ধর্ম ও জীবন

সন্ত্রাস ফেতনা ও ফ্যাসাদ

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৩-২০১৮ ইং ০১:৪৬:৩৭ | সংবাদটি ১০৪ বার পঠিত

কোনো মুসলিমকে হত্যা করা দুনিয়া ধ্বংস হওয়ার চেয়েও গুরুতর। রাসূল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কাছে সারা দুনিয়া ধ্বংস হওয়ার চেয়েও গুরুতর হচ্ছে কোনো মুসলিম ব্যক্তিকে হত্যা করা।’ নিরাপত্তা প্রদানকৃত যে-কোনো ধর্মাবলম্বীকে হত্যাকারীর সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিরাপত্তা প্রদানকৃত ব্যক্তিকে হত্যা করে, আমার সঙ্গে ওই হত্যাকারীর কোনো সম্পর্ক থাকবে না, যদি নিহত ব্যক্তি কাফেরও হয়।’
অন্যায়ভাবে বা পৃথিবীতে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল। আল্লাহ বলেন, ‘এ কারণেই বনি ইসরাইলের প্রতি এই বিধান দিলাম যে, নরহত্যা অথবা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কার্য করার কারণ ছাড়া কেউ কাউকেও হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকেই হত্যা করল।’ পৃথিবীতে সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীদের শাস্তি ও পরিণতি প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহ তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায় তাদের শাস্তি এই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে অথবা বিপরীত দিক হতে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদের দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। দুনিয়ায় এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও পরকালে তাদের মহাশাস্তি রয়েছে।’
ইসলামি আইনের দ্বিতীয় উৎস আল হাদিসে সন্ত্রাস শব্দটি সরাসরি ব্যবহৃত না হলেও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিভিন্ন দিক বোঝাতে বেশকিছু পরিভাষার ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। সেসব পরিভাষার অন্যতম হলো, আল কতলু বা হত্যা, আজ জুলম বা অত্যাচার, আত তারভি বা ভয় প্রদর্শন, হামলুস সিলাহ বা অস্ত্র বহন করা, আল ইশারাতু বিস-সিলাহ বা অস্ত্র দ্বারা ইঙ্গিত করা ইত্যাদি। তবে এসব পরিভাষা ছাড়াও বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে সন্ত্রাসীদের কর্মকান্ডকে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সন্ত্রাস প্রসঙ্গ বোঝাতে যেসব হাদিস বর্ণিত হয়েছে, তার কয়েকটি নিচে উদাহরণ হিসেবে পেশ করা হলো।
একে অপরের প্রতি অত্যাচার করা নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার বান্দারা! আমি আমার জন্য অত্যাচার হারাম করেছি এবং তা তোমাদের জন্যও হারাম করে দিয়েছি। সুতরাং তোমরা পরস্পর অত্যাচারে লিপ্ত হয়ো না।’ স্বাভাবিকভাবে একজনের রক্ত, সম্পদ, সম্মানহানি করা অপরজনের জন্য হারাম। রাসূল (সা.) বলেন, তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের সম্মান পরস্পরের জন্য সেরূপ হারাম যেরূপ হারাম তোমাদের এই শহর, তোমাদের এই মাস এবং তোমাদের এই দিন কোনো মুসলিমকে আতঙ্কিত করা অবৈধ।
রাসূল (সা.) বলেন, ‘কোনো মুসলিমের জন্য অপর মুসলিম ভাইকে আতঙ্কিত বা সন্ত্রস্ত করা বৈধ নয়।’ কোনো মুসলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণকারী ব্যক্তি মুসলিম উম্মাহর সদস্য নয়। এ মর্মে রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তোমাদের (মুসলিমদের) বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ কোনো মুসলিমে অস্ত্র দ্বারা হুমকি দেওয়া নিষিদ্ধ। রাসূল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মাঝে কেউ যেন তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি অস্ত্র দ্বারা হুমকি না দেয়। কেননা হতে পারে তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও শয়তান তার হস্তদ্বয় আঘাত হানার ফলে হতাহতের ঘটনা ঘটবে; অতঃপর সে এ অপরাধের কারণে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।’ রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি যদি লোহা দ্বারা তার ভাইকে হুমকি দেয়, তবে তা থেকে বিরত না হওয়া পর্যন্ত ফেরেশতারা তার প্রতি অভিশাপ করতে থাকেন যদিও হুমকি প্রদানকৃত ব্যক্তি তার সহোদর ভাই হয়।’
আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে আত্মহত্যাও হারাম। রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পৃথিবীতে নিজেকে কোনো বস্তু দ্বারা হত্যা করবে, কেয়ামতের দিন তাকে সে বস্তু দ্বারা শাস্তি দেওয়া হবে।’ রাসূল (সা.) আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করবে, তাকে জাহান্নামে অনুরূপভাবে শাস্তি দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি নিজেকে আঘাত করে আত্মহত্যা করবে, তাকেও জাহান্নামে অনুরূপভাবে আঘাত করা হবে।’
শুধু মুসলিম ব্যক্তি নয়, কোনো অমুসলিমকে হত্যা করাও নিষিদ্ধ। রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুসলিম জনপদে বসবাসকারী চুক্তিবদ্ধ কোনো অমুসলিমকে হত্যা করবে, সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না, অথচ চল্লিশ বছরের পথের দূরত্ব হতেও তার সুগন্ধ পাওয়া যাবে।’ সন্ত্রাসীর অন্তরে দয়ামায়া থাকে না, তাই সে হতভাগা। রাসূল (সা.) বলেন, ‘একমাত্র দুর্ভাগা ব্যক্তি থেকেই দয়া ছিনিয়ে নেওয়া হয়।’
ইচ্ছাকৃত কোনো মোমিনকে হত্যা করা বড় গোনাহগুলোর অন্যতম, যার গোনাহ আল্লাহ মাফ করবেন না। রাসূল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থাপনকারী ও ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মোমিন ব্যক্তিকে হত্যার গোনাহ ছাড়া অন্য যে-কোনো গোনাহকে আল্লাহ হয়তো ক্ষমা করে দেবেন।’ অন্যায়ভাবে মোমিনকে হত্যাকারীর কোনো ইবাদত কবুল করা হবে না। রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোনো মোমিন ব্যক্তিকে হত্যা করবে, আল্লাহ তার কোনো নফল ও ফরজ ইবাদত কবুল করবেন না।’ নিষিদ্ধ পন্থায় অপরের রক্তপাত ঘটানো মোমিনকে উচ্চমর্যাদা থেকে স্খলিত করে। রাসূল (সা.) বলেন, মোমিন ব্যক্তি উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন জীবনযাপন করতে থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত হারাম পন্থায় অন্যের রক্তপাত না ঘটাবে।’
কোনো মুসলিমকে হত্যা করা দুনিয়া ধ্বংস হওয়ার চেয়েও গুরুতর। রাসূল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কাছে সারা দুনিয়া ধ্বংস হওয়ার চেয়েও গুরুতর হচ্ছে কোনো মুসলিম ব্যক্তিকে হত্যা করা।’ নিরাপত্তা প্রদানকৃত যে-কোনো ধর্মাবলম্বীকে হত্যাকারীর সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিরাপত্তা প্রদানকৃত ব্যক্তিকে হত্যা করে, আমার সঙ্গে ওই হত্যাকারীর কোনো সম্পর্ক থাকবে না, যদি নিহত ব্যক্তি কাফেরও হয়।’
বিশ্বে ইসলামের ব্যাপক আবেদন থাকা সত্ত্বেও হিংসা ও স্বভাবজাত শত্রুতাবশে অন্য ধর্মাবলম্বীরা, বিশেষ করে ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা ইসলাম ও মুসলিমদের নামে নানা কুৎসা রটাচ্ছে। ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় ইসলাম ও এর অনুসারীরা ইসলাম বিরোধীর কাছ থেকে যেসব ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে, বর্তমান সন্ত্রাসকে ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার অপচেষ্টাও সেসবের অন্যতম। একদিকে ষড়যন্ত্র; অপরদিকে জন্মগতভাবে ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা ও ভ্রান্তিÑ এ দুয়ে মিলে ইসলাম আজ পৃথিবীতে ভুলবোঝা ধর্মে (ঃযব সরংঁহফবৎংঃড়ড়ফ ৎবষরমরড়হ) পরিণত হয়েছে, যেমনটি বলেছেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামি চিন্তাবিদ মুহাম্মদ কুতুব।
তবে আশার কথা, মুসলিমরা এখন ধীরে ধীরে তাদের অজ্ঞতা ও ভ্রান্তির বেড়াজাল ছিন্ন করার চেষ্টা শুরু করেছে। সন্ত্রাসের সঙ্গে যে ইসলামের কোনো রকম সম্পর্ক নেই, সে কথা উপর্যুক্ত আলোচনায় কিছুটা হলেও স্পষ্ট হয়েছে। ইসলামের অবস্থান কোরআন, হাদিস ও রাসূল (সা.) এর জীবনাদর্শে চমৎকারভাবে বিধৃত হয়েছে। কোরআন, হাদিস ও রাসুল (সা.) এর জীবনাদর্শ দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে, ইসলামের সঙ্গে সন্ত্রাসের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ নয়, বরং চরম বিরোধী। শান্তিকে বিঘিœত করে, এমন কোনো কর্মকান্ডকে ইসলাম সমর্থন করে না; উপরন্তু বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করাই ইসলামের চিরন্তন নীতি। ইসলাম স্বভাবগত কারণেই কখনও সন্ত্রাসে বা বিশ্বশান্তি নষ্ট করে এমন কর্মে উৎসাহ, সমর্থন, অনুমোদন দেয় না। মুসলিম কখনও সন্ত্রাসী হতে পারে না। তাছাড়া গুটিকতক তথাকথিত মুসলিমের কর্মবিচার করে বিশ্বের বৃহৎ ধর্ম ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান ইসলামকে সন্ত্রাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা কখনোই উচিত নয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT