শিশু মেলা

সেদিনের সেই দুপুর

আবদুল হাই মিনার প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৩-২০১৮ ইং ২৩:৪৫:৫৯ | সংবাদটি ৫৬ বার পঠিত

এখন জুলাই মাসের মাঝামাঝি।
আকাশে মেঘের দেখা নেই। ভ্যাপসা গরমে সবাই অস্থির। ভোরে ঘুম ভাঙার পর রোদের তেজ দেখে আমরা আশ্চর্য হয়ে যাই। এ সময়টুকুতে অন্তত একটু ঠান্ডা বাতাসের সাথে নিরীহ রোদের প্রত্যাশা আমাদের থাকতেই পারে! কিন্তু তা নয়। সেই ভোরবেলাতেই বাঘের মতো রোদে তাবৎ দুনিয়া জ্বলতে থাকে। আর দুপুরের দিকে তো কথাই নেই। মাথার উপর গনগনে সূর্য। নিস্তব্ধ দুপুর।
অন্যান্য বছরের এই সময়টাতে আকাশে শঙ্খচিলের ওড়াওড়ি চোখে পড়ত। নীল আকাশের অনেক উপরে তাদের কান্নার ধ্বনি গানের সুর হয়ে ঝরে পড়ত। আর এখন এ জুলাইতে কী অবস্থা! কেউ কোথাও নেই। শুধুই গরম। অসহ্য গরম! আর ক্ষুধা। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের সময়ের এ জুলাই মাসটা আমাদের জন্য এত দীর্ঘ হয়ে এসেছে যে তা আর বলার নয়।
আমরা ভাইবোনেরা মন মরা হয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াই। খেলাধুলা করতে মন চায় না। স্কুলে যাওয়াও বন্ধ। ভালোই হয়েছে। নইলে প্রায় প্রত্যেকদিন কোনো না কোনো স্যার ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, আজ কি খেয়েছিস?
স্যারদের সাথে তো আর মিথ্যা বলা যায় না। বলতেই হতো, রুটি খেয়ে বেরিয়েছি।
তখন তিনি মাথা নাড়তেন। জ্বলজ্বলে চোখে কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। শেষে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলতেন, যা বাসায় চলে যা।
আমার মনে হতো তিনি আমাকে নয়, নিজেকেই কথাটা বলছেন। কিন্তু বাসায় যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। কারণ ক্লাস শেষ হতে তখনো আরও তিন পিরিয়ড বাকি। তাছাড়া বাসায় গিয়েই বা কি করব? দুপুরের খাবার তো তখনি খেতে পারছি না। সে খাবার খাব আমরা রাত্রে। চিনি বা ডাঁটাশাক দিয়ে লাল রুটি। স্যারের দিকে তাকিয়ে দেখতাম তাঁর চোখ দুটো গর্তে বসা। মুখের হাড় উঁচু হয়ে বেরিয়ে এসেছে। শরীরে মাংস বলতে কিছু নেই। একটুক্ষণ পর পরই জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজাচ্ছেন। আমি নিশ্চিত জানি, এই স্যারও আজ মাত্র একটা রুটি খেয়ে বেরিয়েছেন। অথবা কিছুই খাননি। উপোস। শুধু দু’গ্লাশ পানি পান করেছেন।
একদিন দুপুরবেলা। কাঠের গেট খোলার ক্যাচ্ক্যাচ্ শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখি, এক ঢ্যাঙা বুড়ো লোক বিরাট লম্বা দুটো বাঁশ কাঁধে নিয়ে বাসার ভেতর ঢুকছে। বাঁশ সামলে রাখার জন্য হাতে লাঠি। কাঁধে ছোট্ট ঝোলা। লোকটা আসছে সালুটিকরের উত্তরে চেঙেরখাল, তারও উত্তরে লাখাট নামে একটা গাঁও; সেখান থেকে। শহরে বাঁশ বিক্রি করতে যাচ্ছে সে। পথের মাঝে একটু জিরিয়ে নেয়ার জন্য আমাদের বাসায় ঢুকেছে। বাঁশ দুটো সে কাঠের ফেন্সিং-এ দাঁড় করিয়ে রেখে হাঁপাতে হাঁপাতে বারান্দায় এসে বসল। তারপর কাঁধের ঝোলাটা সযতেœ কোলের কাছে নামিয়ে এনে এদিক ওদিক তাকিয়ে আমাকে কাছে ডাকল।
‘এক গ্লাস পানি দাও বাজান।’ ফিসফিসিয়ে বলল সে। পরে আবার বলল, ‘ভাত খাব।’
আমার মন খারাপ হয়ে গেল। বললাম, ‘ভাত তো দেয়া যাবে না। ভাত নেই। শুধু পানি দিতে পারব।’
বুড়ো বিব্রত মুখে বলল, ‘না-না। ভাত লাগবে না। ভাত আমার সাথেই আছে। খালি পানি দিলেই হবে।’ একটুক্ষণ পর আবার বলল, ‘একটু লবণ দিতে পারবা বাজান?’
এ দুটো জিনিস আমাদের বাসায় ছিল। পানি আর লবণ দেয়ার পর যেন সোনার পোটলা খুলছে এমনি সযতেœ বুড়ো তার ঝোলাটা খুলতে লাগল। আমি বিরাট কৌতূহল আর আগ্রহ নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে আছি।
ঝোলা থেকে আস্তে আস্তে সে বের করে নিয়ে এল চৌকোনো একটা প্যাকেট। সুপারি গাছের ঝরাপাতার যে খোল হয়, সেই খোল দিয়ে বানানো চৌকো ঠোঙার মতো বড়োসড়ো প্যাকেট। বুড়ো রয়েসয়ে আস্তে আস্তে সুপারির খোলটা খুলতে লাগল।
আমার মনে হলো যেন সে যুগ-শতাব্দি হাজার বছর ধরে পোটলাটা খুলছে। এ খোলার শুরু নেই, যেন শেষ নেই। কতদিন ধরে খুলে চলবে তাও জানা নেই!
ওর ভেতর ভাত আছে! আহা!
কতদিন হলো ভাতের সাথে আমাদের দেখা নেই!
অধীর আগ্রহে আমি তাকিয়ে থাকি তার সুপারির খোলটা খোলার অপেক্ষায়।
শেষ পর্যন্ত খোল উন্মুক্ত হলো।
সাদা খোলের ভেতর থেকে উষ্ণ ল-বাদালের ভাতের একটা মৃদু আর তীব্র স্বাদের গন্ধ আমার নাকের কাছে এসে ঘোরাফেরা করতে লাগল। লাল চালের বেশ বড়োসড়ো একটা ভাতের চাঙড় সেই পোটলাটায় ছিল।
‘নির্ঘাত দু’জনের খাওয়ার মতো ভাত।’ ভাবলাম আমি।
বুড়ো উদাস ভঙ্গিতে ল-বাদালের দলাটা ভাঙতে লাগল। ভাতের কিনারে তেরো-চৌদ্দটা ভাজা টেংরা মাছ চুপচাপ পড়ে আছে। সেগুলো থেকেও একটা আলাদা মাতাল খুশবু চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। খোলের একপাশে চারটা লম্বা সবুজ কাঁচা মরিচ।
গ্লাস থেকে খুব কৃপণভাবে সামান্য পানি নিয়ে হাতটা ধুলো সে। তারপর খাওয়া শুরু করল। একেক দলা ভাতের সাথে আধখানা টেংরাভাজা কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে। মাঝে মাঝে সবুজ কাঁচা মরিচে কামড় দিচ্ছে।
খেয়াল করে দেখলাম আড়চোখে আমার দিকেও মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে। বলল, ‘দিনকাল বড়ো বাজে যাচ্ছে বাজান। খাওয়া-দাওয়ার বড়োই কষ্ট।’
আমি বললাম, ‘আপনারা তো ধান চাষ করেন। আপনাদের ভাতের অভাব নেই।’
‘তা ঠিক।’ বুড়ো উদাস ভঙ্গিতে হাসল। তার খোলের ভাত আর টেংরা মাছের শুকনো ভাজাটা আস্তে আস্তে নিঃশেষ হয়ে আসছে। শেষে একটুক্ষণ পর সেই দু’জনের খাওয়ার সমান ভাত সে শেষ করে ফেলল।
আমার গলার ভেতরটা কেমন করে ওঠল। চোখে বোধ হয় কিছু পড়েছে। আস্তে করে চোখটা মুছে ফেললাম। তারপরও দেখি পানি আসে। কী যন্ত্রণা!
একটুক্ষণ পর যখন সে বাঁশ নিয়ে আবার বেরিয়ে যাচ্ছে, বললাম, ‘সুপারির খোলটা এভাবে এখানে ফেলে যাবেন না। সাথে নিয়ে যান। বাইরের নালায় ফেলে দেবেন।’
বুড়ো কুন্ঠিতভাবে খোলটা হাতে তুলে নিল। তারপর সে একটু কুঁজো হয়ে হাতের লাঠিতে বাঁশ দুটোর ভার সামলে নিয়ে ওই দুটো কাঁধে নিয়ে বাসার গেট পেরিয়ে আস্তে আস্তে পিচঢালা সড়কে গিয়ে ওঠল।
শুধু তার ফেলে যাওয়া ভাতের ঘ্রাণটা অনেক্ষণ আমাদের বাসার বারান্দায় লেপটে রইল।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT