সাহিত্য

প্রতিক্ষার শেষ প্রহর

ডা. এম এ সালাম প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৪-২০১৮ ইং ০০:২৮:৪৬ | সংবাদটি ২০৪ বার পঠিত

প্রতিক্ষা মানেই অসহিষ্ণু কষ্টদায়ক ক্ষণ গণনা। অসহনীয় বিরক্তি নিয়ে বদরুজ্জামান ভিকি হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে ক্ষণ গণনা করে চলেছে। ঠিক পাঁচটায় আসার কথা অথচ ইতিমধ্যে সোয়া পাঁচটা বেজে গেছে কিন্তু মাহজাবিন নিশার ছায়াটি দেখা যাচ্ছে না। বেলা দ্রুত গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। নীড়েফেরা পাখীদের কলকাকলিতে গোটা সোহরাওয়ার্দি উদ্যান মুখরিত। এই উদ্যাটিকে আজকাল লোকে প্রেমকুঞ্জ বলে তার কারণ, সারাক্ষণ সারাবেলা রাজধানীর সমস্ত প্রেমিক-প্রেমিকাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। তরুণ-তরুণীরা উদ্যানের রোমান্টিক পরিবেশে মন খুলে কথা বলতে পারে। প্রয়োজনে জড়িয়ে ধরে উষ্ণ হৃদয়ের না বলা কথা শোনতে ও বুঝতে পারে। এই ভাষাটিই হচ্ছে নিখুত প্রেমের ভাষা। ভালোবাসার ভ্রুণ। এই প্রেমের আকর্ষণ ও বিকাশ পৃথিবীর প্রথম মানব-মানবী থেকে শুরু হয়েছে এবং এটা শেষ সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলতে থাকবে। বিনোদন এবং প্রেম শব্দ দুটি আদিকালের সৃষ্টি হলেও এরা প্রতিদিন নতুন এবং একটি অন্যটির পরিপূরক। বিনোদনের জন্য যেমন পাখী ডাকা, ফুলফোটা, ছায়াতরু সমৃদ্ধ লোকালয় থেকে একটু দূরে এক টুকরো সুন্দর পরিবেশ-বান্ধব ভূ-খ-ের দরকার, ঠিক তেমনি এই পরিবেশকে গীতিময় বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত করতে স্বপ্নে ভরা তরুণ-তরুণীদের অবাধ বিচরণ ভূমিতে পরিণত করতে সহায়ক সবকিছু নগরবীদদের নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, এটা সময়ের চাহিদা। বিনোদন যেমন গান শোনা, সিনেমা-নাটক দেখা, খেলাধুলা, গল্পকরা, প্রেমালাপ, কবিতা আবৃত্তি এবং বিভিন্ন বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ও আড্ডা মারা ইত্যাদি। এই পৃথিবীতে সুন্দর করে বাঁচতে হলে প্রত্যেকটি নর-নারীকে প্রতিদিন কিছুটা সময় বিনোদনের জন্য সংরক্ষণ করা দরকার। বিনোদনের মাধ্যমে প্রেমালাপ এবং প্রেমালাপ থেকে ভালোবাসার জন্ম। তাই বলতে হয় পরিবেশ, বিনোদন এবং প্রেম একটি পরিপূর্ণ জীবনের পূর্বশর্ত।
ভিকির স্বগতোক্তি ঃ দূর ছাই। আমি অতোসব কি ভাবছি। আমি নিজেই তো প্রতিক্ষার শিকার। এই প্রতিক্ষার শেষ কখন? উঠে গিয়ে সামনের দেবদারু গাছের নিচে মার্বেল পাথরের তৈরি একটি বেঞ্চের উপর বসল। বসে, ফেলে আসা দিনগুলোর কথা যেমন নিশার সাথে পরিচয়, প্রেম-ভালোবাসা এবং বিয়ের অঙ্গীকার ইত্যাদি রোমন্তন করতে লাগল...
সেদিন ছিল থার্টিফাস্ট নাইটের মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানমালা। গোটা মহানগর জুড়ে আনন্দের বন্যা। স্ট্রীট কর্ণার এবং ফাঁকা জায়গাগুলোতে পথ নাটক এবং গানের আসর। তরুণ-তরুণীদের অবাধ বিচরণ। ঠিক এমনি সময় কয়েকটি ককটেল ফোটার বিকট শব্দ হল এবং সাথে সাথে নারী-পুরুষের আর্তচিৎকার, পুলিশ ও এম্ব্যুলেন্সের হর্ণ ইত্যাদি গোটা শহর নিমিষেই প্রেৎপুরীতে পরিণত হল। ভিকি শপিংমলের এক কর্ণারে চুপটি মেরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু কোনো যানবাহনের চিহ্নটিও পাওয়া যাচ্ছিল না। রাস্তাঘাট ফাঁকা, লোকজন প্রাণ নিয়ে পালাচ্ছে, ভিকি দেখলো টল ফিগারের শাড়ীপরা অতি সুন্দরী একটি মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে তার সামনে দিয়ে দৌড়াচ্ছে। ভিকি ঝড়ের বেগে দৌড়ে গিয়ে মেয়েটির হাত ধরে বলল: কোথায় দৌড়াচ্ছেন। শুনছেন না সামনে গুলাগুলি ও মানুষের আর্ত চিৎকার। মেয়েটি বলল: আপনি কে ভাই, আমাকে বাঁচান, বলে জড়িয়ে ধরল ভিকিকে। ঠিক সেই মুহূর্তে একখানি সিএনজি তাদের পাশ দিয়ে দ্রুত পালাচ্ছিল। ভিকি সিগনাল দিয়ে সিএনজিকে থামিয়ে মেয়েটিকে নিয়ে দ্রুত উঠে বসে বলল: ড্রাইভার পরিবাগ যাও। পরিবাগ বাসার সামনে সিএনজি এসে থামলে ভিকি মেয়েটিকে নিয়ে বারান্দায় উঠে চাবি দিয়ে দরজা খুলে ড্রয়িংরুমে ঢুকে লাইট অন করল। মেয়েটি কৌতুহলী কন্ঠে বলল: কি ব্যাপার। আপনি চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলেন। বাসায় কেউ নেই? আই মীন্, আপনার পরিবার, আপনার স্ত্রী ইত্যাদি কেউ বাসায় নেই কেন? আপনি একা একা থাকেন নাকি? ভিকি চমক লাগানো হাসি দিয়ে বলল: জ্হিব হ্যাঁ, আমি একাই থাকি। আমার পরিবার সবাই লন্ডনে থাকে। আর স্ত্রীর কথা বলছেন, আমি তো বিয়েই করিনি, স্ত্রী আসবে কোত্থেকে। তবে হ্যাঁ, এবার বোধহয় আমার বউ খোঁজার প্রতিক্ষার শেষ প্রহর সমাগত। এতোকাল যাকে খুঁজছিলাম, আমার বিশ্বাস তাকে পেয়ে গেছি। বাকীটুকু সময় ও ভাগ্যের উপর নির্ভরশীল। ভিকি হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল: হাই; আমি বদরুজ্জামান ভিকি। ঢাকা ভার্সিটির ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স শেষ বর্ষের ছাত্র। আর তুমি? মুক্তাঝরা নয়নকাড়া নিঃশব্দ হাসি দিয়ে বলল: আমার নাম মাহজাবিন নিশা। সবাই নিশা বলে ডাকে। আমিও ঢাকা ভার্সিটির বাংলা সাহিত্যের শেষ বর্ষের ছাত্রী। কিন্তু আমার কাছে অবাক লাগছে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি কিন্তু ভিকি, একজন সুদর্শন নায়কের সাথে কোনোদিন দেখা হলো না কেন? ভিকি হেসে বলল: কারণ, সময় অপেক্ষায় ছিল আজকের মতো একটা নাটকীয় ঘটনার মাধ্যমে দুজনকে কাছে টেনে এনে ভালোবাসার বরণমালা পরিয়ে দিতে। থার্টিফাস্ট নাইট, তোমাকে ধন্যবাদ। হে বরেণ্য রজনী, তুমি এক লহমায় সে বিশাল কাজটি করে দিলে, আমরা সারাজীবন তোমার কাছে ঋণী থাকব। প্রবাদ আছে সময় ও ¯্রােত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। কিন্তু তোমার-আমার ব্যাপারে এই প্রাচীন বাক্যটির একটি ভিন্ন অর্থ আবিষ্কার করলাম। অর্থাৎ সময় টিকই অপেক্ষায় ছিল ঐরকম একটি দুর্যোগ সৃষ্টি করে দুটি তৃষ্ণার্ত হৃদয়কে এক ঝটকায় পরিচয় করিয়ে পরিণয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে। নিশা আমার অ্যানালাইসিসটা তোমার কাছে কতটুকু যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়? নিশা ঝরঝরে হাসি দিয়ে বলল: ভিকি, পৃথিবীতে সবসময় কিছু সুবিধাবাদি মানুষ থাকে যারা নিজেদের প্রয়োজনের তাগিদে প্রবাদ বাক্যের ভিন্ন অর্থ খুঁজে কিন্তু প্রবাদ কখনো রঙ বদলায় না, নিয়ম-রীতি পাল্টায় না, এটা বহমান আছে এবং চলমান থাকবে অনন্তকাল। ভিকি উঠে এসে নিশার পাশে সোফায় বসে তার হাত ধরে বলল: নিশা, আমাকে ক্ষমা কর। সময় ও ¯্রােতের থিওরি তোমার কাছে উত্থাপন করা আমার ভুল হয়েছে, তুমি বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী, আরো কতো তত্ত্বকথা শোনাবে। আমি অতোসব বুঝি না। তবে সময়ের তথ্য আমার কাছে সঠিক কারণ, সময় আমাকে আমার গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে। আমি সময় তত্ত্বের কাছে ঋণী। আমি নদীতে কখনো ঝাঁপ দেইনি তাই ¯্রােতের তত্ত্বকথা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। নিশা, তুমি তোমার আঁচল দিয়ে আমাকে বেঁধে রেখো যেন ¯্রােত আমাকে তোমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে না যায় কারণ, আমি যে সাঁতার জানি না। নিশা ভিকির গালে হাত বুলিয়ে বলল: ওহ, মাই ডিয়ার ভিকি একটু আগে ঐ স্ট্যাম্পীড অবস্থা থেকে যদি তুমি আমাকে জোর করে ধরে না আনতে তাহলে অতোক্ষণে তথাকথিত ধর্মান্ধ প-িতেরা আমার কি অবস্থা করতো, ভাবতেই আমার গায়ের লোম শিউরে উঠছে। ভিকি, তুমি আমাকে আজ এক নতুন জীবন দিয়েছ। এক বর্ণিল স্বপ্নময় ভূবনে তুলে এনেছ। তা না হলে এতোক্ষণে কোন বিড়ম্বনার শিকার হতাম, ভাবতেই কান্না পাচ্ছে। ভিকি তোমার কাছে চিরঋণী হয়ে রইলাম। ভিকি মোহনীয় হাসি দিয়ে বলল: দেখ নিশা, আমি ব্যাংকার নই তাই ঋণ টিনের হিসাব-নিকাশ আমি বুঝি না। আমি বুঝি প্রেম, ভালোবাসা, বিবাহ এবং সংসার। আর ওগুলোই হচ্ছে একটি সুখী-সমৃদ্ধ জীবনের ইতিকথা। এর প্রথম সোপান হচ্ছে পছন্দ, ভালোলাগা এবং চুম্বকের মতো আকর্ষণ এবং সর্বশেষ পরিণয়। এটা নাটক-নভেলের চটকদার সংলাপ নয়। এটা হচ্ছে প্রকৃত ভালোবাসায় মোড়া দাম্পত্য জীবন। যে জীবন সত্য ও সুন্দরের কথা বলে আর অকল্যাণ এবং অসুন্দর থেকে বাঁচিয়ে রাখে। দাম্পত্য জীবন হলো দু’টি কুঁড়ি একটি ফুল, দু’টি দেহ এক মন আর সর্বাবস্থায় সমঝোতায় বসবাস। ত্রুটি-বিচ্যুতি, ভুল বুঝাবুঝি এবং সংঘাত জীবনের কোনো এক পর্যায়ে আসতেই পারে। তবে সহিষ্ণু মানসিকতা ও প্রেমের অটুট বন্ধন দিয়ে সম্পর্ক ধরে রাখতে হয়। এটা হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ একটি তৃপ্তিময় সুখী দাম্পত্য-জীবনের শেষ কথা। এবার নিশা ভিকির ডান হাতখানি তার মুঠোর মধ্যে পুরে বসন্তে সদ্যফোঁটা কৃষ্ণচূড়ার রঙিন হাসি দিয়ে বলল: ভিকি, এবার থাম। তোমার নান্দনিক কথাবার্তা শোনে আমি মুগ্ধ হয়েছি। ইতিমধ্যে তুমি আমাকে হিপনোটাইজ করে ফেলেছ। যা শোনছি তা-ই ভালো লাগছে। মন বলছে হাঁ, জীবনটা এমনি হওয়া উচিত। কিন্তু অহরহ পত্রিকার পাতায় দাম্পত্য জীবনের বহু ভয়ঙ্কর পরিণতি দেখি, ভালোবাসায় অসহনীয় আর্তনাদ শুনি, সুন্দর সুন্দর স্বপ্নগুলো নরকে পতিত হতে দেখি, তখন প্রেম-ভালোবাসার প্রতি ভীতি ও অবিশ্বাস তৈরি হয়। মন বলে, ঐ সুন্দর সুন্দর সংলাপ আর আবেদনময়ী দৃশ্যাবলী- কেবল ছায়াছবির পর্দায়ই মানায় ভালো, কিন্তু বাস্তবে দিবাস্বপ্ন ছাড়া কিছুই নয়। ভিকি, আমার এই শঙ্কা ও ভীতিগুলো তুমি কি দিয়ে খন্ডন করবে? ভিকি বলল নিশা তবে মন দিয়ে শোন: এই পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে মানুষ বাস করে, ফেরেশতারা নয়। প্রতিটি মানুষের মন-মানসিকতা ভিন্ন। চাওয়া পাওয়া ভিন্ন। স্বপ্ন ও প্রত্যাশা ভিন্ন। স্বভাব-চরিত্র ভিন্ন। শিক্ষা-দীক্ষায় তারতম্য। জীবন কি, প্রেম-ভালোবাসা কিসের জন্য বুঝার মতো প্রজ্ঞার অভাব। দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও কমিটমেন্টের প্রতি বিশ্বাস না থাকা। পূর্ণিমা এবং অমাবশ্যা, দুই পর্বে চন্দ্রমাস, আবহমান কাল থেকে মানব চরিত্রেও এই দুই বর্ণের মানুষ বাস করে আসছে। এটাই পৃথিবী এবং এই দুই পর্বের রাতদিন নিরীক্ষা করে সঠিক পথে আমাদেরকে এগুতে হবে। মানুষ বদলাতে পারে, কিন্তু শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষ কখনো বদলায় না। তাই দুই মেরুর সহঅবস্থান অনাদিকাল থাকবেই। এই বৈরী পৃথিবী থেকে নিজের জন্য সুন্দর একটি ছোট্ট পৃথিবী খুঁজে বের করার মাঝেই প্রকৃত ভালোবাসার বসবাস। পূর্ণাঙ্গ জীবন, সুন্দর পৃথিবী।
নিশা গভীর আগ্রহ নিয়ে ভিকির দর্শন শুনতে শুনতে বলল: ভিকি, তোমার জীবনবোধ চমৎকার, পৃথিবীর স্বরূপ উদঘাটন আরো মোহনীয়। তোমার সুচিন্তিত বক্তব্যগুলো দারুণ হৃদয়গ্রাহী। এই যে জীবন ঘনিষ্ট আবর্তন-বিবর্তনের তত্ত্বকথা যা বললে তা নিঃসন্দেহে বিজ্ঞান ভিত্তিক কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে ঐ দর্শন নিয়ে খুব অল্প সংখ্যক লোকই ভাবে বলে আমার বিশ্বাস। তা না হলে অহরহ দাম্পত্য কলহ, আত্মহত্যা এবং ডিভোর্সের মতো ঘটনা ঘটত না। ভিকি তোমার পর্যবেক্ষণ সঠিক, সুন্দর পৃথিবীর জন্য সুন্দর মন-মানসিকতা সম্পন্ন মানুষের দরকার। ভিকি বলল: নিশা তোমাকে আমার অন্তরের অন্ত:স্থল সিক্ত ধন্যবাদ। তোমার অনুভব এবং বিচক্ষণতা প্রখর। এটা একটা বিশেষ গুণ, সচরাচর মানুষের মাঝে পাওয়া যায় না। নিশা তুমি একটু বস, আমি কফি তৈরি করে নিয়ে আসছি। সাথে ম্যাকডোনাল্ড-এর পিজা। তোমার খুব ভালো লাগবে বলে আমার বিশ্বাস। নিশা বলল: ভিকি থাম। কফি তৈরি আমার কাজ। এসো কিচেনে, কফি বানিয়ে নিয়ে আসি। আর শুধু কফি কেন, রাত অনেক হয়েছে, তুমি বললে ডিনারও তৈরি করি। দু’জনে মিলে এক সাথে খাব। এটা আরো আনন্দের ব্যাপার।’ ভিকি উৎফুল্লচিত্তে বলল: ওহ্ মাই সুইট নিশা, এই প্রস্তাবটি তোমাকে দেব কি-না আমি নিজেই ভাবছিলাম। ভয় হচ্ছিল, পাছে তুমি কিছু মনে করো কি-না। বিষয়টি বাড়াবাড়ি হয়ে যায় কি-না ইত্যাদি নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। আমার সংশয় দূর করার জন্য তোমাকে আবারও ধন্যবাদ। নিশা জ্যোৎ¯œাঝরা হাসি দিয়ে বলল: ভিকি, ধন্যবাদ একটি ওজনদার শব্দ। আপাতত: ওটা ধরে রেখো, রান্না বান্না শেষ হোক। খাওয়া-দাওয়া শেষে কেবল তখনই বলতে পারবে জীবনে দ্বিতীয়বার রান্নার জন্য আমাকে বলবে, না নিজেই রেঁধে আমাকে খাওয়াবে!’ ভিকি মুগ্ধ নয়নে নিশার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর তার ডানহাতখানি মুখের কাছে এনে কয়েকবার চুমু খেয়ে বলল: নিশা তোমাকে দেখার পর বিশ্ব নন্দিত গায়ক প্রয়াত মোহাম্মদ রফির সেই বিখ্যাত গান- ‘চাঁদনী কা চাঁন্দ হ, ইয়া আফতাব হ, য-ভীঁ হ তুম্, খোদা-কী কসম, লা জবাব হ।’ অর্থাৎ ‘তুমি, চাঁদের জ্যোৎ¯œা অথবা সোনালী সূর্য, তুমি যেটাই হও, খোদার কসম, তুমি অতুলনীয়া।’ তুমি হলে সেই চাঁদের জ্যোৎ¯œা। তোমার হাতের ছোঁয়া যেটায় লাগবে সেটাই সোনা হবে।’ নিশা নি:শব্দ হেসে ভিকিকে থামিয়ে বলল: ভিকি তুমি সুন্দর, তোমার মন সুন্দর, তোমার উপমাগুলো আরো চমৎকার। কারণ, সুন্দর মনের মানুষ না হলে ঐ ধরনের সুন্দর কথামালা, সুন্দর উপমা সাধারণ মানুষের মন-মগজে আসা সম্ভব নয়। ¯্রষ্টাকে অশেষ ধন্যবাদ, তিনি সমমনা দুজন মানুষকে এক ঝটকায় পাইয়ে দিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে যার জন্য অধীর আগ্রহে আমরা অপেক্ষায় ছিলাম।
সময়ের পথ ধরে ভিকি ও নিশার বন্ধুত্ব প্রগাঢ় ভালোবাসায় পরিণত হল। প্রতিদিন অন্তত একটিবার সাক্ষাৎ না হলে মন-মস্তিষ্ক যন্ত্রণায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কাজ কর্মে মন বসে না। এমনি এক অসহিষ্ণু জ্বালা যা কথা দিয়ে বুঝানো যায় না, কেবল অন্তর দিয়ে অনুভব করা যায়। প্রেমের জ্বালা যে কি ভয়ঙ্কর উত্তাপ তা কেবল প্রেমিক-প্রেমিকা যারা প্রেমের বন্ধনে আসক্ত, কিন্তু এখনও বিয়ে করেনি এই যে বিয়ের অপেক্ষায় প্রেম, এই মধ্যবর্তী সময়টুকু পৃথিবীতে সবচেয়ে ভারী কষ্টের উপলব্ধি আর অফুরান প্রতিক্ষা। এমনি যন্ত্রণার ভাষায় যখন ভিকি মগ্ন ঠিক তখনই তার মুঠোফোন বাজল। ভিকি বলল: হ্যালো নিশা, কেমন আছ, কি ব্যাপার? অত্যন্ত ক্লান্ত কন্ঠে ওপাশ থেকে জবাব এলো: ভিকি আজ বিকাল চারটায় আমার বাসায় এসো, খুব জরুরি কথা আছে। এসো কিন্তু,্ এখন রাখছি। মুঠোফোনটি টেবিলের উপর রেখে ভিকি ভয়ঙ্কর যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল। বিষয় কি। মনে হলো নিশা কাঁদছে। যে মেয়েটি সদা প্রফুল্ল থাকে, মিষ্টি হাসি ছাড়া কথা বলতে পারে না, যার কথাবার্তায় বসন্তের ফুরফুরে হাওয়ার ঝটকা থাকে সেতো সহজে কাঁদতে পারে না। ভিকি দ্বিধাদ্বন্দ্বে দোল খেতে খেতে বিকাল চারটায় নিশার বাসায় গিয়ে কলিংবেল টিপল। ফুফু দরজা খুলে বললেন: ও, ভিকি, এসো, ভিতরে এসে বস।
নিশা ঘুমোচ্ছে। গতরাত আমেরিকা থেকে তার বাবা টেলিফোনে দীর্ঘক্ষণ কথাবার্তা বলেছেন, এরপর থেকেই নিশার মোড অফ হয়ে আছে। সে যে খুব একটা অস্বস্থিতে আছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমি বললাম: নিশা কি হয়েছে। বাবার সঙ্গে আলাপ শেষে এমন আপসেট হয়ে গেলে কেন? তুর বাবা কি বলেছে? নিশা বড় কষ্টের সাথে জবাব দিল: ও কিছু না ফুফু। তুমি অতোসব বুঝবে না। এমনি সময় নিশা ড্রয়িংরুমে এসে ঢুকল। বলল: ভিকি এসেছ, বস। তোমার সাথে জরুরী কথা আছে। ফুফু আমাদের জন্য একটু চা-নাস্তা পাঠিয়ে দিয়, প্লিজ। ফুফু বললেন: হ্যাঁ মা, পাঠাচ্ছি। তোমরা গল্প কর। ফুফু চলে গেলে নিশা ভিকিকে সোফা থেকে টেনে তুলে গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে আঁকড়ে ধরে বলল: ভিকি সবকিছু মোর উঝাড় করে দিয়েছি তোমায় তুলে। তুমি শুধু আমার এবং আমারই। জীবনে তুমি, মরণে তুমি। তুমি আমার আশা-নিরাশার শেষ অবলম্বন। পৃথিবীর সমস্ত ক্ষমতা আমাকে তোমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। আর দৃঢ় প্রত্যয় জন্মেছে যে, সমস্ত পৃথিবীর বিনিময়ে তুমিও আমাকে চাও। আমাদের প্রেম, আমাদের ভালোবাসা জগতের এক শ্রেষ্ঠ সম্পদ যা কোনোদিন বিলীন হবে না। আমৃত্যু এই বন্ধন অম্লান অক্ষত থাকবে। ভিকির চোখ থেকে জল টপটপ করে নিশার কপালে, গালে পড়তে লাগল। ভিকি বলল: নিশা, আসলে ব্যাপারটা কি? তুমিও কাঁদছো, আমাকেও কাঁদাচ্ছ, কিন্তু কেন, কি হয়েছে? ‘তাড়াতাড়ি খুলে বলো, আমি অজানা এক যন্ত্রণায় পুড়ে যাচ্ছি। নিশা বলে তবে শোন: গতরাতে আমেরিকা থেকে বাবা টেলিফোন করে বলেছেন, আগামীকাল সন্ধ্যা ছয়টা পনের মিনিটের ফ্লাইটে ঢাকা ত্যাগ করি। ট্রাভেল এজেন্সি থেকে সকালে টিকিট ও বোডিং কার্ড দিয়ে গেছে। নিশার কথা শেষ হতে না হতে ভিকি নিশাকে ছেড়ে ধপ করে সোফায় বসে পড়ল। তার মনে হলো উপরের আকাশটা ভেঙে তার মাথায় পড়েছে। তাকে রীতিমত অসুস্থ মনে হলো। নিশা তাড়াতাড়ি পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল: ভিকি তাড়াতাড়ি পানি খাও। শান্ত হও। তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে আমাকে শান্তনা কে দেবে। ভিকি গটগট করে পানি খেয়ে বলল: নিশা এভাবে হঠাৎ তেমাকে ডেকে নেবার কারণ কি? বিয়ে-শাদীর কোনো ব্যাপার নয়তো যা তুমি আমাকে বলতে পারছ না। নিশা বলল: সম্

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT