ইতিহাস ও ঐতিহ্য

গ্রাম বাংলার ছনের ঘর

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৪-২০১৮ ইং ০০:২৯:২২ | সংবাদটি ৫১৮ বার পঠিত

আধুনিকতার উৎকর্ষতায় বর্তমানে ছনের ঘর বিলুপ্তির পথে বললেই চলে। মাত্র কয়েক বছর আগেও সিলেট নগরীর আনাচে কানাচে হলেও দুই চারটি ছনের তৈরি ঘর চোখে পড়ত বর্তমানে কয়েকটি ওয়ার্ড মিলেও সবুজ পাহাড়ে ধূসর রঙের ছনের চালার ঘর এখন আর তেমনটা চোখে পড়ে না। রোদে চিকচিক করা রুপালি ঢেউটিনের চালা বহুদূরে থেকেই জানান দেয় তার সদন্ত অস্তিত্বের কথা। সবুজের ফাঁকে খেলা করে সাদার ঝিকিমিকি। আর হাজার বছরের পরম বন্ধু অভিমানি ‘ছন’ সপ্তর্পণে নিজের অস্তিত্ব বিলিন করে চলেছে। জানা যায়, কম দামে ঢেউটিন পাওয়া যায় বলে শহর থেকে গ্রাম র্সবত্রই দিন দিন টিনের ঘর বাড়ছে। ফলে নতুন করে ছনের ঘর খুব কম হচ্ছে। আবার ছনের ঘর সংস্কারও হচ্ছে খুব কম। তাই গ্রাম থেকে শহর কোথাও আগের মত ছনের চাষও হচ্ছে না। এমন চিত্র শুধুমাত্রই সিলেটেই নয় সমগ্র বাংলাদেশের শহর উপশহর এমনকি জেলা উপজেলাগুলোতেই দেখা যাচ্ছে।
এদিকে টিনের অত্যাধিক ব্যবহারের ফলে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। কারণ দেশে উৎপাদিত অধিকাংশ টিন পরিবেশ বান্ধব নয় তবে এখনো কয়েকটি ছনের ঘর চোখে পড়ে। জানুয়ারি মাস থেকে হাট-বাজারে ছন আসা শুরু হয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে গ্রামীণ এলাকা থেকে শুরু করে শহরের ঘড়বাড়িতে ছাউনি হিসাবে ছনের ব্যবহারে ধুম পড়ে যায়। প্রায় পরিবারেই ছিলো তখন ছনের উপর নির্ভরশীল। এইতো কয়েক বছর আগেও বছর গত হলেই ঘরের ছাউনিতে ছনের প্রয়োজন হতো। গ্রামীণ ও শহুরে এলাকায়। গ্রামীণ ও শহর এলাকার লোকেরা জ্বালানি এবং গরু-মহিষের খাদ্য হিসাবে ছন ব্যবহার করেছে। কিন্তু কালক্রমে গরীবের ছাউনি সেই ছন হারিয়ে যেতে বসেছে। সিলেটে ১০/১৫ হাজার হেক্টর এলাকায় ছন উৎপন্ন হয়েছে।
পাহাড়ের জঙ্গল পরিস্কার করে মাটিকে হালকা খুঁেড় দিলে ভাল ছন ও হয়। একই পাহাড়ে ফলজ ও বনজ গাছের পাশাপাশি ছনও হয়। বিভিন্ন কারণে পাহাড় ধ্বংসের কারণে এবং রীতিমত পাহাড় পরিস্কার না করার কারণে পাহাড়ে আর ছন বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। পর পর দু‘বার ছন না কাটলে সেই পাহাড়ে আর ছন হয় না। প্রতি বছর ছন কাটলে এবং আগাছা পরিস্কার করে দিলে ছনের ভালো উৎপাদন হয়। আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত ছন আহরণ করা হয়ে থাকে। চাষাবাদে তেমন পরিশ্রম নেই। শুধুমাত্র পাহাড়ের যে অংশে ছন চাষ করা হবে তা পরিস্কার করে দিলেই কিছুদিন পর প্রাকৃতিকভাবেই ছনের কুঁড়ি জন্ম নেয়। এরপর ছনের দৈর্ঘ্য দেড় দুই হাত হলে আগাছা পরিস্কর করে একবার ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হয়। আর ৬-৭ ফুট লম্বা হলেই কাটার উপযুক্ত হয়। আহরণের পর পর্যাপ্ত রোদে ১৫ থেকে ২৫ দিন শুকিয়ে নিলে এরপরই তা ব্যবহার উপযোগী হয়।
আজ থেকে বিশ-পচিঁশ বছর আগেও শহরের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ছনের ছাউনির ঘর ছিল। কারণ আশপাশ এলাকায় পাওয়া যেত প্রচুর পরিমাণে ছন যা ব্যবহার করা হতো ঘরের ছাউনি ও পানের বরজের কাজে। নি¤œবিত্তের মানুষ এই ছন দিয়ে ঘরের ছাউনি দিতো। এছাড়া কাঠুরিয়ারা ছন বিক্রি করে সংসার চালাতো। স্থানীয়ভাবে গরীবের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর বলে পরিচিত ছিল। এই ছনের ছাউনির ঘর। উচ্চবিত্তরাও শখের বসে পাকা ঘরের চিলে কৌটায় ছন ব্যবহার করতো। শীত ও গরম উভয় মওসুমে আরামদায়ক ছনের ছাউনির ঘর। ছনের ছাউনির ঘর তৈরির জন্য বেশ কিছু কারিগর ছিল। তাদের মজুরি ছিল ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। বিশেষ কায়দায় ছনকে সাজিয়ে কয়েকটি ধাপের মাধ্যমে ছাউনি দেয়া হতো। ছাউনির উপরে বাঁশ ও বেত দিয়ে শক্ত করে বেঁধে পানি ছিটানো হতো। যাতে করে সহজে ছনগুলো বাঁশের উপর বসে যায়। ছন চাষে কমশ্রমে বেশি লাভ থাকলেও এখন আর ছন চাষে আগ্রহী না চাষীরা। কারণ আধুনিকায়নের সাথে সাথে এখন ছনের চাহিদা কমে গেছে। কারণ মানুষ এখন আর বাঁশ ছন দিয়ে ঘর তৈরি করতে চায় না। বাঁশ ও ছন দিয়ে তৈরি ঘরগুলো বেশি দিন টেকশইও হয় না। প্রতি বছর মেরামত করতে হয় যার কারণে ছনের চেয়ে বেশি চাহিদা বেড়েছে এখন টিনের। তাই ছনের ঘর দখল করে নিয়েছে টিনের ঘর। শহরের প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডেই দেখা মিলে ছোট বড় অসংখ্য টিনের ঘর। ছন চাষের জন্য পাহাড়ের ছোট ছোট গাছপালা ও লতাপাতা পরিস্কার করে দিলেই কিছুদিন পর প্রাকৃতিকভাবে ছন জন্মায়। তবে আশ্বিন মাসের ছন বাজারে চাহিদা থাকে না। ফলে বোঝা প্রতি মাত্র ৬০ টাকা থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি করতে হয় চাষীদের। তবে বর্ষা মৌসুম এলে ছনের চাহিদা বেশি থাকে। তখন বোঝাপ্রতি ছন ১৪০-১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়। বাংলা বর্ষের আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত ছন আহরণ করা হয়। বর্তমানে বাজারে ছনের চাহিদা তেমন নেই। ফলে ভার প্রতি (দুই বোঝা) ছন মাত্র ২৫০ টাকায় বিক্রি করতে হয় তবে চৈত্র মাসে ভারপ্রতি বিক্রি হয় সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা। ছনের উৎপাদন ও ব্যবহার কমে যাওয়ায় এটি এখন বিলুপ্তির পথে। বছর বছর ছন ক্রয় করে চালা মেরামতের পেছনে অর্থ ব্যয় না করে সবাই কমদামী ঢেউটিন ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। সিলেট জেলার বনভুমির আয়তন ৯৫,০০০ হেক্টর। এককালে সিলেটে এ সব বনভূমিতে বনায়নের পাশাপাশি প্রচুর ছন উৎপন্ন হয়েছে।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সাত মার্চের কবিতা ও সিলেট বেতার কেন্দ্র
  • পার্বত্য তথ্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সিলেটের প্রাচীন ‘গড়’ কিভাবে ‘গৌড়’ হলো
  • ৮৭ বছরের গৌরব নিয়ে দাঁড়িয়ে সরকারি কিন্ডারগার্টেন প্রাথমিক বিদ্যালয় জিন্দাবাজার
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা
  • খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন
  • ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
  • শ্রীরামসি গণহত্যা
  • প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্প
  • বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা
  • গ্রামের নাম আনোয়ারপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • Developed by: Sparkle IT