শিশু মেলা

ভূতের মেয়ে হুংশিং

মোঃ ছাবির উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৩-২০১৮ ইং ২৩:৪৬:৫২ | সংবাদটি ১২৬ বার পঠিত

দাদু বললেন-জমিদার বাড়ির আশেপাশেও যেও না। বলা যায় না কখন কি হয়। প্রথম প্রথম একটু ভয় পেয়ে যাই। পরে ভাবলাম-এসব ভূত-প্রেত খুব পুরনো যুগের, বর্তমান সময়ে এসে এসব নিয়ে ভয় পাবার কি আছে! তাই দাদুর কথাতে তেমন কান দিলাম না। বারণও মানলাম না। চঞ্চল মনে ভূত নিয়ে গবেষণা করার প্রবল ইচ্ছে জাগে। বর্তমান সময়ে ভূত। শোনা মাত্রই হাসি পায়। এজন্য প্রতিদিন জমিদার বাড়ির আশপাশ ঘুরতাম। সত্য কি এখনও সেই ভূত এখানে বাস করে? নাকি চলে গেছে। অনেক দিন ধরে এই পরীক্ষা করেই যাচ্ছি, কিন্তু ভূতের দেখা মেলেনি। জমিদার বাড়ির দিকে তাকালে মনের ভেতরে এক অজানা ভয় কাজ করে। শরীর শিউরে ওঠে। কি ভয়ঙ্কর দেখতে। পুরো বাড়ি লতা-পাতায় ঘিরে আছে। বাইরে হতে এই অবস্থা, ভেতরে কেমন দশা কে জানে! একটু-আধটু ভয়ও পাই। লোকেরা এই পুরনো বাড়িতে যাওয়া আসা সেই কবেই বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ আমি চলছি ভূত-প্রেত নিয়ে গবেষণা করে। কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হচ্ছিল না।
প্রকৃতিতে লেগেছে বসন্তের ছোঁয়া। শাখায় শাখায় গজাতে শুরু হয়েছে কচি কচি পাতা। ফুটতে শুরু করেছে রক্তিম কৃষ্ণচূড়া। প্রকৃতির রঙিন রঙ লাগলো মনে। ফাগুনের তীব্র আগুনে, মন রাঙিয়ে নেচে বেড়াই এদিক-ওদিক। ভালোবাসার আবেগে প্রকৃতির সাথে আমি একাকার। ফুলে ফুলে ভরা এক তরুণীর চুলের খোঁপা। বয়স ১০-১১ এর মত হবে। দেখতে ভারি সুন্দরী। একটু এগিয়ে গেলাম। মেয়েটি কেঁদে কেঁদে আমার দিকেই আসছে। আমি তখন তাকে উদ্দেশ্য করে বললাম-
-তোমার নাম কি?
-কোনো উত্তর নেই।
-তোমার বাড়ি কোথায়?
-তারও কোনো জবাব দিচ্ছিল না।
তখন আবার জিজ্ঞেস করলাম-
-তোমার বাড়ি কোথায়?
মেয়েটি একটা কথারও জবাব দেয়নি। কেঁদেই যাচ্ছে অবিরত। আমার হাতের ফুটবলটি দিয়ে বল খেলবে? এসো আমাদের সাথে সারাদিন খেলতে পারবে?
আমি মেয়েটির সাথে কথা বলছি, এমন সময়-পূব হাওরের বড় রাস্তা দিয়ে দাদু আসছিলেন। মাথায় ছিল গরুর জন্য তোলা ঘাসের ঝুড়ি। দাদুকে আসতে দেখে মেয়েটিকে বললাম-
-আর চিন্তা কর না, ওই দেখো আমার দাদু আসছেন। এবার তুমি যার জন্য কাঁদছো, সেটা এনে দেবে। আমার দাদু ভীষণ ভালো। ছোট বাচ্চাদেরকে খুব আদর করেন। এসব বলতে বলতে আমরাও দাদুর দিকে এগুচ্ছি। দাদু আমাদের কাছে এলেন। মেয়েটিকে কাঁদতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন-
-কি হয়েছে তোমার? তুমি কাঁদছো কেন?
এবারও মেয়েটি কোনো কথা বলল না। দাদু তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন-
দেখো, তুমি কোথায় যাবে? আমি তোমাকে নিয়ে যাবো। বল-তুমি কে?
অনেকক্ষণ পর মেয়েটি কেঁদে কেঁদে বলে-
আমি আর মা এখানে বেড়াতে এসেছিলাম। কিন্তু আমি ঘুরতে ঘুরতে এখানে চলে এলাম। তারপর মা যে কোথায় চলে গেলেন, খোঁজে পাচ্ছি না। তাই কাঁদছি।
দাদু বললেন- চলো, আমাদের বাড়িতে। তারপর খোঁজে বের করবো তোমার মাকে। নিশ্চই আশেপাশে কোথাও আছেন। হয়তো তোমাকেও খুঁজছেন তিনি। আমি তার হাত ধরে বললাম চলো; আমরা দু’জনে ফুটবল খেলবো। মেয়েটি চোখের জল মুছে আমাদের সাথে বাড়িতে চলে এলো। আম গাছে ছিল আমার দোলনা। ওখানে তাকে বসিয়ে দোলনা দোলাতে দোলাতে তার নাম জিজ্ঞেস করলাম-
সে তার নাম বলতে চাইলো না। আমি তখন বললাম-
আমি তোমার বন্ধু হতে চাই। বলো না, তোমার নাম কি?
একটু চিন্তায় পড়ে গেল। নামখানি জিজ্ঞেস করতে এতো ভয় পেয়ে গেল কেন? এই জবাব খোঁজে পাচ্ছি না। আমিও নাছোর বান্দা। অবশেষে নাম জেনেই নিলাম। তার নাম হুংশিং। নামটা শুনেই কি রকম ফিল হলো আমার। আমি দাদুকে সব বলে দিলাম। দাদু তাকে বললেন-
-তুমি কে?
-তখন হুংশিং দাদুকে বলে- আমার পরিচয় পেয়ে আমাকে মারবে না তো?
দাদু বললেন-না, আমরা তোমার কোনো ক্ষতি করব না।
-আমি ভূম। জমিদার বাড়িতে আমি থাকি। রাতে মা আর আমি বেড়াতে আসি। মা আমাকে একটি বট গাছের গোড়ায় বসিয়ে গিয়েছিলেন। তখন আমি দেখলাম-কিছু আলো আমার চোখে পড়ছে। জ্বলছে, নিভছে। তাই কাছে গেলাম। গিয়ে দেখি এক ঝাঁক জোনাকি। ওদের সাথে খেলতে ভোর হয়ে গেল। মা আমাকে রেখে চলে গেলেন।
ভূতের মেয়ে হুংশিং তার পরিচয় দিতেই আমি অবাক হলাম। আর বুঝতে পারলাম দাদুর বলা সব ঘটনাই সত্য।
কিছু সময় পর দাদু বললেন-রাত হলে তুমি চলে যেতে পারবে। এখন হাসুর সাথে খেল। মানুষজন যেন বুঝতে না পারে। তুমি ভূতের মেয়ে। দাদু আমাকে ডেকে বলেন-হাসু, দাদু ভাই ওকে নিয়ে খেলা। আমি আর হুংশিং খেলতে থাকি। খেলার কোনো এক মুহূর্তে সন্ধ্যে নেমে এলো। হুংশিং চলে যাবে। তখন মনের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। একদিনেই যেন সে আমার ভালো বন্ধু হয়ে গেল। হুংশিং ছিল আমার খেলার পারফেক্ট একজন সাথী। সারাদিন কত মজা করেছি তার সীমা নেই।
আমি ভাবলাম, তাহলে ভূত নিয়ে গবেষণা করার জন্য যে সব চিন্তা-ভাবনা ছিল, আজ সেটা দূর হলো। ভূত শুধু দেখাই হয়নি। খেলার সাথীও হয়েছে। যাই হোক, সন্ধ্যে শেষ হয়ে রাত নেমে এলো চারদিকে অন্ধকার। দাদু হুংশিংকে বললেন-চলে যাও। তোমার আর ভয় নেই।
হুংশিং হঠাৎ কেঁদে উঠলো। দাদুকে জড়িয়ে ধরে বলে- আমরা ভাবতাম, মানুষ খুব নিকৃষ্ট জাতি। যারা অন্যান্য জীবকে ধ্বংস করতে মেতে ওঠে। কিন্তু আজ জানলাম। এমন কি নিজের চোখে দেখলাম, মানুষই সৃষ্টির সেরা জীব। কাঁদতে কাঁদতে আরও বলল-
-দাদু তুমি খুব ভালো। আমি যদি মানুষ হতাম তোমাদের কাছে সারাজীবনের জন্য থেকে যেতাম। পরে আমায় ধরে বলে-হাসু, তুমিও খুব ভালো। তোমার সাথে কাটানো স্মৃতিগুলো কখনও ভুলব না। আমি তোমার বন্ধু হয়ে সারাজীবন থাকব।
কেঁদে কেঁদে বিদায় নিতে যাবে তখনি আবার মুখ ফিরিয়ে দাদুকে আর আমাকে ধরে বলে-তোমাদের যে কোনো বিপদে আমাকে স্মরণ করবে। আমি আসব।
এবার আমাকে বিদায় দাও। চোখ ছয়টি জলে টলোমলো করছে। বুকের ভেতরে কেমন যেন একটি ধাক্কা খেল। হুংশিং এক পা ফেলে একবার ফিরে তাকায়। বিদায় দিতে একদম ইচ্ছে নেই। মনে হচ্ছে, ও কেন মানুষ হয়নি। কিছু বলতে পারছি না। কেবল বোবা আর্তনাদ।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT