সম্পাদকীয়

দুর্নীতি প্রতিরোধ সপ্তাহ

প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৩-২০১৮ ইং ২৩:০৪:৩৫ | সংবাদটি ১০৬ বার পঠিত

দুর্নীতি প্রতিরোধ সপ্তাহ পালিত হচ্ছে সারা দেশে। শুরু হয় গত ছাব্বিশে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে। শেষ হচ্ছে আগামীকাল। প্রতি বছরই সপ্তাহটি পালন করা হয়। আর তা শুরু হয় মহান স্বাধীনতা দিবসে। মূলত আমাদের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন হচ্ছে ছাব্বিশে মার্চ। এই দিনটি আমাদের হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন স্বাধীনতা অর্জনের দিন, দখলদার হানাদার বাহিনীকে তাড়ানোর জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার দিন। আর এই দিনেই শুরু হয় প্রতি বছর দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এবার দিনটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘বন্ধ হলে দুর্নীতি, উন্নয়নে আসবে গতি’। দুর্নীতি দমন কমিশন এই সপ্তাহ পালনে নানা কর্মসূচীর আয়োজন করে। দুর্নীতি হচ্ছে আমাদের সার্বিক উন্নতি-অগ্রগতির অন্যতম অন্তরায়। যে স্বপ্ন নিয়ে ৪৭ বছর আগে এদেশের মানুষ দেশ স্বাধীন করেছিলো, সেই স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ করতে ওঠে পড়ে লেগেছে দুর্নীতিবাজ লুটপাটকারী চক্র। এরা দেশের শত্রু, সমাজের শত্রু, মানবতার শত্রু। তাই মহান স্বাধীনতা দিবসেই শুরু হয় এই দুর্নীতিবাজ ‘দেশদ্রোহীদের’ বিরুদ্ধে অভিযান।
দুঃখজনকহলেও সত্য যে, দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাচ্ছে। যতোই দিবস-সপ্তাহ পালন করা হোক, পরিচালিত হোক অভিযান, কিন্তু কিছুতেই যেন দুর্নীতির লাগামটানা যাচ্ছে না। সর্বক্ষেত্রে-সর্বস্তরে দুর্নীতির বিস্তার ঘটছে অবাধে। আর যাদের ওপর এই দুর্নীতি দমনের দায়িত্ব তারা নিজেরাই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। এরাই ঘুষ খায় অহরহ, আবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে নানান বাণীও আওরায়। গবেষকদের মতে আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে প্রধান প্রতিবন্ধকতা দুর্নীতি-লুটপাট। এই দুর্নীতিবাজরা শুধু দেশে নয়, বিদেশেও হেয় করছে বাংলাদেশকে। তাই দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ঘৃণা প্রকাশের মাধ্যমে এদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আর এই আন্দোলন শুরু হোক এই সপ্তাহ থেকেই।
দুর্নীতি আমাদের জন্য একটি অভিশাপ। বলা যায়, সমাজের প্রতিটি স্তরে বিস্তার ঘটছে দুর্নীতির। ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম, লুটপাটের মাত্রা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে, সরকারি অফিস আদালতে অবৈধ অর্থের লেনদেন অতি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না, ঘুষ ছাড়া কোন কাজ হয় না। সরকারি অফিস-আদালতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এমন একজনকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি ঘুষ ছাড়া কোন কাজ করে দিয়েছেন। দেশের সকল অর্থনৈতিক কার্যক্রমেই ঘটছে দুর্নীতি ব্যাপকভাবে। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তার ঘটছে দুর্নীতির। দেশের নি¤œ আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত বছরে তিন হাজার কোটি টাকার বেশী ঘুষ লেনদেন হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। সরকারি কাজে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে সীমাহীন দুর্নীতি। কিন্তু প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেই। চিহ্নিত দুর্নীতিবাজরা শাস্তি পায়না বললেই চলে। আর তাই সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির মাত্রা বেড়েই চলেছে। এতে একদিকে অপচয় হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থের, অপর দিকে পরিকল্পনা অনুযায়ী অবকাঠামো নির্মাণ না হওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
বিভিন্ন জরিপে প্রাপ্ত তথ্য হচ্ছে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই লুটপাট হচ্ছে। তাছাড়া দুর্নীতির কারণে দ্রুত বাড়ছে কালো টাকার পাহাড়। বাড়ছে ধনী-গরীবের ব্যবধান। প্রতি মাসে দুর্নীতির কারণে দেশে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে কমপক্ষে ৩৬ কোটি টাকা। আর দুর্নীতির কারণে বিভিন্ন প্রকল্পে দাতা সংস্থার অর্থ সাহায্য স্থগিত করার ঘটনা তো ঘটছেই। অর্থাৎ সরকারি অফিসে একদিকে সাধারণ মানুষ হয়রানীর শিকার হচ্ছেন, অপরদিকে লুটপাট হচ্ছে সরকারি অর্থ। অথচ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে তদারকির কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তারা দুর্নীতির তথ্য উদঘাটনে বরাবরই ব্যর্থ। এই সর্বগ্রাসী দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে দরকার সর্বমহলের সচেতনতা, দরকার সামাজিক আন্দোলন। যেকোন ধর্মেই ঘুষ-দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া হয়নি। তাই ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হলে কেউই দুর্নীতির জালে আটকা থাকতে পারে না। সেই সঙ্গে দরকার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT