পাঁচ মিশালী

ইংল্যান্ডের তারুণ্যময় গ্রীষ্মকাল

চৌধুরী ইসফাকুর রহমান কুরেশী প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৩-২০১৮ ইং ২৩:০৭:৪৯ | সংবাদটি ৪৭ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
সকালের নাস্তা শেষে বড় ভাই হাজির হন। আমরা কারে ভাইয়ের বাসায় চলে আসি। ৩০ জুন ২০১৭ পবিত্র শুক্রবার। ইস্ট লন্ডনের সর্ব বৃহৎ বাংলাদেশী মসজিদে জুম’য়া পড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। ড্রাগেনহাম ইস্ট স্টেশনে গিয়ে ভূগর্ভস্থ ট্রেন ধরি। ইস্ট লন্ডন জামে মসজিদের সন্নিকটে হোয়াইট চ্যাপেল স্টেশনে নামি। স্টেশন হতে বের হয়েই উপরে বাংলা টাউন। কিছু দূর হেঁটে যাবার পর দি ইস্ট লন্ডন মসজিদের সাইনবোর্ড ও গম্বুজ চোখে পড়ে। টুপীপরা এদেশীয় মুসল্লীরা দলে দলে মসজিদে ঢুকছেন। উপরের তলাগুলো লোকে লোকারণ্য। কোনোমতে ভূগর্ভস্থ ফ্লোরে প্রবেশ করি। এখানে আমার প্রিয় বন্ধু সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝরের সাথে বহুবছর পর দেখা হয়।
মসজিদের খুতবা প্রথমে আরবীতে পড়া হয়। তারপর উক্ত খুতবা প্রথমে বাংলা ও পরে ইংরেজিতে অনুবাদ করে পাঠ করা হয়। সুন্দর খুতবা পড়েন খতিব শেখ আব্দুল কাইয়ুম। তিনি বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার বাসিন্দা অতি ধর্মীয় জ্ঞান সম্পন্ন বাগ্মী আলিম। খুতবার বিষয়বস্তু খুবই সাধারণ; অথচ জরুরি একটি বিষয় যে, পশ্চিমা বিশ্বে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে সব অপপ্রচার ও প্রপাগান্ডা চলছে সেগুলো ইঙ্গিত করে তার প্রতিকার ব্যবস্থা ইমাম সাহেব প্রতিটি অপকর্মের জবাব ভালো ব্যবহার ও ভালোকর্মের মাধ্যমে দিতে উদ্ভুদ্ধ করেন। শান্তি বিঘিœত হয় এমন কাজ কোনো মুসলমান করতে পারে না। ইতোমধ্যে কিছু দুর্বৃত্ত জঙ্গী লন্ডনের রাস্তায় নিরিহ লোকজনকে কোপায় ও হত্যা করে। তার প্রতিক্রিয়ায় দু’চার জায়গায় মুসলিম লোকজন এসিড হামলার শিকার হন। ইমাম ধৈর্য্যধারণের ও ব্রিটিশ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে মুসল্লীদের উপদেশ দেন।
মসজিদটি বহুতল বিশিষ্ট। যেখানে কয়েক সহ¯্র লোক একসাথে নামাজ আদায় করতে পারেন। এখানে মক্কা ও মদীনা মসজিদের নিয়মে নামাজ ও খুতবা পরিচালিত হয়। মসজিদ কমিটি সিলেটিদের দখলে এবং লন্ডনে পরলোকগমনকারী লোকজনের জানাযাও এখানে সম্পন্ন হয়। বাদ জুম’য়া জানাযায় শরিক হই।
ইস্ট লন্ডন সিলেটি অধ্যুষিত এলাকা। এখানে বাংলা টাউনের অবস্থান। দোকান পাট,ব্যবসা-বাণিজ্য, বাসা-বাড়ি সবই সিলেটিদের দখলে। এখানে রাস্তার দু’পাশে অসংখ্য ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট যা বাংলাদেশী লোকজন পরিচালনা করেন। ১৯৭০ সাল হতে ১৯৮৫ সালের মধ্যে ইহুদী অধ্যুষিত এই এলাকাটি সিলেটিদের হস্তগত হয়। রাস্তায় সিলেটি কায়দা-কানুন, ভাষা ও সিলেটি লোকজনের কোলাহলে সর্বদা মুখরিত থাকে। এখানে দোকান পাটের সাইন বোর্ড সব বাংলা ও ইংরেজি হরফে লিখা রয়েছে। মনে হয় আমি বুঝি বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে ঘুরছি। এক সময় ক্ষণিকের ভ্রান্তি যখন ভেঙে যায়। মনে হয় এটা তো উন্নত দেশ ব্রিটেন স্বল্পোন্নত বাংলাদেশের মফস্বল সিলেট নয়।
মসজিদের মুসল্লীদের ভীড়ে গাদাগাদি দাড়িয়ে জুম’য়ার নামাজ আদায় করে আমি বন্ধু সিদ্দিকের হাত ধরে বাংলা টাউনের রাস্তায় নামি। অন্যরা চলে যান। সিদ্দিক জড়াজড়ি করে রাস্তায় হাঁটতে বাধা দেয়। আমি কারণ জানতে চাইলে সে উত্তর দিলো এদেশে অসংখ্য গে (সমকামী পুরুষ) ও লেসবিয়ান (সমকামী নারী) রয়েছেন। এভাবে হাত ধরাধরি করে হাঁটলে লোকে ‘গে’ ভাববে। বুঝলাম এসব উন্নত দেশগুলোর নষ্টামী, যা থেকে আমাদের দেশ দরিদ্র হলেও পবিত্র রয়েছে। কিছু দূর গিয়ে নির্ঝর বললো- আমি একজনের সাথে বক্ষ মেলাবো। একটি বনাজি ঔষধের দোকানে ঢুকে হাত বাড়াতেই একজন চিকন হালকা-পাতলা শ্বেতাঙ্গ লোক বেরিয়ে এসে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরেন। জিন্সের প্যান্ট ও লাল গ্যাঞ্জিপরা লোকটা পুরুষ না কি নারী বুঝার উপায় নেই। তাকে যে কোনো জেন্ডারে পরিচয় দেয়া যাবে। বক্ষ সমতল অথচ মসৃন মুখশ্রী লোকটা যে একজন নারী অনেকক্ষণ পর বুঝতে পারলাম। হাঁটার রাস্তায় অসংখ্য সিলেটি ‘ভাইসাবদের’ দেখা পেলাম যারা নির্ঝরের পরিচিত ও আপনজন। সবাই দৌঁড়ে এসে সালাম দিচ্ছেন ও বুক মিলাচ্ছেন। কয়েকজন সাংবাদিকের দেখা পেলাম যারা আমাকে নিয়ে প্রেস কনফারেন্সের আমন্ত্রণ জানান। ইস্ট লন্ডনে বাংলা প্রেসক্লাব রয়েছে। এখানে টেমস সুরমাসহ যে সব ক্ষুদে পত্র-পত্রিকা রয়েছে এগুলোর সংবাদকর্মীরা সমবেত হন। আমি দশ-বারটি বইয়ের লেখক হিসাবে তাদের দৃষ্টিতে প্রেস কনফারেন্সের জন্য একজন উপযুক্ত ব্যক্তি। এখানে বাংলাদেশ হতে আগত ভুঁইফোড় নেতা, লেখক, কবি, শিল্পীরা প্রেস কনফারেন্সে এসে সাক্ষাৎকার দেন। স্থানীয় কমিউনিটি পত্রিকাগুলোতে তাদের সচিত্র খবর প্রকাশিত হয়। আমার হাতে সময় নেই। তাই প্রেস কনফারেন্সের আমন্ত্রণ কোনোমতে ফিরিয়ে দেই।
এবার আফতাব আলী পার্কে এসে বসি। এই আফতাব আলী একজন ‘বিশ্বনাথী’। তখন সবেমাত্র সিলেটিরা লন্ডনে আসতে শুরু করেছেন। বর্ণবাদ ছিল তীব্র। বর্ণবাদীদের হামলার ভয়ে এসব সিলেটি দলবদ্ধভাবে ঘুরাফেরা করতেন। প্রাথমিক যুগের সিলেটিরা তেমন শিক্ষিত ছিলেন না। আধুনিক উচ্চ শিক্ষিত ইংলিশ সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে খাপ খাওয়াতে তাদের বেশ কষ্ট হয়। এই হাইটেক সমাজ ও কাঠামোতে তারা তেমন মানানসই ছিলেন না। একই ধরনে বাসা-বাড়ি ও পাড়া-মহল্লায় বসবাসে তারা বাসার সামনে ইট-পাথর রেখে বা দাগ দিয়ে চিহ্ন তৈরি করতেন বলে শোনা যায়। চিহ্ন হারালে তারা বাসার খোঁজে গলদঘর্ম হতেন। শ্বেতাঙ্গদের সাথে না ইশারায়, না কথা বলে বুঝাতে পারতেন ‘আবাস হারিয়ে ফেলেছি।’ কলিবড়িয়ান সড়কে তারা সরকারি গোসলখানায় দল বেঁধে গোসল করতেন। রাস্তার নাম উচ্চারণ করতে না পেরে রাস্তাটিকে তারা ‘কালাপানি’ রোডে পরিণত করেন। জানালা দিয়ে বৃদ্ধা মহিলার পানের পিক নিক্ষেপে রক্তবমি মনে করে ‘আলী হোসেন (এম্বুলেন্স) ছুটে আসে। ইংরেজটা যখন জানলো এটা একধরনের খাবার তখন ডাক্তার ও আলী হোসেন প্রস্থান করে। বর্তমান বাংলাদেশীরা ও তাদের নতুন প্রজন্ম এ অবস্থায় নেই। এই ধরনের মিথ্ বা কাহিনী এখন অচল। বর্তমান সিলেটি সম্পর্কে এ ধরনের হাস্যকর মিথ আর সাজে না। তারা এখন লন্ডনে যথেষ্ট স্মার্ট ও চলনসই এশিয়ান জনগোষ্ঠি।
উচ্চ শিক্ষিত ইংলিশ সংস্কৃতির সাথে খাপ খাওয়াতে তাদের বেশ কষ্ট হতো। এই হাইটেক সমাজ ও কাঠামোতে তারা তেমন মাননসই ছিলেন না। কিন্তু এ সমস্যা আর নেই। তখন একা এশিয়ানকে উগ্র বর্ণবাদীরা সহজেই হামলা করে দিত। প্রায় ৪০/৫০ বৎসর পূর্বে এই স্থানে উগ্রবর্ণবাদীদের উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে আফতাব আলী নিহত হন। এই আফতাব আলী পার্কের পাশেই আজকের বাংলাটাউন।
সিদ্দিকের ছোট্ট পরিপাটি বাসায় ঢুকে তার জার্মান পতœী ইভাক্সক্ষা জেজেগ ও ছেলে-মেয়ের সাথে দেখা হয়। কন্যা সাকিবা ও পুত্র ইব্রাহিমকে নিয়ে তাদের সুখী পরিবার। পার হয়ে গেছে পনের ষোল বছর। খুব ভালো দয়ালু মহিলা ইভাক্সক্ষা দু’চারটা বাংলা বলার চেষ্টাও করেন। কন্যা সাকিবা খুব চালাক। তাকে ইংরেজের চেয়ে বাঙালিই বেশি মনে হয়। ছেলে ইব্রাহিম তার উল্টো। দুধে আলতা মেশানো এই শিশুটি যেন একজন বিদেশী শ্বেতাঙ্গদের প্রতিরূপ।
ইভাক্সক্ষা ভাবী আমাকে নিয়ে সপরিবারে চললেন বনভোজনে। শিশু ইব্রাহিমকে দোলনা গাড়িতে বসিয়ে হেঁটে হেঁটে বড় রাস্তায়, তারপর দোতলা বাসে চেপে অনেক দূরে ইভাক্সক্ষা ভাবীর জার্মান বান্ধবীর বাসায়। ছয় তলা বাসার পাঁচ তলার একটি ফ্ল্যাটে থাকেন ইভাক্সক্ষা ভাবীর জার্মান বান্ধবী ও তার স্বামী কুষ্টিয়া জেলার হারুন ভাই। হারুন ভাই লন্ডনে পড়তে এসে এই জার্মান শ্বেতাঙ্গিনীর প্রেমে পড়েন। পরে তা বিয়েতে গড়ায়। তাদের সুন্দর সুন্দর দুই মিশ্র জাতের পুত্র ও এক কন্যা রয়েছে। এবার বাসার পিছনের সুন্দর বাগানে যাই। বেশ বড় বাগান। বাচ্চাদের খেলার অবারিত জায়গা। ডিজাইন করে নানা জাতের কুসুম বিথি লাগানো। চারপাশে নানান ফুলের মধুর হাসি। হারুন ভাই খোলা আকাশের নিচে বারবিকিউ রান্না করছেন। কড়কড়ে মোরগের রোস্ট, সরষে বাটা, নানরুটি, কড়াপানীয়, সবজি সবমিলে এক ভূরিভোজের আয়োজন। চুল্লীর ধোঁয়া উড়ছে। খাবারের খুশবো বাগানে ভেসে বেড়াচ্ছে। রাতের আগমনের পূর্বে অতি ধীরলয়ে দুই/তিন ঘণ্টা রান্না ও খাওয়া দাওয়া চললো। পার্কের পাকা বেঞ্চে বসে ফুলের কুঞ্জে আড়ালে আড়ালে বসে গল্প করে বিকালটা হারিয়ে গেল। মান্নাদের গানটা মনে পড়লো কোথায় হারিয়ে গেল, সোনালী বিকেলটা যে এই, আজ আর নেই।
এ দেশের বাচ্চাগুলো দারুণ সভ্য। আমাদের বাচ্চাদের মতো এতো দুষ্ট নয়। তারা কোথায়ও ময়লা না ফেলে ডাস্টবিনে নিয়ে যায়। গাছের কোনো ফুল বা পত্র ছিঁড়ে না। আর মারামারিতো জানেই না। এতোগুলো বাচ্চা খেলাধূলা করছে কিন্তু কোনো ধরনের চেচামেচি- হৈ চৈ নেই। চারপাশ শান্ত নিস্তব্ধ। ভানধরা, মিথ্যাচার কিছুই এই বাচ্চাদের স্পর্শ করতে পারে না। পার্কের চেয়ারে বসে কুসুমের কুঞ্জ বনে অনে গল্প করি। বছরের পর বছর জমানো গল্প।
সিদ্দিকের কাছে জার্মান সংস্কৃতির কাহিনী শুনলাম। সে শ্বশুড় বাড়ি জার্মানীর রাইনল্যান্ডে যায়। বড় বাড়ি, ছবির মতো সুন্দর দেশ। আমাদের দেশে শ্বশুড় মেয়ের জামাই সম্পর্ক পিতা পুত্রের, কিন্তু জার্মানীতে এই সম্পর্ক বন্ধু সম্পর্ক। এখানে শ্বশুররা মেয়ে জামাইয়ের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করেন। বন্ধুর মতো আচরণ করেন। অনুরূপ শাশুড়িরাও জননী নন, যেন একজন বয়ঃজ্যাষ্ঠ বান্ধবী। শাশুড়ি ও খালা শাশুড়িরা বাড়ির গরম জলের সুইমিংপুলে আনন্দ গোসল করছেন। মেয়ে জামাইকে তাদের সাথে একত্রে গোসলে শরিক হবার আমন্ত্রণ জানান। শ্বশুর-শাশুড়ি-খালা শাশুড়ি, মেয়ে ও মেয়েরজামাই সবাই মিলে সুইমিংপুলের মৃদু উষ্ণ পরিষ্কার জলে একসাথে আনন্দ গোসল, সাঁতার কাটা ও পানি ছিটাছিটি হলো। আর এটাই হলো জার্মান সংস্কৃতি। প্রতি তিন চার মাস পরপর জার্মানী হতে সিদ্দিকের ঘরে কাপড় ও খেলনাসহ প্রচুর উপহার আসে।
সময় শেষ কিন্তু গল্পের শেষ নেই। বিকেল ফুরিয়ে গেল। এবার চললাম হারুন ভাইয়ের পাঁচতলার ফ্ল্যাটে। এখানে দই, কফি, মিষ্টি সামনে সাজানো। ঝুলন্ত ফ্লাওয়ার বক্স ও অর্কিড সজ্জিত বড় রোদেলা সবুজ বারান্দায় আর কিছুক্ষণ কাটিয়ে জার্মান হোস্টভাবীকে হয়তবা চির বিদায় জানিয়ে নেমে আসি। নিচে কার নিয়ে বড় ভাই হাজির। এবার চললাম ড্যাগেনহামের স্থায়ী ঠিকানায়।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT