সম্পাদকীয়

ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আর কতদূর?

মুহা. রুহুল আমীন প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৪-২০১৮ ইং ০১:৩৫:৩৭ | সংবাদটি ৩৪ বার পঠিত

গত ৩০ মার্চ শুক্রবার স্বীয় মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত, স্বেচ্ছা নির্বাসিত বা বাস্তুচ্যুত ৭ লাখ ফিলিস্তিনবাসীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রেক্ষিত তৈরি করতে ফিলিস্তিনিরা অবরুদ্ধ গাজা ও অধিকৃত পূর্ব তীরে দেড় মাসব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করেছে। পাঠকগণ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে, ১৯৪৮ সালে অন্যায়ভাবে ফিলিস্তিন ভূখ- দখল করে বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিদের জন্য কট্টর ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন থেকে আরব ও ইসরাইলের মধ্যে উপর্যুপরি যুদ্ধ শুরু হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের সহায়তায় আন্তর্জাতিক রীতি নীতি লংঘন করে ফিলিস্তিনিদের ভূখ- এক এক করে দখল করা হয়। গাজায় তাদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পশ্চিম তীর দখল করা হয়। প্রায় ৭ লাখ ফিলিস্তিনিকে মাতৃভূমি থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং সর্বোপরি তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে ইসরাইলের রাজধানী স্থানান্তরের ঘোষণা দেওয়া হয়। ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীরা তাদের আন্দোলনকে প্রত্যাবর্তনের মহান যাত্রা হিসেবে অভিহিত করে ইসরাইলি গোলাবারুদে ১৮ জন নিরস্ত্র ফিলিস্তিনির শহীদ হওয়া সত্বেও বিক্ষোভ কর্মসূচী চালিয়ে যাওয়ার দৃপ্ত শপথ উচ্চারণ করেছেন।
স্মরণ করা যায় যে, ২০১৪ সাল থকে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরাইলের সৈন্যদের যে নিরন্তর যুদ্ধ শুরু হয়েছে, ফিলিস্তিন-ইসরাইল দ্বন্দ্বে যে সহিংসতার রেকর্ড তৈরি হয়েছে তাতে ইসরাইলের সাম্প্রতিক নৃশংসতা ভয়াবহতম। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ১৮ জন নিরস্ত্র ফিলিস্তিনির নিহত ও দুই সহস্রাধিক আহত হওয়ার পাশাপাশি ৭৫৮ জনকে আগুনে পুড়িয়ে দগ্ধ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ এবং বিশ্বনেতৃবৃন্দ এ ঘটনার সংজ্ঞায়ন করে এ নির্যাতন বন্ধ করতে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু সে আহ্বানের সুর এতই করুণ এবং দুর্বল যে, বৈশ্বিক মোড়ল রাষ্ট্রসমূহ যারা ইসরাইলের সমর্থক, তাদের কারণে বিশ্ববিবেকের কান্না ও নেতৃবৃন্দের আহ্বান ফলদায়ক সমাধান তৈরি করতে পারছে না।
ইসরাইলের হামলায় ফিলিস্তিনি হতাহতের নিন্দা করে আরব পার্লামেন্টের স্পিকার মার্শাল বি ফাহম আল সালামি বলেন, এ ‘নিষ্ঠুর অপরাধের’ মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লংঘিত হয়েছে। আরব পার্লামেন্টের নিন্দাটি দায়সারা গোছের, আরবদের চিরশত্রু ইসরাইলের সঙ্গে আরবরা এতদিন যুদ্ধ করলেও সম্প্রতি সৌদী আরব ইসরাইলের সঙ্গে স্ট্রাটেজিক ও সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে ফিলিস্তিন ও আরবদের স্বার্থ চিরতরে জলাঞ্জলি দিয়েছে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে আরব পার্লামেন্টের যে কোনো মন্তব্য অরণ্যে রোদনের শামিল।
স্নায়ুযুদ্ধোত্তর পৃথিবীর একমাত্র ও প্রবল পরাক্রমশালী পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এ দুঃখ প্রকাশ তার কদর্য দ্বিমুখী নীতি ও আত্মপ্রবঞ্চনাময়তায় পূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ঐ বিবৃতিকে বিশ্বাস করে না, হয়ত বা কূটনৈতিক ভদ্রতা ও বৈশ্বিক ইমেজ রক্ষার তাগিদে রাষ্ট্রটি এমন বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে, যা কখনো তারা সমর্থন করেনি। সে কারণে জাতিসংঘ প্রস্তাবিত ‘স্বতন্ত্র নিরপেক্ষ’ তদন্তের আহবান যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো দেওয়ার কারণে নস্যাত্ হয়ে গেছে।
এএফপির বরাতে ইরানের প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায়, ইরান ফিলিস্তিনের হতাহতের ঘটনাকে ‘লজ্জাজনক’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সাম্প্রতিক হতাহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তুমুল বাকযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন।
বিশ্বসংস্থা হিসেবে জাতিসংঘ উদ্ভুত পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক উপ-প্রধান তায়ে ব্রুক জেরিহল ইসরাইলের হত্যাকা-কে মানবাধিকার লংঘন হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, ইসরাইলকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের আলোকে তার দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ব বুঝতে হবে। মারাত্মক অস্ত্র-শস্ত্র কেবল সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে বেছে নেওয়া যায়, যা যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত হতে হয়। মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ঘটনার নিরপেক্ষ ও স্বতন্ত্র তদন্তের আহবান জানিয়েছেন। ইসরাইলি সহিংসতার বিরুদ্ধে ‘স্বাধীন ও নিরপেক্ষ’ তদন্তের দাবিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা-পরিষদে কুয়েত খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। কুয়েতের প্রস্তাবে ফিলিস্তিনিদের ‘শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকারে’র কথা উল্লেখ করে