সাহিত্য

শহিদ শিবলী : বিস্মৃত এক মুক্তিযোদ্ধা

তাজুল মোহাম্মদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০৩-২০১৮ ইং ২২:৫৩:৩৬ | সংবাদটি ১০৯ বার পঠিত

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহর। তখনো সংহত হয়নি যুদ্ধ। স্বতঃস্ফূর্ততা কাটিয়ে ভারতের কোথাও কোথাও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। লক্ষ্য ঠিক করা, বুলেট সরানো এ সব শিক্ষা দিয়েই কিছু কিছু লোককে নিয়মিত বাহিনীর সঙ্গি করা হয়েছে। এরকম কয়েকদিন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে কিছু ছাত্র-যুবককে। সে বহরমপুরের কাজিপাড়ায়। আনন্দ মজুমদার নামক এক ধনাঢ্য লোকের বাগানে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বেশ কিছু ছাত্র-যুবক। এর মধ্যে ছিলেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র খুরসেদ আলম শিবলী। মোকাররম হোসেন হেজু (ব্যবস্থাপক, ছোটলেখা চা-বাগান, বড়লেখা, মৌলভীবাজার), ড. জিন্নাতুল আলম (অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর, অবসরপ্রাপ্ত) সহ আরো অনেকে। আর নেতৃত্বে ছিলেন সারদাহ পুলিশ একাডেমির এ্যাডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন রশিদ (কর্নেল, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ড হয়েছে।) তাঁর নেতৃত্বে প্রশিক্ষণ, তাঁরই নেতৃত্বে স্থাপিত শেখপাড়া ক্যাম্পে অবস্থান সবার। ক্যাপ্টেন রশিদ ধীরে ধীরে গুছিয়ে তুলছেন ক্যাম্প। শক্তি সংহত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সর্বাত্মকভাবে।
রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক। এই মহাসড়ক দিয়ে নগরী থেকে বেরিয়ে বানেশ্বরের দিকে একটু অগ্রসর হলেই কাটাখালি। সেখানে রয়েছে একটি সেতু। ক্যাপ্টেন রশিদ চান সেটি উড়িয়ে দিতে। তাহলে পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর চলাচল ব্যাহত হবে। নগরী থেকে পূর্বদিকে বেরুতে পারবে না। যাওয়া সম্ভব হবে না পূর্ব দিকের উপজেলাতে। ঢাকা কিংবা অন্যান্য স্থান থেকে সহজে রাজশাহী নগরীতেও প্রবেশ করতে পারবে না। অন্যদিকে পাকিস্তানি সেনা বাহিনীও মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি সামর্থ সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করবে। তাদেরকে জানিয়ে দেয়া যাবে যে ওদের যে কোনো অবস্থানে মুক্তিযোদ্ধারা আঘাত করতে সক্ষম। তা হলে কে নেবে সে অপারেশনের দায়িত্ব। হাত উঠালেন খুরসেদ আলম শিবলী। দায়িত্ব নিতে চান তিনি। বীর সেনা শিবলি ইতোমধ্যে সাহস এবং শৌর্য-বীর্যের পরিচয় দিয়েছেন নানাভাবে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহের কৃতি ছাত্র শিবলি। ছাত্রলীগ করতেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা আব্দুর রাজ্জাকের (ডক্টর, সাংসদ, মন্ত্রি, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য) আস্থাভাজন। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ন্যাপ নেতা আতাউর রহমানের বাড়িতে সাক্ষাৎ পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। গালে হাত দিয়ে আদর করেছেন এই মহা-মানব। বলেছেন, ‘তোরাই পারবে, তোরা-ই করবে।’ শিবলিও পারতে চান, করতে চান। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তোলপাড় করেছেন চারঘাট এলাকা। নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের দু’প্রার্থী জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদে। তারপর ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন। চারঘাটে মূল নেতাদের একজন তিনি। আন্দোলনকে সঠিক পথে পরিচালনার ক্ষেত্রে অসামান্য ভূমিকা তাঁর। ১৩ এপ্রিল সানাপাড়াকে মহাশ্মশানে পরিণত করার আগেই গ্রামের মানুষকে সাবধান করেছিলেন। বলেছিলেন ওরা গ্রামে আক্রমন চালাবে। অতএব সাবধান থাকতে হবে গ্রামবাসিকে। এর কারণ শিবলিরা আরো অনেকে মিলে সারদাহ পুলিশ একাডেমির কোড ভেঙে নিয়ে এসেছেন অস্ত্র এবং গোলা বারুদ। এগুলো গিয়ে পড়েছে দেশ মাতৃকার মুক্তির তরে নিয়োজিত মুক্তিসেনাদের হাতে হাতে।
পুলিশ একাডেমির এ্যাডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন রশিদকে দিয়ে তৎকালীন ডি.আই.জি এবং পুলিশ একাডেমির অধ্যক্ষ আব্দুল খালেকের নাম ব্যবহার করে চিঠি লিখিয়েছেন ভারতের কাছে। বর্ণনা দেয়া হয়েছে মুক্তি বাহিনীর কর্মকান্ডের। নগরবাড়ি ঘাটে ঢাকা থেকে আসা পাকি বাহিনীকে বাঁধাগ্রস্ত করার তরে, অস্ত্র, গোলা বারুদ, জ্বালানি এবং খাদ্য সাহায্য চাওয়া হয়েছে। সে চিঠি নিয়ে ভারতে গিয়েছেন মোকাররম হোসেন (ব্যবস্থাপক, ছোটলেখা, চা, বাগান, বড়লেখা, মৌলভীবাজার) ও ওবায়দুর রহমান সহ। জ্বালানী এবং খাদ্য সংগ্রহ করতে সমর্থও হয়েছিলেন। সেই শিবলি নিতে চান অপারেশনের দায়িত্ব। সাথে ছিলেন রিয়াজ এবং আরো একজন। রাতের বেলা গিয়েছেন জায়গাটি রেকি করতে। তৈরি করতে হবে প্রয়োজনীয় ম্যাপ। এর জন্য দরকার রাস্তাঘাট সবকিছুরই পুংখানুপুংখ বিবরণ। স্বচক্ষে দেখে দেখে খুঁটি নাটি তথ্য সংগ্রহ করেন শিবলি। তা করতে করতে রাত শেষ হয়ে যায়। এরকম রাতে অজানা-অচেনা পথে পথ খোঁজে পাবেন কেমন করে। শিবলি পড়লেন সংকটে। তা হলে আশ্রয় প্রয়োজন হবে তাঁর। দিন যাপন করতে হবে কোথাও। সে রকম একটি স্থান প্রয়োজন। মনে পড়লো এক বন্ধুর কথা। মেয়ে বন্ধু। পড়ালেখা করেছেন এক সঙ্গে। পরে ব্যাপৃত হন শিক্ষকতায়। নাম হাসিনা বেগম। পিতৃগৃহ থানাপাড়া গ্রামেই। ইতোমধ্যে বিয়ে হয়েছে বান্ধবির। স্বামীর নাম তাইজুদ্দিন আহমদ। পঁচিশ ত্রিশ হতে পারে বয়স। গ্রাম ভাদুড়িয়া, ইউসুফপুর ইউনিয়ন, চারঘাট। ঐ রাতে হাসিনা বেগমের স্বামী গৃহকেই মনে হয়েছে সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। নিজের জীবন দিয়ে হলেও হাসিনা রক্ষা করবেন তাঁকে। এ প্রতীতী ছির তাঁর খুবই দৃঢ়। জানতেন হাসিনার স্বামীও একজন ভালো মানুষ প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি তার। অতএব সে বাড়িতে আশ্রয় নেয়াই নিরাপদ। বীর মুক্তিযোদ্ধা শিবলি আশ্রয় নিলেন সে বাড়িতে।
বাড়িতে অতিথি। সে তো ভাগ্যের ব্যাপার। খুশি হয়েছেন তাইজুদ্দিন আহমদ। কথায়-বার্তায় আচারে আচরণে বার বার প্রকাশ করছেন খুশির বারতা। কিন্তু হাসিনা বেগম সবচেয়ে বেশি খুশি। বুঝতে পারছেন শিবলি। তবে মুখে তেমন কিছু প্রকাশ করছেন না তিনি মনের উচ্ছাস চেপে রাখছেন ভেতরে। স্বামী তার আগ্রহী হয়ে ঘরের মুরগি জবেহ করলেন তাড়াহুড়া করে। হাসিনা বেগম মনোযোগ দিয়ে শুরু করেন রান্না-বান্না। একেবারে মনের মাধুরি মিশিয়ে। বাল্যবন্ধুকে খাওয়াবেন বলে কথা। চাদর পাল্টে, বালিশে নতুন কাভার দিয়ে বিছানা করে দেন তাইজুদ্দিন নিজেই। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর চান শিবলির নিকট থেকে। যতœ করে খাওয়ালেন স্বামী-স্ত্রী দু’জন মিলে। এবারে শুতে হবে। অভয় দিয়ে তাইজুদ্দিন বললেন, আমি থাকতে আপনার কোনো ভয় নেই। আমি আছি বাইরে আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমান ভেতরে।
চলে গেলেন স্বামী-স্ত্রী দু’জন। আর বাইরে থেকে আস্তে করে ঝুলিয়ে দিলেন তালা। সে কর্ম সম্পাদনের বিষয়ে হাসিনা বেগম অবহিত কি না জানা যায়নি। হাসিনা বেগমতো নিজের ঘরে। স্বামী বাইরে থেকে বন্ধুর প্রহরায় নিযুক্ত। কতক্ষণ কাটলো এমনতরো? নিশ্চিত করে বলা যাবে না। এক সময় দরজা খোলার শব্দ হলো। ঘুম ভেঙে গেল মুক্তিযোদ্ধা শিবলির। চোখ খোলার সঙ্গে-সঙ্গেই চোখ তাঁর ছানাবড়া। বন্ধু বা বন্ধু পতœী নয়- অস্ত্র তাক করে করে ঘরে প্রবেশ করে পাকিস্তানি মিলিটারিরা। এক, দুই, তিন করে ঘরে প্রবেশ করে অনেকগুলো হায়না। ঝাপ্টে ধরে শিবলিকে। বিছানার পাশেই তাঁর আগ্নেয়াস্ত্র। সেটি ব্যবহার করার কোনো সুযোগ পাননি তিনি। ততক্ষণে বোধগম্য হলো কেন হাসিনা বেগমের স্বামী তাইজুদ্দিন এতো জামাই আদর করেছে তাকে। ‘তোমার এই বিশ্বাসঘাতকতার মাশুল সুদে আসলে দিতে হবে। ওরা সবাই জীবন দেবে বাংলার জমিনে। সেই সঙ্গে তুমি এবং তোমার ন্যায় সকল বিশ্বাসঘাতকরাও’ এই বলে ওর দিকে থু থু নিক্ষেপ করেন।
খুরসেদ আলম শিবলির জন্ম ১৯৫০ সালে চারঘাট পৌর সভার অধীনস্থ সানাপাড়ায়। পিতা আমিনুর আলম পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর হাতে শহিদ হয়েছেন ১৩ এপ্রিল। না, একা নন। একই সঙ্গে শহিদ হয়েছেন বড় ভাই খায়রুল আলম পরাগ, চাচা শামসুল আলম এবং চাচাতো ভাই শফিকুল আলম পান্না। শিবলি আরো আগে থেকেই মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের কাজে ব্যাপৃত ভারতে। তাই বেঁচে যান সেদিন। শহিদ পরাগ একই সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছিলেন পড়ালেখা এবং ক্যাডেট একাডেমির চাকরি। পাকিস্তানি হানাদার সৈন্য বাহিনী বাঁচতে দেয়নি কাউকেই। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সম্পন্ন করেছেন প্রাথমিক স্তরের লেখাপড়া। মেট্রিক পর্যন্ত সারদাহ সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে। ১৯৬৬ সালে সে স্কুল থেকে রাজশাহী বোর্ডে ২য় স্থান অধিকার করে মেট্রিক পাশ করেন। বিষয় ছিল তাঁর কৃষি বিজ্ঞান। ভর্তি হলেন ময়মনসিংহস্থ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। আবাসিক ছাত্র কায়েদে আযম হলের (বর্তমানে শহিদ শামসুল হক হল) এ বছরই ছিল অনার্স চুড়ান্ত বর্ষ। পরীক্ষাও হয়ে যায় অনেকটা। কিন্তু চুড়ান্ত ফলাফল জেনে যেতে পারেন নি তিনি।
খুরশেদ আলম শিবলি তখন রাজশাহীর সারদাহস্থ পুলিশ একাডেমিতে। সেখানেই পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর, সে অঞ্চলের প্রধান ক্যাম্প। বিরাট বহর নিয়োজিত। তাদের ঘেরাওয়ে আছেন বন্দি শিবলি। হালকা, পাতলা, গড়নের ২১ বছর বয়সী শিবলি। অত্যাচারে অত্যাচারে জর্জরিত তখন। সমস্ত শরীর রক্তাক্ত। ব্লেড দিয়ে সমস্ত শরীরে চামড়া কেটে কেটে লবণ এবং মরিচ লাগিয়েছে। যন্ত্রনায় কাতর হয়েছেন। কিন্তু ওদের কাছে নত হননি। মুখ থেকে বের করতে পারেনি কোনো তথ্য। সেখানে গিয়ে হাজির হলেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। নাম জইনুদ্দিন। শিবলিদের আত্মীয় হলেও জাতিদ্রোহী কর্মকান্ডে লিপ্ত। পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর সহযোগী। ওদের মানবতা বিরোধী সকল কর্মকান্ডকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন এবং এ সবের বাস্তবায়নে সহায়তাও করছেন। মধ্যস্থতা করতে চান তিনি। শিবলিকে বললেন, যতোটুকু হবার হয়ে গেছে। সব কিছু ভুলে যাও। আমি তোমাকে ছাড়াবার ব্যবস্থা করছি। তুমি শুধু বলো- পাকিস্তান-জিন্দাবাদ। তারপর তোমার মুক্তির ব্যবস্থা করছি। খুরসেদ আলম শিবলি তখন বক্তৃতা দিয়ে বলতে থাকেন- ওরা বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করেছে। নির্বিচারে মানুষ মারছে। আর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করার আহবান জানিয়েছেন জাতিকে। আমার ন্যায় হাজার হাজার শিবলি প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করেছে। ক’জনকে মারবে ওরা? ওদের কেউ পাকিস্তানে ফিরে যেতে পারবে না। সবার কবর হবে এই বাংলার মাটিতে। আর আপনারা যারা ওদের, দালালি করছেন- আপনাদের বিচারও হবে স্বাধীন বাংলাদেশে। জয় বাংলা। এরপরও জইনুদ্দিন বার বার বলেছেন পাকিস্তান-জিন্দাবাদ বলতে। প্রতিবারই তিনি বলেছেন, জয় বাংলা।
মানুষের উপর নির্যাতনের যতোরকম কৌশল জানা আছে তাদের সবই প্রয়োগ করেছে তাঁর উপর। ফল হয়নি কিছুই। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গঁ কেঁটে কেঁটে বিচ্ছিন্ন করেছে শরীর থেকে। কাঁটাস্থানে লবণ মরিচ মাখিয়েছে। বেয়নেট দিয়ে কুপিয়েছে সারা শরীর। নির্যাতনের আরো কতো রকম ফের। ব্যর্থ হলো তবু আইনুদ্দিনের আপোস ফর্মূলা। ফিরে গেলেন তিনি। নিজের রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়কে দিয়ে একবারও উচ্চারণ করাতে পারেন নি পাকিস্তান-জিন্দাবাদ। ‘জয় বাংলা’ ব্যতিত একটি শব্দও বের করাতে পারেন নি তাঁর মুখ থেকে।
চারঘাট উপজেলার পাশেই বিশাল পদ্মা। তেমনি বড়াল নদীও চারঘাট উপজেলা সদর দিয়ে প্রবাহিত। নদীর কোথা দিয়ে কোনো অংশে কখন কেউ ফেলেছে তিন তিনটি মৃতদেহ। ভাটির টানে যেতে যেতে একটি খুঁটির সঙ্গে আটকে যায় মৃতদেহের পরনে থাকা লুঙ্গি। সে তো একটি মৃতদেহের। বাকি দু’টি ¯্রােতের টানে কোথায় যে মিশে গেছে পদ্মার গভীর জলে কে জানে সে সন্ধান। এক সময় মানুষের নজরে পড়ে খুঁটির সঙ্গে আটকে থাকা লাশ । তুলে আনার প্রয়াস চালান সহৃদয় ব্যক্তিরা। ডাঙ্গায় তুলে আনার পর সনাক্ত হলো এটি শহিদ মুক্তিযোদ্ধা শিবলির লাশ। পুরো দেহ ক্ষত বিক্ষত। পচন ধরেছে নানা স্থানে। লাশের নেই কান, নেই নাক। কেটে ফেলা হয়েছে হাতও। সারা শরীরে বেয়নেটের আঘাত। প্রতিটি কাঁটা স্থানে লবণ লাগানোর ফলে সে সব স্থান পচে গেছে। মাথাও শরীর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। শুধু চামড়াটাই আটকে রেখেছে তাঁর মাথা। এ অবস্থায় সন্তানের লাশ নিয়ে যাওয়া হলো মায়ের সামনে। এর চেয়ে করুণ দৃশ্য আর কি হতে পারে? পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে তাঁকে। কিন্তু রিয়াজসহ অন্য দু’যোদ্ধার মৃতদেহও পাওয়া যায়নি।
খুরসেদ আলম শিবলির পেছন থেকে ঘাড়ে কুপ দিয়েছিল হানাদার সৈন্য। মস্তক বিচ্ছিন্ন হয়ে গলার চামড়ার সঙ্গেঁ ঝুলে যায়। মাকে অবশ্যি এ অবস্থা দেখতে দেয়া হয়নি। এমনিতেই মূর্ছা গিয়েছেন কতো শত বার। কখনো আবার পাথর হয়ে বসে থাকতেন। তবে, দিনের অধিকাংশ সময় কাটতো ছেলের কবরের পাশে। এক সময়তো রাতের বেলাও কবরের পাশে বসে দোয়া দুরূদ করতেন। পরে নানা কৌশল অবলম্বন করে রাতে কবরে যাওয়া বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু একবারের তরেও শুকায়নি তাঁর চোখের কোন। প্রতিদিন বুকভাসে তার অশ্রুজলে। হ্যাঁ, একজন নারী একজনমে কতো দুঃখ সহ্য করতে পারেন? গণহত্যার শিকার হলেন স্বামী, বড় পুত্র পরাগ তখন একমাত্র উপার্জনক্ষম পরিবার সদস্য। হারালেন তাকেও। দেবর/ ভাসুর এবং ভাতিজা কেউ রেহাই পেলেন না। পৃথিবীতে অবলম্বন বলতে যেন কিছুই নেই। মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক, অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র শিবলি। তিনি নন শুধু তাঁকে নিয়ে গর্ব করতো সমগ্র উপজেলা এবং জেলাবাসীও। সেই ছেলে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করতে করতে নিজেও হাতে নেন অস্ত্র। আর কাটাখালি সেতু ধ্বংস করতে গিয়ে ধরা পড়েন বিশ্বাসঘাতক এক দালালের দ্বারা। সেটি ছিল তাঁর প্রথম অপারেশন। চারঘাট উপজেলা সদরের যেখানে গুচ্ছগ্রাম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ঠিক সেখানে আটকা পড়েছিল এই বীর যোদ্ধার পবিত্র দেহ। তারপর ইসলামের বিধান অনুযায়ী অন্তত তাঁর মৃতদেহের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
শহিদ মুক্তিযোদ্ধা খুরসেদ আলম শিবলির রক্তে রঞ্জিত হয়ে বাংলার জমিনে উদিত হয় স্বাধীনতার সূর্য। সেই স্বাধীন দেশ এবং স্বাধীন জাতি কিভাবে মূল্যায়ন করেছে এই মহান শহিদকে। বাংলাদেশে তার সংগঠন ছাত্রলীগ ও মূল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনে হয়েছে ১৬ ডিসেম্বরেই ভুলে গেছে তাঁকে। হয়তো বা শিবলির প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে গেছে এখন। কেউ কোনোদিন খোঁজ নেয়নি তার পরিবারবর্গের। কোনো স্তরের কোনো নেতা, কোনোদিনই পাশে দাঁড়াননি তাঁর জনমদুখি মায়ের। শোনাননি একটি শান্তনার বাণী। যার আহবানে যুদ্ধে যাওয়া সেই বঙ্গবন্ধুর সরকার ভুলেছিল তাঁকে। তাঁর পিতা-ভ্রাতা, চাচা এবং চাচাতো ভাইকে। একটি বারের তরেও খোজ নেয়নি এই মহান শহিদদের পরিবারবর্গের। ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যান বীর মুক্তিযোদ্ধা খুরসেদ আলম শিবলি।
শহিদ শিবলির মা যখন স্বামী পুত্রদের জন্যে মাতম করেন, বুক চাপড়ে দিন অতিবাহিত করছেন তখন শিবলিকে যে বিশ্বাস ঘাতক ধরিয়ে দিয়েছিল তার অবস্থানটা কি? স্বাধীনতার পর পরই গা ঢাকা দিয়েছিল পাকি বাহিনীর পা চাটা দালাল তাইজুদ্দিন আহমদ। সে সময়টাতে কোথায় ছিল সে নিশ্চিত করে বলতে পারেন না কেউ। কেউ বলেন দেশের ভেতরেই ছিল গভীর আত্ম-গোপনে। কারো মতে পালিয়ে যায় পাকিস্তান। কারো অভিমত-মধ্যপ্রাচের কোনো দেশে বসবাস করেছে এই দালাল। ১৯৭৫ সালে তাঁদের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন জিয়াউর রহমান। প্রকাশ্যে আসেন দালাল তাইজুদ্দিন। দেখতে দেখতে আকাশ ছোঁয়া ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে তারও। অল্পদিনের মধ্যেই বাগিয়ে নেন রাজশাহী শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের শিক্ষকের পদ। গ্রাম ছেড়ে বসবাস করতে থাকেন রাজশাহী নগরীর উপ-শহরে। তখন থেকেই পরম পরাক্রমশালি তিনি। এখনো তাই। পরবর্তীতে ছেলেরা ভালো ভালো স্থানে অভিসিক্ত হওয়াতে ক্ষমতার হাত প্রসারিত হয়েছে আরো অনেক দূর অবধি।
নিজের এলাকা চারঘাট উপজেলা- সেখানকার মানুষকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন সেখানকার মানুষ শিবলি নামে কাউকে চেনে না। নতুন প্রজন্মতো নামই শুনেনি কখনো। তাঁকে চিনতে পারে, জানতে পারে এমন কোনো ব্যবস্তাও নেই। তাকে নিয়ে এ রকম কোনো কাজও হয়নি।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছিলেন কায়েদে আযম হলের আবাসিক ছাত্র। স্বাধ

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT