বিশেষ সংখ্যা

বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ

এ. এইচ. এম ফিরোজ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৩-২০১৮ ইং ০১:৩০:৪৯ | সংবাদটি ১৭৭ বার পঠিত

আজ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। জাতি এ দিবসটিকে যথাযোগ্য মর্যাদা ও আলাদা আনন্দ উল্লাস নিয়ে পালন করবেন। কারণটা হচ্ছে, বঙ্গন্ধুর জন্ম দিনে বাংলাদেশ বিশ্ববাসির কাছে, ‘স্বল্পোন্নত’ দেশ থেকে উন্নয়শীল দেশের গৌরবময় মর্যাদা অর্জন করেছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা সংস্থা দ্য স্ট্যাটিসটিক্স তাদের গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্বের দ্বিতীয় ‘সেরা’ প্রধানন্ত্রীর স্বীকৃতি দিয়েছেন। সেরা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রমোদি এবং তৃতীয় সেরা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। দেশবাসির জন্য এটা বড় সু সংবাদ। আমাদের জীবন যাত্রার মানন্নোয়ন, দারিদ্র বিমোচন, অবকাঠামো এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন সহ সামাজিক সুচকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বাঙালির জাতীয় জীবনে স্বাধীনতা সহ এসব বড় এক বিস্ময়কর অর্জন। এ অর্জনের মহা নায়ক ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা।
বাঙালি-বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু এক সুতায় গাঁথা। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেক দীর্ঘ ইতিহাসের শেষ অধ্যায়টি ছিল মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। জনগণের মধ্যে যারা যেখানে পারছে, যার যা আছে, তাই নিয়েই হানাদারদের মোকাবিলা করেছেন। এ যুদ্ধের এক দিকে ছিল বর্বরতা, অন্যদিকে ছিল বীরত্ব। নিরপরাধ ও নিরস্ত্র জনগণের ওপর পাকিস্তান বাহিনীর অত্যাচার নির্যাতন, অন্যদিকে সেই সশস্ত্র বাহিনীকে প্রতিহত করতে সহজ সরল বাঙালির অসীম সাহসিকতা। যুদ্ধকালীন মানুষ যে নিষ্ঠা ও ত্যাগ তিতিক্ষা নিয়ে কাজ করে, বিজয়ের পরও ততটাই ত্যাগ ও নিষ্ঠা থাকার দরকার বিজয়ের সাফল্যের জন্য। যদি তা না হয়, তাহলে বিজয় অপূর্ণ থাকে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল, পৃথিবীর ন্যায়সংগত স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি। যে কারণে ৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণের ৩ মাসের মধ্যে ৫৪টি দেশ স্বীকৃতি দেয়। ৭১ সালে এ ভুখন্ডে জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটির মত। তাদের মধ্যে যারা প্রাপ্ত বয়স্ক ছিলেন, তাদের প্রায় ৩ কোটি লোকের মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল। সেই ৩ কোটির মধ্যে ২ কোটি ইতিমধ্যে মারা গেছেন। এদের অন্তরে আর চোঁখে ছিল ৯ মাসের বর্বরতার ভয়াবহ স্মৃতি। আরো ৫/১০ বছর পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলার মত কেউ হয়তো আর থাকবেনা এবং যুদ্ধের ইতিহাসও ক্রমেই বিলিন বা বিকৃত হতে পারে। যুদ্ধের সময় সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও নির্যাতিত হয়েছেন নি¤œ মধ্যবিত্ত কৃষক শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ। তাঁদের ঘরে খাওয়ার কিছু না থাকলেও হৃদয়ে স্বাধীনতার ইচ্ছা ছিল প্রবল। মুক্তিযুদ্ধের নির্ভুল ইতিহাস রচনায় বহু উপাদান এখন হারিয়ে যাচ্ছে। তাঁর পরও ইতিহাস বিকৃতি তো আছেই। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষীর জবানি রেকর্ড ও গণহত্যার স্থানগুলো সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাঁর সমমর্যাদায় নিয়ে আসা হয়, মুক্তিযুদ্ধের জেড ফোর্সের অধিনায়ক, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। জিয়াউর রহমান ১৯৭৩ সালে “সাপ্তাহিক বিচিত্রায়’ “একটি জাতীর জন্ম, শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা বর্ণনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে একটি নিবন্ধ নিজে লিখেছেন। জিয়াউর রহমান তাঁর লেখায় বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণা আমাদের কাছে গ্রীণ সিগন্যাল মনে হলো। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন, মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের কথা, স্বাধীনতার ঘোষণার কথা। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক ও বঙ্গবন্ধু বিশেষণে আখ্যায়িত করেন।
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করে ছিলেন, এ রাষ্টের কাঠামোর মধ্যে আমরা বাঙালিরা নির্যাতিত নিস্পেষিত হব। তাই ১৯৪৮ সালে ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ এবং ৪৯ সালের ২৩ জুন গঠন করেন আওয়ামী লীগ। তখন থেকে ধাপে ধাপে প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যান তিনি। ৫২ সালের পূর্বে ৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা দিবস হিসেবে পালিত হতো। এ পর্বের ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। ৭০ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের ৭১ সালের ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে শপথ গ্রহণ করান বঙ্গবন্ধু। তখন ভাষণে তিনি বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আমার কোন ইচ্ছা নেই। প্রধানমন্ত্রী আসে এবং যায়। যে ভালবাসা ও সম্মান দেশবাসি আমাকে দিয়েছেন। তা আমি সারা জীবন মনে রাখব। অত্যচার নিপিড়ন এবং কারাগারে নির্জন প্রকোষ্টকেও আমি ভয় করি না। কিন্তু জনগণের ভালবাসা যেন আমাকে দুর্বল করে ফেলেছে। তিনি বলেছিলেন, ৬ দফা ও ১১ দফা আজ আমার নয়, আমার দলের ও নয়। এটা বাংলার জনগণের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে কেউ যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে, বাংলার মানুষ তাকে জ্যান্ত সমাধিস্থ করবে। এমন কি আমি যদি করি আমাকেও । আমাকে মোনায়েম খান, আয়ুব খান, কাবু করতে পারেনি আপনাদের ভালবাসায়। ৭১ সালের ১লা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টি ঢাকার পূর্বাণী হোটেলে ৬ দফার আলোকে পাকিস্তানের খসড়া শাসনতন্ত্র প্রণয়নের বিষয়ে আলাচনায় মিলিত হন। এদিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বেতার ভাষণে অধিবেশন স্থগিত ঘোষনা করলে সমগ্র ঢাকা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ২ মার্চ ঢাকায় ৩ মার্চ সারা দেশে হরতাল পালন করা হয়। ঐ দিন পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগ ও শ্রমিকলীগ আয়োজিত জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন এবং বলেন, “যারা আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে এনেছে এবং ভোট দিয়েছে আমি মরে গেলেও আমার আত্মা তাদের সুখ ও সমৃদ্ধি যখন দেখতে পাবে তখন শান্তি পাব। আরও বলেন ৭ কোটি মানুষকে হত্যা করতে পারবেন না। আমি না থাকলেও বাংলার মানুষ তাদের লক্ষ্য পথে এগিয়ে যাবে। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই এখন কেবল বৈধ কর্তৃত্বের অধিকারি। ৫ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি-বেসরকারি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে জনসভার কর্মসুচি ঘোষণা করেন। ২ মার্চ সরকার সান্ধ্য আইন জারি করে। কিন্তু জনতা তা অমান্য করে মিছিল বের করলে ৩ জন নিহত ও ৬০ জন আহত হয়।
৭ মার্চের ভাষণ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির ভাষ্য ছিল, ৭ মার্চের ভাষণের মধ্যে দিয়ে শেখ মুজিব আসলে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি বাঙালিদের যুদ্ধের নির্দেশনাও দিয়ে দেন। প্রকৃত অর্থে ঐদিনই স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। বঙ্গবন্ধু তাঁর ১৮ মিনিটের দুনিয়া কাপানো ভাষণ দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলার আহবান জানিয়ে সমগ্র বাঙালিকে স্বাধীনতার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেন। সকল শ্রেণী পেশার মানুষ বুঝতে পেরেছিল, বঙ্গবন্ধু তাদের কি হুকুম দিয়ে ছিলেন। পাড়ায় পাড়ায় যুদ্ধে যাওয়ার উৎসবে মেতে উঠেছিল বাঙালি। ৮ মার্চ থেকেই রেডিও টেলিভিশন, দেশের সমুদয় প্রশাসন ও জীবন যাত্রা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে চলতে থাকে। কেবল সেনানিবাস ছাড়া কোথায়ও পাকিস্তানের পতাকা দেখা যায়নি। সর্বত্রই ছিল সবুজ জমিনে লাল সূর্য, মাঝে সোনালি রংগের ভূ-মানচিত্র আঁকা বাংলাদেশের পতাকা। ঢাকা শহর থেকে সর্বত্র গ্রাম-গঞ্জে মহল্লায় কাঠের রাইফেল, লাটি সোটা, কোদাল, কাস্তে বল্লম নিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন বাঙালি। ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে পাকিস্তানের পতাকা উড়েনি। সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাইকোর্ট, বঙ্গবন্ধুর বাসভবনসহ বাড়ি-ঘরে স্বাধীন বাংলার পতাকা পত পত করে উড়ছিল।
মানবতার নারী ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্ধিরা গান্ধী বর্ডার খুলে দিয়ে ১ কোটি বাঙালিকে খাদ্য, আশ্রয় এবং যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করে বাঙালিকে চির ঋনে আবদ্ধ করেন। ২৫ মার্চ কালো রাতে থম থমে দিনটিতে অপারেশন সার্চলাইট নামে গণহত্যা শুরুর প্রাক্কালে সাংবাদিকদের এক সাক্ষাতকারে বিষাদাচ্ছন্ন স্বরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়ির তীরে এই বাংলায়। আশ্চর্য রকম অবলিলায় পরিস্থিতি পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করে মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলার জয়গান গেয়েছেন। তিনি জানতেন পাকিস্তানিরা তাঁকে হয় হত্যা করবে, না হয় গ্রেফতার করবে। এ রাতেই ১২.২০ মিনিটে তিনি বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ঘোষণা বার্তা ওয়্যারলেস যোগে চট্ট্রগ্রামে জহুর আহমদ চৌধুরীর নিকট পাঠানো হয়। ইপিআরের ওয়্যারলেস যোগে বাংলাদেশের প্রতিটি থানায় ও ইপিআর পোষ্টে পৌছে যায় এবং তা সর্বত্র সাইকোস্টাইল করে বিতরণ করা হয়। বিদেশের পত্র পত্রিকায়ও বেতার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষষা পাকিস্তান থেকে পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ও মুক্তিযুদ্ধের খবর প্রচারিত হয়। তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তানের মিয়ান আলী কারাগারে। ১০ এপ্রিল মুজিব নগর সরকার গঠিত হলে ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণের মাধ্যমে দীর্ঘ ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। দীর্ঘ ৯ মাস ১৪ দিন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থেকে ৭২ সালের ১০ জানুয়ারি প্রিয় জন্ম ভুমি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এ বছর ২৬ শে মার্চ বেতার টেলিভিশন ভাষষে তিনি বলেছিলেন, শ্মশান বাংলাকে আমরা সোনার বাংলা গড়ে তুলতে চাই। সে বাংলায় আগামী দিনে মায়েরা হাসবে শিশুরা খেলবে আমরা শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে চাই।
বঙ্গবন্ধু শুধু ভারত বর্ষের ইতিহাসের একমাত্র সফল আন্দোলনের নির্মাতা ছিলেন না, তিনি স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে উপমহাদেশের সর্ব কালের সকল শহীদদের ঋণ শোধ করেছেন। বঙ্গবন্ধু জীবন ও কর্ম সফল করেছে, ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতা, সূর্যসেন থেকে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার কিংবা ৬৯ এর শহীদ আছাদের আত্মদানকে। তিনি সর্বকালের বাংলা ও বাঙালির আপনতম কন্ঠ। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলার মত মহান ব্যক্তিদের কঠিন সন্ধিক্ষণে বঙ্গবন্ধুকে দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু বিহীন বাংলা ও স্বাধীনতার ইতিহাস হয়তো দীর্ঘকালের জন্য অশুভ অন্ধকারে থমকে থাকত।
লেখক : কলামিস্ট

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT