ সবচেয়ে অধিক বিপদে পতিত হন। কিন্তু দেখা গেছে, বিপদের তীব্রতা যতো কঠিন হোক না কেন, দৃঢ়পদে তাঁরা সহ্য করেছেন। এমনকি আনন্দিত চিত্তেই তাঁরা তা মেনে নিয়েছেন। মোটকথা, দুনিয়ার আরাম আয়েশকে সত্যবাদিতা ও সঠিকতা এবং বিপদাপদকে খারাপ কাজের নিদর্শন বলা যায় না।
অবশ্য কখনো কোনো কোনো কর্মের সামান্য ফলাফল দুনিয়াতেও প্রকাশ করা হয় বটে, তবে তা সেকাজের পূর্ণ বদলা হতে পারে না। এগুলো সাময়িকভাবে সতর্ক করার জন্য একটু নিদর্শন মাত্র।
‘মালিকি ইয়াও মিদ্দীন’ বাক্যটিতে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এই যে, বুদ্ধিমান ব্যক্তিমাত্রই একথা জানান যে, সেই একক সত্তাই প্রকৃত মালিক, যিনি সমগ্র জগতকে সৃষ্টি করেছেন এবং এর লালন-পালন ও বর্ধনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং যাঁর মালিকানা পূর্ণরূপে প্রত্যেক বস্তুর মধ্যেই সর্বাবস্থায় পরিব্যাপ্ত। অর্থাৎ- প্রকাশ্যে, গোপনে, জীবিতাবস্থায় ও মৃতাবস্থায় এবং যার মালিকানার তুলনাযোগ্য নয়। কেননা, মানুষের মালিকানা আরম্ভ ও শেষের চৌহদ্দীতে সীমাবদ্ধ। এক সময় তা ছিল না; কিছু দিন পরেইতা থাকবে না। অপরদিকে মানুষের মালিকানা হস্তান্তরযোগ্য। বস্তুর বাহ্যিক দিকের উপরই বর্তায়; গোপনীয় দিকের ওপর নয়। জীবিতের ওপর; মৃতের ওপর নয়। এজন্যই প্রকৃত প্রস্তাবে আল্লাহ তা’আলার মালিকানা কেবলমাত্র প্রতিদান দিবসেই নয়, বরং পৃথিবীতেও সমস্ত সৃষ্টজগতের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তা’আলা। তবে এ আয়াতে আল্লাহ তা’আলার মালিকানা বিশেষভাবে প্রতিদান দিবসের এ কথা বলার তাৎপর্য কি? আল কুরআনের অন্য আয়াতের প্রতি লক্ষ করলেই বোঝা যায় যে, যদিও দুনিয়াতেও প্রকৃত মালিকানা আল্লাহ তা’আলারই, কিন্তু তিনি দয়াপরবশ হয়ে আংশিক বা ক্ষণস্থায়ী মালিকানা মানবজাতিকেও দান করেছেন এবং পার্থিব জীবনের আইনে এ মালিকানার প্রতি সম্মানও দেখানো হয়েছে। বিশ্বচরাচরে মানুষ ধন-সম্প, জায়গা-জমি, বাড়ী-ঘর এবং আসবাব পত্রের ক্ষণস্থায়ী মালিক হয়েও এতে একেবারে ডুবে রয়েছে। আল্লাহ তা’আলা ‘মালিকি ইয়াও মিদ্দীন’ একথা ঘোষণা করে এ অহংকারী ও নির্বোধ মানব-সমাজকে সতর্ক দিয়েছেন যে, তোমাদের এ মালিকানা, আধিপত্য ও সম্পর্ক মাত্র কয়েক দিনের এবং ক্ষণিকের। এমন দিন অতি সত্বরই আসছে, যে দিন কেউই জাহেরী মালিকও থাকবে সমস্ত বস্তুর মালিকানা এক ও একক সত্তার হয়ে যাবে।
সূরা আল ফাতিহার প্রথমে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এ সূরার প্রথম তিনটি আয়াতে আল্লাহর প্রশংসা ও তারীফের বর্ণনা করা হয়েছে এবং এর তাফসিরে একথা সুস্পষ্ট হয়েছে যে, তা’রীফ ও প্রশংসার সাথে সাথে ঈমানের মৌলিক নীতি ও আল্লাহর একত্ববাদের বর্ণনাও সূক্ষ্মভাবে দেয়া হয়েছে।
তৃতীয় আয়াতের তাফসিরে আপনি অবগত হলেন যে, এর দু’টি শব্দে তা’রীফ ও প্রশংসার সাথে সাথে ইসলামের বিপ্লবাত্মক মহোত্তম আকীদা যথা কিয়ামত ও পরকালের বর্ণনা প্রমাণসহ উপস্থিত করা হয়েছে।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT