ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৩-২০১৮ ইং ০১:৪৭:৩৬ | সংবাদটি ৯০ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
এখন চতুর্থ আয়াতের বর্ণনা : ‘ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন’ এ আয়াতের এক অংশে তা’রীফ ও প্রশংসা এবং অপর অংশে দোয়া ও প্রার্থনা। ‘না’বুদু- ইবাদত’ শব্দ থেকে গঠিত। এর অর্থ হচ্ছে : কারো প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দরুন তাঁর নিকট নিজের আন্তরিক কাকুতি-মিনতি প্রকাশ করা। ‘নাসতাঈন- ইসতেআ’নাত’ হতে গঠিত। এর অর্থ হচ্ছে কারো সাহায্যে প্রার্থনা করা। আয়াতের অর্থ হচ্ছে, ‘আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং একমাত্র তোমার নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করি। মানব জীবন তিনটি অবস্থায় অতিবাহিত হয়। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। পূর্বের তিনটি আয়াতের মধ্যে ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামিন’ এবং ‘আররাহমানির রাহিম’ এ দু’টি আয়াতে মানুষকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, অতীতে সে কেবল মাত্র আল্লাহ তা’আলার মুখাপেক্ষী ছিল, বর্তমানেও সে একমাত্র তাঁরই মুখাপেক্ষী। অস্তিত্বহীন এক অবস্থা থেকে তিনি তাকে অস্তিত্ব দান করেছেন।
তাকে সকল সৃষ্টির মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর আকার-আকৃতি এবং বিবেক ও বুদ্ধি দান করেছেন। বর্তমানে তার লালন-পালন ও ভরণ-পোষণের নিয়মিত সুব্যবস্থাও তিনিই করেছেন। অতঃপর ‘মালিকি ইয়াওমিদ্দিন’ -এর মধ্যে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, ভবিষ্যতেও সে আল্লাহ তা’আলারই মুখাপেক্ষী। প্রতিদান দিবসে আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো সাহায্য পাওয়া যাবে না।
প্রথম তিনটি আয়াতের দ্বারা যখন একথা প্রমাণিত হলো যে, মানুষ তার জীবনের তিনটি কালেই একান্তভাবে আল্লাহর মুখাপেক্ষী, তাই সাধারণ যুক্তির চাহিদাও এই যে, ইবাদতও তাঁরই করতে হবে। কেননা, ইবাদত যেহেতু অশেষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে নিজের অফুরন্ত কাকুতি-মিনতি নিবেদন করার নাম, সুতরাং তা পাওয়ার যোগ্যতা সম্পন্ন অন্য কোনো সত্ত্বা নেই। ফলকথা এ স্বতঃস্ফূর্ত স্বীকৃতি উচ্চারণ করছে যে, আমরা তোমাকে ব্যতিত অন্য কারো ইবাদত করি না। এ মৌলিক চাহিদাই ‘ইয়্যাকা না’বুদু’ তে বর্ণনা করা হয়েছে।
যখন স্থির হলো যে, অভাব পূরণকারী একক সত্ত্বা আল্লাহ তা’আলা, সুতরাং নিজের যাবতীয় কাজে সাহায্যও তাঁর নিকটই প্রার্থনা করবে। এ মৌলিক চাহিদারই বর্ণনা ‘ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন’ এ করা হয়েছে। মোটকথা, এ চতুর্থ আয়াতে একদিকে আল্লাহর তা’রীফ ও প্রশংসার সাথে একথাও স্বীকৃতি রয়েছে যে, ইবাদত ও শ্রদ্ধা পাওয়ার একমাত্র তিনিই যোগ্য। অপরদিকে তাঁর নিকট সাহায্য ও সহায়তার প্রার্থনা করা এবং তৃতীয়ত : আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করার শিক্ষাও দেয়া হয়েছে। এতদসঙ্গে এও বলে দেয়া হয়েছে যে, কোনো বান্দাই আল্লাহ ব্যতিত অন্য কাকেও অভাব পূরণকারী মনে করবে না। অপর কারো নিকট প্রার্থনার হাত প্রসারিত করা যাবে না। অবশ্য কোনো নবী- বা কোনো ওলীর বরাত দিয়ে প্রার্থনা করা এ আয়াতের মর্মবিরোধী নয়।
এ আয়াতে এ বিষয়ও চিন্তা করা কর্তব্য যে, ‘আমরা তোমারই নিকট সাহায্য চাই।’ কিন্তু কোন কাজের সাহায্য চাই, তার কোনো উল্লেখ নেই। জমহুর মুফাসসিরীনের অভিমত এই যে, নির্দিষ্ট কোনো ব্যাপারে সাহায্যের কথা উল্লেখ না করে আ’ম বা সাধারণ সাহায্যের প্রতি ইশারা করা হয়েছে যে, আমি আমার ইবাদত এবং প্রত্যেক ধর্মীয় ও পার্থিব কাজে এবং অন্তরে পোষিত প্রতিটি আশা-আকাক্সক্ষায় কেবল তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।
শুধু নামায রোযারই নাম ইবাদত নয়। ইমাম গায্যালী স্বীয় গ্রন্থ আরবাঈন-এ দশ প্রকার ইবাদতের কথা লিখেছেন। যথা- নামায, যাকাত, রোযা, কুরআন তিলাওয়াত, সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্মরণ, হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা, প্রতিবেশী এবং সাথীদের প্রাপ্য পরিশোধ করা, মানুষকে সৎকাজের আদেশ ও খারাপ কাজ হতে বিরত থাকার উপদেশ দেয়া, রাসূলের সুন্নত পালন করা।
একই কারণে ইবাদতে আল্লাহর সাথে কাকেও অংশীদার করা চলে না। এর অর্থ হচ্ছে, কারো প্রতি ভালোবাসা, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার সমতুল্য হবে না। কারো প্রতি ভয়, কারো প্রতি আশা-আকাক্সক্ষা পোষণ আল্লাহর ভয় ও তাঁর প্রতি পোষিত আশা-আকাক্সক্ষার সমতুল্য হবে না। আবার কারো ওপর একান্ত ভরসা করা, কারো আনুগত্য ও খেদমত করা, কারো কাজকে আল্লাহর ইবাদতের সমতুল্য আবশ্যকীয় মনে করা, আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো নামে মানত করা, আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো সামনে স্বীয় কাকুতি-মিনতি প্রকাশ করা এবং যে কাজে অন্তরের আবেগ-আকুতি প্রকাশ পায়, এমন কাজ আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো জন্য করা- যথা রুকু বা সেজদা করা ইত্যাদি কোনো অবস্থাতেই বৈধ হবে না।
শেষ তিনটি আয়াতে মানুষের দোয়া ও আবেদনের বিষয়বস্তু এবং এক বিশেষ প্রার্থনা পদ্ধতি শিক্ষা দেয়া হয়েছে। তা হচ্ছেÑ ‘ইহদিনাস সিরাতাল মুসতাক্বিম, সিরাতা’ল্লাযিনা আনআ’মতা আ’লাইহিম, গাইরিল মাগদু’বি আ’লাইহিম, ওয়ালাদ’দ্দোল্লিন।
অর্থাৎ ‘আমাদিগকে সরল পথ দেখাও, সে সমস্ত মানুষের পথ, যারা তোমার অনুগ্রহ লাভ করেছে। যে পথে তোমার অভিশপ্ত বান্দারা চলেছে সে পথ নয় এবং ঐ সমস্ত লোকের রাস্তাও নয় যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।’
এ তিনটি আয়াতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। যেমন, সরল পথের হেদায়াতের জন্য যে আবেদন এ আয়াতে শিক্ষা দেয়া হয়েছে, এর আবেদনকারী যেমনিভাবে সাধারণ মানুষ, সাধারণ মুমিনগণ, তেমনি আওলিয়া, গাউস- কুতুব এবং নবী-রাসূলগণও বটে। নিঃসন্দেহে যাঁরা হেদায়াত প্রাপ্ত, বরং অন্যের হেদায়াতের উৎস স্বরূপ, তাঁদের পক্ষে পুনরায় সে হেদায়াতের জন্যই বারংবার প্রার্থনা করার উদ্দেশ্য কি? এ প্রশ্নের উত্তর হেদায়াত শব্দের তাৎপর্য পরিপূর্ণরূপে অনুধাবন করার ওপর নির্ভরশীল।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT