পাঁচ মিশালী

কিছু স্মৃতি কিছু কথা

মোঃ ফজলুল হোসেন মীনা প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৩-২০১৮ ইং ২৩:১০:০২ | সংবাদটি ৬৫ বার পঠিত

সবুজ শ্যামল বনানী ঘেরা সিলেটের পূর্ব কোণ ঘেষে পাহাড়ের পাদদেশে খাদিমনগর চা বাগান আমি। বাংলা মায়ের উর্বর মাটির কোলে বিশাল পরিধি নিয়ে আমার কোল ঘেঁষে কালাগুল, গুলনী, ছড়াগাং ও বর্জান। একই সংসার আমাদের, একই রূপ একই অবদান। স্বাধীনতার পরম লগ্নে বয়ে এনেছে আমার জন্য এক নতুন জীবনের স্বপ্ন, সোনালী ভবিষ্যতের আশা-আকাঙ্খা আর তাইতো উজ্জীবিত হয়ে এক অনাবিল আনন্দে আমার সারাটা হৃদয়ে নতুন গানের সুর দিয়েছে- নতুন সুরে ভরে তুলেছে আমার মন প্রাণ। এ নবজাগরণের জোয়ার এসেছে সমগ্র দেশে সাড়ে সাত কোটি মানুষের জীবন চলার পথে অপূর্বচেতনা ও কর্মপ্রেরণা এক অভূতপূর্ব সাড়া। এদেশের শত সহ¯্র লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত মেহনতী মানুষের মাঝে এসেছে এক নতুন কর্মপ্রেরণার ও উদ্দীপনা। আজকে তারই প্রশান্তি গাইতে বসে বিগত ২৫ বৎসরের বেদনাদায়ক দিনগুলির স্মৃতি মানসপটে ভেসে উঠে যে পশ্চিমা বেনিয়ারা কেবল আমাকেই কংকালসার করেনি, আমারই সমগোত্রের বাংলাদেশের ১৪৭টি চা বাগানকেও করেছে শোষণ। আমাদেরই উৎপাদিত চা বিদেশে বিক্রি করে কোটি কোটি বিদেশী টাকা অর্জন করে পশ্চিমে শত শত দালান কোঠা আর আমোদ প্রমোদের লীলা নিকেতন তৈরি করেছে- করেছে এদেশের মেহনতী মানুষকে অকর্মন্য ও লাঞ্চিত। এদেশের মেহনতী মানুষকেই কেবল লাঞ্ছিত করেনি করেছে আমাকেও। আমি জড় পদার্থ হতে পারি, কিন্তু আমারও আছে জীবন, যৌবন আছে, আছে মৃত্যু। আমিও চাই কিছু শান্তি, কিছু পরিচর্যা, কিছু আদর আপ্যায়ন এবং সর্বোপরি আমার বংশবৃদ্ধির পরিবর্ধনের তত্ত্বাবধান। কিন্তু বেনিয়ারা মেহনতী মানুষের মত আমাকেও শোষণ ও শাসন করেছে- করেছে অবহেলা ও লাঞ্চিত। বেদনাবিধুর দিনগুলির স্মৃতি ভুলে গিয়ে উজ্জ্বল সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ জীবনের কথা ভেবে আজ আমার মন বারবার পুলকিত হয়ে উঠছে। কারণ আমারই মায়ের সন্তানরা আমাকে পরিচর্যার ভার নিয়েছে। তারা সকল প্রকার সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিচ্ছে কিভাবে আমার যৌবনকে প্রলম্বিত করা যায়- কিভাবে আমার কর্মহীনতা ও অকাল বার্ধক্যকে ধুয়ে মুছে সাফ করে নতুন উদ্দীপনায় ভরপুর করা যায়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে সামান্য কয়েক মাসে (৭/৮ মাসে) আজ আমি মৌনতা ভেঙ্গে স্বাধীনভাবে নিজের কথা বলতে শিখেছি এবং এরূপ সুন্দর চেষ্টায় আমার মনে হয় অদূর ভবিষ্যতে আমি আবার আমার কর্মক্ষমতা ফিরে পাব।
আমি আজ সত্যি আনন্দিত, গর্বিতও বটে। কারণ আমি বুঝতে পেরেছি বর্তমানে যারা আমাকে সেবা ও শুশ্রুষার ভার নিয়েছে তারা এক বিরাট পরিকল্পনা নিচ্ছে কিভাবে আমাদের মধ্যে সজীবতা ফিরিয়ে আনা যায়। আমার জন্য আমি চাই না। আমি চাই দিন রাতে আমাকে নিয়ে মশগুল থাকে যারা, সেই মেহনতী মানুষের একটি সুন্দর ও সুখী জীবন। প্রত্যুষে যারা চলে যায় হাড় ভাঙ্গা রোদ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে চায়ের পাতা আনতে। ক্লান্ত বিকেলে ফিরে আসে ফ্যাক্টরীর আঙ্গিনায়। তারপর সেই পাতা ‘ধুপঘর’ হয়ে চলে যায় ফ্যাক্টরীতে আর সেখান থেকে নানান প্রক্রিয়ায় বের হয়ে চা, মানুষের ক্লান্তি দূরীকরণ সুধা। এই যে সকাল হতে রাত- রাত থেকে সকাল, হাড়ভাঙ্গা খাটুনী- এর প্রতিদান এই মেহনতী মানুষ এতদিন কি পেয়েছে? আজ সত্যি আনন্দ হচ্ছে যে, হাড়ভাঙ্গা খাটুনীর কিছুটা পারিশ্রমিক আজ পাচ্ছে। মনে হচ্ছে আজ মেহনতী মানুষ শ্রমের মর্যাদা পেতে যাচ্ছে। পেতে যাচ্ছে তাদের ইস্পিত আকাঙ্খা সুখ সমৃদ্ধি।
প্রথমেই বলতে হয় মেহনতী মানুষের ঘরে ঘরে বিনা খরচায় বৈদ্যুতিক আলো প্রবর্তনের সর্বপ্রকার করণীয়, প্রতিটি মানুষের আরাম ও আয়েশের জন্য থাকার বাসস্থান, বাগানের রাস্তা পাকা করা এবং লেখাপড়া শেখার পদ্ধতিকে আরও সময়োপযোগী করার অঙ্গীকারকে একটি পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা যায়। আজকে আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ হচ্ছে এখানেই যে, এই বাগান সমূহের মেহনতী মানুষ এক বিরাট কর্মপ্রেরণায় উদ্দীপ্ত এবং তারা মিলেমিশে কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের প্রাপ্য শান্তিপূর্ণভাবে আদায় করে নিচ্ছে। যেখানে স্বাধীনতা উত্তরণে বাংলাদেশের মেহনতী মানুষ ও তত্ত্বাবধায়কের মধ্যে ঐক্যের বিরাট অভাব, সেখানে আমার মায়ের সন্তানদের মধ্যে যে ঐক্য উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে, সেটাকেই আমি বলব প্রগতির পূর্বস্তর এবং আশা করি এটাই হবে জাতির অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত।
[নিবন্ধটি লিখেছিলাম ২১ আগস্ট ১৯৭২ সালে। তখন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী, জেমস ফিনলে এন্ড কোম্পানী লিমিটেড এর অধীনে খাদিম নগর চা বাগান ছিল। ফিনলের সহযোগী কনসার্ন হিসেবে ইম্পোর্ট সেকশন ছিল বিধায় আমার কার্যক্রম ও অফিস খাদিম নগর চা বাগানের ভিতরেই ছিল। সে সময় আমার বিভিন্ন কর্ম ব্যবস্থার কারণে, লেখাটি ফাইলবন্দী ছিল এতদিন। সম্প্রতি আমার লেখালেখির কাগজপত্র ঘাটাতে গিয়ে বেশ কয়েকটি লেখা খুঁজে পাই। এ নিবন্ধ এর মধ্যে একটি।]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT