পাঁচ মিশালী

ইংল্যান্ডের তারুণ্যময় গ্রীষ্মকাল

চৌধুরী ইসফাকুর রহমান কুরেশী প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৩-২০১৮ ইং ২৩:৩৭:৫৫ | সংবাদটি ৪৮ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
ব্রিটিশ রাজপরিবারের মধ্যে ঢুকে রাণী এলিজাবেত দম্পতির দু’পাশে দাঁড়িয়ে আমি ও নূরজাহান জাদুঘরের ক্যামেরায় ছবি তুলি। আমাদের অন্যদিকে ছিলেন-প্রিন্স হ্যারী ও প্রিন্স উইলিয়াম, রাজবধূ ক্যাট। আমি ছিলাম প্রিন্স চার্লস ও কিং ফিলিপসের মধ্যে দাঁড়ানো। আমরা সাধারণ মানুষ। রাজভাগ্য আমাদের কপালে নেই। অথচ মনে হলো আমরা যেন আজ অনেক অনেক ভাগ্যবান। দুনিয়ার সব বিখ্যাত বিখ্যাত মানুষের যেন সাহচর্য্যে চলে এসেছি। হযরত ঈসা (আ.), মুসা (আ.), গৌতম বুদ্ধ সবাই আজ আমার চার পাশে ধ্যান ভঙ্গিমায় রয়েছেন।
পরবর্তী হলে বিশ্ববিখ্যাত ক্রীড়াবিদগণের মধ্যে ঢুকে পড়ি। ফুটবল জগতের পেলে, ম্যারাডোনা, রোনাল্ড, বেকেন বাওয়ার, জিনেদিন জিদান, প্লাথিনী, মেসি সবার সাথে দেখা হলো। ক্রিকেট জগতের শচিন টেন্ডুলকার, ইমরান খান, গ্যারি সবরস, কপিল দেব, মুরালীধরন, স্যার ডন ব্রাডম্যানসহ অনেককে পেলাম। বক্সারদের মধ্যে মোহাম্মদ আলী ক্লে, মাইক টাইসন, জর্জ ফোরম্যান, লিওনেক্স লুইস প্রমুখ দাঁড়িয়ে আছেন। এখানে অন্য সব ধরনের ক্রীড়াবিদ ও অলিম্পিক বিজয়ীদের সাথেও মোলাকাত হলো।
এখান হতে বের হয়ে বিশ্ব বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আইনস্টাইন, স্যার আইজেক নিউটন ও স্টিফেন হকিংয়ের দরবারে যাই। হুইল চেয়ারে বসা স্টিফেন হকিংকে অপূর্ব লাগছিলো। সদ্য প্রয়াত এই লোকটি বর্তমান বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ছিলেন।
এখন আমরা চলে আসি ম্যাদামতুসো জাদুঘরের ভিতরে স্থাপিত একটি ট্রেনের প্লেটফরমে। এখানের আমরা একটি খেলনা ট্রেনের যাত্রি হবো, এই ট্রেন চড়ে ঘুরে দেখবো প্রাচীনকাল হতে আজ পর্যন্ত লন্ডনের জীবনযাত্রা ও প্রযুক্তির ইতিহাস ও বিবর্তন। পথে পথে দেখা হলো- ছাপাখানার বিবর্তন, বাতি, কলম, ছাতা, লন্ডনবাসীর বিভিন্ন যুগের পোষাকের বিবর্তন ও ইতিহাস। এমনকি বিভিন্ন যুগের রান্নার চুল্লী, সোফাসেট, দেখলাম ঘোড়ার গাড়ি হতে বর্তমান যান পর্যন্ত। মানুষের জীবন যে থেমে থাকে না, রোজ রোজ একটু একটু করে বদলে যায় সেই সত্য টয়ট্রেনে বসে হাজার বছরের লন্ডনকে দেখে সহজে অনুভব করা যায়। টয়ট্রেন হতে এক জায়গায় বিশ্ববিখ্যাত ইংলিশ কবি উইলিয়াম শেক্সপিয়ারকে ষোড়শ শতাব্দীর ডিজাইনে নির্মিত চেয়ার টেবিলে বসে লিখতে দেখলাম। সামনে বিশাল খাতা, আঙ্গুলের ফাঁকে রয়েছে রাজহাঁসের পালকের কলম ও কালিদানী। ত্রিশ মিনিটে হাজার বছরের লন্ডন সফর সুন্দরভাবে সমাপ্ত হলো।
এবার মাদামতুসো জাদুঘরের বিশাল অডিটোরিয়ামে ঢুকলাম। সামনে বিশাল পর্দা জুড়ে চার ডায়মেনশন ছবি দেখানো হবে। হল ভর্তি লোকজন। আলো নিভে গেল। লন্ডন শহরে ভিনগ্রহের এলিয়নের আক্রমন ও লন্ডনবাসীর প্রতিরোধ চিত্র। সভ্য লন্ডনবাসীর বিজয়ের মাধ্যমে ছবির সমাপ্তি। এবার বের হয়ে ট্রেন ধরলাম। ট্রেনে বসে ২০ পাউন্ডে কেনা রাজ পরিবারের সাথে উঠানো আমাদের ছবিটি আজফারের হাতে দিলাম। আজফার কৌতুক করে বললো- চাচা, আপনারাতো গেস্ট অফ কুইন। আজফারের কথাশুনে পাশের দু’জন ইংরেজ ভদ্রলোককে মৃদু হাসতে দেখলাম। তুসোর মানব মূর্তিগুলো এতোই প্রাণময় যে পাশে দাঁড়ালে মনে হয় যেন জীবন্ত লোকটির পাশে দাঁড়িয়েছি। ট্রেনে হঠাৎ করে দেখা হলো বাল্যবন্ধু তুড়কখলা গ্রামের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক জনাব ময়না মিয়ার একমাত্র সন্তান যুবায়েরের সাথে। তার উদ্যোগে উক্ত গ্রামে একটি এতিমখানা পরিচালিত হচ্ছে। চৌধুরীবাজার শাখার ব্যবস্থাপক থাকাকালে এক বৎসর পূর্বে দেখা হয়েছিল। আমাকে বাসায় যাবার আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি ভূগর্ভস্থ অলগেট স্টেশনে নেমে যান।
রাতে ভাগ্নি এনবের বাসায় যাই। সে আমার ফুফুতো বোন সেবি আপার একমাত্র কন্যা। সেবি আপা এক সময়ের খুব হাসিখুশী ও আমোদ স্বভাবের ছিলেন। বহু বছর পর দেখা হলো। তিনি আমার মায়ের প্রায় সমবয়সী। আমার মা যখন দাউদপুর আসেন, তখন কয়েকজন প্রায় সমবয়সী ভাগ্নি ও ভাতিজি পান। যারা ছিলেন একদিকে ভাগ্নি- ভাতিজি অন্যদিকে বান্ধবীও। সেবি আপা বুড়ি হয়ে গেছেন, কানে শ্রবণ শক্তিও নেই। চিৎকার করে করে কথাবার্তা বলা হলো। কিন্তু তার ¯েœহ-মায়া এখনও আগের মতো অটুট রয়েছে।
২৯ জুন ২০১৭। লন্ডনের কয়েকজন নিকটাত্মীয়ের বাসায় যাই। কানিহাটি হাজীপুরের ফুফুতো বোন সায়মা আপা থাকেন দক্ষিণ লন্ডন। তার পুত্র রুহেলের সাথে বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা হতো। তাকে পেয়ে যাই। তার বড় ভাই মামুনের সাথে দেখা হল বহুবছর পর। মামুন আমার প্রায় সমবয়সী। ১৯৮১ সালে ছাতকে একসাথে অনেক ঘুরাফেরা করেছি। সেই কিশোর মামুন আর নেই। মাথায় টাক, আমার চেয়েও মনে হচ্ছে অনেক বয়স্ক হয়েগেছে। মামুন কিচেনে গিয়ে বেশ কয়েকপদের নাস্তা নিজ হাতে তৈরি করে নিয়ে আসে।
মামুনের বাসা হতে বের হয়ে ভাগ্নি পপির বাসায় যাই। এখানে রাতে থাকতে হবে। লন্ডন ঢুকার পর হতে তার বাসায় থাকার আবদার শুনে আসছি। গাড়ি প্রধান গেটে আসতেই অটো গেট খোলে গেল। গাড়ি বনজঙ্গল, বৃক্ষলতা সুসজ্জিত এক সুন্দর বাসায় প্রবেশ করলো। লন্ডনের অন্যান্য বাসাগুলো রাস্তার পাশে পাশে সাজানো কিন্তু এ প্রাসাদোপম বাসাটি প্রধান রাস্তা হতে অনেক ভিতরে রয়েছে। মনে হলো বাসাটি বুঝি বাংলাদেশের বিদেশী চা বাগানের এক নির্জন বাংলো। ভাগ্নিবর সামাদ বললেন রাস্তার ধারের বাসায় শব্দ ও ধুলা দূষণ হয়, এখানে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। লন্ডনের অভিজাত এলাকার ঘন অরণ্য পরিবেষ্টিত এই বাসার সামনে ও পিছনে বড় বাগান। পিছনের বাগানে একটি ছোট্ট শিশুপার্ক সাজানো। যেখানে আমার নাতি ও নাতনিরা খেলা করে। তিন তলার এই ট্রিপ্লেক্স বাসায় বড় বড় পাঁচটি বেডরুম, দুইটি ড্রয়িং রুম। বড় কিচেন, পিছনের বাগানের মধ্যে ঢুকে পড়া বড় একটি গ্লাসঘেরা সিটিং রুম সোফাসেট সজ্জিত রয়েছে।
বাসার দুইটি ফিস এক্যুরিয়ামের একটিতে ছোট ফিস ও অন্যটিতে মিডিয়াম ফিস রয়েছে। পাখি রুমে কয়েক প্রকার সবুজ, লাল ও শ্বেতকায় পাখি লাফালাফি করছে। ভোরে এই পাখিগুলোর সুমিষ্ট কিচির-মিচির শুনে ঘুম ভাঙ্গে। এ বাসায় সুস্বাদু স্যালমন ফিস খাই।
মধ্য লন্ডনের এই অভিজাত বাসার নির্জন বন্য পরিবেশে বসে ইংল্যান্ডের জাতীয় পাখি রবিনের ডাক শুনি। থ্রিডি টেলিভিশনে ছবি দেখি। তৃতীয় তলার ব্যায়ামাগারে সকালে ব্যায়াম করি। দামীগাড়িসহ এমন বিলাসবহুল বাসা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না। ভাগ্নিবর সামাদ একজন চার্টার্ড একাউন্টেন্ট। একটি বহুজাতিক ব্রিটিশ ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। পূর্বে পোস্টিং ছিল নিউইয়র্ক। ফিরে এসে কিছু দিন লন্ডনে কাটানোর পর এখন কাতারের রাজধানী দোহায় নিযুক্ত হয়েছেন। তিন/চার সপ্তাহ পরপর লন্ডন আসেন। প্রতি ছয় সপ্তাহ পর পুরো পরিবার দোহায় গিয়ে দুই সপ্তাহ কাটিয়ে আবার লন্ডনে ফিরে আসেন।
এবার আজদা মার্কেটে বাজার করতে যাই। বাসায় ফেরার পর পপি তার ছোট্ট গাড়ি চালিয়ে মাহনুরের স্কুলসহ আশপাশ ঘুরে আসে। বাসার চার পাশে ঘন অরণ্যে হাঁটি। আমি বললাম এতো সবুজ, যেন আমাদের বাংলাদেশের সবুজকে লজ্জা পাইয়ে দেবে। পপি বললো- মামা, এখানে সবুজতো বাংলাদেশের মতো বারো মাস থাকে না। শীতে তুষার ঝরে। ডিসেম্বর জানুয়ারিতে বৃক্ষে কোনো পত্র থাকে না। গাছগুলোকে মৃত মনে হয়। পত্রহীন ডালে যখন বরফ ঝুলে মনে হয় যেন শুভ্র ক্রিষ্টাল ঝুলছে। তুষারপাত হলে ঠান্ডা কমে যায়, বাতাস বিশুদ্ধ হয়। আসলে তখন পাতা ঝরা বৃক্ষরাজি আলাদা এক সৌন্দর্য্যরে আধারে পরিণত হয়।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT