পাঁচ মিশালী

আবুল মনসুর আহমদ ও জাতিসত্ত্বার বুনিয়াদ

মো. আব্দুল বাছিত প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৩-২০১৮ ইং ২৩:৩৮:৪২ | সংবাদটি ২৮৮ বার পঠিত

আবুল মনসুর আহমদ বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়ের অকুতোভয় এক যোদ্ধার নাম। উপমহাদেশে অনেকবার উচ্চারিত হয়েছে এ নাম। তাঁর স্বাতন্ত্র্য আমাদের কাছে এসেছে নানাভাবে। কখনো রাজনীতির মঞ্চে, কখনো সংবাদপত্রে, কখনো সাহিত্যে স্যাটায়ারিস্ট (ব্যাঙ্গাত্মক) ও প্রবন্ধের চিন্তানায়ক হিসেবে। আইনজীবী হিসেবেও নামটি সুপরিচিত। তাঁর জীবনের শুরুতে তিনি বাঙালি মুসলমানের চেতনায় উন্মেষ যুগকে দেখেছেন, যৌবনে উপমহাদেশের স্মরণীয় আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থেকেছেন, পরিণত জীবনে সংবাদপত্রের সঙ্গে থেকে নানা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাজনীতি তাঁর মূলমন্ত্র, সাংবাদিকতার মাধ্যমে কর্মজীবনের হতেখড়ি এবং সাহিত্য সাধনায় নিহিত থেকে একজন জীবনশিল্পীর চোখে চারপাশ গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। আবুল মনসুর আহমদের জীবনকাল বিশ্লেষণে দেখা যায়, একাধিক ক্ষেত্রে বিচরণ করতে গিয়ে তাঁর শক্তি-সামর্থ্য নিখুঁত হয়েছে। একেই বলা যায়, আবুল মনসুর আহমদের বিচরণক্ষেত্রগুলো পরস্পর সহায়ক ও সম্পূরক।
এ সবের সমষ্টিতেই জন্ম হয়েছে আত্মপ্রত্যয়ী সাহিত্যিক, অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকের। সম্ভবত অন্যসব পরিচয় ডিঙিয়ে একমাত্র সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদই যেন সর্বোপরি অধিষ্ঠিত নাম; আজকের যেমন, তেমনি অনাগত কালের জন্যও। মননশীলতার বিচারে আবুল মনসুর আহমদ নামের যে-বটবৃক্ষ, সময়ের মধ্যে থেকে সব সহজযোগ নাগালে থাকা সত্ত্বেও, সময়ের অনাচারের বিরুদ্ধে, অবিচল বটের মতো স্থির ছিলেন। সম্প্রদায়ের প্রতি; প্রত্যক্ষ ও উচ্চকিত হৃদ্যতা থাকা সত্ত্বেও অসাম্প্রদায়িকতার পরিচয় দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের বক্তব্যটি উল্লেখযোগ্য : ‘পরশুরাম হিন্দু দেবদেবী নিয়ে অনেক কিছু বলেছেন, হিন্দু সম্প্রদায় তা সহ্য করেছে। আবুল মনসুর আহমদের দুঃসাহস সেদিন সমাজ সহ্য করেছিল। আজ কোনো সম্পাদক এমন গল্প ছাপতে সাহস করবেন কিনা এবং সমাজ তা সহ্য করবে কিনা সে-সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে। আবুল মনসুরের আক্রমণের লক্ষ্য কোনো ব্যক্তি, ধর্ম বা সম্প্রদায় নয়, তাঁর বিদ্রোহ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। আয়না প্রকাশের এতকাল পরেও মনে হয়, এরকম একটি গ্রন্থের প্রয়োজন আজো সমাজে রয়ে গেছে।’
নন্দিত এই লেখক ১৮৯৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর (১৯ ভাদ্র ১৩০৫) ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধানীখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার মাতার নাম মীর জাহান খাতুন, পিতার নাম আব্দুর রহিম ফরাযী। তিনি ১৯১৭ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাশ করেন এবং ১৯১৯ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। তিনি কোলকাতার রিপন ‘ল’ কলেজ থেকে আইন বিষয়ে পাশ করেন। এই সময়টা ছিল খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের। তিনি ৯ বছর ময়মনসিংহে আইন ব্যবসায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। অবশ্য, ১৯৫০ সালের পরে তিনি পুনরায় ময়মনসিংহ জজ কোর্টে ফিরে গিয়ে আইন ব্যবসায় নেমে পড়েন এবং একটানা ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত এই পেশায় নিযুক্ত ছিলেন। তারপর কোলকাতায় পেশাদার সাংবাদিক হিসাবে কাজ করেন।
আবুল মনসুর আহমেদ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর কংগ্রেস আন্দোলনসমূহের সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পরে তিনি বাংলার মুসলীম লীগের সাথে সম্পৃক্ত হন এবং ১৯৪০ সাল থেকে পাকিস্তানের আন্দোলনসমূহের সাথে যুক্ত হন। মূলত তিনি কৃষক-প্রজা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে আসেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তিনি ত্রিশাল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী হন। ১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খাঁর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের যুক্তফ্রন্ট সরকারের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। তিনি ছয়দিন ওই দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তীতে (১৯৫৬-৫৭) সালে তিনি হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রীও ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুপস্থিতিতে অল্প কিছুদিনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর স্থলাভিষিক্তও ছিলেন। ১৯৫৭ সালে তিনি পাক-ভারত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন উপলক্ষে ভারত সফরে গিয়ে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহরু এবং শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী মুরারজী দেশাই-এর সঙ্গে আলোচনায় মিলিত হন। পূর্ববাংলার মঙ্গলের জন্য তিনি নানা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, বিশেষ করে শিল্পায়নে তিনি বিশেষ অবদান রাখেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১দফার অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি। আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ) এর প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক ছিলেন। আইয়ুব খানের শাসনামলে অর্থাৎ পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে ও ষাটের দশকের প্রথম দিকে তিনি বেশ কয়েকবার কারাবরণ করেন এবং ১৯৬২ সালে মুক্তি পাবার পর রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে আবুল মনসুর আহমদ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্য দল থেকে শুরু করে সুভাষ বসুর আকর্ষণে কংগ্রেস, পাকিস্তান আন্দোলন, কৃষক প্রজা পার্টি, মুসলিম লীগ এবং সর্বশেষ আওয়ামী লীগ গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। এ প্রসঙ্গে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর বক্তব্য : ‘দীর্ঘদিন তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। এক সময় কেন্দ্রের প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন। পরিণত বয়সে নিজের রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিকথা লিখেছেন, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর। এই বইটির অনেক তথ্য অনেক ঘটনা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, মতভেদ রয়েছে, নতুন ব্যাখ্যাও রয়েছে। কিন্তু কেউ একথা অস্বীকার করেন না যে, এই বইটি পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক সাহিত্যের বহুদিনের অভাব ভালোভাবে পূরণ করেছে।’
রাজনীতির ময়দানে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী প্রখর চিন্তার অধিকারী আবুল মনসুর আহমদ এবং তখনকার সময়ের প্রতিনিধি মুসলিম লেখকবৃন্দ বিশেষ মিশন নিয়ে লেখায় মনোনিবেশ করেছিলেন যা সমকালীন প্রকাশিত গ্রন্থ কিংবা মননশীলতার প্রকাশ থেকে সহজেই অনুধাবণ করা যায়। মুসলিম সমাজমানস গঠনে, মানসিকতার পরিবর্তনে, আত্মশুদ্ধির পথে প্রণোদনা দানে এবং একটি শাণিত শালীন বিদ্বত-প্রজন্ম গড়ে তোলাই ছিল সে সময়কার সাহিত্যসাধকবৃন্দের বিশেষ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এর জন্য কেউ রচনা করেছেন গল্প-উপন্যাস-কবিতা-নাটক, কেউ রচনা করেছেন জাতীয় ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক-ঐতিহ্যিক বিবর্তনসমূহের ঘটনাক্রমে অথবা কেউ কেউ দেশসেবার মানসে রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছেন। কারো কারো কাছ থেকে সমাজ একসঙ্গে দুটোই লাভ করেছে। লেখালেখি ও রাজনীতি। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আবুল মনসুর আহমদ। একাধারে লেখালেখি, রাজনীতি ও সাংবাদিকতা করেছেন। এছাড়া একজন প্রথিতযশা আইনজ্ঞ হিসেবেও তাঁর তুলনা বিচার্যের বাইরে। আবুল মনসুর আহমদের সামগ্রিক সাহিত্য বিবেচনা করলে কিংবা তাঁর ব্যক্তিজীবনের ব্যাপ্তি পর্যালোচনা করলে তাঁকে বহুধায় বিভক্ত করে বিবেচনা করা একান্ত কর্তব্য এবং অনিবার্য সত্য হয়ে দাঁড়াবে। কারণ সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ এবং আইনজীবী হিসেবে স্ব স্ব ক্ষেত্রে তিনি উজ্জ্বল এবং দীপ্তিমান। প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর অবদান এবং আত্মত্যাগ কিংবা তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিকতার গভীরতা প্রত্যেক ক্ষেত্রে তাঁর ব্যাপ্তির পরিচয় বহন করবে। সুতরাং একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে তাঁর সামগ্রিক জীবনের বিশালতা এবং পদচারণাকে অবহেলা করা হবে বটে।
আবুল মনসুর আহমদের সাহিত্য জীবনের অমর কীর্তি ‘আয়না’ (১৯৩৫) ও ‘ফুড কনফারেন্স’ (১৯৪৪)। তিনি একজন প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ হওয়া সত্ত্বেও উক্ত গ্রন্থ দুটিতে রাজনীতিবিষয়ক স্যাটায়ারসহ ‘রাজনৈতিক বাল্যশিক্ষা’ ও ‘রাজনৈতিক ব্যাকরণ’ রচনায় কুণ্ঠিত হননি। বস্তুত গ্রন্থ দুটি এ দেশের কিছু সংখ্যক সরল মানুষকে সচেতন করতে চিহ্নিত রাজনীতিবিলাসী মানুষের কুটিল হৃদয়জগৎ উন্মোচন করে প্রকৃতার্থে বোমা ফাটিয়েছে। প্রত্যক্ষভাবেই যা দেশপ্রেমের সংজ্ঞাভুক্ত। এ গ্রন্থ দুটি সে সময়ে পাঠকের হৃদয় রাজ্যে আগ্নেয়গিরিতুল্য বিস্ফোরণ ঘটায়। মহান বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘আয়না’র ভূমিকায় লেখেন : এমন আয়নায় শুধু মানুষের বাইরের প্রতিচ্ছবিই দেখা যায় কিন্তু আমার বন্ধু শিল্পী আবুল মনসুর যে আয়না তৈরি করেছেন, তাতে মানুষের অন্তরের রূপ ধরা পড়েছে। যে সব মানুষ হরেক রকমের মুখোশ পরে আমাদের সমাজে অবাধে বিচরণ করছে, আবুল মনসুরের আয়নার ভেতরে তাদের স্বরূপ-মূর্তি বন্য ভীষণতা নিয়ে ফুটে উঠেছে। মানুষের মুখোশ পরা এই বহুরূপী বনমানুষগুলোর সবাইকে মন্দিরে, মসজিদে, বক্তৃতার মঞ্চে, পলিটিকসের আখড়ায়, সাহিত্যসমাজে বহুবার দেখেছি বলে মনে হচ্ছে। মূলত আবুল মনসুর আহমদের আয়না-সাহিত্য পর্যালোচনা করলে এটাই অনুধাবণ করা যায় যে, ‘আয়না’ বাংলা সাহিত্যে ব্যঙ্গ রচনার জগতে একটি কালজয়ী গ্রন্থ। সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি প্রতিটি ক্ষেত্র নিয়ে ‘আয়না’র উদ্দেশ্যমূলক প্লট তৈরী করেছেন মানুষের জীবন ও সমাজের একটি আবৃত দিকের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচনের উদ্দেশ্য নিয়ে। বলা যায়, ব্যঙ্গ রচনার মাধ্যমে সমাজের অসঙ্গতিকে তুলে ধরার অসাধারণ নৈপুণ্য অর্জন করেছিলেন আবুল মনসুর আহমদ।
তাঁর ব্যঙ্গ রচনার বিষয়বস্তু বতর্মান সময়কে স্পর্শ করেছে। সমাজজীবনের প্রতিচ্ছবি ব্যঙ্গ রচনায় প্রতিফলন আবুল মনসুর আহমদের সাহিত্য প্রতিভার অনন্য কারিগরী প্রভাব। সমাজজীবনের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা তাঁকে জীবনশিল্পীর মর্যাদা দিয়েছে। এজন্য দেখা যায়, সমাজ জীবনের নানা অসঙ্গতি পড়তে গিয়ে কখনো হাসি পেয়েছে, আবার কখনো কাঁদিয়েছে পাঠককে। মূলত, ব্যঙ্গাত্মক লেখকের প্রয়োজনীয় এবং অপরিহার্য বিষয় সংবেদনশীলতাকে তিনি রপ্ত করেছেন দক্ষ একজন জীবনশিল্পী হিসেবে। তাঁর সাহিত্য প্রতিভার অনন্য এবং উজ্জ্বল স্বাক্ষর ‘আয়না’র পরে ‘ফুড কনফারেন্স’ বার হলে বিদগ্ধমহল খুশিতে-উল্লাসে-আনন্দে নেচে ওঠেন। স্বতঃস্ফূর্তভাবে তারা উচ্ছ্বাসের কথা ব্যক্ত করেন। ‘ফুড কনফারেন্স’ গ্রন্থটি পাঠ করে অন্নদাশংকর রায় মন্তব্য করেছিলেন, ‘আয়না’ লিখিয়া আবুল মনসুর প্রাতঃস্মরণীয় হইয়াছিলেন। ফুড কনফারেন্স লিখিয়া তিনি অমর হইলেন। ভূমিকায় আবুল কালাম শামসুদ্দীন লেখেন : রঙ্গ ও ব্যঙ্গের ভেতর দিয়ে লেখক বাঙালি-চরিত্রের এই সাধারণ বাস্তব দিক দেখিয়ে পাঠকদের প্রচুর হাসিয়েছেন বটে কিন্তু অবিমিশ্র হাসিই যে আসল ব্যাপার নয়, হাসির পেছনে লেখকের অন্তরের বেদনার দরিয়া যে উচ্ছ্বসিত ধারায় বয়ে চলেছে অন্তদৃষ্টিসম্পন্ন পাঠকদের তা নজর এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়। ‘আয়না’য় প্রধানত বাংলা মুসলমানের সামাজিক জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি দেখানো হয়েছিল। ‘ফুড কনফারেন্সে’ বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের জাতীয় চরিত্রের বাস্তব দিকে রূপায়িত করে তোলা হয়েছে। এছাড়া তাঁর অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ব্যঙ্গরচনা ‘গালিভারের সফরনামা’, স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ গুলো: আত্মকথা (১৯৭৮, আত্মজীবনী), আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর (১৯৬৯), শেরে বাংলা হইতে বঙ্গবন্ধু (১৯৭২) এবং অন্যান্য রচনার মধ্যে ‘সত্য মিথ্যা’ (১৯৫৩), ‘জীবনক্ষুধা’ (১৯৫৫), ‘আবে হায়াত’ (১৯৬৪), ‘হুযুর কেবলা’ ”বাংলাদেশের কালচার” (১৯৬৬) সহ আরো গ্রন্থ রচনা করেছেন।
আবুল মনসুর আহমদের চিন্তা ও চোখ প্রসারিত ছিল নানান দিকে ও বিচিত্র বাঁকে। গল্প-উপন্যাস ছাড়াও কবিতা এবং নাটক নির্মাণের দিকে তাঁর বিশেষ ঝোঁক পাঠকের নজর কাড়ে। তিনি কবিতার কাঠামোয় পরিবেশন করেছেন আসমানী পর্দা (প্রকাশকাল: ১৯৫৭)। পুঁথি সাহিত্যের ঢঙে লেখা এই রচনা ছিল সমকালীন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ভ-ামির মুখোশে প্রবল আঘাত। এছাড়া শিশুদেরও নিয়ে তাঁর চিন্তা-চেতনার কলম আটকে থাকেনি। বাঙালি হিন্দু সমাজে ছোটদের জন্য সহজ-সরল ভাষায় রামায়ণ-মহাভারত রচিত হলেও মুসলমান সমাজের শিশু-কিশোরদের জন্য তেমন কোনো গ্রন্থ ছিল না, যা পড়ে ছোটদের ধর্মীয় অনুভূতি জাগ্রত হতে পারে। তখন আবুল মনসুর আহমদ লিখলেন কাসাসুল আম্বিয়া বা পয়গম্বরদের কাহিনি-মুসলমানি কথা (প্রকাশকাল: ১৯২৪), নয়াপাড়া (১৯৩৪), ছোটদের কাসাসুল আম্বিয়া (১৯৫০), পবিত্র কোরআনের নির্বাচিত অনুবাদ: আল কোরআনের নসিহৎ (১৯৭৫), আর্থ-রাজনীতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত নিবন্ধের সংকলন: বেশি দামে কেনা কম দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা (১৯৮২) এবং পরিবার-পরিকল্পনা (১৯৬৭) নামক একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে, সমকালীন বিশ^ সাহিত্যে কিংবা এর পূর্ববর্তী সময়গুলোতে যারা ব্যঙ্গাত্মক ধারা কিংবা ঘরানার লেখক ছিলেন তাদের সাহিত্যের দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিন্তা-চেতনার লৌকিকতাকে অবলোকন করলে বুঝা যায়, আবুল মনসুর আহমদ বাংলা সাহিত্যের অন্যসব আবর্তন-বৃত্ত থেকে আলাদা, তাঁর কণ্ঠস্বর ভিন্ন এবং স্বতন্ত্র। তাঁকে বাংলা ব্যঙ্গ সাহিত্যের পথিকৃৎ বললে অত্যুক্তি হবে না। যদিও বাংলা ব্যঙ্গ সাহিত্য তেমনভাবে বিকশিত না হলেও বিশে^র সমৃদ্ধভাষাগুলোর ব্যঙ্গ সাহিত্য বেশ সমৃদ্ধ হবার সুযোগ পেয়েছে। ব্যঙ্গাত্মক রচনার ক্ষেত্রে ইংরেজি সাহিত্যে যেমন জোনাথন সুইফট, বাটলার, আলেক্সজান্ডার পোপ, চচার, অরওয়েল এবং বার্নাড শ’রা আছেন, তেমনি আমাদের সাহিত্যে আছেন আবুল মনসুর আহমদ, প্রমথ চৌধুরী, সৈয়দ মুজতবা আলী, প্রিন্সিপাল ইবরাহিম খাঁ প্রমুখ। তবে ইংরেজি সাহিত্যে জোনাথন সুইফটের সে-স্থান বাংলা সাহিত্যে আবুল মনসুর আহমদের স্থান তার চেয়ে বৃহৎ এবং ভিন্ন রকমের।
আবুল মনসুর আহমদের লেখায় রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও সাহিত্য- এই ত্রিধারার সম্মিলন ঘটেছে। আবুল মনসুর আহমদের লেখায় দেশ ও দেশের মানুষের সমস্যার প্রত্যক্ষ পর্যালোচনা আছে। ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের আঘাতে সমাজ ও দেশের চৈতন্য জাগরণ তার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। তাই তার সাহিত্য আমাদের দেশ ও দেশের মানুষের কাছে তাৎপর্যবহ। সুতরাং বলতে বাধা নেই, আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন দূরদর্শী বিজ্ঞ গুরুতুল্য ব্যক্তিত্ব, আজকের প্রজন্ম যাকে অনুসরণ করলে বরঞ্চ অধিক উপকৃত হবেন। সাহিত্য চর্চায় অসাধারণ অবদানের জন্য আবুল মনসুর আহমদ ১৯৭৯ সালে দেশের “সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার” হিসাবে পরিচিত “স্বাধীনতা পুরস্কার” (মরণোত্তর) লাভ করেন। এছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬০) ও নাসিরুদ্দীন স্বর্ণপদকে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৭৯ সালের ১৮ মার্চ ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। আবুল মনসুর আহমদ মরেননি, বেঁচে আছেন তাঁর মননের আলোয়। তাঁর সাহিত্যকর্ম, বিবর্ণ জাতিকে জাতিসত্ত্বার পথে আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখাবে। মুখোশের অন্তরালের সমাজকে সবার সামনে টেনে আনবে। তাঁর সৃষ্টিকর্ম।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT