উপ সম্পাদকীয়

আমাদের শহরে শিশুদের বিনোদন

মোহাম্মদ আব্দুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৩-২০১৮ ইং ২৩:৪৪:২০ | সংবাদটি ৬৮৯ বার পঠিত
Image

শিশু, বৃদ্ধ সকল বয়সের মানুষ খাওয়া, বস্ত্রাদি পরিধান, পড়ালেখা ও ঘুমের পরে একটু আনন্দ পেতে চায় জীবনে। তবে শহর জীবনে শত ব্যস্ততা ও নানামুখী সংকটের আবর্তে রাত দিন কাটানো মা-বাবা নিজের জন্য আনন্দ খোঁজার সময় বের করতে না পারলেও প্রায় সকলেই নিজ নিজ সন্তানকে নিয়ে ভাবেন। তাই হাজারটা সমস্যা উপেক্ষা করেও এই শহরের সচেতন মা-বাবা খুঁজে খুঁজে বের করেন হাতের নাগালে শিশুদের বিনোদনের জন্যে জায়গা কোথায় আছে। হ্যাঁ, এ কথা অনস্বীকার্য যে, আমাদের এই বিভাগীয় নগরীতে পাকা দালান বাড়ি, গাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মানুষের ভীড়ে আমাদের ছোট্ট শিশুদের একটু দৌড়াদৌড়ি করে, প্রকৃতিজ ফুলের ও গাছের সাথে মিশার এবং বিভিন্ন আধুনিক খেলনা বা দোলনা নিয়ে একটু আনন্দে সময় কাটানোর সুযোগ খুবই অপ্রতুল। এরই মাঝে ভরসাটুকু আছে দু’টি পার্ক, শহরের মধ্যখানে হওয়াতে শহরবাসী ও শহরে বেড়াতে আসা অনেকে আদরণীয় সন্তান সাথে করে মনে আশা নিয়ে ছুটেন ছোটো ছোটো বাচ্চাদের একটু আনন্দ পাইয়ে দিতে। হ্যাঁ, একটি হচ্ছে ‘বঙ্গবীর ওসমানী শিশু উদ্যান’ এবং অপরটি ‘জালালাবাদ পার্ক’। ভাবছেন, তাহলেতো হয়েই গেলো, আর সমস্যা কোথায়? আসুন তবে ঘুরে আসি।
প্রিয় পাঠক, লেখার উপক্রমনিকায় যে শহরের কথা এসেছে সেটি তিন শ’ ষাট আউলিয়ার দেশ খ্যাত পুণ্যভূমি আমাদের পর্যটন নগরী সিলেট এবং যে দু’টি পার্ক এর নাম উল্লেখ হয়েছে তার প্রথমটি শহরস্থ ধোপাদিঘীরপাড়ে অবস্থিত এবং দ্বিতীয়টি এই সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কীন ব্রিজ সংলগ্ন সিলেট সার্কিট হাউস ও সিলেট জেলা পরিষদ ভবন এর মাঝে অবস্থিত ফুল গাছের এক সুন্দর বাগান ‘জালালাবাদ পার্ক’। এদুটি পার্কের তত্ত্বাবধান করেন একটি ব্যক্তি উদ্যোগে এবং অপরটি সিলেট সিটি কর্পোরেশন। আমাদের এই শহরের এদুটি পার্কের সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তির কম বেশি হলে এবং দর্শনার্থীগণ নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা অনুভব করলে দায় পুলিশ প্রশাসনের উপর বর্তায় এবং জনগণ স্থানীয় প্রতিনিধিকে অভিভাবক বিবেচনায় প্রথমেই সিটি মেয়রকে স্মরণ করে। আমাদের নানান সংকটে আমরা সব সময় মেয়র মহোদয়ের কাছে যাই না। তবে ত্রুটি কিছু ধরা পড়লে জনগণের বন্ধু পুলিশ ও মেয়র মহোদয়ের কথা ওঠে আসে ভুক্তভোগী পিতা-মাতা ও বেড়াতে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের মুখে মুখে। এটি খুবই স্বাভাবিক। কারণ, আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও জন নিরাপত্তা বিধান করার জন্যেই জনগণের ট্যাক্স থেকে পাওয়া বেতনের চাকুরিজীবী আমাদের পুলিশ, একথা এই একবিংশ শতাব্দীতে আর কারো অজানা নেই। আর একাজটি ঠিক ঠিক মতো যাতে নাগরিক পায়, তা দেখভাল করা ও কথা বলার জন্যে রয়েছেন জনগণের ভোটে নির্বাচিত মেয়র।
আমরা যদি বঙ্গবীর ওসমানী শিশু উদ্যানে ঘুরতে যাই, প্রথমেই যে সমস্যাটির মুখোমুখি হই, তাহলো রিক্সা কিংবা ছোটো কোনো গাড়ি নিয়ে বাচ্চাদের সাথে করে গেলে উদ্যানের সম্মুখে পঞ্চাশ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে বাহন থেকে নিরাপদে নামার সুযোগ নেই। কারণটা এই শহরবাসী প্রায় সকলের জানা। ঠিক উদ্যানের মূল ফটকেই সকাল থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত হযবরল অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকে অটোরিক্সা বা লেগুনা নামক গাড়ি এবং সেই সাথে চলে প্যাসেঞ্জার সংগ্রহের জন্যে চিৎকার চেঁচামেচি গাড়ির চালক এবং হেলপারদের। এমনি অবস্থায় পড়ে আনন্দ পেতে আসা ছোটো ছোটো বাচ্চারা প্রথমেই ভয় পেয়ে যায় এবং এই ভয় নিয়ে মা-বাবার কোলে চড়ে কিংবা হাত ধরে সামনে এগুতে থাকে আর বার বার পিছনে ফিরে তাকায়। ভিতরে প্রবেশ করার পর বিনোদনের ব্যবস্থা যা ই আছে তাতে চড়ে কিছুটা সময় হয়তো আনন্দেই কাটায়। কিন্তু যখন ফিরতে হবে বুঝতে পারে, তখন অনেক শিশু ফটক দিয়ে বের হবার সাথে সাথেই সেই আগেকার মতো চিৎকার আর গাড়ির আওয়াজে ভয়ে জড়সড় হয়ে যায়। ওই জায়গায় প্রায় প্রতিদিন গাড়ি শ্রমিক ও রিক্সা শ্রমিকদের মাঝে না হয় যাত্রী সাধারণের সাথে লেগুনা গাড়ির হেলপারদের কথা কাটাকাটি থেকে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়। তখন পার্কের সামনে দাঁড়ানো অভিভাবক বাবা ও মায়েরা বাচ্চাদেরকে নিয়ে রীতিমতো ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় পড়েন। আর ছোট্ট শিশুমনে আনন্দের চেয়ে ভয়টাই জায়গা করে নেয়। এটা একটা শিশুর মানসিক সুস্থ বিকাশের জন্যে কোনোভাবেই ইতিবাচক হতে পারে না। অনেকটা একই রকম চেঁচামেচি আছে সারাক্ষণ ‘জালালাবাদ পার্ক’ এর সামনেও। সেই সাথে আছে হকারদের দৌরাত্ম বা উৎপীড়ন। পার্কের মূল ফটক বা গেইটের উভয় পাশের ফুটপাত ভাসমান হকার ও ভাসমান ধূমপায়ীদের দখলে। পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষেধ, এমন আইন থাকলেও পুলিশের আশেপাশেই চলে প্রকাশ্যে ধূমপান এবং কুন্ডলি পাকিয়ে বাতাসে ধুয়া ছাড়ার প্রতিযোগিতা বা মহোৎসব। যার ইচ্ছা হলো সে ই বসে কিংবা দাঁড়িয়ে প্র¯্রাব করছে প্রকাশ্যে। যারা একবার গেছেন প্র¯্রাবের গন্ধে নাকে রুমাল দিয়েছেন। দ্বিতীয়বার আর সেদিকে যাবার চিন্তা করতে সাহস করেননি।
মানুষ মাত্রই সুস্থভাবে বাঁচতে চায়। মানুষ চায় ব্যস্ততার অবসরে একটু বিনোদন। আর আমাদের আগামী দিনের কান্ডারি বর্তমান শিশু কিশোরদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্যে আনন্দময় অঙ্গন বা বাগান অতিব জরুরি। এ আমাদের নাগরিকদের প্রত্যাশা থাকতেই পারে। যে দু’টি পার্ক নিয়ে কথা হচ্ছে তা আকারেও বেশি বড় নয় বরং ছোটো। তাই মনে করি, আমাদের এই নগরীতেই শিশুদের জন্যে নতুন আরো একটি মাঝারি আকারের শিশু পার্ক করা এই সময়ের বাস্তব পদক্ষেপ হবে। তার আগে আমাদের কোনোভাবে চলা উক্ত পার্ক দুটিকে শিশু বান্ধব করার বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এব্যাপারে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনতিবিলম্বে ঠিক উদ্যোগটি নেয়া জরুরি মনে করছি। পার্কে বেড়াতে আসা অভিভাবকদের চেহারায় উৎকণ্ঠা নয় বরং থাকুক বিশ্বাস। আর ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়ের মুখে ভয় নয় বরং হাসিটুকু লেগে থাকুক।
লেখক : কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT