সম্পাদকীয়

বেকারত্ব বাড়ছে

প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৩-২০১৮ ইং ২৩:৩৪:২৫ | সংবাদটি ৯৬ বার পঠিত

দেশে বেকার জনগোষ্ঠী এখন ২৭ লাখ। সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য হচ্ছে এটি। তাদের মতে, গত কয়েক বছর ধরে দেশে ২৬ লাখ বেকার থাকলেও এবার তা বেড়েছে। ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরের শেষে দেশে ১৪ লাখ পুরুষ এবং ১৩ লাখ নারী বেকার। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মানদ- ব্যবহার করে বেকারত্বের এই পরিসংখ্যান তৈরী করে পরিসংখ্যান ব্যুরো। এই মানদ- অনুযায়ী সক্ষম জনগোষ্ঠী যারা সপ্তাহে অন্তত এক ঘন্টাও কাজ করেনা, তাদেরকে বেকার হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী সম্প্রতি বিপুল পরিমাণ শ্রমিক দেশের বাইরে কর্মসংস্থানের জন্য গিয়েছে। কিন্তু সেভাবে দেশে নতুন কর্মসংস্থান গড়ে ওঠেনি। কর্মসংস্থান কমছে কৃষিক্ষেত্রে। অবশ্য শিল্প ও সেবাখাতে কিছুটা বেড়েছে কর্মসংস্থান। বিগত এক বছরে নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে ১৩ লাখ। সে সময় বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে দশ লাখ। বেকারত্বের এই তথ্য মানতে রাজী নন বিশেষজ্ঞগণ।
বেকারত্বের হার নিয়ে একটা জটিল পরিসংখ্যান পাওয়া যায় বিভিন্ন সময়। পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আইএলও এক সময় এক তথ্য প্রকাশ করে। আর এই সব তথ্যের মধ্যে একটার সঙ্গে অন্যটির গরমিল অনেক। আইএলও ২০১৫ সালে আশংকা প্রকাশ করেছিলো অচিরেই বেকারের সংখ্যা ছয় কোটিতে পৌঁছুবে। সে অনুযায়ী জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশই থাকবে বেকার। দেশে বিনিয়োগে বন্ধ্যাত্ব, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক ঋণে মাত্রাতিরিক্ত সুদ, সার্ভিস চার্জের নামে অর্থ আদায়সহ ঋণ অনুমোদনের নামে ঘাটে ঘাটে হয়রানীসহ নানা কারণে শিল্পপতি কিংবা উদ্যোক্তারা দেশে বিনিয়োগ করতে পারছে না। এতে শিল্প বাণিজ্যের প্রসার ব্যাহত হচ্ছে। নতুন করে কাজের সুযোগ তৈরী হচ্ছে না। এর পাশাপাশি নানা কারণে শিল্পকারখানা বন্ধ হচ্ছে। যেগুলো টিকে আছে সেগুলোতেও ছাঁটাই হচ্ছে কর্মী। ফলে বাড়ছে দক্ষ-অদক্ষ বেকারের সংখ্যা। পরিসংখ্যান নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলেও দেশে যে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, এটাই ঠিক।
শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারা বিশ্বেই বেকারত্ব একটা বৃহৎ সমস্যা। আইএলও’র মতে, সারা বিশ্বে বেকারের সংখ্যা ২০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। আর বাংলাদেশে আইএলও’র তথ্য অনুযায়ী বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ বা ছয় কোটি যেটাই হোক, প্রকৃত অর্থে এই সংখ্যা ছয় কোটিরও বেশী হবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। ২০১০ সালে দেশে অনুষ্ঠিত হয় শ্রম জরিপ। এর পরে আর কোন জরিপ অনুষ্ঠিত হয়নি। আর সপ্তাহে কমপক্ষে এক ঘন্টা কাজ করে না এমন ব্যক্তিকেই বেকার হিসেবে বিবেচনা করার জন্য আইএলও যে সংজ্ঞা দিয়েছে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা কার্যকর নয়। কারণ এখানে সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করে জীবনধারণ করা অসম্ভব। এজন্য পরিসংখ্যান ব্যুরো শ্রমশক্তি জরিপে সপ্তাহে ৩৫ ঘন্টা কাজ করার সুযোগ পান- এমন ব্যক্তির কাজের হিসাব জরিপে নিয়ে থাকে। অবশ্য বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ধরণের ব্যক্তিকে বলা হয় ‘অর্ধবেকার’। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার এই দেশে প্রতি বছর ১৮ লাখ মানুষ নতুন করে শ্রম বাজারে প্রবেশ করছে। যার মধ্যে বেশীর ভাগই বেকার বা আংশিক বেকার থেকে যাচ্ছে।
গবেষকদের মতে, অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশে বেকারত্ব বৃদ্ধির হার বেশী। যে হারে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে সেই হারে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে না। এটাই হচ্ছে দুশ্চিন্তার বিষয়। বেকারত্ব হচ্ছে কাজের অভাবে অনিচ্ছাকৃত কর্মহীনতা। শ্রমশক্তির এই অংশকেই বেকার বোঝানো হয়। বেকারত্ব বৃদ্ধির নেপথ্যে রয়েছে সার্বিক বিনিয়োগ হ্রাস, উৎপাদনমুখী শিল্পায়নে উদ্যোক্তার অনাগ্রহ, শ্রমিকের অদক্ষতা, সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব, কারিগরি শিক্ষার অভাব, কৃষি, মৎস্য, পশু পালন ও পোল্ট্রির মতো লাভজনক খাতে শিক্ষিতদের প্রবেশে অনীহা ইত্যাদি। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারি খাত মাত্র পাঁচ শতাংশ অবদান রাখছে। বাকি ৯৫ শতাংশ কর্মসংস্থানই হচ্ছে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে। কিন্তু বেসরকারি খাতও এখন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ঝিমিয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে বেকারত্ব নিরসনে দেশে এমন একটি অর্থনৈতিক অবস্থা সৃষ্টি করা দরকার, যাতে উৎপাদনশীল খাতে ক্ষুদ্র, মাঝারী ও বৃহৎ বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। শিল্পকারখানা বৃদ্ধির ফলে কাজের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষার ক্ষেত্রেও কর্মমুখী শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT