সাহিত্য

কবিতার অক্ষরে, কবির বেদনার ভেতর

ফকির ইলিয়াস প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৩-২০১৮ ইং ২২:০৬:৪৫ | সংবাদটি ১১৩ বার পঠিত


কবিতার আনন্দ নিয়ে থাকি। থাকি, কবিতার বিষাদ নিয়েও। এই বিষাদ কাউকে দেখানো যায় না। আনন্দ দেখানো যায়। উল্লাস করা যায় সমবেত। কাঁদতে হলে নির্জনে যেতে হয়। আমি জীবনে অনেক উল্লাস করেছি। কেঁদেছিও অনেকবার। কেঁদেছি, বিশেষ করে যখন শুনেছি কোনো কবি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আচ্ছা, কবির মৃত্যু আমাকে এমন করে কাঁদায় কেন? শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হক, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দিলওয়ার, রফিক আজাদ, আনওয়ার আহমদ, সমুদ্র গুপ্ত, সিকদার আমিনুল হক, ত্রিদিব দস্তিদার- এমন আরও কত নাম। তাঁদের সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল।
তাঁদের হাতে হাত রেখেছি। কথা বলেছি। আড্ডা দিয়েছি। তাঁরা আজ কোথায়?
ভাবি-কাঁদি-ভাবি।
একজন মার্কিনী কবির গল্প আপনাদের শোনাই। তাঁর নাম নর্মান রস্টান। জন্ম- ১ জানুয়ারি ১৯১৩। মৃত্যু- ৭ মার্চ ১৯৯৫। আমার পিতার জন্মসাল ১৯১৩। সে কথাটি আমি নর্মান রস্টানকে বলেছিলাম। তিনি আবার আমার হাত চেপে ধরেছিলেন। বলেছিলেন- ‘বৎস হে!চিরদিন কবিতাময় থেকো’।
১৯৯০-১৯৯৫ পাঁচ বছর তাঁর সাথে অনেক আড্ডা দিয়েছি। কথা বলেছি। জেনেছি অনেক কিছু। তাঁর একটি বিশেষ পরিচয় ছিল। তিনি ছিলেন বিশ্বখ্যাত অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো’র কবিবন্ধু। ১৯৫৫ সালে মেরিলিনের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। এর পর থেকেই নর্মান রস্টান ও তাঁর স্ত্রী হেদা রস্টান, মেরিলিন মনরো’র অন্তরঙ্গ কাছে যাবার সুযোগ পান। মেরিলিন মনরো’র মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এই দম্পতির সাথে সুসম্পর্ক রেখেছিলেন। মেরিলিন তার উইলে কবি নর্মান রস্টানের মেয়ে প্যাট্রিশিয়া রস্টানের জন্য লেখাপড়া বাবৎ পাঁচ হাজার ডলার রেখে যান। ১৯৭৩ সালে কবি নর্মান রস্টান মেরিলিন মনরো-কে নিয়ে একটি বই লিখেন। ‘মেরিলিন: এন আনটোল্ড স্টোরি'’। এই না বলা গল্প বইটি খুবই আলোচিত হয়। নর্মান রস্টান ছিলেন, আমেরিকার বিখ্যাত গীতিবিদ, নাট্যজন আর্থার মিলারের ঘনিষ্ট বন্ধু।
আর্থার মিলার এই সময়ে নর্মান রস্টানের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। মিলার বলেছিলেন- নর্মান রস্টান মেরিলিন মনরো’র জীবনকে পাবলিক’লি নিয়ে এসেছেন। অথচ আর্থার মিলার নিজেই মেরিলিনকে নিয়ে না না স্মৃতিচারণ করেছিলেন বিভিন্ন লেখায়।
নর্মান আমাকে বলেছিলেন, মেরিলিন মনরো’র ভেতরে ছিল একটি উজ্জ্বল কবি প্রতিভা। একসময় মেরিলিনের প্রণয় গড়ে উঠে আর্থার মিলারের সাথে। মেরিলিন তার স্বামী জো ডিমাগিও এর সাথে ডিভোর্স নেয়ার পর নিউইয়র্কে চলে আসেন কিছু দিনের জন্য। নর্মান রস্টান, মেরিলিন মনরো’র একটি কবিতা আমাকে পড়ে শুনিয়েছিলেন। আমি এর বাংলা রূপান্তর এখানে তুলে ধরতে চাই।
অমসৃণ সবুজ কাঠঘেরা ঘর আমি ফেলে এসেছি-/ ফেলে এসেছি নীল রঙের সোফা।/ তারপরও আমি স্বপ্ন দেখি,/ একটি উজ্জ্বল তৃণগুচ্ছের/ যা ফেলে এসেছি দরজার বাইরে।/ হাঁটার বাঁকে যে বহন করছে/ আমার স্বপ্নপুতুল তার বাহনে,/ আমি তাকেই ছেড়ে চলে এসেছি ক্রমশ।/ বলছি- কেঁদো না হে পুতুল আমার/ কেঁদো না-/ আমি তোমাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছি/ আমার গন্তব্যে। না, অভিনয় করছি না/ যদিও আমি তোমার মৃত জন্মদাত্রী নই।/ আর বলছি- সাহায্য চাই-/ সাহায্য!/ জীবন আমার কাছে ছুটে আসছে/ আমি শুধুই মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছি।’
পাঠক, এই ছিল বিশ্বখ্যাত একজন মানুষের মনের পঙতিমালা। তিনি কি কেঁদেছিলেন তা আমরা জানি না। তবে জানি এক বিশাল শূন্যতায় পূর্ণ ছিল তার জীবন।
কবি নর্মান রস্টান'কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম- প্রেম কি মানুষকে হত্যা করে?
তিনি হেসে জবাব দিয়েছিলেন- প্রেম মানুষকে হত্যা করে বড় বেদনাদায়ক ভাবে।
দুই.
কবি রফিক আজাদের সাথে আমার সখ্য ছিল অনুজ-অগ্রজের। তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম- আপনি কি কবিতা লিখে কখনও কেঁদেছিলেন? তিনি বলেন, তাহলে একটা কবিতা শোনাই। কবি আওড়াতে থাকেন-
‘যদি ভালবাসা পাই আবার শুধরে নেব/ জীবনের ভুলগুলি/ যদি ভালবাসা পাই ব্যাপক দীর্ঘপথে/তুলে নেব ঝোলাঝুলি/ যদি ভালবাসা পাই শীতের রাতের শেষে/ মখমল দিন পাব/ যদি ভালবাসা পাই পাহাড় ডিঙ্গাবো/ আর সমুদ্র সাঁতরাবো/ যদি ভালবাসা পাই আমার আকাশ হবে/ দ্রুত শরতের নীল/ যদি ভালবাসা পাই জীবনে আমিও পাব/ মধ্য অন্তমিল।'’
[যদি ভালবাসা পাই]
রফিক আজাদ কি জীবনের অন্তমিল খুঁজে পেয়েছিলেন? তা আমরা জানি না। জেনে কোনো লাভও নেই। কারণ কবিজীবনের অনেক কথাই সবার জানার দরকার পড়ে না।
আমরা তাঁকে জেনেছি তাঁর কবিতায়। জীবনমুখী কতোটা ছিলেন রফিক আজাদ সেটা দ্রোহ আর প্রেমের পাশাপাশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর পংক্তিতে পংক্তিতে। আপন হাসি, আপন কান্নায়, আপন ভাবনায় ও শব্দশৈলীতে তিনি ছিলেন অনন্য ও আপন ঘরানার নির্মাতা। তাঁর কবিতা ‘নগর ধ্বংসের আগে’, ‘কুয়াশার চাষ’, ‘মনোভূমি বনভূমি’, ‘সমুদ্রায়ন’, ‘অন্তরঙ্গে সবুজ সংসার’, ‘ওপরতলার কেচ্ছা’, ‘মানুষেরা বড় ভয়াবহ প্রাণী’ ‘সুন্দরের দিকে চোখ রেখে’ ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ ইত্যাদি থেকে যাবে আমাদের প্রেরণা হয়ে।
আমার দেখা আরেকজন উজ্জ্বল কবি সিকদার আমিনুল হক। নিউইয়র্কে তিনি বেড়াতে এসেছিলেন। আড্ডা দিই তাঁর সাথে। কথা হয় কবিতা নিয়ে। বলেন- বাংলা কবিতা নিয়ে আমি আশাবাদী। তাঁর ‘সতত ডানার মানুষ’, ‘কাফকার জামা’ পড়ে চমকে উঠেছিলাম। সে কথা তাঁকে বলি। তিনি হাসেন। বলি- একটি কবিতা পড়ে শোনান। তিনি উচ্চারণ করেন-
‘তোমার কাছেই চিঠি লিখছি এখন;/ এই একমাত্র খবরের শেষে আর অতিরিক্ত নেই।/ তুমি সুন্দর। অনেকখানি পাওয়া যায় একসঙ্গে।/ সমস্তটা আমার হলে একসঙ্গে কিছুক্ষণের জন্যে/ কে আর কবর, বিচ্ছেদ এসব বিশ্বাস করে!/ চিঠি লিখছি আলোয় অথচ অন্ধকারের গন্ধ পাচ্ছি!/ মেদ কি অন্ধকার? মাংস কি অন্ধকার? সব গহ্বর কি,/ অন্ধকার? – নাকি বসন্ত বলেই আমি আজ এত কামার্ত!/ চিঠি তো লিখছি না, যেন বাতাসে উড়তে উড়তে সংগম করছি।'’
[ মধ্যবয়স্কা কাউকে যখন চিঠি লিখি ]
কবিকন্ঠে কবিতা শোনার মজাই আলাদা। একজন কবি যখন কবিতা পড়েন- আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। তার ঠোঁট কাঁপছে। ভুরু উঠা-নামা করছে।
নিঃশ্বাস উড়ছে আকাশে। আহা! কবিতা জীবন! এই জীবনটি যদি সহস্র বছরের হতো! কথাটি বলেছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। নিউইয়র্কের এক আড্ডায়।
তৃতীয় ‘আমেরিকা-বাংলাদেশ-কানাডা (এবিসি)’ কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয় নিউইয়র্কে। ২৩ ও ২৪ জুন ২০১২ শনি ও রোববার দুই দিনব্যাপী জমজমাট অনুষ্ঠান ছিল সেটি। ওই অনুষ্ঠানটির সাহিত্য বিষয়ক সেমিনারের মূল সমন্বয়কের দায়িত্ব ছিল আমার উপর। সেই সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন তিনি। সেমিনারে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন।
সব্যসাচী কবি সৈয়দ শামসুল হক বলেন, ভাষাকে বাঁচাতেই লিখতে হবে। পাঠক কজন, তা বিবেচনায় না রেখেই লেখককে তার সৃষ্টি চালিয়ে যাওয়া দরকার। তিনি বলেন, ‘পাওয়ার অফ ওয়ার্ডস’-এর বিকল্প কিছু নেই। আর এ শক্তি সব ভাষাতেই আছে। শুধু ব্যবহারের অপেক্ষায়ই থাকে সেই শক্তি। সৈয়দ হক বলেন, রিজেকশন থেকে শিক্ষা নেয়ার অনেক কিছুই আছে। তিনি বলেন, এই বয়সে এসে আমি দৃঢ়তার সঙ্গে আপনাদের জানাতে চাই, আমি চাইলে যে কোন ইংরেজ ভাষাভাষী লেখকের চেয়ে ভালো ইংরেজিতে আমি লিখতে পারতাম। কিন্তু আমি লিখিনি। কারণ বাংলা আমার ভাষা। বাংলা আমার গর্ব। আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি যে কোন ভাষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে বাংলা ভাষা।
সৈয়দ হক বলেন, রোমান হরফে বাংলা ভাষার প্রতি ‘ভাষার আগ্রাসন’ চলছে। যে বাঙালি ’৫২ সালে ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছিল, সেই প্রজন্ম এখন বাংলিশে এসএমএস করে প্রতিদিন কোটি কোটিবার। তিনি বলেন, বাংলাদেশ টেলি কমিউনিকেশন বোর্ডের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি আমাকে কথা দিয়েছেন, যেসব মোবাইল থেকে বাংলা লেখা যায় না, সেসব কোম্পানির মোবাইল বাংলাদেশ আমদানি করবে না। তা আসছে বছর থেকেই কার্যকরী হবে বলে আমরা আশা করছি। যেসব মোবাইল থেকে বাংলা হরফে লেখা যায়, তেমন মোবাইল বাংলাদেশেও তৈরির চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, বাংলাসাহিত্য, বিশ্বের যে কোন ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে। এ নিশ্চয়তা আমি আপনাদের দিচ্ছি।
সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন সাহসী কবি। অনেক কথাই বলতে পারতেন সাহসের সাথে। কিন্তু তাঁর প্রেমের হৃদয় ছিল বড় বিশাল। তিনি লিখেছেন-
‘নষ্ট জলে পা ধুয়েছো এখন উপায় কি?/ আচ্ছাদিত বুকের বোঁটা চুমোয় কেটেছি।/ কথার কোলে ইচ্ছেগুলো বাৎসায়নের রতি,/ মানে এবং অন্য মানে দুটোই জেনেছি।/ নষ্ট জলে ধুইয়ে দেবে কখন আমার গা,/ তোমার দিকে হাঁটবে কখন আমার দুটো পা?/ সেই দিকে মন পড়েই আছে, দিন তো হলো শেষ;/ তোমার মধ্যে পবিত্রতার একটি মহাদেশ/ এবং এক জলের ধারা দেখতে পেয়েছি-/ একেই বুঝি মানুষ বলে, ভালোবেসেছি।''
[একেই বুঝি মানুষ বলে]
শহীদ কাদরীর অনেক কবিতা আমাকে আনন্দ দিয়েছে। কাঁদিয়েছেও। তিনি যখন কবিতা পড়েছেন, শুনেছি মন দিয়ে। বিষাদ আমাকে ছুঁয়েছে। তিনি বলেছেন ‘বিষাদিত রোদের কিনারে থাকো চিরকাল’। পড়া যাক আমার প্রিয় একটি, শহীদ কাদরীর কবিতা-
মানুষ, নতুন শতকে/ আজ আবার উদ্যত ছুরি মানুষের হাতে,/ ওর পায়ের নিচে/ পিষ্ট হচ্ছে নারী,/ শিশুরা নিহত হচ্ছে চতুর্দিকে!/ কবি, তোমার বর্মগুলো বের করে নাও।/ তোমার কবিতাই শ্রেষ্ঠ বর্ম আজ!/ মধ্যযুগের অন্ধকার ছিঁড়ে/ আবার উদ্যত ছুরি/ মানুষের হাতে।/ আমাদের চেনা নগরগুলো থেকে/ উঠছে ক্রন্দনধ্বনি/ কবি, ওকে প্রতিহত করো।/ কবি তুমি জানো আমাদের প্রিয় কবিতার/ অমর পঙ্ক্তিগুলো/ হত্যার বিরুদ্ধে চিরকাল - চিরকাল.../ কবি, ওকে প্রতিহত করো
[মানুষ, নতুন শতকে]
কবিতা আমাকে আনন্দের কিনারে নিয়ে যায়। আমি কবিতায় কবিকে খুঁজি। তার মুখ ভেসে উঠে। ঢেউ জাগে। জাগে রোদন। কবির পদছাপ খুঁজি। মিলিয়ে যায় হাওয়া। মানুষের চেয়ে, তার অক্ষরগুলো অমর! বড় ঈর্ষা হয় অক্ষরের প্রতি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT