ধর্ম ও জীবন

আল-কুরআনের গাণিতিক রহস্য

ডা. এম সোলায়মান খান প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৪-২০১৮ ইং ০১:৩৯:৪৫ | সংবাদটি ৬০ বার পঠিত

আল-কুরআন গণিতের নানা ফর্মুলায় সমন্বিত। এই ফর্মুলা তৈরী হয়েছে ১৯ সংখ্যাটির ম্যাথ্মেটিকেল কোড দিয়ে। কুরআনের সকল সূরা, আয়াত, শব্দ, অক্ষর, ১৯ এর কোডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত। ১৯ এর এই কোড খুব সহজে বোঝা যায়। কেউ কেউ প্রশ্ন করেন কেন ১৯ দিয়ে কুরআন বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে? ১৯ কোথা থেকে এলো? ১৯ বেছে নেয়ার কারণ কি? কেন অন্য কোন সংখ্যা বেছে নেয়া হলো না? গবেষণার ফল মিলানোর জন্যে চালাকি করে ১৯ বেছে নেয়া হয়েছে? ১৯ এর কোড আন্দাজে মিলে গেছে? নিছক কাকতালীয় ঘটনা? সিম্প্লি কো-ইন্সিডেন্স?
১৯ একটি কঠিন সংখ্যা। ১৯ একটি মৌলিক সংখ্যা, প্রাইম নাম্বার। যে কোন ম্যাথ্মেটিকেল কোড তৈরী করতে প্রাইম নাম্বার ব্যবহার করা হয়। ১৯ ইচ্ছে করে বেছে নেয়া হয়নি। ১৯ কুরআন থেকে নেয়া হয়েছে। সূরা মুদ্দাসসিরের ৩০ নম্বর আয়াতে ১৯ সংখ্যাটি আছে। মুদ্দাসসির অর্থ গোপন। আয়াতটি হলো ‘আলাইহা তিসয়াতা আশারা’ অর্থাৎ ‘ইহার উপর ১৯’। ১৯ আছে ৩০ নম্বর আয়াতে। ১৯ এবং ৩০ এই দুটির মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে। ১৯ একটা প্রাইম নাম্বার, আর ৩০ হচ্ছে ১৯ তম নন্ প্রাইম নাম্বার। (৪, ৬, ৮, ৯, ১০, ১২, ১৪, ১৫, ১৬, ১৮, ২০, ২১, ২২, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ৩০)। প্রাইম নাম্বার এবং নন্ প্রাইম নাম্বার এক আয়াতে বিদ্যমান এবং সংখ্যা দুটো ১৯ রিলেটেড। ১৯তম নন্ প্রাইম নাম্বার আয়াতে প্রাইম নাম্বার ১৯ দিয়ে কিছু একটা ইঙ্গিত করা হয়েছে! কি ইঙ্গিত করা হয়েছে তা জানতে, বুঝতে, খুঁজতে, অনুধাবন করতে ১৯ নিয়ে হিসাব নিকাশ শুরু হয়। ১৯ কাকতালীয়ভাবে আসেনি এবং চালাকি করে বেছে নেয়া হয়নি। ১৯ নিয়ে অনুসন্ধিৎসু হওয়ার কারণ সুস্পষ্ট। আমরা ১৯ এর কিছু ম্যাথ্মেটিকেল কোড পর্যবেক্ষণ করব, যেগুলি সহজে বোঝা এবং যাচাই করা যায় অর্থাৎ বোঝার জন্যে কোন টুলস, ক্যালকুলেটর, কম্পিউটার, আরবি ভাষা জানার তেমন দরকার পরে না।
কুরআন শব্দটি ৩৮টি সূরায় উল্লেখ আছে। (৩৮ = ১৯.২)। কুরআনের ৭২ নম্বর সূরার ২৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ‘ওয়া আহেচ্ছায়া কুল্লা শাইয়িন আদাদা’ অর্থ ‘তিনি সব কিছুর সংখ্যা গুণে গুণে রাখেন’। আদাত শব্দের অর্থ সংখ্যা। আদাত শব্দটি এই সূরার ২৮৫ নম্বর শব্দ। ২৮৫ = ১৯.১৫। সূরার ক্রমিক নম্বর ৭২, আয়াত নম্বার ২৮। এক্ষেত্রে (৭ + ২ + ২ + ৮) = ১৯। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ফরজ রাকাত সংখ্যা পর পর বসালে হয় (২, ৪, ৪, ৩, ৪) = ২৪৪৩৪ = ১৯.১২৮৬। প্রসঙ্গ ক্রমে কুরআনের প্রথম সূরা পাঠ কালে ১৯ বার ঠোঁট একত্রিত হয়।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম বাক্যটিতে মোট অক্ষরের সংখ্যা ১৯ এবং শব্দ সংখ্যা ৪টি। ৪টি শব্দের প্রতিটির অক্ষর সংখ্যা হচ্ছে, ১ম শব্দ বিসমি-৩ অক্ষর, ২য় আল্লাহ-৪ অক্ষর, ৩য় রাহমান-৬ অক্ষর, ৪র্থ রাহীম ৬ অক্ষর। এখন বাম থেকে ডানে প্রথমে শব্দের সংখ্যা নম্বর এবং পরে শব্দের অক্ষর সংখ্যা পর পর বসালে হয় (১৩, ২৪, ৩৬, ৪৬) = ১৩২৪৩৬৪৬ = ১৯.৬৯৭০৩৪।
আবার ডান থেকে বামে প্রথমে অক্ষর সংখ্যা পরে শব্দের সংখ্যা নম্বর পর পর বসালে হয় (৪৬, ৩৬, ২৪, ১৩) = ৪৬৩৬ ২৪১৩ = ১৯.২৪৪০১২৭।
অতি প্রাচীনকাল থেকে গাণিতিক সংখ্যাকে আরবি, গ্রীক, হিব্রু, ভাষার অক্ষরে লেখার প্রচলন ছিল। প্রতিটি অক্ষরের সংখ্যাগত মান ছিল এবং গণনার জন্যে অক্ষরগুলি ব্যবহার হতো। একে আবজদ বলে। বিসমিল্লাহর অক্ষরগুলির আবজদ মান ৭৮৬। বিসমিল্লাহর মোট শব্দ ৪টি, মোট অক্ষর ১৯টি এবং আবজদ মান ৭৮৬ পর পর বসালে হয় (৪, ১৯, ৭৮৬ ) = ৪১৯৭৮৬ = ১৯.২২০৯৪। আবার ৪, ১৯, ৭৮৬ এই তিনটি সংখ্যাকে উল্টো করে বসালে হয় (৬৮৭, ৯১, ৪) = ৬৮৭৯১৪ = ১৯.৩৬২০৬।
সূরা আল মুদ্দাসসিরে ১৯ সংখ্যাটি আছে। আল মুদ্দাসসির বানানে ৬টি আরবি অক্ষর আছে যেমন-আলিফ, লাম, মীম, দাল, ছা, রা। অক্ষর গুলির আবজদ মান এবং যোগফল যথাক্রমে (১ + ৩০ + ৪০ + ৪ + ৫০০ + ২০০)। যোগফল = ৭৭৫। ৭, ৭, ৫, পর পর বসিয়ে যোগ করলে হয় (৭ + ৭ + ৫) = ১৯।
বিসমিল্লাহ কুরআনের প্রথম আয়াত। প্রথম আয়াতের নম্বর, আয়াতের মোট অক্ষর সংখ্যা, প্রতিটি শব্দের অক্ষর সংখ্যা পর পর বসালে হয় (১, ১৯, ৩৪৬৬) = ১১৯৩৪৬৬ = ১৯.৬২৮১৪ = ১৯.১৯.১৭৪।
কুরআনের ১১৪টি সূরার মধ্যে ১১৩টি সূরার শুরুতে রয়েছে বিসমিল্লাহ। সূরা তওবার শুরুতে বিসমিল্লাহ নেই। তা সত্ত্বেও কুরআনে মোট বিসমিল্লাহর সংখ্যা ১১৪ = ১৯.৬। সূরা নমলের শুরুতে এবং ৩০ নম্বর আয়াতে বিসমিল্লাহ আছে। অন্য কোনো সূরায় দুই বিসমিল্লাহ নেই। এভাবে পুরো কুরআনে বিসমিল্লাহর সংখ্যা হলো ১১৪ = ১৯.৬।
সূরা নমলের ক্রমিক নম্বর ২৭। বিসমিল্লাহ আছে ৩০ নম্বর আয়াতে। এক্ষেত্রে (২৭ + ৩০) = ৫৭ = ১৯.৩।
৯ নম্বর সূরা বিসমিল্লাহ নেই। ২৭ নম্বর সূরা দুই বিসমিল্লাহ। ৯ থেকে ২৭ পর্যন্ত মোট সূরার সংখ্যা = ১৯।
৯ থেকে ২৭ পর্যন্ত সূরাগুলির ক্রমিক সংখ্যার যোগফল (৯ + ১০ + ১১ + ১২ + ১৩ + ১৪ + ১৫ + ১৬ + ১৭ + ১৮ + ১৯ + ২০ + ২১ + ২২ + ২৩ + ২৪ + ২৫ + ২৬ + ২৭) = ৩৪২ = ১৯.১৮। সূরা নমলের দুই বিসমিল্লাহর মাঝে মোট অক্ষরের সংখ্যাও ৩৪২ = ১৯.১৮।
সূরা নমল শুরু হয়েছে ত্ব এবং সীন অক্ষর দিয়ে। সূরার নম্বর ২৭, ত্ব আছে ২৭টি। আয়াত ৯৩টি, সীনও আছে ৯৩টি। সূরার নামকরণ হয়েছে নমল (পিঁপড়া) শব্দ দিয়ে। নমল শব্দটি আছে ১৮ নম্বর আয়াতে, ঐ আয়াতের শব্দ সংখ্যা ১৯।
সর্ব প্রথম নাযিল হয় সূরা আল আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত। প্রথম পাঁচটি আয়াতের শব্দ সংখ্যা ১৯। প্রথম পাঁচটি আয়াতের অক্ষর সংখ্যা ৭৬ = ১৯.৪। এই সূরার মোট আয়াত সংখ্যা ১৯। সূরাটির মোট অক্ষর সংখ্যা ২৮৫ = ১৯.১৫।
সূরাটির ক্রমিক নম্বর ৯৬। কুরআনের মোট সূরা ১১৪ = ১৯.৬। ১১৪ থেকে ৯৬ পর্যন্ত মোট সূরার সংখ্যা ১৯।
সর্ব শেষ নাযিলকৃত সূরার শব্দ সংখ্যা ১৯। প্রথম আয়াতের অক্ষর সংখ্যা ১৯।
কুরআনের ১১৪টি সূরার ক্রমিক সংখ্যার যোগফল (১ + ২ + ৩ + ৪ + ... + ১১২ + ১১৩ + ১১৪) = ৬৫৫৫ = ১৯.৩৪৫। এভাবেও যোগ করা যায় (১১৪ + ১) ১১৪/২ = ৬৫৫৫ = ১৯.৩৪৫।
কুরআনে পূর্ণ সংখ্যা আছে ৩০টি। (১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৯, ২০, ৩০, ৪০, ৫০, ৬০, ৭০, ৮০, ৯৯, ১০০, ২০০, ৩০০, ১০০০, ২০০০, ৩০০০, ৫০০০, ৫০০০০, ১০০০০০)। এই ৩০টি সংখ্যার যোগফল = ১৬২১৪৬ = ১৯.৮৫৩৪।
কুরআনের দশমিক সংখ্যাগুলি হলো-(১/২, ১/৩, ১/৪, ১/৫, ১/৬, ১/৮, ১/১০, এবং ২/৩)। মোট দশমিক সংখ্যা ৮টি। ১৯ এবং ৮ এর মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে। ১৯ হচ্ছে ৮ নম্বর প্রাইম নাম্বার। (২, ৩, ৫, ৭, ১১, ১৩, ১৭, ১৯)। কুরআনের মোট পূর্ণ সংখ্যা + মোট দশমিক সংখ্যা = (৩০+৮) = ৩৮ = ১৯.২।
১৯ হচ্ছে ৮ নম্বর প্রাইম নাম্বার। কুরআনে মাত্র একবার করে ১৯ এবং ৮ সংখ্যা দুটির উল্লেখ আছে। ১৯ আছে সূরা মুদ্দাসসির, ৭৪ : ৩০ নম্বর আয়াতে এবং ৮ আছে সূরা আল হাক্কক্কাহ ৬৯ : ১৭ নম্বর আয়াতে। সূরা দুটির ক্রমিক নম্বর এবং আয়াত নম্বরের যোগফল (৭৪ + ৩০ + ৬৯ + ১৭) = ১৯০ = ১৯.১০। (লক্ষ্য করুন, ৩০ এবং ৮ সংখ্যা দুটি ১৯ এর গুণিতক না হলেও ১৯ রিলেটেড)।
মোকাত্তায়াত-কুরআনিক কোড যেমন (আলিফ, লাম, মীম, ইয়া, সীন, নুন) দিয়ে যেসব সূরা শুরু হয়েছে তাকে মোকাত্তায়াত বলে। মোকাত্তায়াত অক্ষর ১৪টি। অক্ষরের সংযুক্তি সেট ১৪টি। মোকত্তায়াত আছে ২৯টি সূরার শুরুতে, যাদের যোগফল (১৪ + ১৪ + ২৯) = ৫৭ = ১৯.৩।
মোকাত্তায়াত যুক্ত প্রথম এবং শেষ সূরা যথাক্রমে ২ নম্বর সূরা বাকারা এবং ৬৮ নম্বর সূরা কালাম। ২ থেকে ৬৮ পর্যন্ত সূরার সংখ্যা ৬৭। ৬৭ সংখ্যাটি ১৯ তম প্রাইম নাম্বার।
মোকাত্তায়াতযুক্ত ২৯ টি সূরার ক্রমিক নম্বর গুলির যোগফল (২ + ৩ + ৭ + ১০ + ১১ + ১২ + ১৩ + ১৪ + ১৫ + ১৯ + ২০ + ২৬ + ২৭ + ২৮ + ২৯ + ৩০ + ৩১ + ৩২ + ৩৬ + ৩৮ + ৪০ + ৪১ + ৪২ + ৪৩ + ৪৪ + ৪৫ + ৪৬ + ৫০ + ৬৮) = ৮২২। মোকাত্তায়াত সেট ১৪টি (৮২২ + ১৪) = ৮৩৬ = ১৯.৪৪।
মোকাত্তায়াত যুক্ত প্রথম এবং শেষ সূরার মাঝে ৩৮টি সূরা মোকাত্তায়াত বিহীন। ৩৮ = ১৯.২।
মোকাত্তায়াত যুক্ত প্রথম এবং শেষ সূরার মাঝে পালাক্রমে মোকাত্তায়াত যুক্ত এবং মোকাত্তায়াত বিহীন সূরার একটি সেট আছে। সেটের সংখ্যা ১৯।
কুরআনের ১৩টি সূরার শুরুতে রয়েছে মোকাত্তায়াত অক্ষর আলিফ। এই সূরাগুলির ক্রমিক সংখ্যার যোগফল (২ + ৩ + ৭ + ১০ + ১১ + ১২ + ১৩ + ১৪ + ১৫ + ২৯ + ৩০ + ৩১ + ৩২ = ২০৯ = ১৯.১১।
আয়াতে শুধুমাত্র মোকাত্তায়াত অক্ষর আছে, অন্য কোন শব্দ নেই, যেমন আলিফ, লাম, মীম, একটি আয়াত। হা, মীম, একটি আয়াত, এমন আয়াতের মোট সংখ্যা ১৯।
আল কুরআনে ১৯ এর কোড এমন ভাবে সুদৃঢ় যে, কুরআনের কোন একটি বাক্য, শব্দ, অক্ষরের বিচ্যুতি হলে ১৯ এর কোড থাকবে না। ১৯ এর কোড এই কিতাবকে সুরক্ষিত করেছে। ১১৪টি সূরা, ছয় হাজারের বেশী আয়াত, সাতাত্তর হাজারের বেশী শব্দ, তিন লক্ষাধিক অক্ষরের মধ্যে এক বার নয়, দুবার নয়, বার বার নয়, অগণিত অসংখ্য বার ১৯ এর ম্যাথ্মেটিকেল কোডের নিখুঁত, নির্ভুল, সুসংহত, সুবিন্যস্থ, সমন্বয় থাকা, মোটেই নিছক কাকতালীয় ঘটনা বা সিম্প্লি কো-ইন্সিডেন্স নয়। কুরআনের ৮৩ নম্বর সূরার ৯ এবং ২০ নম্বর আয়াতে দুই দুই বার বলা হয়েছে কিতাবুন মারকুম (গাণিতিক ভাবে) লিপিবদ্ধ কিতাব।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT