পাঁচ মিশালী

সিলেটে পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ

এম.এ রহিম প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৩-২০১৮ ইং ২৩:৩৯:২৬ | সংবাদটি ১০৮ বার পঠিত

পর্যটন হচ্ছে এক মহান মানবিক কার্যক্রম। এটা আপন দেশ ও জনগণকে গভীরভাবে চেনা ও জানার সুযোগ ছাড়া ও অন্যান্য দেশ ও জনগণকে জানার সুযোগ এনে দেয়। জনগণের আর্থিক কল্যাণ ছাড়াও এটা জনসমষ্ঠি ও জাতিপুঞ্জের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও শুভ্চ্ছোর বন্ধন সুদৃঢ় করে। পর্যটন উৎসব এর ব্যাপারে বাংলাদেশের যে সম্পদ রয়েছে তার যথাযথ ব্যবহার ও উন্নয়ন হলে শুধু এদেশের জন্যেই নয়,বিদেশী পর্যটকদের জন্যও তা যথেষ্ট আকর্ষণ সৃষ্টি করতে ও সুবিধা দিতে পারে। মনোমুগ্ধকর বাংলাদেশের একজন পর্যটক কোনো রকমেই তার অফুরন্ত সৌন্দর্য, অপরিমেয় মনোহারিত্ব ও উষ্ণ আমেজ ভুলতে পারেনা।
এ কথা আবশ্যই স্বীকার করতে হবে, সুদীর্ঘ সমুদ্র সৈকত, পাহাড় -পর্বত, আঁকাবাঁকা নদী, প্রতœতাত্তিক সম্পদে সমৃদ্ধ বহু শহর ও জনপদ রয়েছে বাংলাদেশে। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, সেন্টমার্টিন, মহাস্থানগড়, ময়নামতি, সিলেটের জাফলং, বিছনাকান্দি পান্তুমাই এবং রাতারগুল দর্শনীয় স্থানগুলোর অন্যতম। পর্যটন প্রেক্ষাপটে এগুলো বড় রকমের একটি অনুকূল পরিবেশ। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ছুটির দিনে দলভিত্তিক পর্যটন শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান পর্যটন আকর্ষণের জন্য ও ভ্রমণের জন্য এর মাঝেই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সিলেটের কিছু পিকনিক স্পট এখন বাংলাদেশের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এদের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে জাফলং।
জাফলং হচ্ছে বাংলাদেশের পর্যটন স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। সিলেটের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের পাদদেশে এবং গোয়াইনঘাট উপজেলার পূর্ব-উত্তর প্রান্তে প্রাকৃতিক দৃশ্যে আবর্তিত এ জাফলংয়ের অবস্থান। এ জনপদের রয়েছে প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য। প্রথমেই বলা যাক জৈন্তা রাজ্যের কথা। সেখানে রয়েছে প্রাচীনকালের গোল চাকতির মতো লম্বা পাথর, যার নাম ‘মেগালিথিক পাথর’। সম্ভবত: আদিবাসীরা মৃত ব্যক্তির স্মরণে এ সব পাথরে এসে পূজা করত। এখানে জৈন্তা রাজার বাড়ি ছিল। বর্তমানে আগাছায় ঢেকে গেছে। দেয়ালে ঘোড়ার মূর্তি, এক সময় এখানে একটি সোনার মূর্তিও ছিল। এখন মূর্তিটি নেই। সামনে একটি মন্দির ছিল এবং মন্দিরের সামনে একটি সজনে গাছ ছিল, তার নিচে বিরাট একটি গোল পাথর। বহু রক্ত লেগেছে এই পাথরের গায়ে। ঊনিশ শতকের শেষ দিকে ও সেখানে মানুষ বলি দেবার ঘটনার বিবরণ আছে। একবার কয়েকজন বৃটিশ সৈন্যকে সেখানে বলি দেওয়া হয়েছিল সেই ঘটনার কথা তখনকার সংবাদপত্রে উল্লেখ আছে। এ নিয়ে বৃটিশ আইন সভাতে এই বর্বর ঘটনার বিরুদ্ধে কথা উঠেছিল। জৈন্তা রাজার বিরুদ্ধে বৃটিশরা তখন অভিযানও চালিয়েছিল। জৈন্তা থেকে জাফলং যাবার রাস্তার চারপাশের দৃশ্য ভারী চমৎকার। সিলেট সীমান্তের এক সুন্দর জায়গা। তামাবিল, শ্রীপুর, জাফলং। যদিও রাস্তাটি তেমন মসৃণ নয়। এক সময় এর নাম ছিল শিলং রোড। জাফলং যাবার পথে এক জায়গায় পথের দু’পাশে অসংখ্য অর্কিডের সারি। মেঘালয়ের বুকে কুলকুল করে বয়ে যাওয়া ঝর্ণার স্বচ্ছ পানি। চারিদিকে ছড়ানো অজস্র নুড়ি পাথর। কমলা-বাগান, চা-বাগান দূরে আকাশের গায়ে আবছা নীলের মত পাহাড়ের আভাস দেখা যায়। দৃশ্যটা যে একবার দেখে তার মনে ছবির মত গেঁথে যায়। এই রকম দৃশ্য দেখলে যে কোনো পর্যটকের মন উদাস হয়ে যায়। কতক্ষণ পরপর ক্ষীণ ঝর্ণাধারা দেখে মনে হয় যেন পাহাড়ি ললনারা পর্যটকদের হাতছানি দিযে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। যাতায়াতের রাস্তা, সোবহানিঘাট থেকে বাসে সরাসরি যেতে পারবেন। ভাড়া নেবে ষাট টাকা। সি.এন.জি অটোরিক্সা, লাইটেস অথবা নোহা গাড়ি রিজার্ভ করেও যেতে পারেন। ভাড়া নেবে পনেরশ’ থেকে দুই হাজার টাকা।
দ্বিতীয়ত বিছনাকান্দি, পর্যটনের আরেকটি প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে বিছনাকান্দি। বাংলাদেশের ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অতি আকর্ষণীয় একটি স্পট যেটি দেখতে অনেকটা জাফলংয়ের মত হলেও মূলতঃ এর বিস্তার বা প্রশস্ততা অনেক বেশি। চতুর্দিকে খোলামেলা কুলকুল করে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি নদী। নদীতে শুধু পাথর আর পাথর। ছোট, বড় ও মাঝারি সব ধরনের পাথর। সাতটি পাহাড় এসে মিলিত হয়েছে, এই জন্য এটাকে সাত পাহাড়ের মোড়ও বলা হয়ে থাকে। বিভিন্ন উৎসবে, সরকারি ছুটির দিনে হাজার হাজার পর্যটকদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠে এই বিছনাকান্দি। তা ছাড়া সীমান্ত পীলারের কাছেই ভারতের স্থানীয় একটি বাজার রয়েছে, এ বাজারের নাম হচ্ছে নয়া বাজার। আপনি ওখানে গিয়ে বাজারেও যেতে পারেন। দেখা যাবে খাসিয়া ও বাঙ্গালিরা মিলে কিভাবে ব্যবসা বাণিজ্য করে। যেভাবে যাবেন, সিলেটের আম্বরখানা থেকে সি.এন.জি অটোরিক্সা, লাইটেস অথবা নোহা গাড়ি রিজার্ভ করে যেতে পারেন। ভাড়া নেবে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা।
তৃতীয়ত পানতুমাই, একটি ঐতিহ্যবাহি গ্রাম। বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম বলে ইতোমধ্যে খ্যাতি পেয়েছে। এখানে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে একটি ঝর্ণা। কেউ কেউ এর নাম দিয়েছেন সুন্দরি ঝর্ণা, কেউবা এর নাম দিয়েছেন মায়াবতী ঝর্ণা। স্থানীয়ভাবে একে বলা হয়, ফাটাছড়া। ঝর্ণার পাশেই আছে মেঘালয় পাহাড়ের গায়ে বড় একটি পাথর,ওই পাথরের উপরে আছে একটি সুদৃশ্য মন্দির। স্থানীয় ভাষায় এই পাথরকে বলা হয় বড়হিল। তার পাশেই আছে বিশাল একটি ফুটবল খেলার মাঠ। এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। এই মাঠের সাথেই আছে ভারতীয় সীমান্ত পীলার। কথিত আছে এই ঝর্ণার নীচে ১৯৬৫ সালে পাক ভারত যুদ্ধের সময় একটি ভারতীয় বিমান বিধ্বস্ত হয়, যার ধ্বংসস্তূপ এখনো দেখতে পাওয়া যায়। আপনি মায়াবতী ঝর্ণা দেখতে এই সীমান্ত পার হয়ে অনেকটা ভিতরে চলে যাবেন। এই সময়ে শত শত পর্যটক পান্তুমাই দেখতে যান। তাদের অবসর সময় কাটিয়ে আসেন। তবে বর্ষার ভরা মৌসুমে পান্তুমাই গেলে বর্ষার পরিপূর্ণ রূপ দেখতে পাওয়া যায়। কীভাবে তার যৌবন উছলিয়ে পড়ছে তা স্বচক্ষে না দেখলে সহজে অনুমান করা যাবে না। তবে সবচেয়ে ভাল লাগে বর্ষাকালে গভীর রাতে যখন সবকিছু নিরিবিলি হয়ে যায় তখন মায়াবতী ঝর্ণার শাঁ শাঁ শব্দে আপনার ঘুম ভেঙ্গে যাবে। আর এটাই হবে আপনার পান্তুমাই ঘুরে আসার সার্থকথা। যাতায়াতের রাস্তা, বন্দরবাজার তেতুল তলা থেকে সি.এন.জি অটোরিক্সা করে গোয়াইনঘাট তারপর গোয়াইনঘাট থেকে সরাসরি পান্তুমাই। ভাড়া নেবে একশত পঁচাত্তর টাকা। সি.এন.জি অটোরিক্সা অথবা নোহা রিজার্ভ করলে ভাড়া নেবে পনেরশ থেকে আড়াই হাজার টাকা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT