পাঁচ মিশালী

মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ও আধ্যাত্মিক শক্তি

ড. গাজী আবদুল্লাহেল বাকী প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৩-২০১৮ ইং ২৩:১০:৪০ | সংবাদটি ৩৫৩ বার পঠিত

শক্তি একটি শব্দ। ইংরেজীতে বলা হয় চড়বিৎ। এখানে চড়বিৎ বলতে বুঝায় ঐ শক্তি যা দেখা যায় না, কিন্তু প্রবল আকর্ষণ আছে। যেমন আমরা বলি কহড়ষিবফমব রং চড়বিৎ অর্থাৎ জ্ঞানই শক্তি। এখানে জ্ঞান তার শক্তি দ্বারা মানুষকে আকর্ষণ করে অথবা মানুষ জ্ঞান অর্জন করলে ঐ মানুষের প্রতি অন্যেরা আকৃষ্ট হয়; যেহেতু তার জ্ঞান আছে। কাজেই ‘শক্তি’Ñতে রয়েছে টান বা আকর্ষণ। এখন আমরা দেখবো আমাদের আলোচ্য বিষয় মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ও আধ্যাত্মিক শক্তি বলতে কি বুঝি?
‘মাধ্যাকর্ষণ শক্তি’ এর আবিষ্কারক বৈজ্ঞানিক নিউটন যা ইতিহাসের তথ্য। তাহলে প্রশ্ন নিউটনের আগে কি এই শক্তির অস্তিত্ব ছিল না? মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নিউটনের পূর্বেও কার্যকরী ছিল, কিন্তু সেটা কোথায় কিভাবে কার্যকরী ছিল বা তার অস্তিত্ব কিরূপ, এ বিষয়ে মানুষের ধারণা ছিল না। বিজ্ঞানী নিউটনের মধ্যে আপেল মাটিতে পড়ার দৃশ্য দেখে এই মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ধারণা জন্মে। তিনি চিন্তা করলেন আপেল তো গাছ হতে মাটিতে পড়লো, কেন উপরের দিকে গেল না? তাহলে নিশ্চয়ই মাটির অর্থাৎ পৃথিবীর একটা আকর্ষণ রয়েছে, যে আকর্ষণের ফলে কোন বস্তু উপর হতে ছেড়ে দিলে, অথবা উপরে নিক্ষেপ করলে তা সোজা মাটিতে এসে পড়ে। এই আকর্ষণ এক ধরণের ‘টান’- যে টানের ফলে বস্তুটি উপর হতে পৃথিবীতে নেমে আসে। এ টানকে বলা হয় মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। সুতরাং মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বলতে আমরা যা বুঝি তা ভারী কোন জিনিসের সাথে পৃথিবীর আকর্ষণের সম্পর্ক।
মানবসৃষ্টি প্রকৃতপক্ষে রহস্যময়। এ সৃষ্টি বৈচিত্র সম্পর্কে আমাদের জানা দরকার। মায়ের পেটে মানবদেহ গঠন শেষ হওয়ার পর মহান আলাহ রূহ ফুকে দেন, এই রূহ এক ধরণের আল্লাহর নির্দেশ যা আলোকময় এক নূরানী সত্ত্বা। রূহ দেহে প্রবেশের সাথে সাথে মায়ের পেটে শিশু জীবিত হয়। এই আলোকময় রূহ অন্ধকার দেহে প্রবেশ করে, কিন্তু যেহেতু এটা আল্লাহর নির্দেশ সেহেতু তার টান থাকে আল্লাহর প্রতি। এখন পরিষ্কার বোঝা গেল যে মানব দেহ পৃথিবীতে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির আওতায় একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় মায়ের পেটে জন্ম নিচ্ছে। কিন্তু রূহ মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বাইরে সরাসরি নূরানী তথা রূহের জগত (আলমে আমর) হতে দৃশ্যমান সৃষ্টি জগতে (আলমে খালক) এর মধ্যে এসে মানব দেহে প্রবেশ করছে। সুতরাং দেহ যদিও পৃথিবীতে অবস্থান করে কিন্তু রূহের টান ও আকর্ষণ মহান আল্লাহর প্রতি। এই টান ও আকর্ষণকে যে সব ব্যাক্তি শক্তিশালী করতে পারেন এবং আল্লাহর মারেফত অর্জন করতে পারেন এবং ফানাফিলাহ হতে পারেন তারাই আধ্যাত্মিক শক্তি লাভ করতে সক্ষম হন। আধ্যাত্মিক শক্তিকে আমরা অনেক সময় আত্মিক শক্তিও বলে থাকি। পৃথিবীতে বসে আত্মার উন্নতি প্রয়োজন এবং এই আত্মিক উন্নতির ফলে আধ্যাত্মিক শক্তি জন্মলাভ করে। তাই মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টান পৃথিবীর দিকে আর আধ্যাত্মিক শক্তির টান মহান আল্লাহর দিকে।
দেহ স্থূল, পদার্থের সংমিশ্রণ, পৃথিবীও সেইভাবে সৃষ্ট। তাই দেহ পুরোপুরি মাধ্যাকর্ষণ শক্তির আওতায়। এই দেহটাই আবার নফস বা প্রবৃত্তি। এই নফসের মৃত্যু আছে, কিন্তু রূহের মৃত্যু নেই। তাই পাক কোরাণে বলা হয়েছে ‘কুল নাফছেন জায়কাতুল মউত’ অর্থাৎ সকল দেহের (নফসের) মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। এখানে নফস বলা হয়েছে, ‘রূহ’ বলা হয়নি। পরিভাষায় নফসকে জীবাত্মা বলে ও ‘রূহ’কে পরমাত্মা বলে। তাই রূহের কোন মৃত্যু নেই, কেননা রূহ সরাসরি মহান রবের আদেশ। প্রকৃতপক্ষে রূহ যখন দেহ হতে ইলিন অথবা সিজ্জিনে চলে যায় তখনই এই অবস্থাকে দেহের মৃত্যু বুঝায়। অর্থাৎ আল্লাহর আদেশ যখন দেহের থেকে উঠিয়ে নেয়া হয় বা বের হয়ে যায় তখন দেহ অকেজো হয়ে পড়ে, দেহের শক্তির কার্যকারিতা থাকে না। রূহই তাহলে দেহের সব কিছু, শক্তি ও চালক। এই রূহ বা পরমাত্মা এবং দেহ বা জীবাত্মা এর মিলনেই পূর্ণাঙ্গ মানব দেহ কার্যকরী থাকে এবং বিভিন্ন অণুশীলনের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক শক্তি লাভ করতে পারে।
দেহ বা নফস জাগতিক, অপরপক্ষে রূহ আলোকময়। একটি দৃশ্যমান অপরটি অদৃশ্য জগতের সত্ত্বা। পৃথিবীর শক্তি দেহকে টানে, আলার শক্তি রূহকে টানে। দেহের যেমন পৃথিবীর প্রতি মোহ রয়েছে, তেমনি রূহের আল্লাহর প্রতি মোহ সৃষ্টি করতে হবে। পবিত্র হাদিসে আছে, ‘তুমি আলার বিধি-বিধান মানিয়া চল, তারপর আল্লাময় হয়ে যাও, তারপর তুমিও বলো হও, দেখ হয়ে যায়’। এই বিধি-বিধান বলতে পাক কোরআন ও সুন্নাহ। পাক কোরআন ও সুন্নাহ মেনে চললে, আল্লাহ-রাসুলের নির্দেশ মত আমল করলে, জিকির করলে কলব আলোকময়, নূরানীময় হয়ে উঠবে। সুতরাং আধ্যাত্মিক শক্তির প্রকৃত উৎস কোরাণ ও সুন্নাহ। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি পৃথিবীতে আল্লাহ দিয়ে দিয়েছেন তা অর্জন করতে হয় না, কিন্তু আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জন করতে হয়। এই আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জিত হওয়ার পর এই পৃথিবীতে বসে মানুষ বিভিন্ন মাকাম সফর করতে পারে। তার রূহকে ইচ্ছামতো পৃথিবীর ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন আলমে, মাকামে সফর করাতে পারে। তাই মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মতো আধ্যত্মিক শক্তির অস্তিত্ব রয়েছে। প্রণিধাণযোগ্য যে পৃথিবীতে যার সত্য প্রমাণিত ধারণা রয়েছে, তার অস্তিত্ব রয়েছে।
মোট ছয়টি ইন্দ্রিয়ের মধ্যে পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের সাথে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অর্থাৎ পৃথিবীর সাথে সম্পৃক্ত-চক্ষু,কর্ণ, নাসিকা, জিহবা ও ত্বক। আর ষষ্ট ইন্দ্রিয় ও তৃতীয় নয়নের সাথে রূহ তথা আধ্যাত্মিক শক্তি সম্পর্কযুক্ত। পৃথিবীর সবকিছু আমরা পাঁচটি ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগ ও উপলব্ধি করি ও আত্মা দিয়ে আমরা ঐশ্বরিক শক্তিকে উপলব্ধি করি। ঐশ্বরিক শক্তি আধ্যাত্মিক শক্তির মূল ও উৎস। যেমন কেহ একটি গান ইন্দ্রিয় দিয়ে শুনে আবার কেহ আত্মা দিয়ে শোনে। গানের মাধুর্য কারো ইন্দ্রিয়ের ওপর আপতিত হয়, আবার কারো আত্মার ওপর আপতিত হয়। যার ইন্দ্রিয়ের ওপর গান বা বাজনার প্রভাব আপতিত হয়, সে জগতে উদ্বেগ, ভাবাবেগ ও আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয় এবং তা খারাপ পথে নিয়ে যেতেও পারে। আর এই গান-বাজনা যে আত্মা দিয়ে উপলব্ধি করে বা আত্মা দিয়ে শুনে, সে এর প্রভাব নিয়ে ঐশ্বরিক পথে অগ্রসর হতে পারে, বা তার ঐশ্বরিক শক্তি বলবান হতে পারে। যেমন একজন প্রেমের একটি গান যদি ইন্দ্রিয় দিয়ে শোনে তবে সে ব্যক্তি জৈব প্রেমে উদ্ভুদ্ধ হতে পারে, আর যদি কেহ আত্মা দিয়ে ঐ একই গান শোনে তবে সে আল্লাহর প্রেমে উদ্ভুদ্ধ হতে পারে। মাওলানা জালালউদ্দীন রূমী (রহ.) বাজনা ও এক প্রকার নাচের দ্বারা ঐশী প্রেমে মাতোয়ারা হতেন।
প্রেমে এক ধরনের নেশা ও উন্মাদনা থাকে। ‘প্রেম’ শব্দের সঠিক অর্থ, সংজ্ঞা, প্রকৃতি ও এর সত্ত্বা সম্পর্কে স্বচ্ছ ও পুরোপুরি জ্ঞান না থাকায় আমাদের মধ্যে কিছু ভুল ধারনা কাজ করে। প্রকৃতপক্ষে প্রেম একটি অতি মূল্যবান উপাদান, শক্তি ও শক্তিশালী ঐক্য-বন্ধনের ধারক। এটা সসীমের সাথে সসীম ও সসীমের সাথে অসীমের মিল এনে দিতে পারে তথা আকার ও নিরাকারের মধ্যেও মিলন সৃষ্টি করতে পারে যা ঐশী প্রেম হিসেবে অভিহিত এবং অন্য কোনো শক্তি দ্বারা এই বিষয় সম্পাদন আদৌ সম্ভব নয়। এই শক্তিই অবিচ্ছিন্ন এবং নশ্বর ও অবিনশ্বর বন্ধনের একমাত্র উৎস। আমরা অনেক সময় অপ্রতিরোধ্য আবেগ, সোহাগ, অনুভূতি ও অতি গভীর সম্পর্ক ইত্যাদিকে প্রেম হিসেবে ধারনা করি, যা পুরোপুরি সঠিক নয়।
প্রকৃত প্রেমের জন্ম হৃদয়ে বা অন্তরে, অন্য কোনো শারিরীক অঙ্গে নয় এবং এই প্রেম অন্য হৃদয়কে আকর্ষণ করে থাকে, শরীরকে নয়। প্রেমের সম্পর্ক অন্তর-আত্মার সাথে। শরীর আত্মার বাহন মাত্র, তাই শরীরে এর প্রভাব পড়ে। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির আওতায় পার্থিব জীবনে মাতা-পিতা ও সন্তান, ভাই ও ভাই, বোন ও বোন, ভাই ও বোন, স্বামী ও স্ত্রী, এবং অতি নিকটতম আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে বিভিন্ন সম্পর্ক এবং সর্বোপরি মানবতার প্রতি যেথায় নিঃস্বার্থ সম্পর্ক বিরাজ করে, তাদের মধ্যে প্রেম সৃষ্টি হতে পারে যা পার্থিব প্রেম। তাই কেউ যদি বলে আমি আল্লাহকে ভালোবাসি, অথচ তিনি মাতা-পিতা, ভাই-বোন বা অন্য মানুষকে কষ্ট দেয়, তাহলে তার মধ্যে কোন প্রেম নেই এবং সে মিথ্যা কথা বলে, কারণ আপনজনকে ভালো না বেসে খোদাকে ভালোবাসা যায় না। তাই প্রেম ভালোবাসা প্রথমে পার্থিব সম্পর্কে শুরু হয়ে ঐশী মুখে ধাবিত হতে থাকে।
অতএব, এই প্রেম বিপরীতমুখী লিঙ্গের (স্বামী-স্ত্রী) মিলন দ্বারা সৃষ্ট হয় না। লিঙ্গের মিলন সম্পূর্ণ প্রবৃত্তিগত এবং নিছক জাগতিক, যৌন ক্ষুধা পরিতৃপ্তি ও সন্তান-সন্ততির জন্যে। আধ্যাত্মিক প্রেম সকল জাগতিক বিষয়ের উর্ধে, পবিত্র ও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে অনুভূতিলব্ধ। পবিত্র হাদিসে আছে নবী করিম (সাঃ) এর প্রতি পার্থিব যে কোনো সম্পর্ক ও সম্পদের চেয়ে উম্মতের প্রেম-ভালোবাসা যদি বেশি না হয় তাহলে মুমিন হওয়া সম্ভব নয়। আর এই মুমিন বান্দারাই আল্লাহর বন্ধু যা পবিত্র কোরানে উল্লেখ রয়েছে। নবী করিম (সাঃ) এর প্রতি প্রেম সৃষ্টি হওয়া সম্ভব, কেননা তিনি দৃষ্টির অন্তরালে গেলেও তিনি হায়াতুন নবী, তাই পাক কোরানে তাকে (উম্মতের) সাক্ষী স্বরূপ (ওয়া শাহিদাও) প্রেরণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ আছে, আর খোদার সাথে মানুষের প্রেম স্থাপিত হবে এ কারণের জন্য যে প্রত্যেক মানুষের মধ্যে তিনি ফুঁকে (রুহ) দিয়েছেন যা তার সাথে মানুষের সম্পর্কের বিষয় বলে গণ্য হবে। অধিকন্তু আল্লাহ ¯্রষ্টা আর নবী করিম (সাঃ) রহমত; তাই প্রত্যেক মানুষের ¯্রষ্টার সাথে সম্পর্ক থাকা যেমন প্রয়োজন তেমনি তার রহমতেরও প্রয়োজন। এখানেই মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ও আধ্যাত্মিক শক্তির পার্থক্য ও সম্পর্ক পরিলক্ষিত।
তাই বিমূর্ত প্রেমের জন্ম বিমূর্ত অন্তরে; নারী-পুরুষ এর লিঙ্গে কোনো প্রেমের জন্ম হয় না কারণ যে কোনোই লিঙ্গ মানব দেহের অন্যান্য অঙ্গের ন্যায় একটি অঙ্গ এবং কোনো অঙ্গ প্রেম সৃষ্টি করতে পারে না। স্বামী-স্ত্রীর মিলনের দ্বারা মানব সৃষ্টি সম্পাদিত হয় যা একটি চলমান প্রক্রিয়া যে নিয়মটি অন্যান্য জীব ও প্রাণীর মধ্যেও রয়েছে। ‘লিঙ্গ’ সম্পূর্ণ পার্থিব জীবের একটি অঙ্গ যা অন্যান্য অঙ্গের ন্যায় মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মধ্যে বাস্তব পৃথিবীর প্রতি আকর্ষিত, এটি কোনো বিমূর্ত উপাদান নয়, তাই পঞ্চ ইন্দ্রিয় ও লিঙ্গের সাথে প্রেমের জন্মের কোনো সম্পর্ক নেই; অধিকন্তু রূপ-সৌন্দর্য মোহনীয় মানব দেহের অঙ্গ সৌব ও চেহারার সাথে সম্পর্কিত এবং মানব দেহ ও চেহারা বিভিন্ন অঙ্গের সমন্বয়; সুতরাং আবিষ্টকর রূপ চেহারার প্রতি আকর্ষণ সম্পূর্ণ পার্থিব, তাতে প্রকৃত প্রেম সৃষ্টি হয় না, যদিও মানুষ সর্বোৎকৃষ্ট অবয়বে সৃষ্ট, কাজেই মানবীয় আকর্ষণ ও গভীর সম্পর্কের কারণে যা সৃষ্টি হয় তা জৈব আকর্ষণ বা এক প্রকার পার্থিব ভালোবাসার বন্ধন, তবে এই জাগতিক বন্ধন হতে ঐশী বন্ধনের দিকে ধাবিত হওয়া সম্ভব।
পাক কোরাণে উল্লেখ আছে মানুষের তিন প্রকার নফসঃ নফসে আম্মারা যা পশুবৎ আত্মা, নফসে লওয়ামা যা বুদ্ধিবৃত্তি আত্মা ও নফসে মুতমাইন্না যা শান্তিময় আত্মা। নফসে আম্মারার অধিকারী ব্যাক্তিবর্গ পৃথিবী তথা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির উপরে উঠতে পারে না এবং তারা দুনিয়ায় পাপ ও অন্যায় কাজে লিপ্ত থাকে। দ্বিতীয় আত্মা মাঝপথে অবস্থন করে, অন্যায়ও পাপ করলে আত্মা ধিক্কার দেয় এবং উন্নতির পথে অর্থাৎ মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বাইরে উপরে ওঠার চেষ্টা করে। তৃতীয় শান্তিময় আত্মা আধ্যাত্মিক শক্তির আধিকারী এবং মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অনেক উর্ধ্বে উঠে ঐশী প্রেমে মশগুল থাকে। মৃত্যুর পর এই তৃতীয় আত্মা বেহেশতবাসী হবে।
দেহ মাধ্যাকর্ষণ শক্তির আওতায় থাকে, রূহ তেমনি ঐশী শক্তির আওতায় থাকে। মাধ্যাকর্ষণ ও আধ্যাত্মিক উভয়ই শক্তির স্রষ্টা আল্লাহ। আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান। পাক কোরাণে উলেখ আছে যে মহান আল্লাহ মানুষের শাহ-রগ হতেও অতি নিকটবর্তী। সুতরাং মাধ্যাকর্ষণ শক্তি যেমন মানুষকে টেনে রেখেছে তেমনি মহান আল্লাহর শক্তি আমাদেরকে ঘিরে অর্থাৎ পৃথিবীর সব জীব, বস্তু ও শক্তি আলাহর শক্তির আবেষ্টনের মধ্যে। সুতরাং আল্লাহর অস্তিত্ব সর্বত্র তা মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ও আধ্যাত্মিক শক্তি উভয়ের মধ্যে রয়েছে। লালন ফকির ঠিকই বলেছেন ‘সে আর লালন একখানে রয় লক্ষ যোজন ফাঁক রে’। মানুষ বা জীবজন্তু যেমন মরণশীল এবং সকল বস্তু ধ্বংস প্রাপ্ত হবে এবং পৃথিবীও কেয়ামতের দিন লয় হবে, সেদিক থেকে চিন্তা করলে মাধ্যাকর্ষণ শক্তিও একদিন নি:শেষ হবে, অর্থাৎ তার অস্তিত্ব থাকবে না। সুতরাং এ শক্তি চিরায়ত নয়। পাক কোরাণের সুরা আর রাহমানে উল্লেখ আছে সব কিছু একদিন ফানা হবে কিন্তু মহান শক্তিমান আল্লাহর অস্তিত্ব স্থায়ী থাকবে। কাজেই পৃথিবী ধ্বংসশীল এবং তার সাথে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কার্যকারিতা থাকবেনা, কিন্তু রূহ অমর, তাই আধ্যাত্মিক শক্তি বিলীন হবে না। ঐশী শক্তি অর্জন করলেই আল্লাহর সাথে বিলীন হওয়া যাবে এবং তা চিরস্থায়ী। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি পৃথিবীর, তা মানুষের অর্জন করতে হয় না, কিন্তু ঐশী শক্তি অর্জন করতে হয়, আর এই শক্তি অর্জন করতে হলে এলমে তাসাউফ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের দেহের যেমন রোগ আছে, অন্তরেরও তেমনি রোগ আছে। দেহের রোগের জন্য যেমন ঔষধ আছে এবং তা প্রয়োগে দেহ সুস্থ্য হয়, তেমনি আলাহর দেওয়া বিধি বিধান মেনে চললে আত্মিক রোগ দূর হয়ে যাবে। তাই তাসাউফ বলতে বুঝায় মানুষের মন ও অন্তরের মধ্যে যে কালিমা, পাপ করার প্রবণতা, গর্ব-অহংকার, হিংসা-দ্বেষ, লোভ-লালসা, কাম-মোহ, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি রয়েছে তা দূর করে আলার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। আল্লার ভয় ও তার প্রেম তাসাউফের পথের সন্ধান দিতে পারে। এক কথায় পশুবৎ (নফসে আম্মারা) কর্মকা- বিসর্জন দিয়ে আলার গুণে ভূষিত হওয়াকে তাসাউফ বলে। মহান সুফী হাসান বসরী (রহ:) বলেন ‘একটি শস্য পরিমাণ আত্মিক বিশুদ্ধতা হাজার রাকাত নফল নামাজ ও হাজারটি নফল রোজার চেয়ে উত্তম’। সুরা বাকারায় উল্লেখ আছে : তোমরা আল্লার রঙে রঞ্জিত হও। আল্লার রঙের চেয়ে সুন্দর রঙ কার আছে? সুতরাং আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জন করতে গেলে মানুষকে আল্লার রঙে রঞ্জিত হতে হবে, আল্লার পথে চলতে হবে। প্রতিটি মূহুর্তে আল্লাহর স্মরণে কাটাতে হবে। তবে ঐশী শক্তি অর্জন করা সম্ভব হবে। তাই যেখানে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির আওতায় দেহের ও মনের শক্তির শেষ, সেখানেই আধ্যাত্মিক শক্তির শুরু, তাই আধ্যাত্মিক শক্তি অসাধ্য সাধন করতে সক্ষম।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT