শিশু মেলা

রোবট ইঁদুর

জসীম আল ফাহিম প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৩-২০১৮ ইং ২৩:৪৫:০৯ | সংবাদটি ৯২ বার পঠিত

সালমানের বাবা একজন কৃষক মানুষ। সারাদিন তিনি মাঠে কৃষি কাজ করেন। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বাবা খেত-খামারের কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেন। তখন তার কাঁধে থাকে লাঙ্গল। মাথায় তালপাতার তৈরি বিশেষ ছাতা। হাতে লাঠি। বাবা মাঠ থেকে তার গরুগুলো তাড়িয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরেন। এটা তার নিত্যদিনের কাজ।
বাবা সেদিন বাড়ি এসে সালমানের মাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমার সব শেষ হয়ে গেছে। জমির ফসল কেবল পাকতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে ইঁদুরের উৎপাত শুরু হয়ে গেছে। প্রতিদিনই দেখি ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। এসব দেখতে আমার আর ভালো লাগে না। কী যে করি এখন।
বাবার হাহাকার শুনে সালমানের মা বললেন, আচ্ছা-হাট থেকে ইঁদুর মারার বিষ এনে জমিতে ছিটিয়ে দিলেই তো পারো। ইঁদুর মরে কাঠ হয়ে যায়।
সালমানের মায়ের কথা শুনে বাবা বলেন, তা দিয়েছি। কিন্তু বাজারের বিষ ইঁদুরের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। দেড়শো টাকার বিষ কিনে ছিটালাম। অথচ একটি ইঁদুরও মরল না। মনে হচ্ছে বিষেও আজকাল ভেজাল মেশানো।
মা-বাবার কথার মাঝে সালমান এসে যোগ দিল। সে বলল, বাবা-ইঁদুর মারার ব্যাপারে আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারব।
সালমান এসএসসিতে পড়ে। বিজ্ঞান বিভাগে। এ বছর সে এসএসসি ফাইনাল পরীক্ষা দেবে। এরই মধ্যে সে ছোটোখাটো বেশ কয়েকটি যন্ত্র তৈরি করে ফেলেছে। তার মধ্যে ইঁদুর নিধন যন্ত্র অন্যতম।
সালমানের কথা শুনে বাবা বলেন, কীভাবে রে বেটা?
সালমান বলতে লাগল, আমি একটি রোবট ইঁদুর তৈরি করেছি বাবা। দেখতে অবিকল আসল ইঁদুরের মতো। তবে এটা ইঁদুর নয়। এটা একটা যন্ত্র। আমি এর নাম দিয়েছি ‘রোবট ইঁদুর’।
ছেলের কথায় খুশি হয়ে বাবা বললেন, তাই নাকি বেটা। তাহলে তো খুব ভালো হয়। নিয়ে আয় তো দেখি তোর রোবট ইঁদুরটি।
বাবার নির্দেশ পেয়ে সালমান তার পরীক্ষাগারে গেল। গিয়ে রোবট ইঁদুরটি নিয়ে আবার বাবার সামনে এসে হাজির হলো। মা-বাবা দুজনই অবাক হয়ে সালমানের রোবট ইঁদুরটি দেখতে লাগলেন। রোবট ইঁদুরকে দেখে মা অবাক হয়ে বলেন, ভারি আশ্চর্য তো! এ যে দেখছি অবিকল আসল ইঁদুরের মতোই রে বেটা। তুই কি করে এটি তৈরি করলি বাবা?
মায়ের প্রশ্নের জবাবে সালমান বলল, আমি এটাকে পলিমার দিয়ে তৈরি করেছি। পলিমারের ওপর ইঁদুরের চুলের মতো বিশেষ একপ্রকার তন্তু ব্যবহার করেছি। এর চোখ দুটোতে লেন্সযুক্ত দুটো শক্তিশালী ক্যামেরা বসানো রয়েছে। ক্যামেরার সাহায্যে অনেক দূর পর্যন্ত এটি দেখতে পায়। আলো-আঁধারে এটি সমানভাবে পথ চলতে পারে। এর শরীরটা পলিমারের তৈরি হলেও দেহের ভেতর বেশ কিছু জটিল কলকবজা রয়েছে। ব্যাটারির মাধ্যমে এটি চলাচল করে। তবে যেই সেই ব্যাটারি নয়। অতি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যাটারি। রিচার্জেবল ব্যাটারি। ব্যাটারিতে একবার চার্জ দিলে বাহাত্তর ঘণ্টা পর্যন্ত সচল থাকে।
সালমানের কথা শুনে বাবা আশ্চর্য হয়ে বলেন, দারুণ জিনিস তো! এটি বানানোর ধারণা তুই কোথায় পেলি রে বেটা?
সালমান বলল, বাবা আমাদের পাঠ্য বইয়ে একটি অধ্যায় রয়েছে। রোবট বিষয়ক পাঠ। ওখান থেকে ধারণা নিয়ে আমি এটি তৈরি করেছি।
বাবা বললেন, খুব ভালো কাজ। খুব ভালো। তা রোবট ইঁদুর দিয়ে তুই খেতের ইঁদুর মারবি কেমন করে?
বাবার প্রশ্ন শুনে সালমান বলল, বাবা আমার রোবটটি আসলে ইঁদুর মারতে পারে না। তবে ইঁদুরকে কিছুসময়ের জন্য অচল করে দিতে পারে। তার জন্য রোবটটির পেটের ভেতর একটি ছোট্ট বোতল রাখা হয়েছে। বোতল ভরা স্লিপিং গ্যাস। ‘স্লিপিং গ্যাস’ মানে হলো যে গ্যাস ¯œায়ুতন্ত্রকে দুর্বল করে ঘুমের উদ্রেক করে। নিশ্বাসের সাথে এ গ্যাস কোনো প্রাণীর নাকে ঢুকলে সাথে সাথে সে ঘুমের কোলে তলিয়ে যায়। আর এ ঘুম কিন্তু যেই সেই ঘুম নয়। একবার স্লিপিং গ্যাস নাকে ঢুকলে বাহাত্তর ঘন্টার মধ্যে ঘুম আর ভাঙে না। রোবট ইঁদুরটির মুখের কাছে সুতোর মতো চিকন চারটি দাঁড়ি রয়েছে। এ দাঁড়িকে সে সত্যিকারের ইঁদুরের নাকের কাছে নিয়ে অভিবাদন জানানোর মতো ভাব করে। তখন তার দাঁড়ির সাহায্যে স্লিপিং গ্যাস সত্যিকারের ইঁদুরের নাকে গিয়ে প্রবেশ করে। আর গ্যাস প্রবেশ করার পর কিছুসময়ের মধ্যেই তার ¯œায়ুতন্ত্র দুর্বল হয়ে যায়। ইঁদুরটি ঘুমিয়ে পড়ে। সন্ধ্যায় রোবটটি খেতে নিয়ে ছেড়ে দিলে সারারাত এটি কাজ করতে পারবে।
সালমানের কথা শুনে বাবা খুব খুশি হলেন। মনে হলো আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন তিনি। বাবা বললেন, ঠিক আছে তাহলে। আজ সন্ধ্যায় রোবটটিকে খেতে নিয়ে ছেড়ে দেবো।
সন্ধ্যায় সালমান বাবাকে সাথে নিয়ে তাদের ফসলের খেতে গেল। গিয়ে তার রোবট ইঁদুরটিকে অন করে জমিতে ছেড়ে দিয়ে এল। ঘটনা কিছু ঘটল কিনা দেখার জন্য পরদিন সকালবেলা বাপ-বেটা মিলে আবার খেতে গেল। খেতে পৌঁছে তো সালমানের বাবা একেবারে হতবাক। একী দেখছেন তিনি? জমিতে শুধু ইঁদুর আর ইঁদুর। ছোটো ইঁদুর। বড়ো ইঁদুর। মাঝারি ইঁদুর। ধেড়ে ইঁদুর। শুধু ইঁদুরেরই কারবার। ইঁদুরগুলো মৃত নয়-জীবিত। তবে তারা জেগেও নেই-ঘুমন্ত। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন শত শত ইঁদুর। রোবট ইঁদুরকে সে সময় খেতের এক কোনে অবস্থান করতে দেখা যায়। রোবট ইঁদুরের অবাক করা কা- দেখে সালমানের বাবা রীতিমতো আশ্চর্য হয়ে গেলেন। সালমানকে তিনি ধন্যবাদ দিলেন।
এদিকে সালমানদের হুলো বিড়ালটি তাদের পিছু পিছু এসেছিল। খেতের কাছে গিয়ে হুলো বিড়ালটি আনন্দে সহসা ম্যাও ম্যাও ডেকে ওঠল। তার ডাক শুনে কোথা থেকে যেন আরও চার-পাঁচটি বিড়াল ম্যাও ম্যাও ডেকে ছুটে এল। বিড়ালদের ভাবখানা এমন যেন প্রচুর খাবারের সন্ধান পাওয়া গেছে। বিরাট আনন্দের খবর। পরে সকলে মিলে ঘুমন্ত ইঁদুরগুলো খেয়ে ভূরিভোজন করল।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT