সাহিত্য

রবীন্দ্রনাথ ও নীলেশ্বর মুখার্জি

নৃপেন্দ্রলাল দাশ প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৪-২০১৮ ইং ০০:২৯:২০ | সংবাদটি ৬৪ বার পঠিত

১৯১৯ সালের ৪ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ সিলেট এসে পৌঁছেন। তাঁকে রাখা হয়েছিল পাদ্রী উখাস সাহেবের বাংলায়। সেই বাংলোর দরজা জানালার পর্দা মনিপুরী কোমর তাঁতে তৈরি করা ছিল। অপূর্ব বয়ন শিল্পের নিদর্শন ছিল সেই পর্দাগুলি। টেবিলের উপর ছিল মহামূল্যবান মণিপুরী চাদর। প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা দিয়েছেন সুধীরেন্দ্রনারায়ণ সিংহ- ‘বাংলোর বহির্দ্বারে টাঙানো ছিল মণিপুরীদের তৈরি প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরনো একখানা আচ্ছাদন বস্তু। স্থানান্তর থেকে পর্দাখানা আনীত হয়েছিল। ঐ আচ্ছাদন বস্ত্রে মণিপুরীদের শিল্প নৈপূণ্যের পরিচয় পেয়ে কবি মুগ্ধ হলেন। ইচ্ছে হলে পর্দাটি শান্তিনিকেতনের জন্যে নিয়ে যেতে পারেন এ কথা বলায় কবি বললেন, ‘এ যে দিনে দুপুরে ডাকাতি’।
২০ কার্তিক, বৃহস্পতিবার, ১৩২৬ বাংলা, ৬ নভেম্বর ১৯১৯ সকালে টাউন হলে সিলেটের জনগণের পক্ষে কবিকে সংবর্ধনা জানানো হয়। দুপুরে কবিগুরু যান মুরারিচাঁদ কলেজের অধ্যাপক নলিনী মোহন শাস্ত্রীর বাসভবনে মধ্যাহ্নভোজে যোগ দিতে। বেলা ২ টায় ব্রাহ্মমন্দিরে সিলেটের মহিলারা কবিকে সংবর্ধনা জানায়। ৩ টায় সদলবলে যান সিলেট শহরের সন্নিকটবর্তী মাছিমপুর গ্রামে। আবার সুধীরেন্দ্রকে উৎকলন করি- ‘মণিপুরীদের বস্ত্র শিল্পে নৈপুণ্যের পরিচয় পাবার পর থেকেই মণিপুরী তাঁত এবং তাদের জীবনযাত্রা প্রণালী দেখবার জন্যে কবির প্রবল ইচ্ছা হয়েছিল। মহিলা সমিতি থেকেই মণিপুরী পল্লী পরিদর্শন করার উদ্দেশ্যে তিনি মাছিমপুর গিয়ে পৌঁছলেন।’ মাছিমপুরে মণিপুরী ছেলেরা রাখাল নৃত্য দেখালো। রাতে মেয়েরা পাদ্রী টমাসের বাংলাতে গিয়ে রাসনৃত্য দেখায়। এই রাখালনৃত্য দলে ছিলেন নীলেশ্বর মুখার্জি। পরবর্তীকালে তিনি শান্তিনিকেতন যান মণিপুরী নৃত্যের শিক্ষক হয়ে।
দুই.
মাছিমপুরে রবীন্দ্র সংবর্ধনার বর্ণনা দিয়েছেন একজন মণিপুরী লেখক রবিবাবু সিংহ, তাঁর ‘মণিপুরী নৃত্য ও রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে। তিনি লিখেছেন- ‘উৎসবাদি অনুষ্ঠানে অতিথিগণের অভ্যর্থনা কাজে কর্তব্যরত যোগ্য ব্যক্তি বিশেষকে মণিপুরী ভাষায় ‘সম্ভাষা’ (সম্ভাষণ করে যে) বলা হয়। সে দিন ২০ শে কার্তিক ১৩২৬, ৭ নভেম্বর (সঠিক তারিখ হচ্ছে-৬ নভেম্বর) ১৯১৯ গ্রামে নাটমন্দিরের প্রবেশ পথে মাঙ্গলিক কদলীবৃক্ষে সুশোভিত আর কাগজ কাটা ফুল পাতা দিয়ে সাজানো সুদৃশ্য তোরণদ্বার। ঘন ঘন শঙ্খ ধ্বনি চলছে, তার মধ্য দিয়ে কবিগুরুকে বরণ করেন। নিবেদন ‘সম্ভাষা মহাশয়’, যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে।
রবীন্দ্রনাথ ফেরার পথে মণিপুরী বস্ত্র ক্রয় করেন। শ্রীনিকেতনে এই বয়নশিল্পের কাজ আরম্ভ করতে চান। সবচেয়ে ভালো লাগে তাঁর মণিপুরী নৃত্য। তিনি শান্তিনিকেতনে এই নৃত্যের শিক্ষণ কাজ আরম্ভ করতে চান। বেশ কয়েকজন মণিপুরী নৃত্য শিক্ষক বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষক হিসেবে শান্তিনিকেতনে যান তাদের অবদানের কথা আমরা জেনে নিতে চাই। বিশেষ করে কমলগঞ্জ উপজেলার বালি গাঁওতে জন্মগ্রহণকারী প্রখ্যাত মণিপুরী নৃত্যাচার্য নীলেশ্বর সম্পর্কে। হরিদাস সিংহ নামের একজন শিক্ষক বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় একটি বই লিখেছেন নীলেশ্বর মুখার্জি সম্পর্কে।
তিন.
মহারাজ বীরেন্দ্রকিশোর মানিক্যকে লেখা একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ মণিপুরী নৃত্য শিক্ষক সংক্রান্ত নানা তথ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। রবীন্দ্রপত্রটি উৎকলন করি-
ওঁ
বহুমানভাজলেষুন, শান্তিনিকেতন
মহারাজ, বুদ্ধিমন্ত সিংহকে আশ্রমে-পাঠাইয়াছেন সে জন্য আমরা আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ হইয়াছি। ছেলেরা অত্যন্ত উৎসাহের সহিত তাহার নিকট নাচ শিখিতেছে। আমাদের মেয়েরাও নাচ ও মণিপুরী শিল্প কার্য্য শিখিতে ঔসুক্য প্রকাশ করিতেছে। মহারাজ যদি বুদ্ধিমন্ত সিংহের স্ত্রীকে এখানে পাঠাইবার আদেশ দেন তবে আমাদের উদ্দেশ্য সাধিত হইবে। আমাদের দেশের ভদ্রঘরের মেয়েরা কাপড়বোনা প্রভৃতি কাজ নিজের হাতে করিতে অভ্যাস করে ইহাই আমাদের ইচ্ছা। এই জন্য আসাম হইতে একজন শিক্ষয়িত্রী এখানকার মেয়েদের তাঁতের কাজ শিখাইতেছে। কিন্তু শিলেটে (সিলেট) আমি মণিপুরী মেয়েদের যে কাজ দেখিয়াছি তাহা ইহার চেয়ে ভালো। আমি বুদ্ধিমন্তের নিকট আমার প্রস্তাব জানাইয়াছি। সে মহারাজের সম্মতি পাইলেই তাহার স্ত্রীকে আনাইয়া এখনকার মহিলাদিগকে মণিপুরী নাচ ও শিল্পকার্য্য শিখাইবার ব্যবস্থা করিতে পারিবে এইরূপ বলিয়াছে। এ জন্য এ সম্বন্ধে মহারাজের সম্মতি ও আদেশের অপেক্ষায় করিয়া রহিলাম।
ভগবান আপনার কল্যাণ করুন এই কামনা করি। ইতি
১৯ মে মাঘ ১৩২৬
শুভানুধ্যায়ী
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
এই পত্রের আলোকে শান্তিনিকেতনে মণিপুরী শিক্ষক প্রেরণ করার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়। বুদ্ধিমন্ত সিংহ বেশি দিন ছিলেন না। তবু তিনি মণিপুরী নাচ শেখানোর সূত্রপাত করে এসেছিলেন। তারপরে যান নবকুমার সিংহ রাজকুমার।
নবকুমার শান্তিনিকেতনে ছিলেন কয়েক বছর। তারপর আম্বালাল সারা ভাইয়ের আমন্ত্রণে তার বড় ভাইয়ের ছেলে নরেন্দ্র কুমার সিংহকে নিয়ে আহমেদাবাদে যান। সাত বছর সেখানে ছিলেন। পরে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে শ্রীলংকা যান।
‘শাপমোচন’ নৃত্যনাট্যে তিনি অংশগ্রহণ করেন। তারপর যান চন্দ্রজিৎ সিংহ রাজকুমার। তিনিও নৃত্য নাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’ অভিনয়ে অংশগ্রহণ করেন। তারপর যান রাসধারী নরোত্তম সিংহ। ১৯৩১ সালে সেনারিক সিংহ রাজকুমার শান্তিনিকেতন যান, তিনি নতুনভাবে সিলেবাস তৈরি করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মণিপুরী নৃত্যধারা শিল্প দিতে থাকেন। আরেক জন মণিপুরী নৃত্যগুরু আতম্বা সিংহ ‘আবৌবা ভঙ্গীপারে’; ‘বড় ভঙ্গি’ রবীন্দ্রনৃত্যে প্রবর্তন করেন।
চার.
নীলেশ্বর মুখোপাধ্যায় কমলগঞ্জের বালীগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে কৈলাশহরের মশাউলি গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সচিব অনিলকুমার চন্দকে শিলচর পাঠান। ষ্মচ্ছঘাট গ্রামের কৃষ্ণকুমার সিংহ নীলেশ্বরের নাম প্রস্তাব করেন। তিনি ছিলেন মূলত: মৃদঙ্গশিল্পী, তাঁর মৃদঙ্গবাদন ও নৃত্য দেখে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে যাবার জন্যে অনিল কুমার তাঁকে আহ্বান করেন। ১৯৩৫ সালে নীলেশ্বর শান্তিনিকেতন যান।
রবীন্দ্রনাথ উত্তরায়নের দ্বিতলে বসে আছেন। অনেক দর্শনার্থীর ভীড়। হঠাৎ কবিগুরু বলেন- ‘আজ নীলেশ্বর মুখার্জির আসার কথা- তাই না?’ তখন নীলেশ্বর মুখার্জি ভীড়ের মধ্য থেকে বলেন- ‘হ্যাঁ, গুরুদেব আমি এসেছি।’ ১৯১৯ সালে ৬ নভেম্বর সিলেটের মাছিমপুরে নীলেশ্বর মুখার্জির রাখালনৃত্য দেখে রবীন্দ্রনাথ ১০/- টাকা পুরস্কার দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বলেন, তোমাদের মণিপুরী সংস্কৃতির কোন গান গেয়ে শোনাও।
নীলেশ্বর গাইলেন
‘সাজল কুসুম শেজ বিছাওল/ বারই বায়ল বাতি রসে খাতি।’
গানটি কত মাত্রার। নীলেশ্বর বলেন, বারো মাত্রার। আমার মনে হয় চৌদ্দ মাত্রার। পরে মৃদঙ্গ বাজিয়ে তাল যে ১৪ মাত্রার সেটা রবীন্দ্রনাথকে বুঝিয়ে দেন।
নীলেশ্বরকে কবিগুরুর খুব পছন্দ হয়েছিল। তাঁর শান্ত স্বভাব ও গুণী শিল্পীর গুণ দেখে মুগ্ধ হন। নীলেশ্বরের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ একটি বিদায়গীতি লিখে দিয়েছিলেন। গানটি হচ্ছে-
যাবে, যাবে হে নিজালয়ে/ তোমায় বিদায় দিতে/ যত দুঃখ হয় চিত্তে।
নীলেশ্বর মুখার্জি শান্তিনিকেতনে স্বপাকভোজী ছিলেন। তাঁর মণিপুরী রান্না খুব সুস্বাদু হত। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পাকের কালাইডাল’ খেতে পছন্দ করতেন।
১৯৩৫ সালে শান্তি নিকেতনের আ¤্রকুঞ্জে- ‘কোন দেবতা সে কী পরিহাসে’ গানটি নীলেশ্বরের অনুরোধে চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যে সংযোজন করেন। ‘রোদন ভরা এ বসন্ত ও ‘কুঞ্জদ্বারে নব মল্লিকা’-এই দু’টি রবীন্দ্রসঙ্গীত মণিপুরী নৃত্যের তালে তালে সার্থকভাবে মঞ্চে পরিবেশন করেন নীলেশ্বর। ১৯৩৬ সালে পাটনা এলাহাবাদ, দিল্লী, লাহোর ও মিরাটে চিত্রাঙ্গদা মঞ্চস্থ হয়। সেই নব মঞ্চায়নে নীলেশ্বর অংশগ্রহণ করেন। ১৯৩৮ এ শিলং-এ ১৯৪০ সালে নীলেশ্বরের নৃত্য দক্ষতায় আসানসোল, বাঁকুড়া ও মেদিনীপুরে চিত্রাঙ্গদা মঞ্চস্থ হয়। ‘শাপমোচন’, ‘রথেররশি’ ইত্যাদি নাট্যেও তিনি ছিলেন।
১৯৭৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রবীন্দ্র পর্ষদ নীলেশ্বর মুখার্জি মারা গেলে শান্তি নিকেতন থেকে শান্তি দেব ঘোষ এক ব্যক্তিগত চিঠি দেন। সেখানে তিনি বলেন-
¯েœহভাজনেষু
রবি
তোমার চিঠিতে নীলেশ্বর বাবুর মৃত্যু সংবাদ শুনে অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি। চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যে অর্জুনের সহচর গুরুদেবের অত্যন্ত ¯েœহের পাত্র ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে আমরা শান্তিনিকেতনবাসী বিদেহী আত্মার সদগতি ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই। তাঁর স্মরণে বিশ্বভারতীতে একদিন ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ইতি
শান্তিনিকেতন আশীর্বাবদক
৩রা অক্টোবর ১৯৯৭৭
শান্তিদেব ঘোষ।
নীলেশ্বর ছিলেন শান্তিনিকেতনে ইন্দিরা গান্ধীর নৃত্যগুরু। তাঁর মৃত্যু সংবাদ শুনে তিনি দশ হাজার টাকা পাঠিয়ে ছিলেন শ্রাদ্ধ শান্তির জন্যে। তাঁর বড় ভাইয়ের ছেলে বিজয় মুখার্জির মাধ্যমে এ টাকা আসে।
ভাগবতের ‘রাসপঞ্চাধ্যায়’ বিষয়ে একটি গ্রন্থ লিখেছিলেন নীলেশ্বর মুখার্জি। সেই পান্ডুলিপি প্রকাশিত হয়নি।
চন্ডালিকা নৃত্যনাট্যে নীলেশ্বর দইওয়ালার ভূমিকায় অভিনয় করে খুবই জনপ্রিয় হয়েছিলেন। তাঁর গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত আলাদা এক মাত্রা যোগ করেছিল গায়নরীতিতে। এ বিষয়ে শান্তিদেব ঘোষ বিস্তৃত আলোচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ নলিনীকুমার ভদ্রের কাছে মণিপুরী নৃত্যের বিশেষত্ব সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন- এৎধপবভঁষ নবংঃ ভড়ৎস ড়ভ ঢ়যুংরপধষ বীবৎপরংব. তিনি রাসনৃত্য দেখে ২০/- পুরস্কারও দিয়েছিলেন। যার কৃতিত্ব নীলেশ্বর মুখার্জির। কারণ, ‘...ধ ঃৎড়ঁঢ়ব ড়ভ ফধহপবৎং ঁহফবৎ ঃযব মঁরফধহপব ড়ভ ঘরষবংযধিৎ গঁশযধৎলবব ফবসড়হংঃৎধঃবফ মষরসঢ়ংবং ড়ভ জধংধষববষ রহ ভৎড়হঃ ড়ভ ঞড়মড়ৎব.’
পাঁচ.
ত্রিপুরার রবীন্দ্র-গবেষক বিকচ চৌধুরী লিখেছেন ‘সিলেটের মাছিমপুরে প্রথম রাসনৃত্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু এটা ঐতিহাসিক সত্য নয়। ১৮৯৯ সালে ২৭শে মার্চ কুঞ্জবন টিলায় প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে মণিপুরী নৃত্যশিল্পীদের নৃত্যভঙ্গিমা কবিকে মুগ্ধ করেছিল। ১৮৯৯ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত যে সাতবার তিনি ত্রিপুরায় আসেন, তখন ঘরোয়া পরিবেশে মণিপুরী নৃত্য পরিবেশিত হয়েছিল।’
বিকচ চৌধুরীর এই দাবী ইতিহাসসম্মত হলেও বাস্তবসম্মত নয়। ত্রিপুরা রাজবাড়িতে একান্ত ঘরোয়াভাবে মণিপুরী নৃত্য রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন। রাসমঞ্চে শিল্পকলা ভাস্বর নাচ কেবল সিলেটেই দেখেছিলেন। সেই দেখা রবীন্দ্র সাহিত্যে বিপুল প্রভাব পড়েছিল। তিনি ‘চিত্রাঙ্গদা’ ‘রথের রশি’ ‘চন্ডালিকা’ ও ‘শাপমোচন’ ও ‘ঋতুরঙ্গ’ নৃত্য নাট্যে মাছিমপুরে দেখা ভঙ্গিমাপারেংকে প্রয়োগ করেছেন। রাস নৃত্যের পূর্ণাঙ্গ রস প্রস্থানিক ভাবপরিধি মাছিমপুরের স্থানপরিধিকেই দীপ্র করেছে। ড. কালিদাস নাগকে লেখা পত্রে সিলেট ভ্রমণের আনন্দ অভিজ্ঞতার চমৎকার ভাষায় বর্ণনা করেছেন। আগরতলা নয়, ‘সুরমানন্দিনীদের অভয়মুদ্রার মধ্যেই তিনি খুঁজেছিলেন নিজ নৃত্যনাট্যগুলির নন্দন আভাকে। অন্য জায়গায় বিকচ চৌধুরী লিখেছেন- ‘রবীন্দ্রনাথ সিলেটেই প্রথম প্রথম মণিপুরী নৃত্য দেখেছিলেন বা সিলেটেই মণিপুরী নাচ দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এ কথা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ একাধিকবার বলেছেন এবং আমরাও তা উল্লেখ করেছি।’
ছয়.
প্রখ্যাত রবীন্দ্র গবেষক ও রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তি জীবন সম্পর্কে প্রায় কুড়িটি গ্রন্থের লেখক অমিতাভ চৌধুরী লিখেছেন- ‘বাংলার নৃত্য জগতে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হল ১৯১৯ সালে। সেবারই রবীন্দ্রনাথ শিলং থেকে সিলেট যান বেড়াতে। সিলেট শহরের কাছে মণিপুরী গ্রাম মাছিমপুরে গিয়ে মণিপুরী রাসনৃত্য দেখে তিনি অভিভুত হয়ে পড়েন। (রবীন্দ্রনাথ রাসনৃত্য মাছিমপুরে দেখেননি, দেখেছিলেন তাঁর আবাসস্থল টমাস সাহেবের বাংলোয় রাতে। মাছিমপুর গিয়েছিলেন বিকেল ৩ টায়, দেখেছিলেন রাখালনৃত্য। তিনি সারাদিন নানা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাই ফিরে যান বাংলোয় ও রাতে মণিপুরী ছেলে মেয়েরা সেখানে গিয়ে রাসনৃত্য দেখায়। শান্তিনিকেতনে ফিরে স্থির করেন এই নাচ শান্তিনিকেতনে চালু করতে হবে। তিনি দেখলেন মণিপুরী নাচের ভঙ্গি, বিন্যাস ও ছন্দ তাঁর নিজের গানের মেজাজের সঙ্গে ভালো খেলে। রবীন্দ্রনাথ নাচের সময় কোমর দোলানো ঘাড় বাঁকানো চোখ ঘোরানো ইত্যাদি কামোদীপক অঙ্গভঙ্গি পছন্দ করতেন না। মণিপুরী নাচে এ সব নেই। রবীন্দ্রনাথ একজন মণিপুরী নৃত্য শিক্ষককে শান্তি নিকেতনে পাঠাবার জন্যে ত্রিপুরার মহারাজকে চিঠি লেখেন। মহারাজ বুদ্ধিমন্ত সিংহ নামে একজন নাচিয়েকে পাঠান।’
মণিপুরী নৃত্য ভিত্তিক নারী চরিত্র নিয়ে ‘নটীর পূজা’ লিখলেন। মণিপুরী নাচের উপর অসাধারণ এক গান রচনা করলেন- ‘আমার ক্ষম হে ক্ষম।’ নীলেশ্বর ছিলেন এই নাচের প্রধান সহায়ক রূপকার। প্রতিমা দেবী তাঁর ‘নৃত্য’ গ্রন্থে পাশ্চাত্য নাচের সঙ্গে আমাদের প্রাচ্য নাচের সংমিশ্রণে রবীন্দ্র ঘরানার নাচের উদ্ভব হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। গুরুসদয় দত্ত গ্রামীণ নাচ বার বেঁশে ও ঢালীনাচকে ভদ্র সমাজে পরিচিত করান। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে প্রশংসা করে চিঠি লেখেন।
সাত.
স্মৃতিকুমার সিংহ নীলেশ্বরকে মৃদঙ্গশিল্পী হিসেবেই উল্লেখ করেছেন- ‘ইধংরপধষষু, ঐব (ঘরষবংযধিৎ) ধিং ধ সৎরফধহমধ ফধহপবৎ. ঐব ধিং ধ সধংঃবৎ ড়ভ ঞধষধমুধহ. ঐব খবধৎহঃ চঁহম ঈযধষধস ধহফ ড়ঃযবৎ সৎরফধহমধ ধৎঃং ভৎড়স ঔযড়শপযড়স চৎবসনধফধহ ড়ভ গধহরঢ়ঁৎ. তাঁর খ্যাতি রবীন্দ্র অন্তেবাসী নৃত্যগুরুরূপে। তিনি রবীন্দ্রনৃত্য ঘরানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কুশীলব।
তাঁর জীবনীর তথ্য সংগ্রহ করা খুব কঠিন কাজ। হরিদাস সিংহ তাঁর ‘নৃত্যাচার্য নীলেশ্বর মুখোপাধ্যায়’ বইতে নীলেশ্বরের জন্ম তারিখ উল্লেখ করেননি। কোন সূত্র থেকেই তাঁর জন্ম কবে হয়েছিল জানা যায়নি। বহু অনুসন্ধান করেও সে তথ্য পাইনি। ‘ড. উপাধিপ্রাপ্ত একজন বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী অধ্যাপকের কাছে কাকুতি মিনতি করেও তাঁর লেখা পাইনি। শুনেছি তিনি নীলেশ্বরের জীবনকথা লিখেছেন। তবে কোথাও সে লেখা পাওয়া যায় না। সেখানে জন্ম তারিখ আছে কিনা জানি না।
রবিবাবু সিংহ লিখেছেন ভানুবিল প্রজা আন্দোলনের সময় মহাত্মাগান্ধী ভানুবিল এসে বালিগাঁও গিয়ে নীলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গেও তাঁর হৃদ্যতা জন্মেছিল। ১৭ বছর বয়েসী ইন্দিরাগান্ধী শান্তিনিকেতনে নীলেশ্বরের ছাত্রী ছিলেন। তখন হয়ত জওহরলালের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হতে পারে। ভানুবিল প্রজা আন্দোলন বিষয়ক কোন গ্রন্থে মহাত্মাগান্ধীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। রবিবাবু সিংহ কোন তথ্যসূত্র প্রদান করেননি।
কনৌজ থেকে আগত পাঁচ জন ব্রাহ্মণের অন্যতম রাম মুখোপাধ্যায় নীলেশ্বরের পূর্ব পুরুষ ছিলেন এই দাবিও অনেক গবেষণার দাবি রাখে। মণিপুরী উৎসমূলের ধারণাকেও বিপদগামী করে। এই দাবি ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আট.
নীলেশ্বর মণিপুরী খোলের ‘পুংচলম’ ও ‘মুখবোল’-এর শৈলী চিত্রাঙ্গা নৃত্যনাটে সংযোজন করেন মুদ্রা ও অঙ্গভঙ্গির ক্ষেত্রেও শালীন রীতির প্রয়োগ করেন। ১৯৩৬ সালের ১১, ১২, ১৩ মার্চ কলকাতার ৩ স্পয়ার থিয়েটারে চিত্রাঙ্গদা মঞ্চায়নে নীলেশ্বর অংশগ্রহণ করেন। কুশীলবদের তালিকা ও আলোকচিত্র সংযোজন করা গেল।
১. নীলেশ্বর মুখোপাধ্যায়- অর্জনের সহচর। ২. গোবর্ধন পান্ডাল- অর্জুনের সহচর। ৩. শিবকুমার দত্ত- ওসরাঙ্গ। ৪. শিশির কুমার ঘোষ- গানের দলে। ৫. মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়- সখী

শেয়ার করুন
সাহিত্য এর আরো সংবাদ
  • ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সাহিত্যের জনক
  • সুশাসন ও দুঃশাসনের তাত্ত্বিক পাঠ
  • মালতি
  • ‘মার্কস চিন্তার সহি তফসির’
  • নষ্ট দাঁতের যন্ত্রণা
  • সুরমা সৈকতে গীতাঞ্জলি বিতর্ক
  • রবীন্দ্রনাথ ও নীলেশ্বর মুখার্জি
  • প্রতিক্ষার শেষ প্রহর
  • ‘দায়বদ্ধ অর্থশাস্ত্রী’ ও আমাদের দায়বদ্ধতা
  • শহিদ শিবলী : বিস্মৃত এক মুক্তিযোদ্ধা
  • হাজরে আসওয়াদের ইতিহাস
  • নাশপাতি ঘ্রাণে মন : কবির অনবদ্য সৃষ্টি
  • কবিতার অক্ষরে, কবির বেদনার ভেতর
  • অন্য স্বাদের ব্রেকফাস্ট
  • ডিগবাজি
  • কবিতা
  • ছন্দ ঝরে বন্ধ ঘরে : ছড়ার চিরন্তন ব্যঞ্জনা
  • বঙ্গীয় বাস্তবতায় উত্তর-আধুনিকতা
  • এমসি কলেজ : ইতিহাস ও জ্ঞান বিকাশের বাতিঘর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • Developed by: Sparkle IT