ইসরাইল-ফিলিস্তিন বিরোধ নিরসনে দ্বিরাষ্ট্র ভিত্তিক শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিতে আহবান করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে কুয়েতের প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে যে, ফিলিস্তিনিরা মারমুখী হয়ে সীমান্ত বেড়ার দিকে এগিয়ে গেলে ফিলিস্তিনি সৈন্যরা গুলি ও কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়তে বাধ্য হয়। ইসরাইলের সামরিক বাহিনী ফিলিস্তিনিদের পাথর নিক্ষেপকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকা-’ হিসেবে বিবেচনা করে তা প্রতিহত করতে ১৬ জনকে হত্যা ও দেড় হাজার লোককে আহত করতে বাধ্য হয়েছে। তবে, ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর এ দাবি সর্বৈব মিথ্যা ও শঠতাপূর্ণ। কারণ, এ পর্যন্ত কোনো সূত্র থেকে এমন খবর পাওয়া যায়নি যে, ইসরাইলের কোনো সৈন্য বা সাধারণ নাগরিক ফিলিস্তিনিদের আক্রমণে আহত বা নিহত হয়েছে।
ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি সৈন্যদের হতাহতের মর্মন্তুদ ঘটনায় উপর্যুক্ত বিশ্ব-প্রতিক্রিয়া এ কথারই ইঙ্গিত দেয় যে, ফিলিস্তিনীদের সামনে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। আগেই উল্লেখ করেছি যে, ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তীতে একে একে ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করে ফিলিস্তিনিদের ভিটেছাড়া করলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইহুদী মিত্রদের সহায়তায় ইসরাইলের দখলদারিত্ব টিকে থাকে। প্রথমদিকে আরবরা ইহুদীদের সঙ্গে যুদ্ধ করলেও পরবর্তীতে পাশ্চাত্যশক্তিসমূহ আরবদেরকে আঞ্চলিক স্বার্থ-দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ফেলে তাদেরকে বহুধাবিভক্ত করে দেয়। এমনকি সৌদি আরব ও উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের সাম্প্রতিক মিত্রতা ফিলিস্তিন-ইসরাইল বিরোধ নিষ্পত্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত থাকবে।
এমতাবস্থায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার রক্ষা করা। একটি দেশ ও জাতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে, তাদের ভূমি কেড়ে নিয়ে সে ভূমিতে বহিরাগতদের জন্য রাষ্ট্র তৈরি করে তাদের ঠাঁই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিবর্গ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। দখলদার ইসরাইল ফিলিস্তিনীদেরকে সমূলে বিনাশ করার যে প্রক্রিয়া চালিয়ে আসছে, তা গণহত্যার পর্যায়ে পড়ে যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে মারাত্মক অপরাধ। দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধান মেনে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে ফিলিস্তিনিরা অনেক উদারতার পরিচয় দিয়েছে। যে ইহুদীদেরকে পৃথিবীর কেউ আশ্রয় দেয়নি, তাদেরকে নিজভূমিতে রাষ্ট্র তৈরি করে বসবাস করার অধিকার রক্ষা করে ফিলিস্তিনিরা মানবতা ও পরোপকারের মহান নজীর স্থাপন করেছে। কিন্তু আশ্রিত ইসরাইলের পুনর্গঠিত দখলদারিত্ব নীতি তাদের বেঈমানী, কপটতা, শঠতা ও প্রতারণার ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যকে বিশ্বময় তুলে ধরছে। আজ ফিলিস্তিনিরা রাষ্ট্রশূন্য। ভবিষ্যতে যদি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র জন্ম লাভ করে, তাহলে তার সম্ভাব্য রাজধানী জেরুজালেমও আজ দখলের পথে। ট্রাম্পের জেরুজালেম ঘোষণা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য বড় একটি বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মে মাসের ১৫ তারিখে জেরুজালেম ঘোষণা যাতে বাস্তবায়িত না হয়, সেজন্য ফিলিস্তিনিরা দেড় মাসের বিক্ষোভ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। এ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার তাদের রয়েছে। কারণ এটা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের মৌলিক মানবিক দাবি। মিসরের উৎপীড়ক দুর্র্ধষ ফেরাউনের বন্দিদশা থেকে হযরত মুসা (আ) ও তাঁর অনুসারীদের মুক্তির স্বর্ণালী মুহূর্ত উদযাপনের আগ-মুহূর্তে নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের ইসরাইলের দখলদারিত্ব হতে মুক্তির বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে ইসরাইলের সমর্থন পাওয়ার দাবি রাখে। অথচ মুক্তিকামী ফিলিস্তিনিদের হত্যা করে ইহুদীরা পৃথিবীর অভিশপ্ত জাতির তকমাটি স্থায়ী করেই রাখল।
এ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর এ গুরুদায়িত্ব বর্তায় যে, ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠায় তারা সচেষ্ট হবে। জাতিসংঘের ‘নিরপেক্ষ ও স্বতন্ত্র তদন্ত’-এর কাজটি এগিয়ে নিতে বিশ্বসমাজকে দৃঢ়-নীতি ধারণ করতে হবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত লীগ অব নেশন্স প্রবর্তিত ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার নীতি’ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সৃজিত জাতিসংঘের মানবাধিকার নীতির পূর্ণ বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সমাজ দায়বদ্ধ। যদিও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়নে জাতিসংঘের বিভিন্ন শাখায় নানা আইনি রক্ষা কবচও রয়েছে। সাধারণ পরিষদের আওতায় ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়। বিশ্বসমাজকে সে পথেই অগ্রসর হতে হবে।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT