সাহিত্য

নাশপাতি ঘ্রাণে মন : কবির অনবদ্য সৃষ্টি

শারমিন সুমি প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৩-২০১৮ ইং ২২:০৮:৩০ | সংবাদটি ১৬৮ বার পঠিত

অযুত যুক্তিতর্কের আড়ালে আবডালে লুকিয়ে থাকে কিছু কিছু সত্য। আর কেউ কেউ সেই সত্যকে জীবনের সাবলীল অভিজ্ঞতার আলোকের ছোঁয়ায় অমাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। কবি হোসনে আরা কামালী তেমনি এক ব্যক্তি যে কিনা সময়ের গূঢ় সত্যগুলোকে স্বীয় অন্তরের স্বতন্ত্র ভাষায় উপস্থাপন করেন আমাদের সম্মুখপানে। কবিতার সুনিপুণ কারিগর হয়ে অনেক উপাত্তের ডালি দিয়ে সাজিয়েছেন তার কাব্যগ্রন্থ, নাশপাতি ঘ্রাণে মন। উৎসর্গের চৌকাট পেরিয়ে সামনে এগুলেই পাওয়া যায় এক ডালা কবিতার পাহাড়। যদিও এটা কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ, তথাপি আমি বলবো তিনি কবিতার সুনিপুণ কারিগর, অনন্য এক শিল্পশ্রষ্টা। আর এতে কোন সন্দেহ নেই। নাশপাতি ঘ্রাণে মন নামের মধ্যেই কেমন যেন একটা মউ মউ গন্ধ প্রবাহমান। ছড়িয়ে পড়ে হাড়ের মজ্জায়। কাব্যের নামের মধ্যেও একটা বৈশিষ্টতা লক্ষণীয় যা আমাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছে। যেকোন কাব্য পাঠে আমরা যেটা উপলব্ধি করি কিংবা খুঁজে বেড়াই সেটা হল সময়ের আখ্যান, গভীর জীবনের চিত্রকল্প, কিছু নতুন নতুন পঙক্তি। কবি হোসনে আরা কামালীর কাব্যগ্রন্থেও আমরা খুঁজে পাই সেরকম কিছু পঙক্তিমালা। ‘মনে থাকবে না’ কবিতায় কিছু লাইন এমন :
‘আমিইতো ছেড়ে দিয়ে এলাম আমাকে/ অল্প আলোয় স্বল্প ফিরে দেখলাম না নিজেকে...।’/ কিংবা- ‘গেলামতো হেঁটে হেঁটে একা বড়ো রাস্তার শেষ সীমানায়/ আর ফিরব না, কথা তো দিলাম তবে কেন আর বৃথা বায়না।’
এরকম চিত্রময় পঙক্তির জন্য কবিকে অভিনন্দন। কবির কিছু কিছু কবিতায় জীবনের বিশালতার ছোঁয়াও আমরা ঠিকই খুজে পাই। ‘সংগ্রামে সন্ধিতে’ কবিতায় :
‘আমি আমি নই/ আমি অন্যের স্বজন/ আমি স্নেহের ফেরিওয়ালা/ আমি স্বার্থহীন ভালবাসার প্রবক্তা/ আমি উত্তরাধিকারের উজ্জ্বল নিশান।’
কবি বলেছেন ‘প্রতিশ্রুতি নেই প্রাঙ্গণ আছে’। আর আমি বলি সেই প্রাঙ্গণে লাল টিপ আর লাল চুড়ি টিকই থাকবে। কবির থাকবে না কোন কষ্টের সীমারেখা। আমাদের নিত্যদিনের আবেগ কিংবা ঘটনা যেসব তরঙ্গ সৃষ্টি করে, তার সঙ্গে লেখকদের সম্পৃক্ত থাকাটা জরুরী। লেখক মনের গভীরে প্রোথিত করবেন সৃষ্টির বীজ। আসলে মানুষের মনে আবেগ দুঃখ আনন্দ এসব আছে বলেই মানুষ সৃজনশীল। তাইতো কেউ কেউ ছবি আঁকেন, গান করেন, কিংবা কবিতা লেখেন। কবিদের অনুভব এতোই গভীর যে, সেই গভীরতা থেকেই বোধসত্ত্বার জন্ম হয়। বোধতাড়িত কবি কামালীর ‘অনুযোগ’ কবিতায় প্রশ্ন : কি করে মানুষ মরে যায়, প্রিয় মানুষের হাতে।’
তেমনি ‘দুঃখ জাগানিয়া’ কবিতার ঘরে প্রবেশ করলে আমরা পাই :
এক তিল জায়গা হবে / পৃথিবীর মানুষ,/ বড়ো সাধ সুখের একটু চাষাবাদ করি...’
কবির অনেকগুলো কবিতার লাইন খুবই চমৎকার, খুলে দেয় ভাবনার খিলান। বোধের তীক্ষতা আর অভিনব চিত্রকল্পের ব্যবহার পাওয়া যায় তার কাব্যগ্রন্থে। মানবতার উপলব্ধিও খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর অনেক কবিতায়। ‘ভ্রম’ কবিতার একটি লাইন এমন : ‘সবার জন্য উন্মুক্ত আমার সাধারণ ক্ষমা...।’
‘গেল না তাকে একটু ছোঁয়া’ কবিতায় :
একলা আকাশটাকে,/ একলা পাওয়া গেলনা/ নিঃসঙ্গ পাওয়া গেল না।/ সঙ্গীহীন ক্রন্দসীকে...।
কবি হোসনে আরা কামালীর ‘দেয়াল’ কবিতার দিকে তাকালে দেখতে পাই :
‘আমার কি সাধ্য আছে/ একগুচ্ছ গোলাপ হাতে শ্মশানে দাঁড়িয়ে/ নিহতকে স্বাগত জানাই।’
কবির কাজ হলো নৈমিত্তিক দিক কিংবা সাধারণ বাস্তবতা থেকে জীবনকে তুলে এনে শব্দের জগতে প্রাণবন্ত করা। আবার সেই শব্দের বোধ বিভিন্নজনে, বিভিন্ন প্রকারের। সত্য বলতে কি, সাহিত্য সব সময়ই কোন কিছুর অভিব্যক্তি। সেটা হতে পারে উপলব্ধির, আবেগের কিংবা আত্মজিজ্ঞাসারও। আসলে যাই বলি না কেন সাহিত্য চিরকালই আত্মপ্রকাশের শিল্প। কবি হোসনে আরা কামালীর কবিতায় আত্মজিজ্ঞাসা যে প্রবল সেটার প্রমাণও আমরা পাই তাঁর কিছু পঙক্তি নয়তো কিছু কিছু শব্দে। শব্দকে আমরা কবিতার মাধ্যম বলতে পারি। আর সেই শব্দের আশ্চর্য বিকাশ হতে দেখি কবিতার মধ্যে। তাই কবিতাকে এক অর্থে আমরা শব্দ কিংবা ভাষাগত বোধের শিল্পও বলতে পারি। কবির সেই শিল্পবোধের দরজার সীমানা আরো ব্যাপক হোক। যার বোধের দরজা এতো বেশী দৃঢ় তাঁর কাব্য প্রকাশে কেন এতো বিলম্ব? সেটা কি কবির উদাসিনতা নাকি সময়ের বহুমাত্রিক সংকট। অচিরেই কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের প্রত্যাশায়। পাঠক হিসেবে বলবো আমি কবি হোসনে আরা কামালীর ‘নাশপাতি ঘ্রাণে মন’ কাব্যগ্রন্থটি নি:সন্দেহে অনবদ্য সৃষ্টি। আমি গ্রন্থটির ব্যাপ্তি, পাঠকপ্রিয়তা আশা করি। চোখটানা প্রচ্ছদের জন্য শিল্পি তৌহিদ হাসানকে আন্তরিক অভিনন্দন। বইটিতে কবির ছাপ্পান্নটি কবিতা স্থান পেয়েছে। আর মূল্য রাখা হয়েছে একশত পঞ্চাশ টাকা। সিলেটের বেশ কয়েকটি লাইব্রেরীতে বইটি পাওয়া যাচ্ছে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT