ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৪-২০১৮ ইং ০০:১৮:৫৮ | সংবাদটি ১০৭ বার পঠিত


[পূর্ব প্রকাশের পর]
খন্ড-৪ : পার্বত্য চুক্তি ও ভূমি সমস্যা
(ক) পর্বতাঞ্চলের ভূমি সমস্যা :
(তাং- রোববার, ৯ আশ্বিন ১৪০৭ বাংলা, ২৪ সেপ্টেম্বর খ্রি./ দৈনিক গিরিদর্পণ, রাঙামাটি)।
বস্তুত : পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা একটি বিরাট বিষয়। যার কিছুটা মানব সৃষ্ট, আর অধিকাংশ আইনি জটিলতার ফল। লোভী ও দুষ্ট লোকেরা সব সমাজেই থাকে এবং সংখ্যায়ও তারা কম নয়। তবে নির্লোভ সাধু লোকের সংখ্যাও শূন্য বলা যায় না। বলতে গেলে মানবতা ও সভ্যতা সাধুদের কারণেই টিকে আছে। কোনো সমাজকে নির্বিচারে দোষারোপ করা অন্যায়। অনেক সময় মূল্যায়ন ভুল হয়। তাতে মিত্র হয় শত্রু আর শত্রু হয় মিত্র। পার্বত্য অঞ্চলে বিপক্ষ নির্ণয়ে অনেকেই এই ভুলের শিকার।
ব্যহ্যত : এখানে উপজাতীয় রাজনীতিকদের দ্বারা বাঙালিরা ঢালাও ভাবে অভিযুক্ত। এ যেন সব দোষ নন্দ ঘোষ ধরণের কান্ড। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি আর আইনি জটিলতার কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হলে, এই বলির পাঠাদের কিছু হলেও রেহাই মিলতো। যা ঘটেছে আইনের বলে সরকারই তা ঘটিয়েছে। নেংটি বাঙালিরা এখানে কিছুতেই ঘটক নয়। বাঙালিরা পার্বত্য অঞ্চলের বিরাট এলাকা দখল করে আছে এবং পাহাড়ীরা নিজ ভূমে ভূমিহীনে পরিণত, এটা যেমন কিছুটা সত্য, তেমনি সত্য হলো : পাহাড়ীদের পরিবেশ পরিস্থিতি অনুধাবনের অভাব, এবং মানিয়ে চলতে পারার অক্ষমতা। কেবল দাবি দাওয়া ক্ষোভ ও অস্থিরতা সমস্যার সমাধান করে না। ভিন্নভাবে বাঁচার ও টিকে থাকার পথ অবলম্বন করতে হয়। এটা বিবেচ্য যে, নব প্রজন্মদের আমরা পাশাপাশি সংস্থান করে দিচ্ছি। দিনে দিনে বর্ধিত হচ্ছে জনসংখ্যা। প্রতিনিয়ত ভাগ বাটোয়ারা হচ্ছে জায়গা জমি বাড়িঘর, আলো-বাতাস, বিদ্যুৎ-পানি, খাদ্য বস্ত্র ইত্যাদি। আমরা সহনশীল মনোভাবে এসব মেনে নিচ্ছি। তবে আগ্রাসন ও নিপীড়ন এ থেকে ভিন্ন। যার প্রতি ক্ষুব্ধ ও মারমুখী হওয়া স্বাভাবিক। ঘটনা মাত্রকেই আগ্রাসন ও নিপীড়নের পর্যায়ে ফেলা যায় না। পার্বত্য অঞ্চলের আনাচে-কানাচে বাঙালিদের বসতি স্থাপন, উপজাতিদের ক্ষুব্ধ আর উত্যক্ত করলেও, এটা পরিস্থিতির অনিবার্য পরিণতি। এটা জাতিগত আগ্রাসন নয়। পরিস্থিতি বাঙালিদের অত্রাঞ্চলে টেনে এনেছে। এখন সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাময় প্রাথমিক অবস্থা নেই। উভয় সমাজেরই ভাবা উচিত। উত্তাপ উত্তেজনা হিংসা ও বিদ্বেষের একাধিক দশক পেরিয়ে এখন উভয়কে প্রতিবেশি হয়ে থাকতে হচ্ছে। কারোরই উৎখাত উচ্ছেদ সম্ভব নয়। সুতরাং অযথাই হিংসা ও বিদ্বেষ। এখন পারস্পরিক মৈত্রী হোক সামনে চলার কৌশল।
উপজাতিরা ভূমিহীন উৎখাত ও ছন্নছাড়া হোক, এটা বাঙালিদের কাম্য নয়। জাতিগত বিদ্বেষে ভূমি কাড়াকাড়ি শুরু হওয়াটা বাঞ্ছিত নয়। এখনো পর্বতাঞ্চলে ভূমির আকাল পড়েনি। সরকারিভাবে ভূমিহীনদের ভূমি দান সম্ভব। হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়েলই উপজাতীয়দের ভূমি স্বত্ত্ব দেয়নি। সার্কেল আর মৌজা প্রধানদের দায়িত্বে নিযুক্ত তিন সার্কেল চীফ ও তিন শত তেহাত্তর জন হেডম্যান, সরকারের রাজস্ব এজেন্ট মাত্র, জমির মালিক জমিদার নন। তবে পাহাড়ি জনসাধারণের পক্ষে তাদের অধীন ভূমি মালিকানাহীন প্রজা হয়ে থাকা দুর্ভাগ্যজনক। এখানে বন্দোবস্তি মানে কেবল ভোগ দখলের অধিকার লাভ, জমির মালিক হওয়া নয় পার্বত্য অঞ্চল শাসন আইন ধারা নং ৩৪ অনুযায়ী বন্দোবস্তি খরিদ বিক্রি দান হস্তান্তর ও উত্তরাধিকার ডেপুটি কমিশনারের অনুমতি ও অনুমোদন সাপেক্ষ। এর মানে, জনসাধারণ তার অধীন বাধ্য ভোগ দখলকার প্রজা মাত্র। তৎকর্তৃক পরিচালিত বন্দোবস্তি ও হস্তান্তর প্রক্রিয়া এতো দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ যে, ক্রেতা-বিক্রেতা, উত্তরাধিকারী, আর বন্দোবস্তি প্রার্থীদের বৃহদাংশ তাদের জীবনকালে বন্দোবস্তি ও নাম জারি দেখে যেতে পারেন না। এই দীর্ঘ সুত্রিতায় অনেকেই থেকে যান অবৈধ খরিদ্দার অনির্ধারিত উত্তরাধিকারী ও বেআইনী দখলকার। এই সুযোগে দুষ্ট অসাধু ব্যক্তিরা, এবং অনেক লোভী প্রভাবশালী মহল, অনিবন্ধনকৃত খরিদ বিক্রি অস্বীকার করেন এবং গরিব নিরীহ লোকদের আবাদকৃত ও বন্দোবস্তি প্রার্থিত জায়গা জমি জবর দখল, অথবা টাকা ও প্রভাব জোরে, ঐ জমি নিজ নামে বন্দোবস্তি করে নেন। এ ঘটনাগুলো কেবল আন্ত সাম্প্রদায়িকই নয়, প্রতি সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরেও বিদ্যমান। তিন পার্বত্য জেলা প্রশাসকদের অধীন দেওয়ানী আদালতে এরূপ মামলা মোকদ্দমা স্তুপিকৃত হয়ে আছে। জেলা প্রশাসনের বন্দোবস্তি শাখা, হাজারো অমীমাংসিত বন্দোবস্তি মামলায় ভারাক্রান্ত। সারা দেশে মুহূর্তে খরিদ, বিক্রি, দলিল রেজিস্ট্রেশন নাম জারি ও হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। কিন্তু এতদাঞ্চল এক আজব দেশ, যেখানে, জেলা প্রশাসকদের হাতে সব ভূমি আটক। তদুপরি এখানে ভূমি বন্দোবস্তি ও হস্তান্তর বহুদিন যাবৎ বন্ধ। এর উপর ফেখড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের পুর্বানুমোদন আইন। যদ্দরুণ বেআইনী দখলদারী ছাড়া উপায় নেই। হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়েলের ধারা নং ১৮ (২)/ ঘ ও ৩৪ এর পাশাপাশি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ধারা নং ৬৪ নতুন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। এই আইন বলে সব খরিদ বিক্রি, হস্তান্তর নাম জারি ও বন্দোবস্তি, জেলা পরিষদের পুর্বানুমোদন সাপেক্ষ। এতো গোটা ভূমি প্রশাসনই পক্ষাঘাতগ্রস্ত। এতে ঘোষ দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে।
এই আইনের মূল লক্ষ : অস্থানীয় তথা বাঙালিদের ভূমি মালিকানা ঠেকানো, কিন্তু তাতে পাহাড়িরাও ঠেকে যাচ্ছে। পাহাড়ি খরিদ্দার নেই, বাঙালি খরিদ্দার ও বাধাগ্রস্ত। ফলে জমির মূল্যমান নি¤œমুখী। বৈধ খরিদ বিক্রি ও হস্তান্তর বাধাগ্রস্ত হওয়ায় প্রয়োজনে অবৈধ পন্থা অবলম্বিত হচ্ছে। আর সেটি হলো আনরেজিস্টার্ড খরিদ বিক্রি ও হস্তান্তর। তাতে বিরোধ আর হাঙ্গামাও বাড়ছে। পার্বত্য অঞ্চলের অধিকাংশ ভূমি বিরোধ এই জটিলতার ফল। এ থেকে উদ্ধার লাভের উপায় হলো তাৎক্ষণিক দলিল রেজিস্ট্রেশন ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রতিবন্ধকতার অবসান। তজ্জন্য প্রয়োজন হলো ঐ প্রতিবন্ধক আইনসমূহ বাতিল বা সংশোধন করা। প্রস্তাবিত ভূমি কমিশন অনুরূপ ক্ষমতার অধিকারী নন। কেবল লোকজনকে অপরাধী করে তাদের উচ্ছেদ বা শাস্তি দান করা সঠিক কাজ নয়। পুনরায় অনুরূপ অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
[চলবে]

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • উনিশ শতকে সিলেটের সংবাদপত্র
  • হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশঝাড় চাষের নেই উদ্যোগ
  • হারিয়ে যাচ্ছে বেদে সম্প্রদায়ের চিকিৎসা ও ঐতিহ্য
  • একটি হাওরের অতীত ঐতিহ্য
  • বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক
  • বানিয়াচংয়ের ভূপর্যটক রামনাথ
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন
  • সিলেটের গৌরব : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রকৃতিকন্যা সিলেট
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ক্ষেত্র
  • ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ জামালপুর
  • সুনামগঞ্জের প্রথম নারী সলিসিটর
  • Developed by: Sparkle IT